আল কুরআন


সূরা মারইয়াম (আয়াত: 16)

সূরা মারইয়াম (আয়াত: 16)



হরকত ছাড়া:

واذكر في الكتاب مريم إذ انتبذت من أهلها مكانا شرقيا ﴿١٦﴾




হরকত সহ:

وَ اذْکُرْ فِی الْکِتٰبِ مَرْیَمَ ۘ اِذِ انْتَبَذَتْ مِنْ اَهْلِهَا مَکَانًا شَرْقِیًّا ﴿ۙ۱۶﴾




উচ্চারণ: ওয়াযকুর ফিল কিতা-বি মারইয়াম । ইযিন তাবাযাত মিন আহলিহা-মাকা-নান শারকিইইয়া-।




আল বায়ান: আর স্মরণ কর এই কিতাবে মারইয়ামকে যখন সে তার পরিবারবর্গ থেকে পৃথক হয়ে পূর্ব দিকের কোন এক স্থানে চলে গেল।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৬. আর স্মরণ করুন। এ কিতাবে মারইয়ামকে, যখন সে তার পরিবারবর্গ থেকে পৃথক হয়ে নিরালায় পূর্ব দিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল,(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: এ কিতাবে (উল্লেখিত) মারইয়ামের কাহিনী বর্ণনা কর- যখন সে তার পরিবারবর্গ হতে আলাদা হয়ে পূর্ব দিকে এক জায়গায় আশ্রয় নিয়েছিল।




আহসানুল বায়ান: (১৬) (হে রসূল!) তুমি এই কিতাবে (উল্লিখিত) মারয়্যামের কথা বর্ণনা কর; যখন সে তার পরিবারবর্গ হতে পৃথক হয়ে নিরালায় পূর্ব দিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল।



মুজিবুর রহমান: বর্ণনা কর এই কিতাবে উল্লেখিত মারইয়ামের কথা, যখন সে তার পরিবারবর্গ হতে পৃথক হয়ে নিরালায় পূর্ব দিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল।



ফযলুর রহমান: কিতাবে (উল্লিখিত) মরিয়মের ঘটনা বর্ণনা করো; যখন সে তার পরিবার-পরিজন থেকে পৃথক হয়ে পূর্বদিকের এক জায়গায় ঠাঁই নিল।



মুহিউদ্দিন খান: এই কিতাবে মারইয়ামের কথা বর্ণনা করুন, যখন সে তার পরিবারের লোকজন থেকে পৃথক হয়ে পূর্বদিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল।



জহুরুল হক: আর গ্রন্থখানাতে মরিয়মের কথা স্মরণ করো -- যখন তিনি তাঁর পরিবারবর্গ থেকে সরে গিয়েছিলেন পুবদিকের এক জায়গায়,



Sahih International: And mention, [O Muhammad], in the Book [the story of] Mary, when she withdrew from her family to a place toward the east.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৬. আর স্মরণ করুন। এ কিতাবে মারইয়ামকে, যখন সে তার পরিবারবর্গ থেকে পৃথক হয়ে নিরালায় পূর্ব দিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল,(১)


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ পূর্বদিকের কোন নির্জন স্থানে চলে গেলেন। নির্জন স্থানে যাওয়ার কি কারণ ছিল, সে সম্পর্কে সম্ভাবনা ও উক্তি বিভিন্নরূপ বৰ্ণিত আছে। কেউ বলেনঃ গোসল করার জন্য পানি আনতে গিয়েছিলেন। কেউ বলেনঃ অভ্যাস অনুযায়ী ইবাদতে মশগুল হওয়ার জন্যে কক্ষের পূর্বদিকস্থ কোন নির্জন স্থানে গমন করেছিলেন। কেউ কেউ বলেনঃ এ কারণেই নাসারারা পূর্বদিককে তাদের কেবলা করেছে এবং তারা পূর্বদিকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে থাকে। [ইবন কাসীর]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৬) (হে রসূল!) তুমি এই কিতাবে (উল্লিখিত) মারয়্যামের কথা বর্ণনা কর; যখন সে তার পরিবারবর্গ হতে পৃথক হয়ে নিরালায় পূর্ব দিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল।


