সূরা আল-কাহফ (আয়াত: 9)
হরকত ছাড়া:
أم حسبت أن أصحاب الكهف والرقيم كانوا من آياتنا عجبا ﴿٩﴾
হরকত সহ:
اَمْ حَسِبْتَ اَنَّ اَصْحٰبَ الْکَهْفِ وَ الرَّقِیْمِ ۙ کَانُوْا مِنْ اٰیٰتِنَا عَجَبًا ﴿۹﴾
উচ্চারণ: আম হাছিবতা আন্না আসহা-বাল কাহফি ওয়ার রাকীমি কা-নূমিন আ-য়া-তিনা‘আজাবা-।
আল বায়ান: তুমি কি মনে করেছ যে, গুহা ও রাকীমের* অধিবাসীরা ছিল আমার আয়াতসমূহের এক বিস্ময়?
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৯. আপনি কি মনে করেন যে, কাহফ(১) ও রাকীমের(২) অধিবাসীরা আমাদের নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর?(৩)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তুমি কি মনে কর যে, গুহা ও রকীমের অধিবাসীরা ছিল আমার নিদর্শনগুলোর মধ্যে বিস্ময়কর?
আহসানুল বায়ান: (৯) তুমি কি মনে কর যে, গুহা ও রাকীমের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর? [1]
মুজিবুর রহমান: তুমি কি মনে কর যে, গুহা ও রাকীমের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর?
ফযলুর রহমান: তুমি কি মনে করো যে, গুহা ও ফলকওয়ালারা আমার নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি বিস্ময় ছিল?
মুহিউদ্দিন খান: আপনি কি ধারণা করেন যে, গুহা ও গর্তের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর ছিল ?
জহুরুল হক: অথবা, তুমি কি মনে কর যে গুহার বাসিন্দারা ও লিখিত-ফলক আমাদের নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর?
Sahih International: Or have you thought that the companions of the cave and the inscription were, among Our signs, a wonder?
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৯. আপনি কি মনে করেন যে, কাহফ(১) ও রাকীমের(২) অধিবাসীরা আমাদের নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর?(৩)
তাফসীর:
(১) كهف এর অর্থ বিস্তীর্ণ পার্বত্য গুহা। বিস্তীর্ণ না হলে তাকে غار বলা হয়। [কুরতুবী]
(২) رقيم এর শাব্দিক অর্থ مرقوم বা লিখিত বস্তু। এ স্থলে কি বোঝানো হয়েছে, এ সম্পর্কে তাফসীরবিদগণের বিভিন্ন উক্তি বর্ণিত রয়েছে-
(এক) সাঈদ ইবন জুবাইর বলেন, এর অর্থ একটি লিখিত ফলক। সমসাময়িক বাদশাহ এই ফলকে আসহাবে কাহফের নাম লিপিবদ্ধ করে গুহার প্রবেশপথে বুলিয়ে রেখেছিল। এ কারণেই আসহাবে কাহফকে রকীমও বলা হয়।
(দুই) মুজাহিদ বলেন, রকীম সে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত উপত্যকার নাম, যাতে আসহাবে কাহফের গুহা ছিল।
(তিন) ইবন আব্বাস বলেন, সে পাহাড়টিই রকীম।
(চার) ইকরিমা বলেনঃ আমি ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমাকে বলতে শুনেছি যে, রকীম কোন লিখিত ফলকের নাম না কি জনবসতির নাম, তা আমার জানা নেই।
