আল কুরআন


সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 81)

সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 81)



হরকত ছাড়া:

وقل جاء الحق وزهق الباطل إن الباطل كان زهوقا ﴿٨١﴾




হরকত সহ:

وَ قُلْ جَآءَ الْحَقُّ وَ زَهَقَ الْبَاطِلُ ؕ اِنَّ الْبَاطِلَ کَانَ زَهُوْقًا ﴿۸۱﴾




উচ্চারণ: ওয়া কুল জাআল হাক্কুওয়া যাহাকাল বা-তিলু ইন্নাল বা-তিলা কা-না যাহূকা-।




আল বায়ান: আর বল, ‘হক এসেছে এবং বাতিল বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় বাতিল বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮১. আর বলুন, হক এসেছে ও বাতিল বিলুপ্ত হয়েছে; নিশ্চয় বাতিল বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: বল, ‘সত্য এসে গেছে আর মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে, মিথ্যা তো বিলুপ্ত হওয়ারই।’




আহসানুল বায়ান: (৮১) আর বল, ‘সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলীন হয়েছে; নিশ্চয় মিথ্যা বিলীয়মান।’ [1]



মুজিবুর রহমান: আর বলঃ সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে; মিথ্যাতো বিলুপ্ত হয়েই থাকে।



ফযলুর রহমান: বল, “সত্য এসে গেছে আর মিথ্যা অবলুপ্ত হয়েছে। মিথ্যা তো অবলুপ্ত হওয়ারই কথা।”



মুহিউদ্দিন খান: বলুনঃ সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।



জহুরুল হক: আর বলো -- "সত্য এসেই গেছে আর মিথ্যা অন্তর্ধান করেছে। নিঃসন্দেহ মিথ্যা তো সদা অন্তর্ধানশীল।"



Sahih International: And say, "Truth has come, and falsehood has departed. Indeed is falsehood, [by nature], ever bound to depart."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৮১. আর বলুন, হক এসেছে ও বাতিল বিলুপ্ত হয়েছে; নিশ্চয় বাতিল বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।(১)


তাফসীর:

১. এই আয়াতটি হিজরতের পর মক্কা বিজয়ের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উচ্চারণ করেছিলেন। ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কায় প্রবেশ করেন, তখন বায়তুল্লাহর চতুৰ্পার্শ্বে তিনশ ষাটটি মূর্তি স্থাপিত ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সেখানে পৌঁছেন, তখন তাঁর মুখে এ আয়াতটি উচ্চারিত হচ্ছিল, এবং তিনি স্বীয় ছড়ি দ্বারা প্রত্যেক মূর্তির বক্ষে আঘাত করে যাচ্ছিলেন। [বুখারীঃ ২৪৭৮, ৪৭২০, মুসলিমঃ ১৭৮১]

সুতরাং সত্য প্রতিষ্ঠিত হলে মিথ্যা অপসৃত হবেই। অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, “কিন্তু আমি সত্য দ্বারা আঘাত হানি মিথ্যার উপর; ফলে তা মিথ্যাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং তৎক্ষণাৎ মিথ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। [সূরা আল-আম্বিয়াঃ ১৮] আরো বলেন, “বলুন, ‘সত্য এসেছে এবং অসত্য না পারে নূতন কিছু সৃজন করতে, আর না পারে পুনরাবৃত্তি করতে।” [সূরা সাবাঃ ৪৯] আরো বলেনঃ “আল্লাহ মিথ্যাকে মুছে দেন এবং নিজ বাণী দ্বারা সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেন। অন্তরে যা আছে সে বিষয়ে তিনি তো সবিশেষ অবহিত৷” [সূরা আশ-শূরাঃ ২৪]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৮১) আর বল, ‘সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলীন হয়েছে; নিশ্চয় মিথ্যা বিলীয়মান।’ [1]


তাফসীর:

[1] হাদীসে এসেছে যে, মক্কা বিজয়ের পর যখন নবী (সাঃ) কা’বাগৃহে প্রবেশ করেন, তখন সেখানে তিনশ’ ষাটটি মূর্তি রাখা ছিল। নবী (সাঃ)-এর হাতে ছিল একটি কাষ্ঠখন্ড বা লাঠি। তিনি তার ডগা দিয়ে মূর্তিগুলোকে খোঁচা দিচ্ছিলেন আর جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ..। এবং  جَاءَ الْحَقُّ وَمَا يُبْدِئُ الْبَاطِلُ وَمَا يُعِيدُ পড়ে যাচ্ছিলেন। (বুখারীঃ কিতাবুল মাযালিম, মুসলিমঃ কিতাবুল জিহাদ)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৭৮-৮১ নং আয়াতের তাফসীর:



পূর্বের আয়াতগুলোতে কাফির-মুশরিকদের চক্রান্ত ও অন্যান্য বিষয় আলোচনা করার পর অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্বোধন করে সকলকে সঠিক সময়ে সালাত আদায় করার নির্দেশ প্রদান করছেন সে সাথে সালাতের সময়সীমাও উল্লেখ করে দিয়েছেন।



(لِدُلُوْكِ الشَّمْسِ) – لِدُلُوْكِ



শব্দের অর্থ ঢলা বা ঢলে পড়া। অর্থাৎ সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে যাওয়ার পর সালাত আদায় কর। সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে যাওয়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যুহর ও আসরের সালাতের ওয়াক্ত। এবং غَسَقِ اللَّيْلِ অর্থ রাতের অন্ধকার অর্থাৎ সূর্যাস্তের পর রাতের অন্ধকার আগমন কালে মাগরিব ও এশার সালাত আদায় কর। আর قُرْاٰنَ الْفَجْرِ বলে ফজরের সালাতের কথা বুঝানো হয়েছে। ফজরের সালাতকে এজন্য কুরআন বলা হয়েছে, কারণ এতে লম্বা কিরাত পাঠ করা হয়।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَأَقِمِ الصَّلٰوةَ طَرَفَيِ النَّهَارِ وَزُلَفًا مِّنَ اللَّيْلِ ط إِنَّ الْحَسَنٰتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّاٰتِ ط ذٰلِكَ ذِكْرٰي لِلذّٰكِرِيْنَ) ‏



“তুমি সালাত কায়েম কর‎ দিবসের দু’ প্রান্তে রজনীর কিছু অংশ অতিবাহিত হওয়ার পর। সৎকর্ম অবশ্যই অসৎকর্ম মিটিয়ে দেয়। উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য এটা এক উপদেশ।” (সূরা হূদ ১১:১১৪)



এভাবে আল্লাহ তা‘আলা অত্র আয়াতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের সময়সীমা বর্ণনা করেছেন এবং বিশেষ করে ফজরের কথা উল্লেখ করেছেন। কেননা এ সময় ফেরেশতাগণ উপস্থিত হন। হাদীসে এসেছে, আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, একাকী সালাত আদায় করার চেয়ে জামা‘আতে সালাত আদায় করার মর্যাদা পঁচিশ গুণ বেশি। আর ফজরের সালাতের সময় দিনের ও রাতের ফেরেশতারা একত্রিত হয়। তোমরা ইচ্ছা করলে এ আয়াতটি তেলাওয়াত করতে পারে। (সহীহ বুখারী: ৪৭১৭, সহীহ মুসলিম: ৬৪৯)



অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলকে তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন।



তাহাজ্জুদ বলা হয়, রাতের শেষ প্রহরে ঘুম থেকে উঠে যে সালাত আদায় করা হয়। একে কিয়ামুল লাইলও বলা হয়। রমযান মাসে এ সালাতকেই তারাবীর সালাত বলা হয়।



نَافِلَةً لَّكَ শব্দের অর্থ আপনার জন্য অতিরিক্ত, এখানে نَافِلَةً এর অর্থ নিয়ে ইমামগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।



কেউ বলেন, এটা শুধুমাত্র রাসূলের জন্য অতিরিক্ত ফরয ছিল, অন্য কারো জন্য নয়। এখানে نَافِلَةً শব্দ দ্বারা ফরযকেই বুঝানো হয়েছে।