তাফসীর:

-


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৬-৪০ নং আয়াতের তাফসীর:



উক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা ঈসা (عليه السلام)-এর মা মারইয়াম (عليه السلام) সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।



আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এ কুরআনে মারইয়ামের কথা বর্ণনা করার নির্দেশ প্রদান করেছেন।



انْتَبَذَتْ এর আসল অর্থ: দূরে নিক্ষেপ করা। انتباذ এর অর্থ লোকালয় থেকে নিরালায় চলে আসা। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতের উদ্দেশ্যে পরিবার ও লোকালয় থেকে আলাদা হয়ে বায়তুল মুকাদদাসের পূর্ব দিকে পর্দা টাঙ্গিয়ে নিরালায় অবস্থান নিলেন।



এমন সময় আল্লাহ জিবরীল (عليه السلام)-কে পূর্ণাঙ্গ মানবাকৃতিতে প্রেরণ করলেন। سَوِيًّا অর্থ পূর্ণাঙ্গ একজন পুরুষ, যিনি সুন্দর ও উত্তম অবয়বের অধিকারী। মারইয়াম (عليه السلام) তাকে মানুষ মনে করে ভয় পেয়ে গেলেন, হয়তো কোন অসৎ উদ্দেশ্যে এখানে আগমন করেছে, তাই তিনি বললেন: তুমি যদি আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় কর তাহলে আমি তোমার থেকে করুণাময় আল্লাহ তা‘আলার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। জিবরীল (عليه السلام) বললেন: আপনি যা মনে করেছেন তা নয়, আমি আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রেরিত একজন দূত। আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে আপনাকে একটি পূতপবিত্র পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দান করার জন্য।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(إِنَّ اللّٰهَ يُبَشِّرُكِ بِكَلِمَةٍ مِّنْهُ ق لا اسْمُهُ الْمَسِيْحُ عِيْسَي ابْنُ مَرْيَمَ وَجِيْهًا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمِنَ الْمُقَرَّبِيْنَ )



“নিশ্চয়ই আল্লাহ তার পক্ষ থেকে এক কালিমার সুসংবাদ দিচ্ছেন, তার নাম হল মাসীহ, ঈসা ইবনু মারইয়াম। তিনি দুনিয়া এবং আখিরাতে সম্মানিত এবং নৈকট্যপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।” (সূরা আলি-ইমরান ৩:৪৫)



মারইয়াম বললেন, কিভাবে আমার সন্তান হবে? অথচ কোন পুরুষ আমাকে স্পর্শ (বৈধ উপায়ে সহবাস) করেনি এবং আমি ব্যভিচারিণীও নই। জিবরীল (عليه السلام) বললেন: এভাবেই হবে। অর্থাৎ যদিও গর্ভ ধারণের জন্য পুরুষের সাথে মিলন হওয়া আবশ্যক, তবুও এভাবে হবে। আপনার পালনকর্তা বলেছেন, এটা আমার জন্য সহজ ব্যাপার।



পৃথিবীর মানুষকে চার পদ্ধতিতে সৃষ্টি করা হয়েছে: ১. পিতা-মাতা ছাড়া, যেমন আদম (عليه السلام), ২. শুধু পুরুষ হতে যেমন হাওয়া (عليه السلام)-কে আদম থেকে, ৩. ঈসা (عليه السلام)-কে মা থেকে পিতা ছাড়া এবং ৪. পিতা-মাতার মাধ্যমে বাকী আদম সন্তান।



(اٰيَةً لِّلنَّاسِ)



অর্থাৎ ঈসা (عليه السلام)-কে মানুষের একটি নিদর্শন বানাবেন যা আল্লাহ তা‘আলার কুদরতের ওপর প্রমাণ বহন করে। যেমন সূরা আম্বিয়ার ৯১ নং আয়াতে বলা হয়েছে।



অতঃপর মারইয়াম গর্ভে সন্তান ধারণ করল এবং তৎসহ একটি দূরবর্তী স্থানে চলে গেল। এমতাবস্থায় প্রসব বেদনা তাকে একটি খেজুর বৃক্ষের মূলে আশ্রয় নিতে বাধ্য করল। তখন তিনি বললেন: হায়! আমি যদি এর আগেই মারা যেতাম এবং আমি যদি মানুষের স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেতাম। কেননা মানুষ সন্তান সম্পর্কে প্রশ্ন করলে কী জবাব দেব? সবাই জানে আমি বিবাহিতা নই, আমি একজন ইবাদতকারিণী, তাহলে সন্তান জন্ম নিল কিভাবে?



