আল কুরআন


সূরা মারইয়াম (আয়াত: 45)

সূরা মারইয়াম (আয়াত: 45)



হরকত ছাড়া:

يا أبت إني أخاف أن يمسك عذاب من الرحمن فتكون للشيطان وليا ﴿٤٥﴾




হরকত সহ:

یٰۤاَبَتِ اِنِّیْۤ اَخَافُ اَنْ یَّمَسَّکَ عَذَابٌ مِّنَ الرَّحْمٰنِ فَتَکُوْنَ لِلشَّیْطٰنِ وَلِیًّا ﴿۴۵﴾




উচ্চারণ: ইয়াআবাতি ইন্নীআখা-ফুআইঁ ইয়ামাছছাকা ‘আযা-বুম মিনার রাহমা-নি ফাতাকূনা লিশশাইতা-নি ওয়ালিইইয়া-।




আল বায়ান: ‘হে আমার পিতা, আমি আশংকা করছি যে, পরম করুণাময়ের (পক্ষ থেকে) তোমাকে আযাব স্পর্শ করবে, ফলে তুমি শয়তানের সঙ্গী হয়ে যাবে।’




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৫. হে আমার পিতা! নিশ্চয় আমি আশংকা করছি যে, আপনাকে দয়াময়ের শাস্তি স্পর্শ করবে, তখন আপনি হয়ে পড়বেন শয়তানের বন্ধু।




তাইসীরুল ক্বুরআন: হে আমার পিতা! আমার ভয় হয় যে, দয়াময়ের ‘আযাব আপনাকে ধরে বসবে, তখন আপনি শয়তানের বন্ধু হয়ে যাবেন।’




আহসানুল বায়ান: (৪৫) হে আমার পিতা! নিশ্চয় আমি আশংকা করি, তোমাকে পরম দয়াময়ের শাস্তি স্পর্শ করবে এবং তুমি শয়তানের বন্ধু হয়ে পড়বে।’[1]



মুজিবুর রহমান: হে আমার পিতা! আমি আশংকা করি, তোমাকে আল্লাহর শাস্তি স্পর্শ করবে এবং তুমি শাইতানের সাথী হয়ে পড়বে।



ফযলুর রহমান: “বাবা! আমার তো ভয় হচ্ছে যে, তোমার ওপর আল্লাহর কোন আজাব আসবে এবং তুমি শয়তানের সঙ্গী হয়ে যাবে।”



মুহিউদ্দিন খান: হে আমার পিতা, আমি আশঙ্কা করি, দয়াময়ের একটি আযাব তোমাকে স্পর্শ করবে, অতঃপর তুমি শয়তানের সঙ্গী হয়ে যাবে।



জহুরুল হক: "হে আমার বাপুজি! আমি আলবৎ আশঙ্কা করি যে পরম করুণাময়ের কাছ থেকে শাস্তি তোমাকে স্পর্শ করবে, ফলে তুমি হয়ে পড়বে শয়তানের সঙ্গিসাথী।’



Sahih International: O my father, indeed I fear that there will touch you a punishment from the Most Merciful so you would be to Satan a companion [in Hellfire]."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৪৫. হে আমার পিতা! নিশ্চয় আমি আশংকা করছি যে, আপনাকে দয়াময়ের শাস্তি স্পর্শ করবে, তখন আপনি হয়ে পড়বেন শয়তানের বন্ধু।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৪৫) হে আমার পিতা! নিশ্চয় আমি আশংকা করি, তোমাকে পরম দয়াময়ের শাস্তি স্পর্শ করবে এবং তুমি শয়তানের বন্ধু হয়ে পড়বে।’[1]