(পাঁচ) ক'ব আহবার, ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বেবাহ, ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন যে, রকীম রোমে অবস্থিত আয়লা অর্থাৎ আকাবার নিকটবর্তী একটি শহরের নাম। [ইবন কাসীর]
মূলতঃ আসহাবে কাহফ ও আসহাবে রকীম একই দলের দুই নাম, না তারা আলাদা দু’টি দল? এ মতভেদ নিয়েই উপরোক্ত মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। যদিও কোন সহীহ হাদীসে এ সম্পর্কে কোন সুস্পষ্ট বর্ণনা নেই, কিন্তু ইমাম বুখারী ‘সহীহ’ নামক গ্রন্থে আসহাবে কাহফ ও আসহাবে রকীমের দুটি আলাদা আলাদা শিরোনাম রেখেছেন। ইমাম বুখারীর এ কাজ থেকে বোঝা যায় যে, তার মতে আসহাবে কাহফ ও আসহাবে রকীম পৃথক পৃথক দু’টি দল। হাফেজ ইবনে হাজার ও অধিকাংশ তাফসীরবিদের মতে কুরআনের পূর্বাপর বর্ণনা অনুযায়ী আসহাবে কাহফ ও আসহাবে রকীম একই দল।
(৩) অর্থাৎ যে আল্লাহ্ এ আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, রাত-দিনের ব্যবস্থা করেছেন, সূর্য ও চন্দ্রকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্ররাজিকে তাদের কক্ষপথে পর্যন্ত ঘুম পাড়িয়ে রাখা তারপর তাদেরকে ঘুমাবার আগে তারা যেমন তর-তাজা ও সুস্থ-সবল ছিল ঠিক তেমনি অবস্থায় জাগিয়ে তোলা কি তোমরা কিছুমাত্র অসম্ভব বলে মনে কর? যদি চন্দ্র, সূর্য ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্পর্কে কেউ কখনো চিন্তা-ভাবনা করে তাহলে একথা কেউ মনে করতে পারে না যে, আল্লাহর জন্য এটা কোন কঠিন কাজ। মহান আল্লাহর জন্য তো এটা ক্ষুদ্র ব্যাপার। [দেখুন, ইবন কাসীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৯) তুমি কি মনে কর যে, গুহা ও রাকীমের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর? [1]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, এই একটাই বৃহৎ ও বিস্ময়কর নিদর্শন নয়, বরং আমার প্রতিটি নিদর্শনই বিস্ময়কর। আসমান ও যমীনের এই সৃষ্টি, তার ব্যবস্থাপনা, সূর্য, চন্দ্র ও অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রকে আয়ত্তাধীন করা এবং রাত ও দিনের পরিবর্তন ও অন্যান্য অসংখ্য নিদর্শন কি কম বিস্ময়কর? كَهْفٌ সেই গুহাকে বলা হয় যা পাহাড়ে থাকে। رَقِيم (রাকীম) কারো নিকট সেই গ্রামের নাম, যেখান থেকে এই যুবকরা গুহায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। কেউ বলেছেন, সেই পাহাড়ের নাম, যাতে ঐ গুহা ছিল। অনেকের মতে, رَقِيْمٌ মানে مَرْقُوْمٌ অর্থাৎ, লোহা অথবা সীসার তৈরী তক্তি যাতে গুহার অধিবাসীদের নাম অঙ্কিত ছিল। এটাকে رَقِيم (অঙ্কিত বা লিপিবদ্ধ)এ জন্য বলা হয় যে, এতে নাম লিপিবদ্ধ ছিল। বর্তমান তত্ত্ব-গবেষণা দ্বারা জানা যায় যে, প্রথম কথাটাই বেশী সঠিক। কারণ, যে পাহাড়ে এই গুহা রয়েছে, তার সন্নিকটেই রয়েছে একটি জনপদ, যেটাকে এখন الرقيب (আররাকীব) বলা হয়। বহুকাল অতিবাহিত হওয়ার কারণে الرقيم এর বিকৃত রূপ হয়েছে الرقيب (আররাক্বীব)।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৯-২৬ নং আয়াতের তাফসীর:
