আল কুরআন


সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 24)

সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 24)



হরকত ছাড়া:

واخفض لهما جناح الذل من الرحمة وقل ربي ارحمهما كما ربياني صغيرا ﴿٢٤﴾




হরকত সহ:

وَ اخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَۃِ وَ قُلْ رَّبِّ ارْحَمْهُمَا کَمَا رَبَّیٰنِیْ صَغِیْرًا ﴿ؕ۲۴﴾




উচ্চারণ: ওয়াখফিদলাহুমা-জানা-হাযযুলিল মিনার রাহমাতি ওয়াকু র রাব্বির হামহুমা-কামারাব্বাইয়া-নী সাগীরা-।




আল বায়ান: আর তাদের উভয়ের জন্য দয়াপরবশ হয়ে বিনয়ের ডানা নত করে দাও এবং বল, ‘হে আমার রব, তাদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে লালন-পালন করেছেন’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৪. আর মমতাবশে তাদের প্রতি নম্রতার পক্ষপুট অবনমিত কর(১) এবং বল, 'হে আমার রব! তাদের প্ৰতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন'।(২)




তাইসীরুল ক্বুরআন: তাদের জন্য সদয়ভাবে নম্রতার বাহু প্রসারিত করে দাও আর বল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া কর যেমনভাবে তারা আমাকে শৈশবে লালন পালন করেছেন।’




আহসানুল বায়ান: (২৪) অনুকম্পায় তাদের প্রতি বিনয়াবনত থেকো[1] এবং বলো, ‘হে আমার প্রতিপালক! তাদের উভয়ের প্রতি দয়া কর; যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছে।’



মুজিবুর রহমান: অনুকম্পায় তাদের প্রতি বিনয়াবনত থাক এবং বলঃ হে আমার রাব্ব! তাঁদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তাঁরা আমাকে লালন পালন করেছিলেন।



ফযলুর রহমান: আর মমতায় তাদের প্রতি বশ্যতার ডানা নত করে দেবে (তাদের সাথে বিনীত আচরণ করবে) আর বলবে, “হে প্রভু! আমার পিতামাতার প্রতি দয়া করো, যেমন তারা আমাকে ছোট থাকতে (দয়া দিয়ে) লালনপালন করেছেন।”



মুহিউদ্দিন খান: তাদের সামনে ভালবাসার সাথে, নম্রভাবে মাথা নত করে দাও এবং বলঃ হে পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।



জহুরুল হক: আর তাদের উভয়ের প্রতি আনত করো করুণার সাথে আনুগত্যের ডানা দুখানা, আর বলো -- "আমার প্রভু! তাঁদের উভয়ের প্রতি করুণা করো যেমন তাঁরা ছোটবেলায় আমাকে প্রতিপালন ক’রে বড় করেছন।"



Sahih International: And lower to them the wing of humility out of mercy and say, "My Lord, have mercy upon them as they brought me up [when I was] small."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২৪. আর মমতাবশে তাদের প্রতি নম্রতার পক্ষপুট অবনমিত কর(১) এবং বল, ’হে আমার রব! তাদের প্ৰতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন’।(২)


তাফসীর:

১. পাখি যেভাবে তার সন্তানদের লালন পালন করার সময় তার দু’ডানা নত করে আগলে রাখে তেমনি পিতা-মাতাকে আগলে রাখতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া পাখি যখন উড়ে তখন ডানা মেলে ধরে তারপর যখন অবতরণ করতে চায় তখন ডানা গুটিয়ে নেয়, তেমনি পিতামাতার প্রতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পাখি যেভাবে নিচে নামার জন্য গুটিয়ে নিয়ে নিজেকে নিচে নামায় তেমনি তুমি নিজেকে গৰ্ব-অহংকার মুক্ত হয়ে পিতা-মাতার সাথে ব্যবহার করবে। [ফাতহুল কাদীর] উরওয়া ইবনে যুবাইর বলেন এর অর্থ, তাদের নির্দেশ মান্য করা এবং তাদের কাংখিত কোন বস্তু দিতে নিষেধ না করা। [ফাতহুল কাদীর]