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ, আমার ভয় হয় যে, যদি তুমি নিজ কুফরী ও শির্কে অটল থাকো, আর এই অবস্থায় যদি তোমার মৃত্যু এসে যায়, তাহলে আল্লাহর শাস্তি হতে তোমাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। অথবা পৃথিবীতেই তোমার উপর আল্লাহর আযাব এসে পতিত হবে এবং শয়তানের সঙ্গী হয়ে চিরদিনের মত আল্লাহর রহমত হতে বিতাড়িত হয়ে যাবে। ইবরাহীম (আঃ) নিজ পিতার সম্মান-সম্ভ্রম সম্পূর্ণ খেয়াল রেখে অত্যদিক নম্রতা ও শ্রদ্ধার সাথে তাওহীদের (এক আল্লাহর ইবাদতের) নসীহত শোনালেন। কিন্তু তাওহীদের এই সবক (পাঠ) যতই নরম ভাষা ও মধুর ভঙ্গিমায় বলা হোক না কেন, মুশরিকদের কাছে তা অসহনীয়ই হবে। অতএব মূর্তিপূজক পিতা এই নম্রতা ও ভালবাসা-মাখা সম্বোধনের জবাবে অত্যন্ত কটু ও কঠোর বাক্য দ্বারা একেশ্বরবাদী পুত্রকে বলল, ‘যদি তুমি আমার দেবদেবী থেকে বিমুখ হওয়া হতে ফিরে না এসো, তাহলে আমি তোমাকে পাথরের আঘাতে শেষ করে ফেলব।’


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৪১-৫০ নং আয়াতের তাফসীর:



উক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম (عليه السلام) তাঁর মূর্তিপূজক বাবাকে যেভাবে তাওহীদের প্রতি আহ্বান করেছিলেন সে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।



আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন, তিনি যেন তার উম্মাতের নিকট ইবরাহীম (عليه السلام)-এর দৃষ্টান্ত পেশ করেন। তিনি ছিলেন একজন সত্যবাদী নাবী। صِدِّيْقًا শব্দটি صدق থেকে উ™ূ¢ত, অর্থ হল অত্যন্ত বা পরম সত্যবাদী। যিনি কথায় ও কাজে কোন বিপরীত করেন না। সর্বদা সত্য কথা বলেন।



ইবরাহীম (عليه السلام) তাঁর পিতাকে মূর্তিপূজো করার কারণে কোন কর্কশ ভাষা ব্যবহার করেননি; বরং নম্র ভাষায় বললেন, হে আমার পিতা! আপনি কেন এমন কিছুর ইবাদত করেন, যে কোন কিছু শোনে না, দেখে না বরং কোন উপকারও করতে পারে না। যেমন অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম (عليه السلام) এর কথা তুলে ধরে বলেন: (إِذْ قَالَ لِأَبِيْهِ وَقَوْمِه۪ مَا تَعْبُدُوْنَ)‏ “সে যখন তার পিতা ও তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘তোমরা কিসের ইবাদত কর‎?’’ (সূরা শুয়ারা ২৬:৭০)



তিনি আরো বললেন, হে আমার পিতা! আমার কাছে এমন জ্ঞান এসেছে যা আপনার কাছে আসেনি। অতএব আপনি আমার অনুসরণ করুন। আমি আপনাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করব। অতঃপর তিনি বললেন: হে আমার পিতা! শয়তানের ইবাদত করবেন না। শয়তান দয়াময় আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্য; তাই তার আনুগত্য করে কেউ মুক্তি পাবে না।



আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(اَلَمْ اَعْھَدْ اِلَیْکُمْ یٰبَنِیْٓ اٰدَمَ اَنْ لَّا تَعْبُدُوا الشَّیْطٰنَﺆ اِنَّھ۫ لَکُمْ عَدُوٌّ مُّبِیْنٌ)



“আমি কি তোমাদেরকে নির্দেশ দেইনি হে বানী আদম! তোমরা শয়তানের ইবাদত কর না, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্র“।” (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৬০)