উক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা “আসহাবে কাহ্ফের” ঘটনা উল্লেখ করেছেন। এটা ছিল একটা আশ্চর্যজনক ঘটনা। কাহফ বলা হয় পাহাড়ের গুহাকে। সেখানে এই যুবকরা লুকিয়ে গিয়েছিল।
আর “রকীম” দ্বারা উদ্দেশ্য কী এ নিয়ে অনেক মতামত পাওয়া যায়। কেউ বলেছেন, কুকুরের নাম রকীম।
যহ’হাক (রহঃ) বলেন: “রকীম” হল ঐ উপত্যকার নাম যেখানে আসহাবে কাহ্ফরা ছিল।
মুজাহিদ (রহঃ) বলেন: “রকীম” একটা অট্টালিকার নাম।
ইমাম শানকিতী (রহঃ) বলেন: ভাষা ও কুরআনের অন্যান্য আয়াতের দৃষ্টিকোণ থেকে আমার কাছে সঠিক মনে হয় রকীম একটি কিতাবের নাম যা তাদের কাছে ছিল। এ কিতাবে তাদের শরয়ী বিধি-বিধান লেখা ছিল তারা যার অনুসরণ করত।
অথবা স্বর্ণের ফলক তাতে তাদের নাম, নসবনামা ও ঘটনা এবং গুহায় চলে যাওয়ার কারণ উল্লেখ ছিল। তবে সঠিক জ্ঞান আল্লাহ তা‘আলার কাছে।
আসহাবে কাহফ ও রকীম কি একই দলের নাম, না তারা আলাদা দুটি দল, নাকি অন্য কিছু এ ব্যাপারে কোন সহীহ হাদীস নেই। তবে ইমাম বুখারী আসহাবে কাহফ ও আসহাবে রকীমের দুটি আলাদা আলাদা শিরোনাম রেখেছেন। অতঃপর আসহাবে রকীম শিরোনামের অধীনে বানী ইসরাঈলের সে তিন ব্যক্তির ঘটনা নিয়ে এসেছেন যারা ঝড়ের কারণে গুহায় আশ্রয় নেয়, পরে গুহার মুখে পাথর পড়ার কারণে আটকে যায়। ইবনু হাজার আসকালানীসহ অধিকাংশ মুফাসসিরদের মতে কুরআনের পূর্বাপর বর্ণনা অনুযায়ী আসহাবে কাহফ ও রকীম একই দল।
“সংক্ষিপ্ত ঘটনা”
গুহায় আশ্রয় গ্রহণকারীরা ছিল কয়েকজন যুবক। তারা সত্য দীনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে হিদায়াত লাভ করে। এই যুবকরা তাঁদের দীনকে রক্ষা করার জন্য নিজেদের কওমের নিকট থেকে পালিয়ে গিয়ে গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করে। এই ভয়ে যে, না জানি তাঁদের কওমের লোকেরা তাঁদেরকে তাঁদের দীন থেকে বিভ্রান্ত করে ফেলে। সেখানে তাঁরা প্রার্থনা করেছিল যে, হে আল্লাহ তা‘আলা! আপনার পক্ষ থেকে আমাদের ওপর রহমত অবতীর্ণ করুন। আমাদেরকে আমাদের কওম হতে লুকিয়ে রাখুন এবং আমাদের এই কাজের পরিণতি ভাল করুন। অতঃপর তাঁরা সেখানে ঘুমিয়ে পড়ে আর এই ঘুমন্ত অবস্থায়ই বহু বছর অতিবাহিত হয়ে যায়। এরপর আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে জাগ্রত করেন। আর তখন তাদের মধ্যে কোন প্রকারের পরিবর্তন সাধিত হয়নি। তারা ঘুমানোর সময় তাদের দেহ, চুল, চামড়া যেরূপ ছিল ঘুম থেকে ওঠার পরও সেরূপই রয়েছে। তারা পরস্পর বলাবলি করতে লাগল। আচ্ছা বলত, আমরা কত সময় ঘুমিয়ে ছিলাম? উত্তরে বলা হয়: একদিন বা একদিনেরও কিছু কম। কেননা, সকালে তারা ঘুমিয়ে গিয়েছিল, আর যখন জেগে ওঠে তখন ছিল সন্ধ্যা। তাই তারা সূর্যের ওপর অনুমান করে এ কথা বলেছে। অবশেষে এর সঠিক সিদ্ধান্ত আল্লাহ তা‘আলার দিকে ন্যস্ত করে।