(نَسْيًا مَّنْسِيًّا)



অর্থ মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যাওয়া, অর্থাৎ আমি মারইয়াম নামে দুনিয়াতে কোন নারী ছিলাম তা যদি মানুষের স্মৃতিপট থেকে মুছে যেতাম। এমন সময় ফেরেশতা তাকে নিম্নদেশ থেকে আওয়াজ দিয়ে বলল, তুমি দুঃখ কর না। তোমার পালনকর্তা তোমার পাদদেশে একটি ঝর্ণাধারা সৃষ্টি করেছেন।



سَرِيًّا অর্থ ছোট নদী বা ঝরনা। رُطَبًا جَنِيًّا অর্থ সিক্ত পরিপক্ক খেজুর। অর্থাৎ পায়ের নিচে ঝরনা দিলেন, খেজুর গাছে নাড়া দিলে সিক্ত পরিপক্ক খেজুর পড়ে যাবে, এসব কিছু মু’জিযাহ বা কারামতস্বরূপ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বললেন: খাও, পান কর আর সন্তান দেখে চোখ জুড়াও।



আর যদি কোন মানুষকে তুমি দেখ, তবে তাকে বলে দিয়ো যে, আমি দয়াময় আল্লাহ তা‘আলার জন্য সিয়াম পালনের মানত করেছি। সুতরাং আমি আজ কারো সাথে কোন কথাই বলব না।



অতঃপর মারইয়াম (عليه السلام) সন্তান প্রসবের পর শারীরিক সুস্থতা ফিরে আসলে সন্তানকে নিয়ে সম্প্রদায়ের কাছে আসলেন। তারা বলল: হে মারইয়াম! তুমি তো এক অদ্ভূত কাণ্ড করে বসেছ। হে হারূনের বোন! তোমার পিতা কোন অসৎ ব্যক্তি ছিলেন না কিংবা তোমার মাতাও কোন ব্যভিচারিণী মহিলা ছিলেন না। সম্প্রদায়ের এ ধরণের কথা শুনে মারইয়াম তার সন্তানের দিকে ইঙ্গিত করল যে, এসব কথার জবাব সে দেবে। তারা বলল: এ কোলের শিশুর সাথে আমরা কেমন করে কথা বলব?



(أُخْتَ هٰرُوْنَ)



এখানে হারূন বলতে মূসা (عليه السلام) এর ভাই হারূন নয়, বরং হারুন বলতে বানী ইসরাঈলের কোন একজন সৎ ব্যক্তি, মারইয়াম তার সহোদর বোন ছিলেন। (আযওয়ারুল বায়ান)



ঈসা (عليه السلام) তখন বলে উঠল, আমি আল্লাহ তা‘আলার দাস। তিনি আমাকে কিতাব প্রদান করেছেন এবং আমাকে নাবী করেছেন। আমি যেখানেই থাকি না কেন তিনি আমাকে জোরালো নির্দেশ প্রদান করেছেন যতদিন আমি জীবিত থাকি ততদিন সালাত ও যাকাত আদায় করার জন্য এবং আমার মায়ের অনুগত থাকতে। আল্লাহ তা‘আলা আমাকে উদ্ধত ও হতভাগা করেননি। আমার প্রতি শান্তি ও শয়তানের সকল অনিষ্ট থেকে মুক্ত যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি আর যেদিন আমি মৃত্যুবরণ করব এবং যেদিন আমাকে জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত করা হবে। এটাই হল মারইয়াম পুত্র ঈসা (عليه السلام), আর এটাই হল সত্য কথা (যা উপরে বর্ণনা করা হয়েছে) যে বিষয়ে লোকেরা বিতর্ক করে থাকে।