২. এর সারমর্ম এই যে, পিতা-মাতার ষোল আনা সুখ-শান্তি বিধান মানুষের সাধ্যাতীত। কাজেই সাধ্যানুযায়ী চেষ্টার সাথে সাথে তাদের জন্যে আল্লাহ্ তা'আলার কাছে দোআ করবে যে, তিনি যেন করুণাবশতঃ তাদের সব মুশকিল আসান করেন এবং কষ্ট দূর করেন। বৃদ্ধ অবস্থা ও মৃত্যুর সময় তাদেরকে রহমত করেন। [ইবন কাসীর] সর্বশেষ আদেশটি অত্যন্ত ব্যাপক ও বিস্তৃত। পিতা-মাতার মৃত্যুর পরও দো’আর মাধ্যমে সর্বদা পিতা-মাতার খেদমত করা যায়। পিতা-মাতা মুসলিম হলেই তাদের জন্য রহমতের দোআ করতে হবে, কিন্তু মুসলিম না হলে তাদের জীবদ্দশায় পার্থিব কষ্ট থেকে মুক্ত থাকা ও ঈমানের তওফীক লাভের জন্য করা যাবে। মৃত্যুর পর তাদের জন্যে রহমতের দোআ করা জায়েয নেই।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২৪) অনুকম্পায় তাদের প্রতি বিনয়াবনত থেকো[1] এবং বলো, ‘হে আমার প্রতিপালক! তাদের উভয়ের প্রতি দয়া কর; যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছে।’


তাফসীর:

[1] পাখী যখন তার বাচ্চাদেরকে নিজ করুণার ছায়ায় রাখতে চায়, তখন তাদের জন্য নিজের ডানাকে নত করে দেয়। অর্থাৎ, তুমিও পিতা-মাতার সাথে ঐরূপ উত্তম এবং করুণাসিক্ত আচরণ কর। আর তাঁদের ঐরূপ সেবাযত্ন কর, যেরূপ তাঁরা তোমার সেবাযত্ন করেছিলেন; যখন তুমি শিশু ছিলে। অথবা এর অর্থ হল, পাখী যখন উড়ার এবং ঊর্ধ্বে যাওয়ার ইচ্ছা করে, তখন তার ডানা দু’টিকে প্রসারিত করে দেয়। আর যখন নীচে অবতরণ করার ইচ্ছা করে, তখন ডানা দু’টি গুটিয়ে নেয়। এই দিক দিয়ে বাজু বিছিয়ে দেওয়ার অর্থ হবে, পিতা-মাতার সামনে নম্র ও বিনয়ী হয়ে যাও।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ২২-২৪ নং আয়াতের তাফসীর:



(لَا تَجْعَلْ مَعَ اللّٰهِ إلٰهًا اٰخَرَ.... )



উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্বোধন করে সকলকে এ নির্দেশ দিচ্ছেন যে, এ বিশ্বাস কর না যে, আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কেউ ইবাদত পাওয়ার হকদার আছে, অথবা আল্লাহ তা‘আলার সাথে অন্য কেউ ইবাদত পাওয়ার হকদার আছে। বরং একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই সকল ইবাদত পাওয়ার হকদার, তাঁর জন্যই সকল ইবাদত করতে হবে। যদি এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত না করে, অন্য কোন মা‘বূদের ইবাদত কর তাহলে অবশ্যই নিন্দিত ও লাঞ্ছিত হবে। দুনিয়াতে তোমাকে তোমার বাতিল মা‘বূদেরা কোন উপকার করবে না, আখিরাতেও তারা কোন উপকার করতে পারবে না, তাদেরকে নিয়ে জাহান্নামে যেতে হবে। এই শিরক ও তার পরিণতি সম্পর্কে সূরা নিসায় আলোচনা করা হয়েছে।



(وَقَضٰي رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوْا....)



এখানে আল্লাহ তা‘আলা একমাত্র তাঁর ইবাদত করার নির্দেশ দেয়ার সাথে সাথে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছেন। কুরআনের প্রত্যেক স্থানে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নিজের হকের (একমাত্র তাঁর ইবাদতের নির্দেশের) সাথে সাথে মানুষের মধ্যে যারা সবচেয়ে বেশি সৎ ব্যবহার পাওয়ার হকদার তথা পিতা-মাতা তাদের কথা উল্লেখ করেছেন।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَاعْبُدُوا اللّٰهَ وَلَا تُشْرِكُوْا بِه۪ شَيْئًا وَّبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا)



“তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর ও কোন কিছুকে তাঁর সাথে শরীক কর না; এবং পিতা-মাতার সাথে সৎ ব্যবহার কর” (সূরা নিসা ৪:৩৬)



