সূরা মারইয়াম (আয়াত: 77)
হরকত ছাড়া:
أفرأيت الذي كفر بآياتنا وقال لأوتين مالا وولدا ﴿٧٧﴾
হরকত সহ:
اَفَرَءَیْتَ الَّذِیْ کَفَرَ بِاٰیٰتِنَا وَ قَالَ لَاُوْتَیَنَّ مَالًا وَّ وَلَدًا ﴿ؕ۷۷﴾
উচ্চারণ: আফারাআইতাল্লাযী কাফারা বিআ-য়া-তিনা-ওয়াকা-লা লাঊতাইয়ান্না মা-লাওঁ ওয়া ওয়ালাদা-।
আল বায়ান: তুমি কি সেই ব্যক্তিকে দেখেছ* যে আমার আয়াতসমূহ অস্বীকার করে এবং বলে, ‘আমাকে অবশ্যই ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দেয়া হবে।’
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭৭. আপনি কি জেনেছেন (এবং আশ্চর্য হয়েছেন) সে ব্যক্তি সম্পর্কে, যে আমাদের আয়াতসমূহে কুফরী করে এবং বলে, আমাকে অবশ্যই ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দেয়া হবে।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তুমি কি লক্ষ্য করেছ সে ব্যক্তিকে যে আমার নিদর্শনসমূহকে প্রত্যাখ্যান করেছে আর সে বলে, ‘আমাকে অবশ্য অবশ্যই সম্পদ আর সন্তানাদি দেয়া হবে।’
আহসানুল বায়ান: (৭৭) তুমি কি লক্ষ্য করেছ তাকে, যে আমার আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করে এবং বলে, অবশ্যই আমাকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দেওয়া হবে।
মুজিবুর রহমান: তুমি কি লক্ষ্য করেছ তাকে, যে আমার আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করে এবং বলেঃ আমাকে ধন সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দেয়া হবেই।
ফযলুর রহমান: তুমি কি সেই লোকটিকে দেখেছো, যে আমার নিদর্শনসমূহ অবিশ্বাস করেছে আর বলেছে, “(আমি যদি পুনর্জীবিত হই তাহলে) অবশ্যই আমাকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দেওয়া হবে?”
মুহিউদ্দিন খান: আপনি কি তাকে লক্ষ্য করেছেন যে, আমার নিদর্শনাবলীতে বিশ্বাস করে না এবং বলেঃ আমাকে অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি অবশ্যই দেয়া হবে।
জহুরুল হক: তুমি কি তাকে দেখেছ যে আমাদের বাণীসমূহ অবিশ্বাস করে ও বলে -- "আমাকে আলবৎ ধনদৌলত ও সন্তানসন্ততি দেয়া হবে"?
Sahih International: Then, have you seen he who disbelieved in Our verses and said, "I will surely be given wealth and children [in the next life]?"
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৭৭. আপনি কি জেনেছেন (এবং আশ্চর্য হয়েছেন) সে ব্যক্তি সম্পর্কে, যে আমাদের আয়াতসমূহে কুফরী করে এবং বলে, আমাকে অবশ্যই ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দেয়া হবে।(১)
তাফসীর:
(১) খাব্বাব ইবনে আরত রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ তিনি ‘আস ইবনে ওয়ায়েল কাফেরের কাছে কিছু পাওনার তাগাদায় গেলে সে বললঃ তুমি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি ঈমান প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত আমি তোমার পাওনা পরিশোধ করব না। খাব্বাব জওয়াব দিলেনঃ এরূপ করা আমার পক্ষে কোনক্রমেই সম্ভবপর নয়, চাই কি তুমি মরে পুনরায় জীবিত হতে পার। আ’স বললঃ ভালো তো, আমি কি মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত হব? এরূপ হলে তাহলে তোমার ঋণ তখনই পরিশোধ করব। কারণ, তখনও আমার হাতে ধন-দৌলত ও সন্তান-সন্ততি থাকবে। [বুখারীঃ ১৯৮৫, ২০৯১, ২১৫৫, ২২৭৫ মুসলিমঃ ২৭৯৫] অর্থাৎ সে বলে, তোমরা আমাকে যতই পথভ্রষ্ট ও দুরাচার বলতে এবং আল্লাহর আযাবের ভয় দেখাতে থাকো না কেন আমি তো আজো তোমাদের চাইতে অনেক বেশী সচ্ছল এবং আগামীতেও আমার প্রতি অনুগ্রহ ধারা বর্ষিত হতে থাকবে। তাই আল্লাহ্ তা'আলা তাদের এ বিকৃত মনমানসিকতা উল্লেখ করে সেটার উত্তর দিয়ে বলেছেনঃ সে কিরূপে জানতে পারল যে, পুনরায় জীবিত হওয়ার সময়ও তার হাতে ধন-দৌলত ও সন্তান-সন্ততি থাকবে? সে কি উকি মেরে অদৃশ্যের বিষয়সমূহ জেনে নিয়েছে?
