আল কুরআন


সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 37)

সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 37)



হরকত ছাড়া:

ولا تمش في الأرض مرحا إنك لن تخرق الأرض ولن تبلغ الجبال طولا ﴿٣٧﴾




হরকত সহ:

وَ لَا تَمْشِ فِی الْاَرْضِ مَرَحًا ۚ اِنَّکَ لَنْ تَخْرِقَ الْاَرْضَ وَ لَنْ تَبْلُغَ الْجِبَالَ طُوْلًا ﴿۳۷﴾




উচ্চারণ: ওয়া লা-তামশি ফিল আরদিমারাহান ইন্নাকা লান তাখরিকাল আরদা ওয়া লান তাবলুগাল জিবা-লা তূলা-।




আল বায়ান: আর যমীনে বড়াই করে চলো না; তুমি তো কখনো যমীনকে ফাটল ধরাতে পারবে না এবং উচ্চতায় কখনো পাহাড় সমান পৌঁছতে পারবে না।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৭. আর যমীনে দম্ভভরে বিচরণ করো না; তুমি তো কখনই পদভরে ভূপৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনই পর্বত প্ৰমাণ হতে পারবে (১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: যমীনে গর্বভরে চলাফেরা করো না, তুমি কক্ষনো যমীনকে বিদীর্ণ করতে পারবে না, আর উচ্চতায় পর্বতের ন্যায় হতেও পারবে না।




আহসানুল বায়ান: (৩৭) ভূ-পৃষ্ঠে দম্ভভরে বিচরণ করো না, তুমি তো কখনোই পদভারে ভূ-পৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনোই পর্বত-প্রমাণ হতে পারবে না। [1]



মুজিবুর রহমান: ভূপৃষ্ঠে দম্ভ ভরে বিচরণ করনা, তুমিতো কখনই পদভরে ভূ-পৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবেনা এবং উচ্চতায় তুমি কখনই পর্বত সমান হতে পারবেনা।



ফযলুর রহমান: জমিনে দম্ভভরে চলো না। তুমি তো জমিনকে বিদীর্ণ করতে পারবে না কিংবা পর্বতের উচ্চতায়ও পৌঁছাতে পারবে না।



মুহিউদ্দিন খান: পৃথিবীতে দম্ভভরে পদচারণা করো না। নিশ্চয় তুমি তো ভূ পৃষ্ঠকে কখনই বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনই পর্বত প্রমাণ হতে পারবে না।



জহুরুল হক: আর দুনিয়াতে গর্বভরে চলাফেরা করো না, নিঃসন্দেহ তুমি তো কখনো পৃথিবীটাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করতে পারবে না আর উচ্চতায় পাহাড়ের নাগালও পেতে পারবে না।



Sahih International: And do not walk upon the earth exultantly. Indeed, you will never tear the earth [apart], and you will never reach the mountains in height.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩৭. আর যমীনে দম্ভভরে বিচরণ করো না; তুমি তো কখনই পদভরে ভূপৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনই পর্বত প্ৰমাণ হতে পারবে (১)


তাফসীর:

১. অহংকারের অর্থ হচ্ছে নিজেকে অন্যের চাইতে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ এবং অন্যকে নিজের তুলনায় হেয় ও ঘূণ্য মনে করা। হাদীসে এর জন্যে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “আল্লাহ্ তাআলা ওহীর মাধ্যমে আমার কাছে নির্দেশ পাঠিয়েছেন যে, নম্রতা অবলম্বন কর। কেউ যেন অন্যের উপর গর্ব ও অহংকারের পথ অবলম্বন না করে এবং কেউ যেন কারও উপর যুলুম না করে।’ [মুসলিমঃ ২৮৬৫]