এরূপ কুরআনে অসংখ্য আয়াত রয়েছে যেখানে পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এমনকি যদি পিতা-মাতা মুশরিকও হয় তাহলেও তাদের সাথে সৎ ব্যবহার করতে হবে, তবে আল্লাহর আনুগত্য বহির্ভূত কোন কাজ বা তাঁর সাথে শিরক করার নির্দেশ দিলে তাদের কথা মানা যাবে না, কিন্তু বিআদবীও করা যাবে না, সুন্দরপন্থায় বর্জন করতে হবে। হাদীসেও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর ইবাদতের পর পিতা-মাতার হকের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন কবীরাহ গুনাহ হল আল্লাহর সাথে শিরক করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। (সহীহ বুখারী হা: ৬৮৭০, সহীহ মুসলিম হা: ৮৭)



বিশেষ করে তারা উভয়ে বা একজন বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের সাথে ভাল আচরণ করতে হবে, তাদের খেদমত করতে হবে এবং তাদের কথায় বা আচরণে কষ্ট পেয়ে মুখ দিয়ে উফ শব্দটিও উচ্চারণ করবে না, এমন কি ধমকস্বরেও কথা বলবে না। এসময় তারা খেদমতের বেশি মুখাপেক্ষী থাকে, কারণ নিজেরা স্বয়ংসম্পন্নভাবে চলতে ফিরতে পারে না, ঔষধ-ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হয়, কাপড় নষ্ট করে ফেলে ইত্যাদি। তাই এ সময়টির কথা আল্লাহ তা‘আলা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। এবং সর্বদা তাদের সাথে উত্তম ভাষায় সম্মান দিয়ে কথা-বার্তা বলতে হবে। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ভাষায় পিতা-মাতা সন্তানের জান্নাতে ও জাহান্নামে যাওয়ার মাধ্যম। কেউ যদি তাদের সেবা করে সন্তুষ্ট করতে পারে তাহলে আল্লাহ তা‘আলা সন্তুষ্ট হন, আর সে জান্নাতে যাওয়ার সৌভাগ্য লাভ করবে আর যদি কেউ তাদেরকে কষ্ট দেয় তাহলে আল্লাহ তা‘আলাও কষ্ট পান, এ জন্য তাকে জাহান্নামে যেতে হবে। হাদীসে এসেছে



আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা মিম্বরে আরোহণ করে তিনবার বললেন, আমীন, আমীন, আমীন। তখন সাহাবারা এর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন । তিনি বললেন: আমার নিকট জিবরীল এসেছিল। সে বলল, হে মুহাম্মাদ! ঐ ব্যক্তির নাক ধূলোমলিন হোক যার নিকট আমার নাম স্মরণ করার পর সে আমার ওপর দরূদ পাঠ করে না। বলুন আমীন। আমি বললাম, আমীন। অতঃপর সে বলল: ঐ ব্যক্তির নাক ধূলোমলিন হোক যার কাছে রমযান মাস এসেছে আবার চলেও গেছে কিন্তু তাকে ক্ষমা করা হয়নি। বলুন আমীন। আমি বললাম, আমীন। অতঃপর সে আবার বলল: ঐ ব্যক্তির নাক ধূলোমলিন হোক যে, তার পিতা-মাতাকে অথবা তাদের একজনকে তার জীবদ্দশায় পেয়েছে কিন্তু সে জান্নাতে যেতে পারল না। বলুন আমীন। আমি বললাম, আমীন। (তিরমিযী-৩৫৪৫, যাওয়ায়েদুল মুসনাদ হা: ৭৪৪৪, সহীহ)



(جَنَاحَ الذُّلِّ) ‘নম্রতার বাহু’ অর্থাৎ পাখি যখন তার বাচ্চাদেরকে নিজ করুণার ছায়ায় রাখতে চায়, তখন তাদের জন্য নিজের ডানাকে নত করে দেয়। অর্থাৎ তুমিও তোমার পিতা-মাতার সাথে ঐরূপ উত্তম এবং করুণাসিক্ত আচরণ কর। আর তাদের ঐরূপ সেবাযত্ন কর যেরূপ সেবা-যত্ন তারা তোমার শিশুকালে করেছিল। আর তাদের মৃত্যুর পর তাদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করে বল:



(رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِيْ صَغِيْرًا)



‘হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া কর‎ যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।’



আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:



(رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ)



‘হে আমাদের প্রতিপালক! যেদিন হিসেব অনুষ্ঠিত হবে সেদিন আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং মু’মিনগণকে ক্ষমা করে দাও।’ (সূরা ইবরাহীম ১৪:৪১)



