আল কুরআন


সূরা মারইয়াম (আয়াত: 70)

সূরা মারইয়াম (আয়াত: 70)



হরকত ছাড়া:

ثم لنحن أعلم بالذين هم أولى بها صليا ﴿٧٠﴾




হরকত সহ:

ثُمَّ لَنَحْنُ اَعْلَمُ بِالَّذِیْنَ هُمْ اَوْلٰی بِهَا صِلِیًّا ﴿۷۰﴾




উচ্চারণ: ছু ম্মা লানাহনুআ‘লামুবিল্লাযীনা হুম আওলা-বিহা-সিলিইইয়া-।




আল বায়ান: উপরন্তু আমি সর্বাধিক ভাল জানি তাদের সম্পর্কে, যারা জাহান্নামে দগ্ধীভূত হবার অধিকতর যোগ্য।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭০. তারপর আমরা তো তাদের মধ্যে জাহান্নামে দগ্ধ হবার যারা সবচেয়ে বেশী যোগ্য তাদের বিষয় ভাল জানি।




তাইসীরুল ক্বুরআন: আর আমি অবশ্য অবশ্যই খুব ভাল করে জানি তাদের মধ্যে কারা জাহান্নামে দগ্ধ হওয়ার সর্বাধিক উপযুক্ত।




আহসানুল বায়ান: (৭০) তারপর আমি অবশ্যই তাদের মধ্যে যারা জাহান্নাম প্রবেশের অধিকতর যোগ্য তাদের বিষয়ে অধিক অবগত। [1]



মুজিবুর রহমান: তারপর আমিতো তাদের মধ্যে যারা জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হওয়ার অধিকতর যোগ্য তাদের বিষয় ভাল জানি।



ফযলুর রহমান: তারপর নিশ্চয়ই আমি তাদের সম্বন্ধেও সম্যক অবগত যারা জাহান্নামে দগ্ধ হওয়ার অধিক যোগ্য।



মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর তাদের মধ্যে যারা জাহান্নামে প্রবেশের অধিক যোগ্য, আমি তাদের বিষয়ে ভালোভাবে জ্ঞাত আছি।



জহুরুল হক: আর আমরা নিশ্চয় ভাল জানি তাদের যারা নিজেরাই সেখানে দগ্ধ হবার জন্যে সব চাইতে যোগ্য।



Sahih International: Then, surely it is We who are most knowing of those most worthy of burning therein.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৭০. তারপর আমরা তো তাদের মধ্যে জাহান্নামে দগ্ধ হবার যারা সবচেয়ে বেশী যোগ্য তাদের বিষয় ভাল জানি।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৭০) তারপর আমি অবশ্যই তাদের মধ্যে যারা জাহান্নাম প্রবেশের অধিকতর যোগ্য তাদের বিষয়ে অধিক অবগত। [1]


তাফসীর:

[1] صِلِيًا শব্দটি صَلَى يَصلى এর ‘মাসদার সাময়ী’ (শ্রুত ক্রিয়ামূল) যার অর্থ প্রবেশ করা। অর্থাৎ জাহান্নামে প্রবেশ করায় ও ওতে জ্বলে ভস্ম হওয়ার অধিক যোগ্য কারা, আমি তা ভালোই জানি।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৬৬-৭২ নং আয়াতের তাফসীর:



কিছু কিছু লোক কিয়ামত সংঘটিত হওয়া ও পুনরুত্থান দিবসকে অসম্ভব মনে করে। তাদের বিশ্বাস এটা হতে পারে না, আমরা মরে পচে গলে যাব, অতঃপর কিভাবে আমাদেরকে জীবিত করা হবে? তাই আল্লাহ তা‘আলা তাদের এরূপ বিশ্বাস ও চিন্তার জবাব দিয়ে বলেন, এটা আল্লাহ তা‘আলার নিকট অধিক সহজ। কারণ তিনি প্রথমবার নমুনা ছাড়াই অস্তিত্বহীন থেকে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। প্রথমবার সৃষ্টি করা কঠিন, নাকি দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা কঠিন? অবশ্যই প্রথমবার সৃষ্টি করা কঠিন। তাহলে যে আল্লাহ প্রথমবার সৃষ্টি করতে পারলেন তিনি কি দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করতে পারবেন না!



নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:



كَانَ رَجُلٌ يُسْرِفُ عَلَي نَفْسِهِ فَلَمَّا حَضَرَهُ المَوْتُ قَالَ لِبَنِيهِ: إِذَا أَنَا مُتُّ فَأَحْرِقُونِي، ثُمَّ اطْحَنُونِي، ثُمَّ ذَرُّونِي فِي الرِّيحِ، فَوَاللّٰهِ لَئِنْ قَدَرَ عَلَيَّ رَبِّي لَيُعَذِّبَنِّي عَذَابًا مَا عَذَّبَهُ أَحَدًا، فَلَمَّا مَاتَ فُعِلَ بِهِ ذَلِكَ، فَأَمَرَ اللّٰهُ الأَرْضَ فَقَالَ: اجْمَعِي مَا فِيكِ مِنْهُ، فَفَعَلَتْ، فَإِذَا هُوَ قَائِمٌ، فَقَالَ: مَا حَمَلَكَ عَلَي مَا صَنَعْتَ؟ قَالَ: يَا رَبِّ خَشْيَتُكَ، فَغَفَرَ لَهُ



তোমাদের পূর্বে জনৈক ব্যক্তি ছিল যে নিজের প্রতি জুলুম করেছে, যখন তার মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলো তখন সে তার ছেলেদেরকে বলল: আমি যখন মারা যাব তখন আমাকে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলবে, তারপর তা পিষে বাতাসে উড়িয়ে দেবে। আল্লাহর শপথ, আমার রব আমাকে যদি ধরতে সক্ষম হন তাহলে আমাকে এমন শাস্তি দেবেন যা অন্য কাউকে দেয়া হয়নি। যখন সে মারা গেল তা-ই করা হল। অতঃপর আল্লাহ জমিনকে আদেশ দিলেন, তোমার মাঝে তার দেহের যা আছে একত্রিত কর, সে তাই করল। অতঃপর লোকটি জীবিত হয়ে গেল। আল্লাহ বললেন: তুমি কেন এ কাজ করলে? সে বলল: হে রব! আপনাকে ভয় করে এ কাজ করেছি। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন। (সহীহ বুখারী হা: ৩৪৮১) লোকটির বিশ্বাস ছিল আমাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিলে আল্লাহ আমাকে ধরতে পারবে না। আল্লাহ তাকে একত্রিত করে দেখালেন। তাই আল্লাহ পরের আয়াতে শপথ করে বলেছেন: ‘সুতরাং শপথ তোমার প্রতিপালকের! আমি তাদেরকে এবং শয়তানদেরকেসহ একত্রে সমবেত করবই’



(لَنُحْضِرَنَّهُمْ حَوْلَ جَهَنَّمَ جِثِيًّا)



অর্থাৎ হাশরের ময়দানে প্রাথমিক অবস্থায় মু’মিন, কাফির সবাই জাহান্নামের চারদিকে সমবেত হয়ে থাকবে। সবাই ভীতবিহ্বল নতজানু অবস্থায় পড়ে থাকবে। এরপর মু’মিন মুত্তাকিদেরকে জাহান্নাম অতিক্রম করিয়ে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হবে। ফলে জাহান্নামের ভয়াবহ দৃশ্য দেখে আল্লাহ তা‘আলার বেশি বেশি প্রশংসা করবে।



(وَإِنْ مِّنْكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا)



“এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তা (পুলসিরাত) অতিক্রম করবে” হাসান বাসরী ও কাতাদাহ (রহঃ) বলেন: জাহান্নামের ওপর যে পুলসিরাত রয়েছে সেটা অতিক্রম না করে কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। এখানে যে ব্যক্তি পার হওয়ার অনুমতিসহ আসবে, সে ব্যক্তি অতিক্রম করবে। আর যে ব্যক্তি সেটা নিয়ে আসতে পারবেনা সে আটকে যাবে। (তাফসীর কুরতুবী, অত্র আয়াতের তাফসীর)।