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৭৭) তুমি কি লক্ষ্য করেছ তাকে, যে আমার আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করে এবং বলে, অবশ্যই আমাকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দেওয়া হবে।
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৭৩-৮০ নং আয়াতের তাফসীর:
(أَيُّ الْفَرِيْقَيْنِ خَيْرٌ)
কোন দল বলতে মু’মিন ও কাফিরদের দুটি দলকে বুঝানো হয়েছে। কাফিররা দুনিয়ায় স্বাচ্ছন্দ্যে ও আরাম-আয়েশে জীবন যাপন করে থাকে আর মু’মিনরা কষ্টে বসবাস করে থাকে, যার ফলে কাফিররা মু’মিনদেরকে বলত, আমরাই (কাফিররা) শ্রেষ্ঠ দল। যদি তাই না হত তাহলে আমরা দুনিয়ায় আনন্দে থাকতাম না।
তারা বলত:
(وَقَالُوْا نَحْنُ أَكْثَرُ أَمْوَالًا وَّأَوْلَادًا لا وَّمَا نَحْنُ بِمُعَذَّبِيْنَ)
“তারা বলত: আমরা ধনে-জনে সমৃদ্ধশালী; সুতরাং আমাদেরকে কিছুতেই শাস্তি দেয়া হবে না।” (সূরা সাবা ৩৪:৩৫)
তাদের এ কথার জবাবে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, সম্পদে ও ক্ষমতায় অধিক হলেই তারা শ্রেষ্ঠ নয়। বরং এরূপ অনেক সম্পদশালী জাতিকে আল্লাহ তা‘আলা ধ্বংস করে দিয়েছেন। সুতরাং এরাও যখন শাস্তি প্রাপ্ত হবে তখন বুঝতে পারবে কারা ছিল মান-মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ ও কাদের প্রতিদান উত্তম। দুনিয়াতে তাদেরকে অপরাধ করার জন্য অবকাশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِيْنَ كَفَرُوْآ أَنَّمَا نُمْلِيْ لَهُمْ خَيْرٌ لِّأَنْفُسِهِمْ ط إِنَّمَا نُمْلِيْ لَهُمْ لِيَزْدَادُوْآ إِثْمًا ج وَلَهُمْ عَذَابٌ مُّهِيْنٌ)
“যারা কুফরী করেছে তারা যেন এটা ধারণা না করে যে, আমি তাদেরকে যে সুযোগ দিয়েছি, তা তাদের জীবনের জন্য কল্যাণকর; বরং এ জন্যই আমি তাদেরকে অবকাশ প্রদান করি যাতে তাদের পাপ বৃদ্ধি পায় এবং তাদের জন্য অপমানকর শাস্তি রয়েছে।” (সূরা আলি-ইমরান ৩:১৭৮)
(وَالْبٰقِيٰتُ الصّٰلِحٰتُ)
অর্থাৎ দুনিয়ার সকল বস্তু শেষ হয়ে যাবে শুধু অবশিষ্ট থাকবে মানুষের সৎ আমল। যেমনটি সূরা কাহফের ৪৬ নং আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে।
আর এখানে সৎ আমল বলতে বুঝানো হয়েছে সালাত, সিয়াম, হাজ্জ, যাকাত যাবতীয় ভাল কাজগুলোকে।
(عَهْدًا..... أَفَرَأَيْتَ الَّذِيْ) শানে নুযূল:
সাহাবী খাব্বাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, জাহেলি যুগে আমি একজন কর্মকার (কামার) ছিলাম। ‘আস বিন অয়েলের নিকট আমার কিছু ঋণ পাওনা ছিল। আমি তার নিকট আসলাম তা নেয়ার জন্য। সে বলল: তুমি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে অস্বীকার না করা পর্যন্ত আমি এ পাওনা শোধ করব না। তখন আমি বললাম: আমি অস্বীকার করব না আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে মৃত্যু দিয়ে পুনরায় জীবিত না করা পর্যন্ত। তখন সে বলল: আমাকে ছেড়ে দাও মৃত্যুর পর জীবিত না হওয়া পর্যন্ত। তখন আমাকে সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দেয়া হবে আর তা দিয়ে তোমার পাওনা শোধ করব। তখন এ আয়াতদ্বয় নাযিল হয়। (সহীহ বুখারী: ২০৯১, ২২৭৫, সহীহ মুসলিম: ২৭৯৫)
তাদের এ কথার জবাবে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, এটা মোটেও সত্য নয়। বরং তারা কিয়ামতের দিনে আমার নিকট একা একা আসবে। সেখানে তাদের কোন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি থাকবে না।
সুতরাং যারা এরূপ বিশ্বাস রাখবে বুঝতে হবে তাদের ধারণা বা বিশ্বাস ভুল। তাই আমাদেরকে এরূপ বিশ্বাস করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. দুনিয়াতে আরাম-আয়েশে থাকা মানে এ নয় যে, সে-ই শ্রেষ্ঠ।
২. আল্লাহ তা‘আলা মু’মিনদের জন্য হিদায়াত আরো বৃদ্ধি করে দেন।
