সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 49)
হরকত ছাড়া:
وقالوا أئذا كنا عظاما ورفاتا أئنا لمبعوثون خلقا جديدا ﴿٤٩﴾
হরকত সহ:
وَ قَالُوْۤاءَ اِذَا کُنَّا عِظَامًا وَّ رُفَاتًاءَ اِنَّا لَمَبْعُوْثُوْنَ خَلْقًا جَدِیْدًا ﴿۴۹﴾
উচ্চারণ: ওয়া কা-লূআইযা-কুন্না-‘ইজা-মাওঁ ওয়া রুফা-তান আইন্না-লামাব‘ঊছূনা খালকান জাদীদা-।
আল বায়ান: আর তারা বলে, ‘যখন আমরা হাড্ডি ও ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যাব, তখন কি আমরা নতুন সৃষ্টিরূপে পুনরুজ্জীবিত হব’?
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৯. আর তারা বলে, আমরা অস্থিতে পরিণত ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হলেও কি নূতন সৃষ্টিরূপে উত্থিত হব?(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা বলে, ‘কী! আমরা হাড্ডি আর ধূলা-মাটিতে পরিণত হওয়ার পর কি এক নতুন সৃষ্টিরূপে উত্থিত হব?’
আহসানুল বায়ান: (৪৯) তারা বলে, ‘আমরা অস্থিতে পরিণত ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হলেও কি নতুন সৃষ্টিরূপে পুনরুত্থিত হব?’
মুজিবুর রহমান: তারা বলেঃ আমরা অস্থিতে পরিণত ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হলেও কি নতুন সৃষ্টি রূপে পুনরুত্থিত হব?
ফযলুর রহমান: তারা বলে, “আমরা যখন হাড়গোড় ও ধ্বংসাবশেষ হয়ে যাব তারপরও কি আমরা এক নতুন সৃষ্টিরূপে পুনরুত্থিত হব?”
মুহিউদ্দিন খান: তারা বলেঃ যখন আমরা অস্থিতে পরিণত ও চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাব, তখনও কি নতুন করে সৃজিত হয়ে উত্থিত হব?
জহুরুল হক: আর তারা বলে -- "কি! আমরা যখন হাড্ডি ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাব, তখন কি আমরা নতুন সৃষ্টিতে পুনরুত্থিত হব?"
Sahih International: And they say, "When we are bones and crumbled particles, will we [truly] be resurrected as a new creation?"
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪৯. আর তারা বলে, আমরা অস্থিতে পরিণত ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হলেও কি নূতন সৃষ্টিরূপে উত্থিত হব?(১)
তাফসীর:
(১) একই অর্থে অন্যান্য সূরায়ও আখেরাতে পুনরুত্থান সম্পর্কে কাফেরদের সন্দেহের কথা উল্লেখ করে তার জওয়াব দেয়া হয়েছে। [যেমন, এ সূরারই ৯৮ নং আয়াত এবং সূরা আন-নাযি’আতঃ ১০–১২, ইয়াসীনঃ ৭৮–৭৯]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৪৯) তারা বলে, ‘আমরা অস্থিতে পরিণত ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হলেও কি নতুন সৃষ্টিরূপে পুনরুত্থিত হব?’
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৪৯-৫২ নং আয়াতের তাফসীর:
যারা কিয়ামত ও পুনরুত্থানকে অস্বীকার করে, অসম্ভব মনে করে এখানে তাদের উত্তর দেয়া হয়েছে। বস্তুবাদী কাফির-মুশরিকরা মনে করে কিভাবে পুনরুত্থান সম্ভব? অথচ আমরা মরে গেলে হাড়ে পরিণত হয়ে যাব, দেহ ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে, কোন অস্তিত্ব থাকবে না, এরপরেও কি নতুন করে সৃষ্টি করা সম্ভব? এটা কোনদিন সম্ভব হতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলে দিতে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, বল: শুধু হাড় বা মাটি কেন তোমরা