এ পুলসিরাত অতি সূক্ষè ও অতীব ধারালো। জাহান্নামী ব্যক্তি পার হতে গিয়ে আটকে যাবে এবং জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। পক্ষান্তরে জান্নাতীগণ স্বাচ্ছন্দে চোখের পলকে পার হয়ে যাবে এবং কোনরূপ অগ্নিতাপ অনুভব করবে না যেমন পরের আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন। (সহীহ বুখারী হা: ৭৪৩৯, সহীহ মুসলিম হা: ১৮৩) আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সহজভাবে পুলসিরাত পার হওয়ার তাওফীক দান করুন! আমীন।



৮ম হিজরীর জুমাদাল উলা মাসে রোমকদের বিরুদ্ধে মুতার যুদ্ধে রওনা দেয়ার সময় প্রথম সেনাপতি আবব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রাঃ) কেঁদে ফেললেন। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কাদঁছেন কেন? উত্তরে তিনি বললেন: দেখ! আল্লাহ তা‘আলার শপথ! এর কারণ পৃথিবীর মায়া-মহব্বত কিংবা তোমাদের সঙ্গে আমার মধুর সম্পর্ক নয়, বরং আমি রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আল্লাহ তা‘আলার কিতাবের একটি আয়াত পড়তে শুনেছি যাতে জাহান্নামের কথা উল্লেখ রয়েছে। তা হল এ আয়াত। আমি জানিনা জাহান্নামের নিকট আগমনের পর কেমন করে ফিরে আসতে পারব? (আর রাহিকুল মাখতূম, পৃ: ৪৪৬)



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে অস্তিত্বহীন থেকে সৃষ্টি করেছেন।

২. মানুষকে কিয়ামতের দিন পুনরুত্থিত করা হবে এবং শয়তানকেও।

৩. মানুষকে নতজানু অবস্থায় জাহান্নামের সামনে উপস্থিত করা হবে। এবং জাহান্নামে দেয়া হবে।

৪. যারা জাহান্নামী ও যারা জান্নাতী সবাইকে পুলসিরাত অতিক্রম করতে হবে। তবে যারা মুত্তাকি তারা চোখের পলকে তা পার হয়ে যাবে। পার হওয়ার গতি ঈমান ও আমলের তারতম্য অনুপাতে হবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৬৬-৭০ নং আয়াতের তাফসীর:

কিয়ামতকে অস্বীকারকারী কতকগুলি লোক কিয়ামত সংঘটনকে অসম্ভব মনে করতো এবং মৃত্যুর পরে পুনরুজ্জীবন তাদের কাছে ছিল অবাস্তব। তারা ঐ কিয়ামতের এবং ঐ দিন নতুনভাবে দ্বিতীয়বারের জীবনের অবস্থা শুনে অত্যন্ত বিস্ময়বোধ করতো। যেমন কুরআন কারীমে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যদি তুমি বিস্মিত হও, তবে তাদের এই উক্তিটিও বিস্ময় মুক্ত নয়। আমরা যখন মাটি হয়ে যাবো, তখন কি আমরা (পুনরায়) নতুনভাবে

