সূরা মারইয়াম (আয়াত: 9)
হরকত ছাড়া:
قال كذلك قال ربك هو علي هين وقد خلقتك من قبل ولم تك شيئا ﴿٩﴾
হরকত সহ:
قَالَ کَذٰلِکَ ۚ قَالَ رَبُّکَ هُوَ عَلَیَّ هَیِّنٌ وَّ قَدْ خَلَقْتُکَ مِنْ قَبْلُ وَ لَمْ تَکُ شَیْئًا ﴿۹﴾
উচ্চারণ: কা-লা কাযা-লিকা কা-লা রাব্বুকা হুওয়া ‘আলাইইয়া হাইয়িনুওঁ ওয়াকাদ খালাকতুকা মিন কাবলুওয়া লাম তাকুশাইআ-।
আল বায়ান: সে (ফেরেশতা) বলল, ‘এভাবেই’। তোমার রব বলেছেন, ‘এটা আমার জন্য সহজ। আমি তো ইতঃপূর্বে তোমাকে সৃষ্টি করেছি, তখন তুমি কিছুই ছিলে না’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৯. তিনি বললেন, এরূপই হবে। আপনার রব বললেন, এটা আমার জন্য সহজ; আমি তো আগে আপনাকে সৃষ্টি করেছি। যখন আপনি কিছুই ছিলেন না।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তিনি বললেন, ‘এভাবেই হবে, তোমার প্রতিপালক বলেছেন, ‘এটা আমার পক্ষে সহজ। ইতোপূর্বে আমিই তোমাকে সৃষ্টি করেছি যখন তুমি কিছুই ছিলে না।’
আহসানুল বায়ান: (৯) তিনি বললেন, ‘এই রূপই হবে; তোমার প্রতিপালক বললেন, এটা আমার জন্য সহজসাধ্য; আমি তো পূর্বে তোমাকে সৃষ্টি করেছি যখন তুমি কিছুই ছিলে না।’ [1]
মুজিবুর রহমান: তিনি বললেনঃ এরূপই হবে। তোমার রাব্ব বললেনঃ এটা আমার জন্য সহজসাধ্য; আমিতো পূর্বে তোমাকে সৃষ্টি করেছি যখন তুমি কিছুই ছিলেনা।
ফযলুর রহমান: তিনি বললেন, “তাই হবে। তোমার প্রভু বলছেন: এটা আমার পক্ষে সহজ। এর আগে আমি তোমাকেও তো সৃষ্টি করেছি, যখন তুমি কিছুই ছিলে না।”
মুহিউদ্দিন খান: তিনি বললেনঃ এমনিতেই হবে। তোমার পালনকর্তা বলে দিয়েছেনঃ এটা আমার পক্ষে সহজ। আমি তো পুর্বে তোমাকে সৃষ্টি করেছি এবং তুমি কিছুই ছিলে না।
জহুরুল হক: সে বললে -- "এমনটাই হবে যেমন তুমি ভাব, তোমার প্রভু বলেছেন -- 'এটি আমার জন্য সহজসাধ্য, আর আমি তো তোমাকে এর আগে সৃষ্টি করেছি যখন তুমি কিছুই ছিলে না’।"
Sahih International: [An angel] said, "Thus [it will be]; your Lord says, 'It is easy for Me, for I created you before, while you were nothing.' "
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৯. তিনি বললেন, এরূপই হবে। আপনার রব বললেন, এটা আমার জন্য সহজ; আমি তো আগে আপনাকে সৃষ্টি করেছি। যখন আপনি কিছুই ছিলেন না।(১)
তাফসীর:
(১) অস্তিত্বহীন অবস্থা থেকে অস্তিত্ব প্ৰদান করা এটা তো মহান আল্লাহরই কাজ। তিনি ব্যতীত কেউ কি সেটা করতে পারে? তিনি যখন চাইলেন তখন বন্ধ্যা যুগলের ঘরে এমন অনন্য নাম ও গুণসম্পন্ন সন্তান প্রদান করলেন। এভাবে আল্লাহ্ তা'আলা সবকিছুকেই অস্তিত্বহীন অবস্থা থেকে অস্তিত্বে নিয়ে আসেন। এর জন্য শুধু তাঁর ইচ্ছাই যথেষ্ট। মহান আল্লাহ বলেনঃ “মানুষ কি স্মরণ করে না যে, আমরা তাকে আগে সৃষ্টি করেছি। যখন সে কিছুই ছিল না?” [সূরা মারইয়াম: ৬৭] আরও বলেনঃ “কালপ্রবাহে মানুষের উপর তো এমন এক সময় এসেছিল যখন সে উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না।” [সূরা আল-ইনসান: ১] [দেখুন, ইবন কাসীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৯) তিনি বললেন, ‘এই রূপই হবে; তোমার প্রতিপালক বললেন, এটা আমার জন্য সহজসাধ্য; আমি তো পূর্বে তোমাকে সৃষ্টি করেছি যখন তুমি কিছুই ছিলে না।’ [1]