আল্লাহ তা‘আলা এমন নন যে, তিনি সন্তান গ্রহণ করবেন (যেমন খ্রিস্টানরা বলে থাকে ঈসা আল্লাহ তা‘আলার পুত্র) তিনি এ ব্যাপারে মহান, পবিত্র।



আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(یٰٓاَھْلَ الْکِتٰبِ لَا تَغْلُوْا فِیْ دِیْنِکُمْ وَلَا تَقُوْلُوْا عَلَی اللہِ اِلَّا الْحَقَّﺚ اِنَّمَا الْمَسِیْحُ عِیْسَی ابْنُ مَرْیَمَ رَسُوْلُ اللہِ وَکَلِمَتُھ۫ﺆ اَلْقٰٿھَآ اِلٰی مَرْیَمَ وَرُوْحٌ مِّنْھُﺑ فَاٰمِنُوْا بِاللہِ وَرُسُلِھ۪ﺤ وَلَا تَقُوْلُوْا ثَلٰثَةٌﺚ اِنْتَھُوْا خَیْرًا لَّکُمْﺚ اِنَّمَا اللہُ اِلٰھٌ وَّاحِدٌﺚ سُبْحٰنَھ۫ٓ اَنْ یَّکُوْنَ لَھ۫ وَلَدٌ)



“মারইয়ামের ছেলে ‘ঈসা মসীহ তো আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর বাণী, যা তিনি মারইয়ামের নিকট প্রেরণ করেছিলেন ও তাঁর আদেশ। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণে ঈমান আন এবং বল না, ‘তিন!’ (তিনজন ইলাহ) নিবৃত্ত হও, এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর হবে। আল্লাহ তো একমাত্র ইলাহ; তাঁর সন্তান হবে তিনি এটা হতে পবিত্র।” (সূরা নিসা ৪:১৭১)



আর তিনি যে সকল কার্যকলাপ করেন তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তিনি এমন উপাস্য যখন তিনি কোন কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন বলেন, হও! এবং তা হয়ে যায়। যেমন পিতা ছাড়া ঈসা (عليه السلام)-এর জন্ম, সুতরাং সন্দেহ পোষণ করার কোন কিছুই নেই।



সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা কোন সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রী-পরিজন গ্রহণ করা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। ঈসা (عليه السلام) আরো বললেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা আমার পালনকর্তা ও তোমাদের পালনকর্তা। অতএব তোমরা তাঁর ইবাদত কর। আর এটাই হল সরল-সঠিক পথ। ঈসা (عليه السلام)-এর এ সকল কথা শুনেও একশ্রেণির লোকের বিশ্বাস হল না।



(فَاخْتَلَفَ الْأَحْزَابُ)



অর্থাৎ ইয়াহূদীরা ঈসা (عليه السلام)-এর ব্যাপারে বিভিন্ন দলে ও মতে বিভক্ত হয়ে গেল; কেউ বাড়াবাড়ি করে বলল: তিনিই আল্লাহ, কেউ বলল: তিনি আল্লাহ তা‘আলার সন্তান, কেউ বলল: তিনি তিনজনের একজন (আল্লাহ, মারইয়াম ও ঈসা)। কেউ নাবী বলে আখ্যায়িত করে না, বরং বলে থাকে: তিনি জারজ সন্তান যেমন ইয়াহূদীরা। সব কথাই বাতিল, যারাই এসব কথা বলে তারাই কুফরী করেছে। এভাবে তাদের মধ্যকার বিভিন্ন দল বিভিন্ন মত ও পথে বিভক্ত হয়ে গেল। সুতরাং কিয়ামত দিবসে তাদের জন্য থাকবে ধ্বংস ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। যেমন সূরা যুখরুফের ৬৩-৬৫ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে।



তাদের দলে দলে বিভক্ত হওয়ার ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে তিরস্কার করণার্থে বলেন দুনিয়াতে তারা সত্য কথা না শুনলেও, না দেখলেও কিয়ামতের দিন তারা চমৎকারভাবে শুনবে ও দেখবে, যেদিন তারা সবাই আমার নিকট আগমন করবে। আর তারা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে।



আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: কিয়ামত দিবসে মৃত্যুকে একটি ধূসর রঙের মেষের আকারে আনা হবে। তখন একজন সম্বোধনকারী ডাক দিয়ে বলবেন: হে জান্নাতবাসী! তখন তারা ঘাড়-মাথা উঁচু করে দেখতে থাকবে। আহ্বানকারী বলবেন: তোমরা কি একে চিন? তারা বলবে: হ্যাঁ, এ হল মৃত্যু। কেননা সকলেই তাকে দেখেছে। তারপর সম্বোধনকারী আবার ডাক দিয়ে বলবেন: হে জাহান্নামবাসী! জাহান্নামীরা মাথা উঁচু করে দেখতে থাকবে, তখন আহ্বানকারী বলবেন: তোমরা কি একে চিন? তারা বলবে: হ্যাঁ, এ তো মৃত্যু। কেননা তারা সকলেই তাকে দেখেছে। তারপর (সেটিকে) জবেহ করা হবে। আর ঘোষক বলবেন: হে জান্নাতবাসী! স্থায়ীভাবে এখানে থাক। তোমাদের মৃত্যু নেই। আর হে জাহান্নামবাসী চিরদিন এখানে থাক। তোমাদেরও মৃত্যু নেই। এরপর রাসূলুল্লাহ পাঠ করলেন: “তাদেরকে সতর্ক করে দাও পরিতাপের দিবস সম্বন্ধে, যখন সকল সিদ্ধান্ত‎ হয়ে যাবে। এখন তারা গাফিল এবং তারা বিশ্বাস করে না।”



সুতরাং আমাদের উচিত সত্যকে সত্য বলে মেনে নেয়া আর মিথ্যাকে বর্জন করা। কারণ আমাদের সকলকেই একদিন আল্লাহ তা‘আলার নিকট ফিরে যেতে হবে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. সকল ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই হাতে।

২. আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা করলে পিতা ছাড়াও সন্তান দান করতে পারেন।

৩. আল্লাহ তা‘আলা কোন স্ত্রী-পুত্র, পরিজন গ্রহণ করা থেকে পূতপবিত্র।

৪. আল্লাহ তা‘আলা চাইলে কোলের শিশুকেও কথা বলাতে পারেন। যেমন ঈসা (عليه السلام)।

৫. ঈসা (عليه السلام) ছিলেন বরকতস্বরূপ।

৬. সকলকে আল্লাহ তা‘আলার নিকট ফিরে যেতে হবে।

৭. ফেরেশতা মানবাকৃতি ধারণ করতে পারেন।

৮. মানুষের রিযিক নির্ধারণ করা থাকলেও তা অন্বেষণ করে নিতে হবে, যেমন মারইয়াম (عليه السلام)-কে নির্দেশ দেয়া হলো।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৬-২১ নং আয়াতের তাফসীর:

পূর্বে হযরত যাকারিয়ার (আঃ) ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছিল এবং এই বর্ণনা দেয়া হয়েছিল যে, হযরত যাকারিয়া (আঃ) পূর্ণ বার্ধক্যে উপনীত হওয়া পর্যন্ত সন্তানহীন ছিলেন। তার স্ত্রীর মধ্যে সন্তান লাভের কোন সম্ভাবনাই ছিল না। এই অবস্থায় আল্লাহ তাআলা নিজের ক্ষমতাবলে তাদেরকে সন্তান দান করেন। হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন, যিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও খোদাভীরু। এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ তাঁর এর চেয়েও বড় ক্ষমতার নিদর্শন পেশ করছেন। এখানে তিনি হযরত মারইয়ামের (আঃ) ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি ছিলেন চির কুমারী। কোন পুরুষ তাকে কখনো স্পর্শ করে নাই। এভাবে বিনা পুরুষেই আল্লাহ তাআলা স্বীয় পূর্ণ ক্ষমতাবলে তাঁকে সন্তান দান করেন। তার গর্ভে হযরত ঈসার (আঃ) জন্ম হয়, যিনি আল্লাহর মনোনীত নবী এবং তার রূহ ও কালেমা ছিলেন।