এরপর ইবরাহীম (عليه السلام) আবার তাঁর পিতাকে বললেন: হে আমার পিতা! আমি আশংকা করছি যে, আপনি যদি এ শির্ক করা অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেন তাহলে আল্লাহ তা‘আলার শাস্তি আপনাকে স্পর্শ করবে, ফলে আপনি শয়তানের বন্ধু হয়ে যাবেন। অতএব আপনি সতর্ক হোন।



ইবরাহীম (عليه السلام)-এর এ দাওয়াতে পিতা উত্তর দিল, হে ইবরাহীম! তুমি কি আমার মা‘বূদ হতে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ। যদি তুমি তোমার এরূপ কাজ থেকে নিবৃত্ত না হও তাহলে আমি অবশ্যই পাথর মেরে তোমাকে শেষ করে দেব। অতএব তুমি আমার সম্মুখ হতে চিরতরের জন্য দূর হয়ে যাও। পৃথিবীতে এর চেয়ে কষ্ট আর কী হতে পারে যেখানে ছেলে বাবাকে কল্যাণ ও মুক্তির দিকে আহ্বান করছে সেখানে নিজের সন্তানকে বাবা হত্যা করার হুমকি দিচ্ছে। ইবরাহীম (عليه السلام) তাঁর পিতার এ ধরণের কথা শুনেও রাগান্বিত হননি এবং আল্লাহ তা‘আলার গযব কামনা করেননি, বরং তিনি আরো নম্রভাবে বললেন: আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।



এ সালাম বলতে মুসলিম ব্যক্তি অপর মুসলিমদের দেখে যে সালাম দেয় তা উদ্দেশ্য নয়, বরং কারো সাথে বা অজ্ঞ ব্যক্তিদের সাথে কথা-কাটাকাটি হলে সুন্দর করে বিদায় জানানো। যেমন সূরা ফুরকানের ৬৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে।



(سَأَسْتَغْفِرُ لَكَ رَبِّيْ)



‘আমি আমার প্রতিপালকের নিকট আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব’ ইবরাহীম (عليه السلام) এর এ ক্ষমা প্রার্থনা ঐ সময় ছিল যখন মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা নিষেধ হওয়া সম্পর্কে জ্ঞান ছিল না। অতঃপর যখন তিনি জানতে পারলেন তখন সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেললেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা সূরা তাওবার ১১৪ নং আয়াতে উল্লেখ করেছেন।



আমি আমার পালনকর্তার নিকট আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব। নিশ্চয়ই তিনি আমার প্রতি দয়াবান। আর আমি পরিত্যাগ করছি আপনাদেরকে এবং আল্লাহ তা‘আলাকে ব্যতীত আপনারা যার ইবাদত করে থাকেন তাদেরকেও। আমি আমার পালনকর্তাকে আহ্বান করব। আমি আমার পালনকর্তাকে আহ্বান করে বঞ্চিত হব না।



অর্থাৎ যখন ইবরাহীম (عليه السلام) পিতা, স্বজন ও স্বদেশ ছেড়ে চলে এলেন তখন আল্লাহ তা‘আলা তাকে ইসহাক ও ইয়াকুব (عليه السلام)-কে দান করলেন। যাতে তাদের আদর-স্নেহে পিতাকে ছেড়ে আসার শোক ভুলে থাকতে পারেন।



সুতরাং একজন আল্লাহ তা‘আলার পথে আহ্বানকারী কাফির-মুশরিকদের আহ্বান করবেন শালীন ভাষায় ও নম্র-ভদ্র আচরণে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. আল্লাহ তা‘আলাকে ব্যতীত অন্য কোন বাতিল মা‘বূদের ইবাদত করা যাবে না।

২. দীনের তাবলীগ করতে হবে এবং সেক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করতে হবে। অধৈর্য হলে চলবে না।

৩. মানুষকে নম্রভাষায় দাওয়াত দিতে হবে। যেমন ইবরাহীম (عليه السلام) তাঁর পিতাকে দিয়েছেন।