তাফসীর:
[1] ফিরিশতাগণ যাকারিয়া (আঃ)-এর বিস্ময় এই বলে দূর করলেন যে, আল্লাহ তোমাকে পুত্র সন্তান দেওয়ার ব্যাপারে ফায়সালা করে ফেলেছেন এবং তা তিনি অবশ্যই তোমাকে দান করবেন। আর আল্লাহর পক্ষে এটা মোটেই অসম্ভব নয়; কারণ যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন যখন তুমি কিছুই ছিলে না, তিনি তোমাকে বাহ্যিক কারণ না থাকা সত্ত্বেও সন্তান দিতে সক্ষম।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৭-১৫ নং আয়াতের তাফসীর:
পূর্বের আয়াতগুলোতে যাকারিয়া (عليه السلام) এর সন্তান লাভের দু‘আর কথা তুলে ধরা হয়েছে। অত্র আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা যাকারিয়া (عليه السلام)-এর দু‘আ কবূল করে সন্তান দিলেন এমনকি সন্তানের নামও রেখে দিলেন যে, তার নাম হবে ইয়াহইয়া। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَنَادَتْهُ الْمَلٰ۬ئِكَةُ وَهُوَ قَآئِمٌ يُّصَلِّيْ فِي الْمِحْرَابِ لا أَنَّ اللّٰهَ يُبَشِّرُكَ بِيَحْيٰي مُصَدِّقًاۭ بِكَلِمَةٍ مِّنَ اللّٰهِ وَسَيِّدًا وَّحَصُوْرًا وَّنَبِيًّا مِّنَ الصّٰلِحِيْن)
“অতঃপর ফেরেশতারা তাকে ডেকে বললেন: তখন তিনি মেহরাবে সালাতরত অবস্থায় ছিলেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাকে ইয়াহইয়ার সুসংবাদ দিচ্ছেন। তিনি হবেন আল্লাহর বাণীর সত্যায়নকারী, নেতা, প্রবৃত্তি দমনকারী এবং পুণ্যবান নাবীদের একজন।” (সূরা আলি-ইমরান ৩:৩৮-৩৯)
سَمِيًّا অর্থাৎ এ নামে পূর্বে আমি আর কারো নামকরণ করিনি। যাকারিয়া (عليه السلام) সুসংবাদ পেয়ে বললেন: হে আমার পালনকর্তা! কেমন করে আমার পুত্র হবে, অথচ আমার স্ত্রী বন্ধ্যা এবং আমি বার্ধক্যে উপনীত হয়ে গেছি। সূরা আলি ইমরানের ৪০ নং আয়াতও এ কথা বলা হয়েছে।
عَاقِرًا বলা হয় যে নারী বার্ধক্যের কারণে সন্তান জন্ম দিতে অক্ষম, আবার ঐ মহিলাকেও বলা হয়, যে প্রথম থেকেই বন্ধ্যা। এখানে বার্ধক্যের কারণে যে বন্ধ্যা তা-ই উদ্দেশ্য।
যাকারিয়া (عليه السلام) এর প্রশ্নের জবাবে ফেরেশতা বললেন, এভাবেই হবে। তোমার প্রভু বলে দিয়েছেন যে, এটা আমার জন্য খুবই সহজ। আমি তো ইতোপূর্বে তোমাকে সৃষ্টি করেছি, যখন তুমি কিছুই ছিলে না। সুতরাং যে আল্লাহ তা‘আলা কিছু ছাড়াই মানুষ সৃষ্টি করতে পারেন তিনি বৃদ্ধ বয়সেও সন্তান দিতে পারবেন।
যাকারিয়া (عليه السلام) বললেন: হে আমার পালনকর্তা! আমাকে একটি নিদর্শন প্রদান করুন। আল্লাহ তা‘আলা বললেন, তোমার নিদর্শন হচ্ছে, তুমি সুস্থাবস্থায় একটানা তিনদিন কারো সাথে কথা বলতে পারবে না। সূরা আলি ইমরানে বলা হয়েছে, ইশারা করা ছাড়া কথা বলতে পারবে না। অতঃপর তিনি কক্ষ থেকে বের হয়ে সম্প্রদায়ের নিকট আসলেন এবং তাদেরকে ইঙ্গিতে বললেন, সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহ তা‘আলার তাসবীহ পাঠ করার জন্য। سَوِيًّا অর্থ: পূর্ণ সুস্থ, অর্থাৎ কথা বলতে সক্ষম এমন সুস্থাবস্থায় কথা বলতে পারবে না।