সৃষ্ট হবো?” (১৩:৫) সুরায়ে ইয়াসীনে আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ “সে আমার সম্বন্ধে উপমা রচনা করে, অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায়; বলেঃ অস্থিতে প্রাণ সঞ্চার করবে কে যখন তা পচে গলে যাবে? বলঃ ওর মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই যিনি ওটা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি প্রত্যেকটি সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত।` এখানেও কাফিরদের ঐ প্রতিবাদেরই উল্লেখ করা হয়েছে। তারা বলেঃ আমাদের মৃত্যু হয়ে গেলে আমরা কি জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হবো? জবাবে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ মানুষ কি স্মরণ করে না যে, আমি তাকে পূর্বে সৃষ্টি করেছি, যখন সে কিছুই ছিল না? তারা প্রথমবারের সৃষ্টিকে স্বীকার করছে আর দ্বিতীয়বারের সৃষ্টিকে অস্বীকার করছে? যখন তারা কিছুই ছিল না তখন যিনি তাদেরকে কিছু একটা করতে সক্ষম ছিলেন, তারপরে যখন তারা কিছু না কিছু এটা অবশ্যই হবে তখন কি তিনি নতুনভাবে তাদেরকে সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন না?” সুতরাং প্রথমবার সষ্টি করাতো দ্বিতীয়বারে সষ্টি করারই দলীল। যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন তিনি দ্বিতীয়বারও সৃষ্টি করবেন। আর দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করাতো প্রথমবারের সৃষ্টিকরার তুলনায় সহজ হয়ে থাকে।

সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আদম সন্তান আমাকে মিথ্য প্রতিপন্ন করছে, অথচ এটা তার জন্যে উপযুক্ত ছিল না। আদম সন্তান আমাকে কষ্ট দেয়, অথচ এটাও তার জন্যে সমীচীন নয়। আমাকে তার মিথ্যা প্রতিপন্ন করা এই যে, সে বলেঃ যেভাবে আল্লাহ আমাকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন সেভাবে তিনি আমাকে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করবেন না। অথচ এটা স্পষ্টভাবে প্রকাশমান যে, প্রথমবারের সৃষ্টি দ্বিতীয়বারের সৃষ্টির তুলনায় কঠিনতর। আর আমাকে তার কষ্ট দেয়া এই যে, সে বলেঃ আল্লাহর সন্তান রয়েছে। অথচ আমি এক ও অমুখাপেক্ষী। না আমার পিতামাতা আছে, না সন্তান সন্ততি আছে, না আমার সমতুল্য ও সমকক্ষ কেউ আছে। আমি আমার সত্তার শপথ করে বলছি যে, আমি তাদের সকলকেই জমা করবো এবং আমাকে ছাড়া যে সব শয়তানের তারা ইবাদত করতো তাদেরকেও আমি একত্রিত করবো। অতঃপর তাদেরকে জাহান্নামের সামনে আনয়ন করবো যেখানে তারা হাটুর ভরে পতিত হবে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তুমি প্রত্যেক উম্মতকে হাঁটুর ভরে পড়ে থাকতে দেখবে।” (৪৫:২৮) একটি উক্তি এও আছে যে, দাঁড়ানো অবস্থায় তাদের হাশর হবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ যখন সমস্ত প্রথম ও শেষের মানুষ একত্রিত হয়ে যাবে তখন আমি তাদের মধ্য হতে বড় বড় পাপী ও অবাধ্যদেরকে পৃথক করে দেবো। তাদের সরদার ও আমীর এবং যারা মন্দ ও অসৎ কাজ ছড়াতো, যারা তাদেরকে শিরক ও কুফরীর শিক্ষা দিতো এবং তাদেরকে পাপকার্যের দিকে আকৃষ্ট করতো তাদের সকলকেই আমি পৃথক করবো। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যখন সেখানে সবাই একত্রিত হয়ে যাবে তখন পরবর্তী লোকেরা পূর্ববর্তী লোকদের সম্পর্কে বলবেঃ এই লোকেরাই আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল, সুতরাং আপনি তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি প্রদান করুন। (৭:৩৮)।” এরপর খবরের উপর খবরের সংযোগ স্থাপন করে বলেনঃ সবচেয়ে বেশী শাস্তির যোগ্য কারা এবং কারা জাহান্নামের আগুণের উপযুক্ত তা আল্লাহ ভালভাবেই জানেন। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “প্রত্যেকের জন্যেই দ্বিগুণ শাস্তি, কিন্তু তোমরা জান না।” (৭:৩৮)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।