আর কেউ বলেন, এখানে নফল দ্বারা নফলই বুঝানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-সহ অন্য কারো ওপর পাঁচ ওয়াক্ত ছাড়া কোন সালাত ফরয ছিল না। (ইবনে কাসীর ৫ম খণ্ড, পৃ. ১০৮)



তবে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর প্রথমে রাতের সালাত ফরয ছিল যেমন সূরা মুযযাম্মিলে বলা হয়েছে। তারপর এ আয়াত দ্বারা নফল করে দেয়া হয়। এতদসত্ত্বেও নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কখনো রাতের সালাত ছাড়তেন না। রাতের সালাতের যেমন ফযীলত রয়েছে তেমনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে দায়িত্ব মনে করে তা আদায় করতেন। ফযীলতের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: ফরয সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত হল রাতের সালাত। (সহীহ মুসলিম হা: ১১৬৩)



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্যত্র বলেন: মানুষ যখন ঘুমিয়ে যায় তখন সালাত আদায় কর, নিরাপদে জান্নাতে যাবে। (সহীহ, তিরমিযী হা: ১৮৫৫)



রাতে সালাত আদায় করতে করতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পা মুবারক ফুলে যেত। জিজ্ঞাসা করা হল, আপনার অগ্র-পশ্চাত সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে, তারপরেও আপনি এত কষ্ট করেন কেন? তিনি বললেন:



أَفَلاَ أَكُونُ عَبْدًا شَكُورًا



আমি কি আল্লাহ তা‘আলার কৃতজ্ঞ বান্দা হব না! (সহীহ বুখারী হা: ১১৩০)



(مَقَامًا مَّحْمُوْدًا)



এখানে عَسٰٓي অর্থ নিশ্চিত, অর্থাৎ অবশ্যই আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে প্রশংসিত স্থানে অধিষ্ঠিত করবেন। এ প্রশংসিত স্থানটি কি তা নিয়ে ইমাম কুরতুবী (রহঃ) স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে চারটি মত নিয়ে এসেছেন। সঠিক কথা হল কিয়ামতের দিন যখন মানুষ দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করবে কিন্তু তাদের বিচার ফায়সালা শুরু হবে না তখন সকলে মিলে আদম (عليه السلام)-এর আছে যাবে, যাতে তিনি আল্লাহ তা‘আলার কাছে সুপারিশ করে বিচার-ফায়সালার কাজ শুরু করান। এভাবে তারা নূহ, ইবরাহীম, মূসা, ঈসাসহ সকল নাবীদের কাছে যাবে কিন্তু কেউ সুপারিশ করার দুঃসাহস পাবেন না। তখন সকলে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে আসবে, আল্লাহ তা‘আলার রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সিজদায় পড়ে যাবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলবেন: হে মুহাম্মাদ! মাথা তোল। কী চাও? বল, তোমাকে দেয়া হবে। সুপারিশ কর, কবুল করা হবে। তখন সকল মানুষের বিচার ফায়সালা শুরু করার জন্য সুপারিশ করবেন। আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে এমন একটি স্থানে অধিষ্ঠিত করবেন যা পাওয়ার জন্য আদম সন্তানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবাই কামনা করবে। এটাকেই বলা হয় বড় শাফাআত।



(وَقُلْ رَّبِّ أَدْخِلْنِيْ مُدْخَلَ صِدْقٍ)



‘বল: ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে প্রবেশ করাও কল্যাণের সাথে’ কেউ বলেছেন, এটা হিজরতের সময় অবতীর্ণ হয়েছিল। যখন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মক্কা থেকে বের হওয়ার এবং মদীনাতে প্রবেশ করার সময় উপস্থিত হয়েছিল। কেউ বলেছেন: এর অর্থ হল সত্যের ওপর আমার মৃত্যু দিও এবং সত্যের ওপর আমাকে কিয়ামতের দিন উত্থিত করো। আবার কেউ বলেছেন: সত্যতার সাথে আমাকে কবরে প্রবিষ্ট করো এবং কিয়ামতের দিন সত্যতার সাথে আমাকে কবর থেকে বের করো ইত্যাদি। ইমাম শাওকানী বলেছেন: এটা যেহেতু দু‘আ, বিধায় এর ব্যাপকতায় উল্লিখিত সব কথাই এসে যায়।