যাকারিয়া (عليه السلام) এর দু‘আ অনুযায়ী যখন ছেলে ইয়াহইয়া (عليه السلام)-কে পেলেন আর ইয়াহইয়া (عليه السلام)-বুঝেন-শুনেন এমন বয়সে উপনীত হলেন তখন আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রতি ওয়াহী নাযিল করে বললেন, হে ইয়াহইয়া! দৃঢ়তার সাথে এ কিতাব ধারণ কর। (خُذِ الْكِتٰبَ بِقُوَّةٍ) অর্থাৎ তার ওপর আমল কর। কিতাব বলতে তাওরাতকে বা তাঁকে যে বিশেষ কিতাব দান করা হয়েছে তা বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার বিধি-বিধান সম্পর্কে প্রজ্ঞা ও পাণ্ডিত্য দান করেছেন। তখন তিনি ছোট বয়সের ছিলেন।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা ইয়াহইয়া (عليه السلام) এর বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন;
(১) শৈশবেই প্রজ্ঞা দান করা হয়েছে (২) তাঁকে নরম প্রকৃতি ও কোমলতা দান করেছেন, (৩) তিনি পূত-পবিত্র ছিলেন, (৪) তিনি অতীব তাক্বওয়াশীল, (৫) পিতা-মাতার প্রতি অনুগত এবং (৬) তিনি উদ্ধত ও অবাধ্য নন।
এছাড়াও সূরা আলি ইমরানে তাঁর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, (৭) তিনি সাক্ষ্য দিবেন আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশের সত্যতা সম্পর্কে, (৮) তিনি হবেন নেতা, (৯) তিনি নারীসঙ্গ মুক্ত হবেন, (১০) তিনি একজন সৎ কর্মশীল নাবী হবেন।
তাঁর উপরে শান্তি যেদিন তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন আর যেদিন তিনি মৃত্যুবরণ করবেন এবং যেদিন তাঁকে জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত করা হবে।
মানুষের তিনটি সময় কঠিন ও ভয়াবহ (১) যখন সে মায়ের গর্ভ থেকে পৃথিবীতে আসে, (২) যখন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে, (৩) যখন কবর থেকে জীবিত করা হবে এবং নিজেকে কিয়ামতের দিন ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি দেখবে। এ তিন সময়ই তাঁর জন্য থাকবে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে শান্তি।
অনেকে এ আয়াত থেকে দলীল গ্রহণ করে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর জন্মোৎসব বা ঈদে মীলাদুন্নাবী উদ্যাপন করে থাকে। তারা বলে: আল্লাহ তা‘আলা জন্মদিনের জন্য সালাম শব্দটি ব্যবহার করেছেন, তাই আমরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর জন্মদিনে সালাম দেয়ার জন্য ঈদে মীলাদুন্নাবী পালন করে থাকি। তাদের এ দাবী ভিত্তিহীন। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবদ্দশায় এরূপ কোনকিছুর প্রমাণ পাওয়া যায় না; এমনকি সাহাবী, তাবিঈদের যুগেও নয় যার অনুসরণ করা যায়। অতএব এগুলো স্পষ্ট বিদআত যা সর্বাবস্থায় বর্জনীয়। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে যাবতীয় বিদআতী কর্মকাণ্ড পরিহার করে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ মোতাবেক আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন!