৪. মানুষ দাওয়াত গ্রহণ না করলে তার সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হওয়া যাবে না। বরং তার জন্য আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করতে হবে তাকে হিদায়াত দান করার জন্য।

৫. হিদায়াতের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৪১-৪৫ নং আয়াতের তাফসীর:

মক্কার মুশরিকরা যারা মূর্তিপুজক ছিল এবং নিজেদেরকে হযরত ইবরাহীমের (আঃ) অনুসারী মনে করতো তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন এবং স্বীয় নবীকে (সঃ) বলছেনঃ হে নবী (সঃ)! তুমি তাদের সামনে স্বয়ং হযরত ইবরাহীম খলীলের (আঃ) ঘটনা বর্ণনা কর। এ সত্য নবী নিজের পিতাকেও পরওয়া করেন নাই। তার সামনে তিনি সত্যকে খুলে দিয়েছিলেন এবং তাকে মূর্তিপূজা হতে বিরত থাকতে বলেছিলেন। তাকে তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছিলেনঃ “যে মূর্তি তোমার কোন লাভ বা ক্ষতি করতে পারে তার পূজা কর কেন?

তিনি স্বীয় পিতাকে বলেছিলেনঃ “নিশ্চয়ই আমি তোমার পুত্র। কিন্তু আমার মধ্যে আল্লাহর দেয়া যে জ্ঞান রয়েছে তা তোমাদের মধ্যে নেই। তুমি আমার অনুসরণ করো। আমি তোমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করছি এবং আমি তোমাকে অকল্যাণের পথ হতে সরিয়ে কল্যাণের পথে পৌঁছিয়ে দেবো। হে আমার পিতা! মূর্তি পূজা দ্বারা তো শয়তানেরই অনুসরণ করা হয়। সে ঐ পথে পরিচালিত করে এবং এতে সে খুশী হয়। যেমন সূরায়ে ইয়াসীনে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি কি তোমাদেরকে সতর্ক করে দিই নাই হে অদিম সন্তানগণ (এবং হে জ্বিনগণ)! তোমরা শয়তানের পূজা করো না, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু!` (৩৬:৬০) আর এক আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তারা স্ত্রীলোকদেরকে ডেকে থাকে এবং আল্লাহকে পরিত্যাগ করে, প্রকৃত পক্ষে তারা উদ্ধত শয়তানকেই ডেকে থাকে।` (৪:১১৭)

হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতাকে আরো বলেনঃ শয়তান আল্লাহ তাআলার অবাধ্য ও বিরোধী। তার আনুগত্য স্বীকার করার ব্যাপারে সে অহংকারী। এ কারণেই সে মহান আল্লাহর দরবার হতে বিতাড়িত হয়েছে। যদি তুমিও এই শয়তানের আনুগত্য কর, তবে সে তোমাকেও তার অবস্থায় পৌঁছিয়ে দেবে। হে আমার পিতা! তেমাির এই শিরুক ও অবাধ্যতার কারণে আমি আশংকা করছি যে, হয়তো তোমার উপর আল্লাহর শাস্তি এসে পড়বে এবং তুমি শয়তানের বন্ধু ও সঙ্গী হয়ে যাবে। আর এর ফলে তোমার উপর থেকে আল্লাহর সাহায্য সহানুভূতি দূর হয়ে যাবে। দেখো, শয়তানের কোনই ক্ষমতা নেই। তার আনুগত্য করলে তুমি অতি জঘন্য স্থানে পৌঁছে যাবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “এটা নিশ্চিত ও শপথ যুক্ত কথা যে, তোমার পূর্ববর্তী উম্মতদের নিকট ও আমি রাসূল পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু শয়তান তাদের খারাপ কাজগুলিকে তাদের কাছে শোভনীয় ও সুন্দররূপে দেখিয়েছিল এবং সেই আজ তাদের সঙ্গী ও বন্ধু হয়ে যায় (কিন্তু সুফল কিছুই হলো না), তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (১৬:৬৩)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।