তবে যদি পিতা-মাতা বিধর্মী হয় তাহলে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা যাবে না। যেমনিভাবে ইবরাহীম (عليه السلام) তাঁর পিতার অবস্থা জানার পর তার জন্য দু‘আ করা থেকে বিরত থাকলেন। (তাওবা ৯:১০৩) তবে ভাল ব্যবহার করতে হবে এবং সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. আল্লাহ তা‘আলার পরিবর্তে অন্যের ইবাদত করা যাবে না।

২. পিতা-মাতার সাথে ভাল ব্যবহার করতে হবে। তাদের অবাধ্য হওয়া যাবে না।

৩. পিতা-মাতা বিধর্মী হলে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা যাবে না, তবে ভাল আচরণ করতে হবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ২৩-২৪ নং আয়াতের তাফসীর

এখানে (আরবি) শব্দের অর্থ আদেশ করা। আল্লাহ তাআলার গুরুত্বপূর্ণ আদেশ যা কখনো নড়বার নয়। তা এটাই যে, ইবাদত হবে শুধু আল্লাহর এবং পিতা-মাতার আনুগত্যে যেন তিল পরিমাণও ত্রুটি না হয়। হযরত উবাই ইবনু (রাঃ) কাব, ইবনু মাসউদ (রাঃ) এবং যহহাক ইবনু মাযাহিমের কিরআতে (আরবি) এর স্থলে (আরবি) রয়েছে। এই দুটো হুকুম একই সাথে যেমন এখানে রয়েছে, অনুরূপভাবে আরো বহু আয়াতেও রয়েছে। যেমন এক জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর আমার এবং তোমার পিতামাতার।” বিশেষ করে তাদের বার্ধক্যের সময় তাদের সাথে ভদ্রতাপূর্ণ আচরণ করা, কোন বড় কথা মুখ দিয়ে বের না করা, এমনকি তাদের সামনে কোন বিরক্তি সূচক কথা উচ্চারণ না করা, না এমন কোন কাজ করা যা তারা খারাপ মনে করে, বেআদবীর সাথে নিজের হাত তাদের দিকে না বাড়ানো, বরং আদব ও সম্মানের সাথে কথাবার্তা বলা, ভদ্রতার সাথে কথোপকথন করা, তারা যে কাজে সন্তুষ্ট থাকে সেই কাজ করা, তাদেরকে দুঃখ না দেয়া, তাদের সামনে বিনয় প্রকাশ করা, তাদের বার্ধক্যের সময় এবং মৃত্যুর পর তাদের জন্যে দুআ করা অবশ্য কর্তব্য। বিশেষ করে নিম্নরূপ দুআ করতে হবেঃ হে আমার প্রতিপালক! তাঁদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তাঁরা আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।

তবে কাফিরদের জন্যে দুআ করতে মুমিনদেরকে নিষেধ করে দেয়াহয়েছে। যদিও তারা পিতা-মাতাও হয়। পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করার হাদীস অনেক রয়েছে। একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা মিম্বরের উপর উঠে তিনবার আমীন বলেন। তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “আমার কাছে জিবরাঈল (আঃ) এসেছিলেন। এসে তিনি বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! ঐ ব্যক্তির নাক ধূলা মলিন হোক, যার সামনে আপনার নাম উচ্চারিত হয়, অথচ সে আপনার উপর দরূদ পাঠ করে না। বলুন, আমীন।” সুতরাং আমি আমীন বললাম। আবার তিনি বললেনঃ “ঐ ব্যক্তির নাসিকা ধূলায় ধুসরিত হোক যার জীবনে রমযান মাস আসলো এবং চলেও গেল, অথচ তাকে ক্ষমা করা হলো না। বলুন, আমীন।” আমি আমীন বললাম। পুনরায় তিনি বললেনঃ“ঐ ব্যক্তিকেও আল্লাহ ধ্বংস করুন, যে তার পিতামাতা উভয়কে পেলে অথবা কোন একজনকে পেলো, অথচ তাদের খিদমত করে জান্নাতে যেতে পারলো না; আমীন বলুন।” আমি তখন আমীন বললাম।”