অতঃপর তারা তাদের ক্ষুধা মিটানোর জন্য তাদের মধ্য থেকে একজনকে মুদ্রাসহ বাজারে পাঠায় কিছু খাদ্য ক্রয় করে আনার জন্য এবং তাকে বলে দেয়, সে যেন খুব সতর্কতার সাথে কাজ করে। যতদূর সম্ভব জনগণের দৃষ্টি এড়িয়ে চলতে হবে, যাতে কেউ আমাদের খবর জানতে না পারে। কারণ যদি তারা আমাদের খবর জানতে পারে তাহলে কঠিন শাস্তি প্রদান করবে আর আমাদের দীনের ব্যাপারে বিভ্রান্ত করে ফেলবে। কারণ বাদশা দাকইয়ানুস, সে ছিল শির্কী মনোভাবাপন্ন এবং সে মূর্তিপূজা করত। আর তাঁরা এই মূর্তিপূজোকে মানতে পারেনি বলেই তাদের দীন রক্ষার জন্য গুহায় আশ্রয় নেয়, যাতে তাদের দ্বারা কোন শির্ক না হয়ে যায়। আর আল্লাহ তা‘আলা এ বিষয়ে তাদের মনকে আরো দৃঢ় চিত্ত করে দিলেন যাতে তারা ভয় না পায়। আল্লাহ তাদের এ গুহায় সূর্যের মাধ্যমে আলো প্রবেশ করাতেন।
মানুষেরা মনে করত যে, তারা জাগ্রত; মূলত তারা জাগ্রত ছিল না, তারা ছিল ঘুমন্ত। আর আল্লাহ এ অবস্থায়ই তাদের পার্শ্ব পরিবর্তন করাতেন ডানে ও বামে। আর তাদের সাথে একটি কুকুর ছিল। ঐ কুকুরটি তার সম্মুখের পা দু‘টি গুহার দ্বারে প্রসারিত করে রেখেছিল। মানুষেরা এই দৃশ্য দেখলে ভয় পেত। এটি ছিল একটি ভয়ানক দৃশ্য। তারা সে গুহায় ঐ ঘুমন্ত অবস্থায় তিনশত নয় বছর ছিল। আর তাদের সংখ্যা ছিল প্রথমে বলা হয় তিনজন ও চতুর্থজন ছিল তাদের কুকুর। পরবর্তীতে তা খণ্ডন করে বলা হয় পাঁচজন ষষ্ঠজন ছিল তাঁদের কুকুর। তবে তাদের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা ই ভাল জানেন এবং তারা কত বছর ঐ ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন তা-ও একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই ভাল জানেন। এভাবেই আল্লাহ স্বীয় ক্ষমতার বলে মানুষকে গুহাবাসীদের অবস্থা অবহিত করালেন। যাতে তারা আল্লাহ তা‘আলার ওয়াদা ও কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সত্যতার জ্ঞান লাভ করে।
এ কাহিনীর দুটি অংশ:
১. এ কাহিনীর আসল উদ্দেশ্য হল ইয়াহূদীদের প্রশ্নের জবাব দেয়া ও মুসলিমদেরকে তাওহীদ শিক্ষা দেয়া।
২. কাহিনীর ঐতিহাসিক ও ভৌগলিক পটভূমি উক্ত ঘটনাটি কোন্ কালে, কোন্ স্থানে ও জনপদে ঘটেছিল, কাফির বাদশাটি কে ছিল, তাদের সংখ্যা কত ছিল, তারা কতকাল ঘুমিয়েছিল, তারা কি এখনো জীবিত আছে, না মারা গেছে ইত্যাদি।
কুরআনুল কারীমে একজন নাবীর ঘটনা বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তিনি হলেন ইউসুফ (عليه السلام), সে সাথে মূসা (عليه السلام)-এর অনেক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু সম্পূর্ণ নয় যেমন ইউসুফ (عليه السلام)-এর ঘটনা এসেছে। এ ছাড়া কোন ঘটনার বিশদ বর্ণনা কুরআনে আসেনি। প্রত্যেক কাহিনীর ঐ অংশটুকুই বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করা হয়েছে যা মানবীয় হিদায়াত ও শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত। সুতরাং এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা অনর্থক, কোন প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন থাকলে আল্লাহ তা‘আলা নিজে অথবা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা বলে দিতেন।