পাথর হয়ে গেলেও অথবা লোহা হয়ে গেলেও অথবা এমন কিছুতে পরিণত হয়ে যাও যা তোমাদের ধারণায় তার মধ্যে জীবন দেয়া খুবই কঠিন, তা হতেও আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে পুনরায় জীবিত করবেন, এটা তাঁর জন্য কোন কঠিন বিষয় নয়। তাদের এ কথা প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَضَرَبَ لَنَا مَثَلًا وَّنَسِیَ خَلْقَھ۫ﺚ قَالَ مَنْ یُّحْیِ الْعِظَامَ وَھِیَ رَمِیْمٌﮝقُلْ یُحْیِیْھَا الَّذِیْٓ اَنْشَاَھَآ اَوَّلَ مَرَّةٍﺚ وَھُوَ بِکُلِّ خَلْقٍ عَلِیْمُﮞ)
“আর সে আমার সম্পর্কে উদাহরণ বর্ণনা করে, অথচ সে নিজের জন্মের কথা ভুলে যায়। সে বলে: কে জীবিত করবে এ হাড়গুলোকে, যখন তা পঁচে গলে যাবে? বলুন! তিনিই এগুলোকে আবার জীবিত করবেন, যিনি তা প্রথমবারে সৃষ্টি করেছেন। আর যিনি সর্বপ্রকার সৃষ্টি সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন।” (সূরা ইয়াসিন ৩৬:৭৮-৭৯)
যখন এভাবে উত্তর দেয়া হয় তখন স্বীকার করেও অস্বীকৃতিমূলকভাবে মাথা নাড়িয়ে বলে এটা কখন করা হবে। তারা বলত:
(وَيَقُوْلُوْنَ مَتٰي هٰذَا الْوَعْدُ إِنْ كُنْتُمْ صٰدِقِيْنَ)
“আর তারা বলে: তোমরা যদি সত্যবাদী হও (তবে বল:) এই প্রতিশ্রুতি কবে বাস্তবায়িত হবে?” (সূরা মুলক ৬৭:২৫)
তাদের এ কথার উত্তর দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
(ثُمَّ اِذَا دَعَاکُمْ دَعْوَةًﺣ مِّنَ الْاَرْضِﺣ اِذَآ اَنْتُمْ تَخْرُجُوْنَ)
“আবার যখন তিনি তোমাদেরকে জমিন থেকে (বের হয়ে আসার জন্য) আহ্বান করবেন, তখন তোমরা সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে আসবে।” (সূরা রূম ৩০:২৫) আর সে সময়টা খুবই নিকটে। যখন আল্লাহ তা‘আলার ডাকে সাড়া দিয়ে পুনরুত্থিত হবে তখন তাদের কাছে দুনিয়ার জীবনটা মনে হবে খুবই সামান্য সময়ের।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(كَأَنَّهُمْ يَوْمَ يَرَوْنَهَا لَمْ يَلْبَثُوْآ إِلَّا عَشِيَّةً أَوْ ضُحَاهَا)
“যেদিন তারা তা দেখবে, তাতে তাদের মনে হবে যেন তারা (পৃথিবীতে) এক সন্ধ্যা অথবা এক সকালের অধিক অবস্থান করেনি।” (সূরা নাযিয়াত ৭৯:৪৬)
এরূপ সূরা মু’মিনুনের ১১২-১১৪ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে। সুতরাং পুনরুত্থানকে মানুষ যতই অসম্ভব মনে করুক, তাতে অসম্ভবের কিছুই নেই বরং সকলকে আল্লাহ তা‘আলার দরবারে হাজির হতে হবে। সে পুড়ে ছাইয়ে পরিণত হোক আর মাটিতে মিশে যাক আল্লাহ তা‘আলা তাকে উপস্থিত করবেন।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. মানুষ মৃত্যুর পর নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও আল্লাহ তা‘আলা পুনরুত্থিত করবেন।
২. যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন তিনি দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করতে আরো অধিক সক্ষম।
৩. পুনরুত্থানের পর মানুষের কাছে মনে হবে যেন তারা অল্প কিছুক্ষণ পৃথিবীতে অবস্থান করেছে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৪৯-৫২ নং আয়াতের তাফসীর
কাফির, যারা কিয়ামতে বিশ্বাসী ছিল না এবং মৃত্যুর পরে পুনরুত্থানকে অসম্ভব মনে করতো, তারা অস্বীকারের উদ্দেশ্য নিয়ে জিজ্ঞেস করতোঃ আমরা অস্থি ও মাটি হয়ে যাওয়ার পরেও কি আমাদেরকে নতুনভাবে সৃষ্টি করা হবে?