মুসনাদে আহমদে রয়েছে যে, যে ব্যক্তি কোন মুসলমান পিতা-মাতার পিতৃহীন সন্তানদেরকে লালন-পালন করে পানাহার করায় যে পর্যন্ত না তারা ' অমুখাপেক্ষী হয়, নিঃসন্দেহে তার জন্যে জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি কোন মুসলমান গোলামকে আযাদ করে, আল্লাহ তাআলা তাকে জাহান্নাম হতে আযাদ করবেন, তার এক একটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিনিময়ে তাঁর এক একটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জাহান্নাম থেকে মুক্ত করবেন। এই হাদীসেরই একটি সনদে রয়েছেঃ “যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে বা তাদের কোন একজনকে পেলো অথচ জাহান্নামে চলে গেল, আল্লাহ তাআলা তাকে স্বীয় রহমত হতে দূর করবেন।” মুসনাদে আহমাদের অন্য একটি রিওয়াইয়াতে এই তিনটির বর্ণনা একই সাথে আছে। অর্থাৎ গোলাম আযাদ করা, পিতা-মাতার খিদমত করা এবং পিতৃহীনকে লালন-পালন করা। একটি রিওয়াইয়াতে পিতামাতার সম্পর্কে এও রয়েছেঃ আল্লাহ তাকে দূর করুন এবং তাকে ধ্বংস করুন। একটি বর্ণনায় তিনবার তাকে বদ দুআ করা হয়েছে। একটি রিওয়াইয়াতে রাসূলুল্লাহর (সঃ) নাম শুনে দুরূদ পাঠ না কারী ব্যক্তি, রমযান মাসে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত ব্যক্তি এবং পিতা-মাতার খিদমত করে ও তাদেরকে সন্তুষ্ট করে বেহেশতে যেতে পারলো না এমন ব্যক্তির জন্যে রাসূলুল্লাহর (সঃ) বদুআ করা বর্ণিত হয়েছে।

একজন আনসারী এসে রাসূলুল্লাহকে (সঃ) জিজ্ঞেস করলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার পিতা-মাতার ইন্তেকালের পরেও কি তাদের সাথে। সদাচরণের কোন সুযোগ আছে?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “হাঁ, চারটি আচরণ রয়েছে। তাদের জানাযার নামায পড়া, তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা, তাদের ওয়াদা পূরণ করা, তাদের বন্ধু-বান্ধবদের সম্মান করা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখা। এটা এ আচরণ যা তুমি তাদের মৃত্যুর পরেও তাদের সাথে করতে পারো। (এ হাদীসটি সুনানে আবি দাউদ ও সুনানে ইবনু মাজাহতে বর্ণিত হয়েছে)

একটি লোক এসে বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি জিহাদের ইচ্ছায় আপনার খিদমতে সুসংবাদ নিয়ে এসেছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার মা (বেঁচে) আছে কি?” উত্তরে সে বললোঃ “হাঁ, আছে।” তখন তিনি লোকটিকে বললেনঃ “যাও, তারই খিদমতে লেগে থাকো। বেহেশত তার পায়ের কাছে রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে লোকটি দু’বার, তিনবার এই কথাটারই পুনরাবৃত্তি করে এবং রাসূলুল্লাহ ও (সঃ) এই জবাবেরই পুনরাবৃত্তি করেন। (সুনানে নাসাঈ, সুনানে ইবনু মাজাহ প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে এটা বর্ণিত আছে)

বলা হয়েছেঃ আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের পিতাদের সম্পর্কে অসিয়ত করেছেন, আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মাতাদের সম্পর্কে অসিয়ত করেছেন। পরবর্তী বাক্যটিকে তিনি তিন বার বর্ণনা করে বলেনঃ তিনি তোমাদেরকে তোমাদের নিকটতম আত্মীয়দের ব্যাপারে অসিয়ত করেছেন, প্রথমে সর্বাপেক্ষা নিকটতমদের ব্যাপারে এবং এরপর তাদের পরবর্তীদের ব্যাপারে (অসিয়ত করেছেন)। (সুনানে ইবনু মাজাহ ও সুনানে আহমাদে এটা বর্ণিত আছে)

নবী (সঃ) বলেছেনঃ “দাতার হাত উপরে। তোমরা সদাচরণ কর তোমাদের মাতাদের সাথে। পিতাদের সাথে, বোনদের সাথে, ভাইদের সাথে এবং এরপর এর পরবর্তী নিকটতম আত্মীয়দের সাথে এইভাবে স্তরের পর স্তর।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)

একটি রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, একটি লোক তার মাতাকে পিঠে উঠিয়ে নিয়ে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করছিল। এ সময় সে রাসূলুল্লাহকে (সঃ) জিজ্ঞেস করেঃ “এখন আমি আমার মাতার হক আদায় করতে পেরেছি কি?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ না, এক অণু পরিমাণও নয়।” (এ হাদীসটি ইমাম বাযার (রঃ) দুর্বল সনদে স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।