অন্য হাদীসে এসেছে, তোমাদের পূর্বেকার জাতিদের মধ্যে কোন এক লোক দুখানি চাদর নিয়ে গর্বভরে চলছিল। এমতাবস্থায় যমীন তাকে নিয়ে ধ্বসে গেল, সে এভাবে কিয়ামত পর্যন্ত এর মধ্যে ঢুকতে থাকবে। [বুখারীঃ ৫৭৮৯, মুসলিমঃ ২০৮৮]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৩৭) ভূ-পৃষ্ঠে দম্ভভরে বিচরণ করো না, তুমি তো কখনোই পদভারে ভূ-পৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনোই পর্বত-প্রমাণ হতে পারবে না। [1]


তাফসীর:

[1] অহংকার ও দা‎ম্ভিকতার সাথে চলা আল্লাহর নিকট অতীব অপছন্দনীয়। এই অপরাধের কারণেই কারূনকে তার প্রাসাদ ও ধন-ভান্ডার সমেত যমীনে ধসিয়ে দেওয়া হয়েছে। (সূরা কাসাস ৮১ আয়াত) হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, এক ব্যক্তি দু’টি চাদর পরিধান করে অহংকারের সাথে চলছিল। ফলে তাকে যমীনে ধসিয়ে দেওয়া হয় এবং সে কিয়ামত পর্যন্ত ধসেই যেতে থাকবে। (মুসলিমঃ কিতাবুল লিবাস, পরিচ্ছেদঃ দম্ভভরে যমীনে চলা হারাম---) মহান আল্লাহ বিনয় ও নম্রতা পছন্দ করেন।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৩৭-৩৯ নং আয়াতের তাফসীর:



গর্ব-অহংকার করা একটি নিন্দনীয় চরিত্রের লক্ষণ। অহংকারীকে আল্লাহ তা‘আলা পছন্দ করেন না, এমনকি কোন মানুষও পছন্দ করে না। তাই গর্ব-অহংকার করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তোমরা পৃথিবীতে গর্ব-অহংকার করে চলাফেরা করো না। এই গর্ব-অহংকার করে চলাফেরা করার কারণে আল্লাহ তা‘আলা কারূনকে জমিনে ধ্বসিয়ে দিয়েছেন।



আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(فَخَسَفْنَا بِھ۪ وَبِدَارِھِ الْاَرْضَﺤ فَمَا کَانَ لَھ۫ مِنْ فِئَةٍ یَّنْصُرُوْنَھ۫ مِنْ دُوْنِ اللہِﺠ وَمَا کَانَ مِنَ الْمُنْتَصِرِیْنَﮠ)‏



“অতঃপর আমি কারূনকে তার প্রাসাদসহ ভূগর্ভে প্রোথিত করলাম। তার স্বপক্ষে এমন কোন দল ছিল না যে আল্লাহর শাস্তি হতে তাকে সাহায্য করতে পারত এবং সে নিজেও আত্মরক্ষায় সক্ষম ছিল না।” (সূরা ক্বাসাস ২৮:৮১)



হাদীসে এসেছে, ইবনু ওমর (রাঃ) বর্ণনা করেন, নাবী কারীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, একজন ব্যক্তি অহংকার করতঃ তার কাপড় টাখনুর নীচে ঝুলিয়ে পরত। ফলে তাকে ধ্বসিয়ে দেয়া হয়েছে। এমনকি সে কিয়ামত পর্যন্ত এভাবে জমিনের গভীরে যেতে থাকবে।” (সহীহ বুখারী হা: ৩৪৮৫)



তাই লুকমান (عليه السلام) তার ছেলেকে এহেন জঘন্য চরিত্র থেকে মুক্ত থাকার জন্য সাবধান করে বলেন: “আর তুমি অহংকারবশে মানুষকে অবহেলা কর‎ না এবং পৃথিবীতে গর্বভরে বিচরণ কর‎ না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন দাম্ভিক, অহংঙ্কারকারীকে ভলোবাসেন না।” (সূরা লুকমান ৩১:১৮)