الْحَقُّ সত্য হল তাওহীদ, সত্য হল ইসলাম এবং সত্য হল আল্লাহ তা‘আলা যা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে ওয়াহী করেছেন যা কোন দিন দূরীভূত হওয়ার নয় ও মুছে যাওয়ার নয়। আর মিথ্যা হল শিরক ও ইসলামদ্রোহী যাবতীয় কাজ। সত্যের মুকাবেলায় বাতিল সর্বদা বিপর্যস্ত ও পরাভূত।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(بَلْ نَقْذِفُ بِالْحَقِّ عَلَي الْبَاطِلِ فَيَدْمَغُه۫ فَإِذَا هُوَ زَاهِقٌ)



“কিন্তু আমি সত্য দ্বারা আঘাত হানি মিথ্যার ওপর; ফলে তা মিথ্যাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং তৎক্ষণাৎ মিথ্যা নিশ্চিহ“ হয়ে যায়।” (সূরা আম্বিয়া ২১:১৮)



হাদীসে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কায় প্রবেশ করেন এমতাবস্থায় যে, তখন কা‘বার চারপাশে তিনশত ষাটটি মূর্তি ছিল। তখন তিনি তাঁর হাতের লাঠি দ্বারা সেগুলোকে ভাঙ্গতে লাগলেন এবং এই আয়াতটি পাঠ করলেন। (সহীহ বুখারী: ৪৭২০, সহীহ মুসলিম: ১৭৮১)



ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেন: এ আয়াতে দলীল রয়েছে যে, যদি কোন এলাকার ওপর মুসলিমরা জয়ী হয়, অথবা তাদের কর্র্তৃত্বে চলে আসে তাহলে তারা সে এলাকার মুশরিকদের মূর্তিগুলো ভেঙ্গে ফেলবে এবং যত ভাস্কর্য রয়েছে ও ইবাদত করা হয় এমন প্রতিমা রয়েছে সব ভেঙ্গে চূরমার করে দেবে। (তাফসীর কুরতুবী)



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের সময়সীমা জানতে পারলাম।

২. ফজরের সালাতের ফযীলত জানা গেল।

৩. তাহাজ্জুদ সালাত পড়ার ফযীলত সম্পর্কে জানা গেল।

৪. সত্য সর্বদা বিজয়ী হয় এবং মিথ্যা সর্বদা পরাভূত হয়।

৫. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মর্যাদা জানতে পারলাম।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৮০-৮১ নং আয়াতের তাফসীর

হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) মক্কায় ছিলেন, অতঃপর তাঁর প্রতি হিজরতের হুকুম হয় এবং এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। (এটা মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) এ হাদীসটি হাসান সহীহবলেছেন)

হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ মক্কার কুরায়েশরা রাসূলুল্লাহকে (সঃ) হত্যা করার অথবা দেশ থেকে বের করে দেয়ার কিংবা বন্দী করার পরামর্শ করে। তখন আল্লাহ তাআলা মক্কাবাসীকে তাদের দুষ্কর্যের স্বাদ গ্রহণ করাবার ইচ্ছা করেন এবং স্বীয় নবীকে (সঃ) মদীনায় হিজরত করার নির্দেশ দেন। এই আয়াতে এরই বর্ণনা রয়েছে। কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে মক্কা হতে বের হওয়া ও মদীনায় প্রবেশ করা। এই উক্তিটিই সবচেয়ে বেশী প্রসিদ্ধ।