৩. কিয়ামতের মাঠে মানুষ একা একা আসবে, কেউ তার সঙ্গে থাকবে না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৭৭-৮০ নং আয়াতের তাফসীর:
হযরত খাব্বাব ইবনু আরত (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি একজন কর্মকার ছিলাম। আ’স ইবনু ওয়ায়েলের উপর আমার কিছু ঋণ ছিল। আমি তাকে তাগাদা করতে গেলে সে বলেঃ “আমি তো তোমার ঋণ ঐ পর্যন্ত পরিশোধ করবো না, যে পর্যন্ত না তুমি হযরত মুহাম্মদের (সঃ) আনুগত্য পরিত্যাগ করবে।` আমি বললামঃ আমি তো এই কুফরী ঐ পর্যন্ত করতে পারবো না, যে পর্যন্ত না তুমি মরে গিয়ে পুনরুজ্জীবিত হবে। ঐ কাফির তখন বললোঃ “ঠিক আছে, তাই হলো। যখন আমি মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবিত হবো, তখন আমি আমার মাল ও সন্তান সন্ততি অবশ্যই প্রাপ্ত হবো। তখন তুমি এসো, তোমার ঋণ পরিশোধ করে দেবো।` ঐ সময়। এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (এটা ইমাম আহমদ (রঃ) কানা করেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিম (রঃ) এটা তখেরীজ করেছেন) অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, হযরত খাব্বাব ইবনু আরত (রাঃ) বলেছিলেনঃ “আমি মক্কায় আস ইবনু ওয়ায়েলের একটি তরবারী বানিয়ে দিয়েছিলাম। আমার পারিশ্রমিক ধারে ছিল।”
মহান আল্লাহ বলেনঃ সে কি অদৃশ্য সম্বন্ধে অবহিত হয়েছে অথবা দয়াময়ের নিকট হতে প্রতিশ্রুতি লাভ করেছে? আর একটি বর্ণনায় আছে যে, হযরত খাব্বাব (রাঃ) বলেনঃ “তার উপর আমার বহু দিরহাম পাওনা হয়ে গিয়েছিল। সে আমাকে যে উত্তর দেয়, তা আমি রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট বর্ণনা করলে এই আয়াতগুলি অবতীর্ণ হয়।
আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, কয়েকজন মুসলমানের ঋণ তার উপর ছিল। তারা ঐ ঋণের তাগাদা করলে সে বলেঃ “তোমাদের ধর্মে কি এটা নেই যে, জান্নাতে স্বর্ণ, রৌপ্য, রেশম, ফল, ফুল ইত্যাদি পাওয়া যাবে?” উত্তরে তারা বলেঃ “হাঁ, আছে তো।” সে তখন বলেঃ “তা হলে তো আমি সেখানে এ সব জিনিস অবশ্যই পাবো। সেখানে আমি তোমাদের পাওনা পরিশোধ করে দেবো।' তখন (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলি অবতীর্ণ হয়।
(আরবী) শব্দের দ্বিতীয় কিরআত (আরবী) এর উপর পেশ দিয়েও রয়েছে। দুটোরই একই অর্থ। এটাও বলা হয়েছে যে, যবর দ্বারা এক বচন ও পেশ দ্বারা বহু বচনের অর্থ দেয়। কয়েস গোত্রের অভিধান এটাই। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।
আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে ঐ অহংকারকারীকে জবাব দেয়া হচ্ছেঃ তার কি অদৃশ্যের খবর রয়েছে? তার পরকালের পরিণাম সম্পর্কে সে কি কোন সংবাদ রেখেছে? সে কি করুণাময় আল্লাহর নিকট হতে কোন প্রতিশ্রুতি লাভ করেছে? সে কি আল্লাহর একত্ববাদকে স্বীকার করে নিয়েছে যে, এই কারণে তার জান্নাতী হওয়ার পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে?
(আরবী) এ বাক্য দ্বারা আল্লাহর একত্ববাদকে মেনে নেয়াই উদ্দেশ্য।
এরপর মহান আল্লাহ তার কথাকে গুরুত্বের সাথে অস্বীকার করে বলছেনঃ কখনই নয়! সে যা বলে, আমি তা লিখে রাখবো এবং তার শাস্তি বৃদ্ধি করতে থাকবো। তার সেখানে ধন-মাল ও সন্তান-সন্ততি প্রাপ্তি তো দূরের কথা, বরং তার দুনিয়ার ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততিও ছিনিয়ে নেয়া হবে। সে একাকী আমার এখানে হাজির হবে।
হযরত ইবনু মাসউদের (রাঃ) কিরআতে (আরবী) রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ সে যে বিষয়ের কথা বলে তা আমার অধিকারে থাকবে এবং তার আমলও আমার দখলে থাকবে। সে সবকিছু ছেড়ে শূন্য হস্তে একাকী আমার নিকট আসবে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।