এই দু'টি ঘটনায় পূর্ণভাবে পারস্পরিক সম্বন্ধ রয়েছে বলে এখানে এবং সূরায়ে আল ইমরান ও সূরায়ে আম্বিয়াতেও এ দুটি ঘটনাকে মিলিতভাবে বর্ণনা করেছেন, যাতে বান্দা আল্লাহ তাআলার অতুলনীয় ক্ষমতা এবং ব্যাপক প্রতিপত্তি পর্যবেক্ষণ করে।
হযরত মারইয়াম (আঃ) হযরত ইমরানের কন্যা ছিলেন। তিনি ছিলেন হযরত দাউদের (আঃ) বংশধর। এই পরিবারটি বানী ইসরাঈলের মধ্যে পবিত্র পরিবার হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন। সুরায়ে আল-ইমরানে তার জন্মের বিস্তারিত বিবরণ গত হয়েছে। ঐ যুগের প্রথা অনুযায়ী হযরত মারইয়ামের (আঃ) মাতা তাঁকে বায়তুল মুকাদ্দাসের মসজিদে কুদৃসের খিদমতের জন্যে পার্থিব কাজ কর্ম হতে আযাদ করে দিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ তাঁর এই নর কবুল করেছিলেন। 'উত্তমরূপে তিনিহযরত মারইয়ামকে (আঃ) বড় করে তুলেছিলেন। তিনি আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী, দুনিয়ার প্রতি ঔদাসীন্য এবং সংযমী শীলতায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন। তার ইবাদত, আধ্যাত্মিক সাধনা ও তাকওয়ার কথা সর্বসাধারণের মুখে আলোচিত হতে থাকে। তাঁর লালন পালনের দায়িত্বভার তাঁর খালু হযরত যাকারিয়া (আঃ) গ্রহণ করেছিলেন। ঐ সময় তিনি ছিলেন বাণী ইসরাঈলের নবী। সমস্ত বাণী ইসরাঈল তাদের ধর্মীয় কাজে তাঁরই অনুসারী ছিল। হযরত যাকারিয়ার (আঃ) কাছে হযরত মারইয়ামের (আঃ) বহু অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পেয়ে ছিল। বিশেষ করে যখনই তিনি হযরত মারইয়ামের (আঃ) ইবাদত খানায় প্রবেশ করতেন, তখন তিনি তার কাছে নতুন ধরণের অমওসূমী ফল দেখতে পেতেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করতেনঃ “হে মারইয়াম! এই ফল কোথা হতে আসলো?` উত্তরে তিনি বলতেনঃ “এগুলি আল্লাহ তাআলার নিকট হতে এসেছে। তিনি এমন ক্ষমতাবান যে, যাকে ইচ্ছা করেন বে হিসেবে রিক দান করে থাকেন।

অতঃপর আল্লাহ তাআ'লা হযরত মারইয়ামের (আঃ) গর্ভে হযরত ঈসাকে (আঃ) সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন, যিনি পঁচিজন স্থির প্রতিজ্ঞ নবীদের একজন ছিলেন।

হযরত মারইয়াম (আঃ) মসজিদে কুদসের পূর্ব দিকে গমন করেন। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, হায়েয বা মাসিক ঋতুর কারণেই তিনি ঐ দিকে গিয়েছিলেন। অন্যদের মতে তিনি অন্য কোন কারণে গিয়েছিলেন। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আহলে কিতাবের উপর বায়তুল্লাহ মুখী হওয়া ও হজ্ব করা ফরয করা হয়েছিল। কিন্তু হযরত মারইয়াম (আঃ) বায়তুল মুকাদ্দাস হতে পুর্ব দিকে গমন করেছিলেন বলে তারা পূর্ব মুখী হয়েই নামায পড়তে শুরু করে দেয়। হযরত ঈসার (আঃ) জন্মস্থানকে তারা নিজেরাই কিবলা বানিয়ে নেয়। বর্ণিত আছে যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) যে জায়গায় গিয়েছিলেন সেটা ছিল ঐ জনদপ হতে দূরে এক নির্জন স্থান। কথিত আছে যে, সেখানে তার শস্যক্ষেত্র ছিল এবং তাতে তিনি পানি দিতে গিয়েছিলেন। একথাও বলা হয়েছে যে, সেখানে তিনি একটি কক্ষ বানিয়ে নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি জনগণ হতে পৃথক হয়ে নির্জনে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতেন। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।