ইবনু আইয়ায (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, শুভ ও সন্তোষজনক ভাবে প্রবেশ দ্বারা মৃত্যু এবং শুভ ও সন্তোষজনকভাবে বের হওয়ার দ্বারা মৃত্যুর পরবর্তী জীবনকে বুঝানো হয়েছে। এ ব্যাপারে আরো উক্তি রয়েছে, কিন্তু প্রথম উক্তিটিই সঠিকতম। ইমাম ইবনু জারীরও (রঃ) এটাকেই গ্রহণ করেছেন।
এরপর আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিচ্ছেনঃ “বিজয় লাভ ও সাহায্যের জন্যে আমারই নিকট প্রার্থনা কর। এই প্রার্থনার কারণে আল্লাহ তাআলা পারস্য ও রোম দেশ বিজয় এবং সম্মান প্রদানের ওয়াদা করেন। এটা তো রাসূলুল্লাহ (সঃ) জানতেই পেরেছিলেন যে, বিজয় লাভ ছাড়া দ্বীনের প্রচার, প্রসার এবং শক্তিলাভ সম্ভবপর নয়। এ জন্যেই তিনি মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য ও বিজয় কামনা করেছিলেন যাতে তিনি আল্লাহর কিতাব, তাঁর হুদৃদ, শরীয়তের কর্তব্যসমূহ এবং দ্বীনের প্রতিষ্ঠা চালু করতে পারেন। এই বিজয় দানও আল্লাহ তাআলার এক বিশেষ রহমত। এটা না হলে একে অপরকে খেয়ে ফেলতো এবং সবল দুর্বলকে শিকার করে নিতো। কেউ কেউ বলেছেন যে, ‘সুলতান নাসীর' দ্বারা স্পষ্ট দলীল’ বুঝানো হয়েছে। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই বেশী উত্তম। কেননা, সত্যের সাথে বিজয় ও শক্তিও জরুরী। যাতে সত্যের বিরোধীরা জব্দ থাকে। এই জন্যেই আল্লাহ তাআলা লোহা অবতীর্ণ করার অনুগ্রহকে কুরআন কারীমে বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেছেন।

একটি হাদীসে আছে যে, “সালতানাত বা রাজত্বের কারণে আল্লাহ তাআলা এমন বহু মন্দ কার্য বন্ধ করে দেন যা শুধুমাত্র কুরআনের মাধ্যমে বন্ধ করা যেতো না। এটা চরম সত্য কথা যে, কুরআন কারীমের উপদেশাবলী, ওর ওয়াদা, ভীতি প্রদর্শন তাদেরকে তাদের দুষ্কার্য হতে সরাতে পারতো না। কিন্তু ইসলামী শক্তি দেখে ভীত হয়ে তারা দুষ্কার্য হতে বিরত থাকে।

এরপর কাফিরদের সতর্ক করা হচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সত্যের আগমন ঘটেছে, যাতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই। কুরআন,ঈমান এবং লাভজনক সত্য ইলম আল্লাহর পক্ষ হতে এসে গেছে এবং কুফরী ধ্বংস ও বিলুপ্ত হয়েছে। ওটা সত্যের মুকাবিলায় হাত পা হীন দুর্বল সাব্যস্ত হয়েছে। হক। বাতিলের মস্তক চূণ বিচূর্ণ করে দিয়েছে। তাই বাতিলের কোন অস্তিত্বই নেই।

সহীহ বুখরীতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কায় (বিজয়ী বেশে। প্রবেশ করেন। সেই সময় বায়তুল্লাহর আশে পাশে তিনশ ষাটটি প্রতিমা ছিল। তিনি তাঁর হাতের লাঠিটি দ্বারা ওগুলিকে আঘাত করেছিলেন এবং মুখে এই আয়াতটি উচ্চারণ করেছিলেন। অর্থাৎ “সত্যের আগমন ঘটেছে এবং মিথ্যা বিদূরিত হয়েছে, মিথ্যা বিদূরিত হয়েই থাকে।”

মুসনাদে আবি ইয়ালায় বর্ণিত আছে যে, সাহাবীগণ বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে মক্কায় আগমন করি। ঐ সময় বায়তুল্লাহর আশে পাশে তিন শ ষাটটি মূর্তি ছিল, যেগুলির পূজা অর্চনা করা হতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তৎক্ষণাৎ নির্দেশ দিলেনঃ “এগুলিকে উপুড় করে ফেলে দাও।” অতঃপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করেন।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।