সংক্ষিপ্ত তাফসীর:
(أَمْ حَسِبْتَ) অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! তুমি কি মনে করেছ আসহাবে কাহফ ও রকীমের ঘটনা আশ্চর্য ধরণের কোন নিদর্শন? না, বরং আকাশ-জমিন, চন্দ্র-সূর্য ও অন্যান্য বিশাল বিশাল মাখলূক সবই আল্লাহ তা‘আলার বড় বড় নিদর্শন যা আল্লাহ তা‘আলার বড়ত্ব ও মহত্বের ওপর প্রমাণ বহন করে। তিনি যা ইচ্ছা তাই করেন, তাঁেক কোন জিনিস অক্ষম করতে পারে না।
(وَّهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا)
অর্থাৎ নিজেদের দীন রক্ষার্থে গুহায় আশ্রয় নেয়া যুবকরা আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু’আ করে বলেছিল: সঠিক পথে পৌঁছার উপকরণ সহজ করে দিন এবং উভয় জগতের সফলতা দান করুন। এ অর্থও হতে পারে যে, আমাদের পরিণতি ভাল করে দিন।
(فَضَرَبْنَا عَلٰٓي اٰذَانِهِمْ)
অর্থাৎ কানে পর্দা সৃষ্টি করে দিলেন, যাতে বাইরের আওয়াজ তাদের কানে গিয়ে ঘুমের ব্যাঘাত সৃষ্টি না করে। কয়েক বছর বলতে ৩০৯ বছর। (তাফসীর সা‘দী)
এ দুটি দল বলতে তাদের মধ্যে যে দুটি দল মত বিরোধ করেছিল। যেমন ১৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে।
(وَزِدْنٰهُمْ هُدًي)
অর্থাৎ তারা যখন নিজেদের ঈমান রক্ষা করার জন্য গুহায় চলে গেল তাদেরকে দীনের ওপর অটল রাখার জন্য ঈমান বাড়িয়ে দিলাম।
(وَّرَبَطْنَا عَلٰي قُلُوْبِهِمْ)
যেহেতু আত্মীয়-স্বজন, সব কিছু বর্জন করে দেশের বাদশার বিরুদ্ধাচরণ করে চলে যেতে হচ্ছে, তাই জীবন নাশের আশঙ্কা অন্তরে প্রবেশ করতে পারে, তাই তাদের অন্তরকে ঈমানের সাথে বেঁধে দিলাম।
(إِذْ قَامُوْا)
অর্থাৎ এ দাঁড়ানো অধিকাংশ মুফাসসিরদের মতে বাদশার নিকট ছিল। তারা রাজ দরবারে দাঁড়িয়ে তাওহীদের ওয়াজ করছিল। কেউ কেউ বলেছেন, শহর থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়ে একে অপরকে তাওহীদের সে কথা শোনাতে লাগল যা এক এক করে প্রত্যেকের অন্তরে প্রবেশ করে দেয়া হয়েছিল এবং তারা সকলে একত্রিত হয়ে বেরিয়ে আসে।
(تَّزَاوَرُ عَنْ كَهْفِهِمْ ذَاتَ الْيَمِيْنِ)
অর্থাৎ সূর্য ওঠার সময় ডান দিকে এবং অস্ত যাবার সময় বাম দিকে পাশ কেটে চলে যায়। আর এভাবে উভয় সময়ে তাদের ওপর সূর্যের আলো পড়ত না। অথচ তারা গুহার প্রশস্ত চত্বরে আরামে অবস্থান করছিল। فَجْوَةٍ অর্থ প্রশস্ত স্থান।
أَيْقَاظًا শব্দটি يقظ এর বহুবচন, অর্থ জাগ্রত। رُقُوْدٌ শব্দটি راقد এর বহুবচন অর্থ ঘুমন্ত। অর্থাৎ তাদেরকে এ জন্য জাগ্রত মনে হচ্ছিল যে, তাদের চোখগুলো জাগ্রত ব্যক্তির মত খোলা ছিল। কেউ বলেছেন: খুব বেশি পার্শ্ব পরিবর্তন করার কারণে তাদরেকে জাগ্রত মনে হচ্ছিল।