যখন হযরত মারইয়াম (আঃ) জনগণ হতে পৃথক হয়ে দূরে চলে যান এবং তাদের মধ্যে ও তার মধ্যে আড়াল হয়ে যায় তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর কাছে ফেরেশতা হযরত জিবরাঈলকে (আঃ) প্রেরণ করেন। তিনি পূর্ণ মানবাকৃতিতে তার সামনে প্রকাশিত হন। এখানে ‘রূহ দ্বারা এই মর্যাদা সম্পন্ন ফেরেশতাকেই বুঝানো হয়েছে। যেমন কুরআন কারীমের (আরবী) এই আয়াতে রয়েছে।

হযরত উবাই ইবনু কা'ব (রাঃ) বলেন যে, রোযে আযলে যখন হযরত আদমের (আঃ) সমস্ত সন্তানের রূহসমূহের নিকট হতে তার প্রতিপালক হওয়ার স্বীকারোক্তি নিয়েছিলেন ঐ রূহগুলির মধ্যে হযরত ঈসার (আঃ) রহও ছিল। ঐ রূহকেই মানবাকৃতিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে হযরত মারইয়ামের (আঃ) নিকট পাঠানো হয়। ঐ রূহই তার সাথে কথা বলেন এবং তার দেহের মধ্যে প্রবেশ করেন। (কিন্তু এই উক্তিটি অস্বাভাবিক হওয়া ছাড়াও সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার্য। খুব সম্ভব এটা বাণী ইসরাঈলেরই উক্তি হবে)

হযরত মারইয়াম (আঃ) ঐ জনশূন্য স্থানে একজন অপরিচিত লোক দেখে মনে করেন যে, হয়তো কোন দুষ্ট প্রকৃতির লোক হবে। তাকে তিনি আল্লাহর ভয় দেখিয়ে বলেনঃ “আপনি খোদাভীরু লোক হলে তাকে ভয় করুন। আমি তারই কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।” তার চেহারার ঔজ্জ্বল্য দেখেই হযরত মারইয়াম (আঃ) বুঝে ফেলেছিলেন যে, তিনি ভাল লোকই হবেন এবং তিনি জানতেন যে, ভাল লোকের জন্যে আল্লাহর ভয়ই যথেষ্ট। ফেরেশতা হযরত মারইয়ামের (আঃ) ভয় ভীতি দূর করে দেয়ার জন্যে পরিষ্কার ভাবে বলেনঃ “আপনি অন্য কোন ধারণা করবেন না, আমি আল্লাহ তাআলার প্রেরিত ফেরেশতা।” বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলার নাম শুনেই হযরত জিবরাঈল (আঃ) কেঁপে উঠেন এবং নিজের প্রকৃতরূপ ধারণ করেন। আর বলে দেনঃ “ আমি আল্লাহর একজন দূত রূপে প্রেরিত হয়েছি। তিনি আমাকে এজন্যেই প্রেরণ করেছেন যে, তিনি আপনাকে একটি পবিত্র পুত্র সন্তান দান করবেন।”

(আরবী) এর দ্বিতীয় পঠন (আরবী) রয়েছে। প্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত কারী আবু উমার ইবনু আলার কিরআত এটাই। দুটো কিরআতেরই মতলব পরিষ্কার।

হযরত জিবরাঈলের (আঃ) এ কথা শুনে হযরত মারইয়াম (আঃ) আরো বেশী বিস্ময় প্রকাশ করে বলেনঃ “সুবহানাল্লাহ! আমরি সন্তান হওয়া কি করে সম্ব? আমার তো বিয়েই হয় নাই এবং কখনো কোন খারাপ খেয়াল আমার মনে জাগে নাই। আমার দেহ কখনো কোন পুরুষ লোক স্পর্শ করে নাই এবং আমি ব্যভিচারিণীও নই। সুতরাং আমার সন্তান হওয়া কেমন কথা।`