সেজন্য মু’মিনের চরিত্রের বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَعِبَادُ الرَّحْمٰنِ الَّذِيْنَ يَمْشُوْنَ عَلَي الْأَرْضِ هَوْنًا)



‘রাহ্মান’-এর বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে” (সূরা ফুরকান ২৫:৬৩)



অতএব আল্লাহ তা‘আলার এই রাজত্বে আল্লাহ তা‘আলা কাউকে গর্ব-অহঙ্কার করে চলাফেরা করার অনুমতি দেননি। তাই এভাবে চলাফেরা করা যাবে না। বরং নম্র-ভদ্রভাবে চলাফেরা করতে হবে। হাদীসে এসেছে, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার জন্য নত হয় আল্লাহ তা‘আলা তাকে উঁচু করেন অর্থাৎ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। (মিশকাত হা: ৫১১৯)



তারপর আল্লাহ তা‘আলা মানুষের দুর্বলতা তুলে ধরে বলেন: তুমি অহংকার করছ কিসের ক্ষমতায়? তুমি তো ভূ-পৃষ্ঠকে বিদীর্ণ করতে পারবে না, আর উচ্চতায় পাহাড়ের সমান হতে পারবে না। সুতরাং তোমার অহংকার করা শোভা পায় না। এসব আল্লাহ তা‘আলার কাছে ঘৃণিত চরিত্র ও নিন্দনীয়। তাই এসব চরিত্র থেকে বেঁচে থেকে নিজেদেরকে উত্তম চরিত্রে গঠন করা উচিত।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. গর্ব-অহংকার করা যাবে না।

২. নম্রভাবে চলাফেরা করা মু’মিনের বৈশিষ্ট্য।

৩. টাখনুর নীচে কাপড় ঝুলিয়ে পরা হারাম।

৪. আল্লাহ তা‘আলার সাথে কাউকে শরীক করা যাবে না।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৩৭-৩৮ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদেরকে দর্পভরে ও বাবুয়ানা চালে চলতে নিষেধ করেছেন। উদ্ধত ও অহংকারী লোকদের এটা অভ্যাস। এরপর তাদেরকে নীচু করে দেখবার জন্যে আল্লাহ তাআলা বলছেনঃ তুমি যতই মাথা উঁচু করে চল না কেন, তুমি পাহাড়ের উচ্চতা থেকে নীচেই থাকবে। আর যতই খট খট করে দম্ভভরে মাটির উপর দিয়ে চল না কেন, তুমি যমিনকে বিদীর্ণ করতে পারবে না। বরং এরূপ লোকদের অবস্থা বিপরীত হয়ে থাকে। যেমন হাদীসে এসেছে যে, এক ব্যক্তি গায়ে চাদর জড়িয়ে দর্পভরে চলছিল, এমতাবস্থায় তাকে যমিনে ধ্বসিয়ে দেয়া হয় এবং এখন পর্যন্ত সে নীচে নামতেই আছে। কুরআন কারীমে কারূণের কাহিনী বর্ণিত আছে যে, তাকে তার প্রাসাদসহ যমিনে ধ্বসিয়ে দেয়া হয়। পক্ষান্তরে, যারা নম্রতা ও বিনয় প্রকাশ। করে তাদের মর্যাদা আল্লাহ তাআলা উঁচু করে দেন। হাদীসে এসেছে যে, যারা নত হয় তাদেরকে আল্লাহ তাআলা উচ্চ মর্যাদার অধিকারী করে দেন। তারা নিজেদের তুচ্ছ জ্ঞান করে, আর জনগণ তাদেরকে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী মনে করে। পক্ষান্তরে যারা নিজেদেরকে বড় মর্যাদাবান মনে করে ও অহংকার করে, তাদেরকে জনগণ অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখে। এমনকি তারা তাদেরকে কুকুর ও শূকর অপেক্ষাও নিকৃষ্ট মনে করে।