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. মানুষের সকল অভাব পূরণ করে থাকেন একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা।
২. আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে অস্তিত্বহীনতা থেকে সৃষ্টি করেছেন।
৩. সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহ তা‘আলার তাসবীহ পাঠ করতে হবে।
৪. আল্লাহ তা‘আলার প্রতি দৃঢ় আস্থা ও সৎ আমল করে আহ্বান করলে তিনি আহ্বানে সাড়া দেন।
৫. ঈদে মীলাদুন্নাবী পালন করা কোন নেকীর কাজ নয়, যদি তা হত তাহলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবীগণ তা পালন করতেন। সুতরাং তা বর্জণীয় এবং পালন করা বিদ‘আত।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৮-৯ নং আয়াতের তাফসীর:
হযরত যাকারিয়া (আঃ) তাঁর প্রার্থনা কবুল হওয়ার ও নিজের সন্তান হওয়ার সুসংবাদ শুনে আনন্দ ও বিস্ময়ের সাথে জিজ্ঞেস করেন যে, বাহ্যতঃ তো এটা অসম্ব বলেই মনে হচ্ছে। কেননা স্বামী স্ত্রী উভয়ের দিক থেকেই শুধু নৈরাশ্যই বিরাজ করছে। স্ত্রী বন্ধ্যা, এই পর্যন্ত তার ছেলে মেয়েই হয়নি। আর তিনি শেষ পর্যায়ের বৃদ্ধ। তার অস্থি গুলিও তো মজ্জাহীন হয়ে গেছে। তিনি একেবারে শুষ্ক ডালের মত হয়ে গেছেন এবং তাঁর স্ত্রীও তো থুড়থুড়ে বুড়ী। কাজেই এমতাবস্থায় তাদের সন্তান হওয়া কি করে সম্ব? তাই, তিনি আনন্দিত ও বিস্মিত হয়েই বিশ্ব প্রতিপালকের কাছে এর অবস্থা জানতে চান। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “সমস্ত সুন্নাত আমার জানা আছে। কিন্তু আমি জানি না যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুহরে ও আসরে পড়তেন কিনা এবং এটাও জানি না যে, তিনি (আরবী) বলার পর (আরবী) বলতেন কি (আরবী) বলতেন। (এটা ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) ও ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
ফেরেশতারা উত্তরে বললেনঃ “আল্লাহ তাআলা তো এটা ওয়াদাই করেছেন যে, এই অবস্থাতেই এই স্ত্রী হতেই তিনি আপনাকে ছেলে দান করবেন। তার কাছে এ কাজ মোটেই কঠিন নয়। এর চেয়ে বেশী বিস্ময়কর এবং এর চেয়ে বড় শক্তির কাজ তো তোমরা স্বয়ং দেখেছে এবং সেটা হচ্ছে। তোমাদের নিজেদেরই অস্তিত্ব, যা কিছুই ছিল না, আল্লাহ তাআলাই বানিয়েছেন। সুতরাং যিনি তোমাদের সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তিনি কি তোমাদেরকে সন্তান দানে সক্ষম নন? যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিঃসন্দেহে মানুষের উপর কালের মধ্যে এমন একটি সময় অতীত হয়েছে, যখন সে কোন উল্লেখযোগ্য বস্তুই ছিল না।` (৭৬:১)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।