(আরবী) শব্দ দ্বারা ব্যভিচারিণীকে বুঝানো হয়েছে। হাদীসেও এই শব্দটি এই অর্থেই এসেছে। যেমন বলা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ব্যভিচারিণীর খরচা হারাম।

হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর এই বিস্ময় দূর করার জন্যে বলেনঃ “এটা সত্য বটে, তবে স্বামী ছাড়া বা অন্য কোন উপকরণ ও উপাদান ছাড়াও আল্লাহ তাআলা সন্তান দানে সক্ষম। তিনি যা চান তাই হয়। তিনি এই সন্তান ও এই ঘটনাকে মানুষের জন্যে একটা নিদর্শন বানাতে চান। এটা আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন হবে যে, তিনি সর্ব প্রকারের সষ্টির উপরই সক্ষম। হযরত আদমকে (আঃ) তিনি পুরুষ ও নারীর মাধ্যম ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন। হাওয়াকে (আঃ) তিনি সৃষ্টি করেছেন নারী ছাড়াই-শুধু পুরুষের মাধ্যমে। বাকী সমস্ত মানুষকে তিনি পুরুষ ও নারীর মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন। শুধু হযরত ঈসা (আঃ) এই নিয়মের ব্যতিক্রম। তিনি পুরুষ ছাড়াই শুধু নারীর মাধ্যমে সৃষ্ট হয়েছেন। সুতরাং মানব সৃষ্টির এই চারটি নিয়ম হতে পারে এবং সবটাই মহান আল্লাহ পুরো করে দেখিয়েছেন। এভাবে তিনি নিজের ব্যাপক ও পূর্ণক্ষমতা ও বিরাটত্বের দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। এটা বাস্তব কথা যে, তিনি ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ নেই এবং কোন প্রতিপালকও নেই। এই শিশু আল্লাহর রহমতরূপে পরিগণিত হবেন। তিনি তাঁর নবী হবেন। তিনি মানুষকে আল্লাহর ইবাদতের প্রতি আহবান করবেন।` অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “যখন ফেরেশতাগণ বললোঃ হে মারইয়াম (আঃ)! নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছেন একটি কালেমার যা আল্লাহর পক্ষ হতে হবে; তার নাম হবে মাসীহ্ ঈসা ইবনু মারইয়াম; সম্মানিত হবে ইহলোকে এবং পরলোকে, আর সান্নিধ্য প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। মানুষের সাথে কথা বলবে দোলনার মধ্যে এবং প্রাপ্ত বয়সে এবং সসভ্য লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ তিনি বাল্যাবস্থায় ও বৃদ্ধ বয়সে মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের প্রতি আহবান করবেন।

হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত মারইয়াম (আঃ) বলেনঃ “ঈসা (আঃ) আমার পেটে থাকা অবস্থায় যখন আমি নির্জনে থাকতাম তখন সে আমার সাথে কথা বলতো। আর যখন আমি লোকদের সাথে থাকতাম তখন সে তাসবীহ ও তাকবীর পাঠ করতো।` (এটা ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)

ঘোষিত হচ্ছেঃ এটাতো এক স্থিরকৃত ব্যাপার। খুব সম্ভব যে, এটাও হযরত জিবরাঈলেরই (আঃ) উক্তি। আবার এও হতে পারে যে, আল্লাহ তাআলার এই ফরমান রাসূলুল্লাহর (সঃ) মাধ্যমে ঘোষিত হয়েছে। আর এর দ্বারা রূহ ফুকে দেয়াই উদ্দেশ্য। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ “ইমরানের কন্যা মারইয়াম (আঃ), যে তার গুপ্তাঙ্গকে পবিত্র রেখেছিল এবং আমি তার মধ্যে আমার রূহ ফুকে ছিলাম।” সুতরাং এই বাক্যের ভাবার্থ হচ্ছেঃ এটা তো হয়েই যাবে। আল্লাহ তাআলা এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।