ইমাম আবু বকর ইবনু আবিদ দুনিয়া (রাঃ) তাঁর কিতাবুল খুমূল ওয়াত তাওয়াল’ নামক গ্রন্থে এনেছেন যে, ইবনুল আহীম নামক একজন লোক খলীফা মনসরের দরবারে যাচ্ছিল। এ সময় তার পরণে ছিল রেশমী জব্বা এবং ওটা পায়ের গোছার উপর থেকে উলটিয়ে সেলাই করা ছিল যাতে নীচে থেকে কুবাও (লম্বা পোষাক বিশেষ) দেখা যায়। এভাবে সে অত্যন্ত বাবুয়ানা চালে দর্পপদক্ষেপে চলছিল। হযরত হাসান বসরী (রঃ) তাকে এ অবস্থায় দেখে তাঁর সঙ্গীদেরকে লক্ষ্য করে বলেনঃ “ঐ দেখো, ঐ যে মাথা উঁচু করে, গাল ফুলিয়ে ডাট দেখিয়ে আল্লাহ তাআলার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ভুলে গিয়ে, প্রতিপালকের আহকাম ছেড়ে দিয়ে, আল্লাহর হককে ভেঙ্গে দিয়ে পাগলদের চালে অভিশপ্ত শয়তানের সঙ্গী চলে যাচ্ছে।” তাঁর একথাগুলি ইবনুল আহীম শুনতে পেয়ে তৎক্ষণাৎ তাঁর কাছে ফিরে এসে ক্ষমা প্রার্থনা করে। তখন তিনি তাকে বলেনঃ “আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে কি হবে? তুমি আল্লাহ তাআলার কাছে তাওবা কর এবং এটা পরিত্যাগ কর। তুমি কি মহান আল্লাহর এই নিষেধাজ্ঞা শুন নাই? (আরবি) অর্থাৎ “তুমি দম্ভভরে ভূ-পৃষ্ঠে বিচরণ করো না।” (১৭:৩৭)
আবেদ নাজতারী (রাঃ) হযরত আলীর (রাঃ) বংশের একজন লোককে দর্পভরে চলতে দেখে বলেনঃ “হে এই ব্যক্তি! যিনি তোমাকে এই মর্যাদা দিয়েছেন তাঁর চালচলন এইরূপ ছিল না।” সে তৎক্ষণাৎ তওবা করে নেয়।

হযরত ইবনু উমার (রাঃ) এইরূপ একটি লোককে দেখে বলেনঃ “এইরূপ লোকই শয়তানের ভাই হয়ে থাকে।”

ইবনু আবিদ দুনিয়ার (রঃ) হাদীস গ্রন্থে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন আমার উম্মত দর্প ও অহংকারের চালে চলবে এবং পারসিক ও রোমকদেরকে নিজেদের খিদমতে লাগিয়ে দেবে তখন আল্লাহ তাআলা এককে অপরের উপর আধিপত্য দান করবেন।

(আরবি) এর দ্বিতীয় (আরবি) পঠন রয়েছে। তখন অর্থ হবেঃ “আমি তোমাদেরকে যে সব কাজ থেকে নিষেধ করেছি ঐ সব কাজ অত্যন্ত মন্দ এবং আল্লাহ তাআলার নিকট অপছন্দনীয়।” অর্থাৎ ‘সন্তানদেরকে হত্যা করো না’ থেকে। নিয়ে ‘দর্পভরে চলো না পর্যন্ত সমস্ত কাজ। আর (আরবি) পড়লে অর্থ হবেঃ (আরবি) হতে এখন পর্যন্ত যে হুকুম আহকাম ও নিষেধাজ্ঞার বর্ণনা দেয়া হয়েছে, তাতে যত খারাপ কাজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে ওগুলো সবই আল্লাহ তাআলার নিকট অপছন্দনীয় কাজ। ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) এই ব্যাখ্যাই দিয়েছেন।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।