(وَكَذٰلِكَ بَعَثْنٰهُمْ)
অর্থাৎ তাদেরকে যেভাবে আমি নিজ কুদরতে ৩০৯ বছর ঘুমের মধ্যে রেখেছিলাম তেমনি কত কাল অবস্থান করেছে তা জিজ্ঞেস করার জন্য জাগ্রত করেছি।
(لِيَعْلَمُوْآ أَنَّ وَعْدَ اللّٰهِ حَقٌ)
অর্থাৎ তাদেরকে আমি যেভাবে ৩০৯ বছর ঘুম পাড়ানোর পর জাগ্রত করেছি তেমনি দুনিয়ার জীবন অতিবাহিত করার পর মৃত্যুর পরে হাজার হাজার বছর অতিত হয়ে গেলেও হিসাব-নিকাশের জন্য পুনরুত্থিত করতে সক্ষম।
(إِذْ يَتَنَازَعُوْنَ بَيْنَهُمْ)
অর্থাৎ তাদের সম্পর্কে সে সময় অবগত করালেন যখন তারা মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের এবং কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে আপোসে বিতর্কে লিপ্ত ছিল।
(فَقَالُوا ابْنُوا عَلَيْهِمْ بُنْيَانًا)
‘তাদের ওপর সৌধ নির্মাণ কর।’ এ কথা কে বলেছিল? কেউ বলেছেন, সে যুগের ঈমানদারগণ। কেউ বলেছেন; বাদশা ও তার সাথের লোকেরা যখন সেখানে গিয়ে তাদের সাথে সাক্ষাত করল এবং এরপর আল্লাহ তা‘আলা পুনরায় তাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন। তখন বাদশা ও তার সাথীরা বলল: এদের হেফাযত করার জন্য একটি প্রাসাদ নির্মাণ কর।
(الَّذِيْنَ غَلَبُوْا عَلٰٓي أَمْرِهِمْ)
এ প্রবল দলটি ঈমানদার ছিল, না কাফির মুশরিক ছিল? ইমাম শাওকানী প্রথম মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ইবনু কাসীর দ্বিতীয় মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কারণ কবরকে মাসজিদে পরিণত করা নিষেধ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার লা‘নত, তারা তাদের নাবীদের কবরকে মাসজিদ হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। (সহীহ বুখারী হা: ৪৩৫) সুতরাং ঈমানদাররা এ কাজ করতে পারে না।
(سَيَقُوْلُوْنَ)
অর্থাৎ আসহাবে কাহফের সংখ্যা সম্পর্কে মতানৈক্য করেছিল রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগের আহলে কিতাবরা। তাই আয়াতের শেষের দিকে তাদের সংখ্যা সম্পর্কে আহলে কিতাবদেরকে জিজ্ঞেস করতে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নিষেধ করা হয়েছে।
(وَلَا تَقُوْلَنَّ لِشَیْءٍ)
এখানে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নির্দেশ দিয়ে উম্মাতের সকলকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের কোন কাজ করতে হলে এ কথা বলা যাবে না: আগামী কাল আমি এ কাজ করব। বরং বলবে: ইনশা-আল্লাহ তা‘আলা আগামীকাল এ কাজ করব। কারণ হতে পারে আগামী কাল সে উক্ত কাজ নাও করতে পারে।