সুরায়ে নাযিআ’তে এই অস্বীকারকারীদের উক্তি নিম্নরূপে বর্ণিত হয়েছেঃ “আমরা কি আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে আসবো? তবে কি আমরা যখন চুর্ণ-বিচূর্ণ হাড়ে পরিণত হয়ে যাবে তখন (পুনর্জীবনে) প্রত্যাবর্তিত হবো? বলতে লাগলোঃ এমতাবস্থায় এই প্রত্যাবর্তন (আমাদের জন্যে) বড়ই ক্ষতিকর হবে।” সূরায়ে ইয়াসীনে রয়েছেঃ “সে আমার সম্বন্ধে এক অভিনব বিষয় বর্ণনা করলো এবং নিজের মূল সৃষ্টিকে ভুলে গেল; সে বলেঃ কে জীবিত করবে এই হাড়গুলিকে, যখন তা পচে গেল?” সুতরাং তাদেরকে উত্তর দেয়া হচ্ছেঃ হাড় তো দূরের কথা, তোমরা পাথর হয়ে যাও বা লোহা হয়ে যাও অথবা এর চেয়ে শক্ত জিনিস হয়ে যাও, যেমন পাহাড় বা যমীন অথবা আসমান, এমনকি তোমরা যদি স্বয়ং মৃত্যুও হয়ে যাও, তবুও তোমাদেরকে পূনরুজ্জীবিত করা আল্লাহ তাআলার কাছে খুবই সহজ। তোমরা যাই হয়ে যাও না কেন, পুনরুত্থিত হবেই।
হাদীসে রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী স্থানে মৃত্যুকে নেকড়ে বাঘের আকারে আনয়ন করা হবে এবং জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসী উভয় দলকেই বলা হবেঃ “তোমরা একে চিনো কি?” সবাই সমস্বরে বলে উঠবেঃ “হাঁ, চিনি।” তারপর ওকে যবাহ করে দেয়া হবে। তারপর ঘোষণা করা হবেঃ “জান্নাতী লোকেরা! এখন থেকে তোমাদের চিরস্থায়ী জীবন হয়ে গেল, আর মৃত্যু হবে না। হে জাহান্নামী লোকেরা! আজ থেকে তোমাদের জীবন চিরস্থায়ী হয়ে গেল, আর তোমরা মৃত্যুবরণ করবে না।”
এখানে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তারা (কাফির ও মুশরিকরা) জিজ্ঞেস করেঃ “আচ্ছা, আমরা যখন অস্থিতে পরিণত ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবো, অথবা পাথর ও লোহা হয়ে যাবো, বা এমন কিছু হয়ে যাবো যা খুবই শক্ত, তখন কে এমন আছে যে, আমাদেরকে নতুন সৃষ্টি রূপে পুনরুত্থিত করবে? হে নবী (সঃ)! তুমি তাদের এই প্রশ্ন ও বাজে প্রতিবাদের জবাবে তাদেরকে বুঝিয়ে বলঃ তোমাদেরকে পুনরুত্থিত করবেন তিনিই যিনি তোমাদের প্রকৃত সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ। যিনি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন যখন তোমরা কিছুই ছিলে না। তাহলে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা তাঁর পক্ষে কঠিন হতে পারে কি? না, বরং এটা তাঁর পক্ষে খুবই সহজ, তোমরা যা কিছুই হয়ে যাও না কেন। এই উত্তরে। তারা সম্পূর্ণরূপে নির্বাক হয়ে যাবে বটে, কিন্তু এর পরেও তারাহঠকারিতা ও দুষ্টামি হতে বিরত থাকবে না এবং তাদের বদ আকীদা পরিত্যাগ করবে না। বরং তারা উপহাসের ছলে মাথা নাড়তে নাড়তে বলবেঃ “আচ্ছা, এটা হবে কখন? যদি সত্যবাদী হও তবে এর নির্দিষ্ট সময় বলে দাও?” বেঈমানদের অভ্যাস এই যে, তারা সব কাজেই তাড়াহুড়া করে থাকে। এই সময় অতি নিকটবর্তী। তোমরা এজন্যে অপেক্ষা করতে থাকো। এটা যে, আসবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। যা আসবার তা আসবেই এটা মনে করে নাও। আল্লাহ তাআলার একটা শব্দের সাথে সাথেই তোমর যমীন হতে বের হয়ে পড়বে। চোখের পলক ফেলার সময় পরিমাণও বিলম্ব হবে না। আল্লাহর নির্দেশের সাথে সাথেই তোমাদের দ্বারা হাশরের ময়দান পূর্ণ হয়ে যাবে। কবর হতে উঠে আল্লাহর প্রশংসা করতঃ তাঁর নির্দেশ পালনে তোমরা দাঁড়িয়ে যাবে। প্রশংসার যোগ্য তিনিই; তোমরা তাঁর হুকুম ও ইচ্ছার বাইরে নও।
হাদীসে এসেছে যে, যারা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পড়েছে তাদের জন্যে তাদের কবরে কোন ভয় ও সন্ত্রাস সৃষ্টি হবে না। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি যেন তাদেরকে দেখতে রয়েছি যে, তারা কবর থেকে উঠতে রয়েছে। তারা মাথা হতে মাটি ঝাড়তে ঝাড়তে এবং “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পাঠ করতে করতে উঠে দাঁড়াবে এবং বলবেঃ “আল্লাহরই সমস্ত প্রশংসা যিনি আমাদের দুঃখ দুর। করেছেন।” সূরায়ে ফাতিরের তাফসীরে এই বর্ণনা আসবে ইনশা-আল্লাহ। ঐ সময় মানুষের বিশ্বাস হবে যে, তারা খুব অল্প সময় দুনিয়ায় অবস্থান করেছে। যেন তারা সকালে বা সন্ধ্যায় দুনিয়ায় থেকেছে। কেউ বলবে দশ দিন, কেউ বলবে একদিন এবং কেউ মনে করবে মাত্র এক ঘন্টা। প্রশ্নের উত্তরে তারা একথাই বলবেঃ “আমরা একদিন বা একদিনের কিছু কম সময় অবস্থান করেছি।” আর একথা তারা শপথ করে বলবে। অনুরূপভাবে তারা দুনিয়াতেও মিথ্যা কথার উপর কসম খেতো।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।