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: সুলাইমান ইবনু দাউদ (عليه السلام) বলেছেন: অবশ্যই আমি আজ রাতে (আমার) সত্তরজন স্ত্রীর সাথে সহবাস করব। প্রত্যেক স্ত্রী একজন করে অশ্বারোহী মুজাহিদ গর্ভ ধারণ করবে। এরা আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় জিহাদ করবে। সুলাইমান (عليه السلام)-এর এক সাথী বলল: ইনশা-আল্লাহ বলেন। সুলাইমান (عليه السلام) তা বললেন না। অতঃপর একজন স্ত্রী ছাড়া বাকী আর কেউ গর্ভ ধারণ করেনি। সে একটি পুত্র সন্তান প্রসব করল এবং তারও একটি অঙ্গ ছিল না। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: যদি তিনি ইনশা-আল্লাহ বলতেন তাহলে সব স্ত্রীর গর্ভেই সন্তান জন্ম নিত এবং আল্লাহ তা‘আলার রাস্তায় জিহাদ করতো। (সহীহ বুখারী হা: ৩৪২৪, সহীহ মুসলিম হা: ১৬৫৪)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. যদি জনসমাজে থাকার ফলে ঈমান হারানোর আশঙ্কা থাকে তাহলে তা প্রত্যাখ্যান করা জায়েয।
২. আকাশ ও জমিনের প্রতিপালক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা।
৩. হিদায়াত আল্লাহ তা‘আলার হাতে অন্য কেউ হিদায়াতের মালিক নয়।
৪. যা না জানলে দীনের কোন ক্ষতি হবে না তা জানা আবশ্যক নয়।
৫. কিয়ামত অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।
৬. কবরের ওপর মাসজিদ বা সৌধ নির্মাণ করা যাবে না।
৭. কোন অনিশ্চিত বিষয় সম্পর্কে তর্ক বিতর্ক না করে আল্লাহ তা‘আলার দিকে ন্যস্ত করতে হবে।
৮. ভবিষ্যতের কোন কাজের ব্যাপারে অবশ্যই ইনশা-আল্লাহ তা‘আলা বলতে হবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৯-১২ নং আয়াতের তাফসীর:
আসহাবে কাহফের ঘটনা প্রথমে সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হচ্ছে, পরে বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করা হবে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “আসহাবে কাহফের এই ঘটনাটি আমার ক্ষমতা প্রকাশের অসংখ্য ঘটনাবলীর মধ্যে একটি সাধারণ ঘটনা মাত্র। এর চেয়ে বড় বড় ঘটনা দৈনন্দিন তোমাদের চোখের সামনে ঘটতে রয়েছে। আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি, দিবস ও রজনীর পরিবর্তন, সূর্য ও চন্দ্রের আনুগত্য ইত্যাদি হচ্ছে মহা ক্ষমতাবানের ক্ষমতার নিদর্শনসমূহ, যেগুলি এটাই প্রকাশ করছে যে, আল্লাহ তাআলা সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী। তিনি সব কিছুর উপরই পূর্ণ ক্ষমতাবান। তার কাছে কোন কিছুই কঠিন নয়। অসহাবে কাহফের চেয়ে তো বড় বড় বিস্ময়কর ঘটনা তোমাদের সামনেই বিদ্যমান রয়েছে। হে নবী (সঃ)! কিতাব ও সুন্নাহর যে জ্ঞান আমি তোমাকে দান করেছি তার গুরুত্ব আসহাবে কাহফের ঘটনা অপেক্ষা অনেক বেশী। অনেক হুজ্জত ও প্রমাণ আমি বান্দাদের উপর খুলে দিয়েছি যা আসহাবে কাহফের ঘটনা অপেক্ষা বেশী প্রকাশমান।
কাহফ বলা হয় পাহাড়ের গর্তকে। সেখানে এই যুবকরা লুকিয়ে গিয়েছিলেন। রাকীম’ হয় ঈলা পাহাড়ের পার্শ্ববর্তী একটি উপত্যকার নাম, না হয় ঐ জায়গায় একটি অট্টালিকার নাম, কিংবা কোন জনপদের নাম অথবা ঐ পাহাড়ের নাম। ঐ পাহাড়ের নাম নাজলুসও বলা হয়েছে এবং গুহার নাম বলা হয়েছে হায়রূম। ঐ যুবকদের কুকুরটির নাম হামরান বলা হয়েছে।
হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “সমস্ত কুরআন আমার জানা আছে, কিন্তু ‘হানান’ বা ‘আওয়াহ এবং রাকীম’ শব্দ সম্পর্কে আমার অবগতি নেই। আমার জানা নেই যে, রাকীম' কিতাবের নাম কি ঐ ভিত্তির নাম। তার থেকে আর একটি রিওয়াইয়াত বর্ণিত আছে যে, রাকীম' হচ্ছে কিতাব। সাঈদ (রঃ) বলেন যে, ওটা পাথরের একটি ফলক ছিল যার উপর আসহাবে কাফের ঘটনা লিখে ঐ গুহার দরজার উপর লাগিয়ে দেয়া হয়েছিল। আবদুর রহমান (রঃ) বলেন যে, কুরআন কারীমে (আরবী) রয়েছে অর্থাৎ চিহ্নিত লিখিত কিতাব। সুতরাং আয়াতের বাহ্যিক শব্দ দ্বারা এরই পৃষ্ঠ পোষকতা করা হচ্ছে। আর এটাই ইমাম ইবনু জারীরের (রঃ) পছন্দনীয় উক্তি (আরবী) এর ওযনে (আরবী) এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমনঃ (আরবী) এবং (আরবী) এর অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
এই যুবকরা তাদের দ্বীনকে রক্ষা করার জন্যে নিজেদের কওমের নিকট থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের ভয় ছিল যে, না জানি তারা তাদেরকে তাদের দ্বীন থেকে বিভ্রান্ত করে ফেলে। পালিয়ে গিয়ে তারা একটি পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারা প্রার্থনা করেছিলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনার পক্ষ থেকে আমাদের উপর রহমত নাযিল করুন। আমাদেরকে আমাদের কওম হতে লুকিয়ে রাখুন এবং আমাদের এই কাজের পরিণতি ভাল করুন।” হাদীসে একটি দুআ’য় রয়েছে “হে আল্লাহ! আমাদের ব্যাপারে আপনি যে ফায়সালা করবেন তার পরিণাম অমাদের জন্যে ভাল করুন।” মুসনাদে আহমাদে রয়েছে। যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর প্রার্থনায় আরজ করতেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমাদের সমস্ত কাজের পরিণাম ভাল করুন! আমাদেরকে দুনিয়ার লাঞ্ছনা ও আখেরাতের শাস্তি হতে বাঁচিয়ে নিন।
ঐ গুহায় প্রবেশ করে তাঁরা ঘুমিয়ে পড়েন এবং ঘুমের মধ্যেই বহু বছর অতিবাহিত হয়ে যায়। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জাগ্রত করেন। তাদের মধ্যে একজন দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) নিয়ে সওদা খরিদের উদ্দেশ্যে বাজাব্বে দিকে রওয়ানা হন, যেমন সামনে আসছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ
“পরে আমি তাদেরকে জাগ্রত করলাম এটা জানবার জন্যে যে, দুই দলের। মধ্যে কোন্টি তাদের অবস্থিতিকাল সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে।
(আরবী) শব্দের অর্থ হচ্ছে, সংখ্যা ব্য গণনা। আবার এই কথাও বলা হয়েছে যে, এই শব্দটি (আরবী) (শেষ সীমা)-এর অর্থেও এসে থাকে। আরব কবিরা তাদের কবিতার মধ্যেও এটাকে' (আরবী) এর অর্থেই প্রয়োগ করেছেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।