সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 22)
হরকত ছাড়া:
لا تجعل مع الله إلها آخر فتقعد مذموما مخذولا ﴿٢٢﴾
হরকত সহ:
لَا تَجْعَلْ مَعَ اللّٰهِ اِلٰـهًا اٰخَرَ فَتَقْعُدَ مَذْمُوْمًا مَّخْذُوْلًا ﴿۲۲﴾
উচ্চারণ: লা-তাজ‘আল মা‘আল্লা-হি ইলা-হান আ-খারা ফাতাক‘উদা মাযমূমাম মাখযূলা-।
আল বায়ান: আল্লাহর সাথে অপর কোন ইলাহ নির্ধারণ করো না। তাহলে তুমি নিন্দিত ও লাঞ্ছিত হয়ে বসে পড়বে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২২. আল্লাহর সাথে অন্য কোন ইলাহ সাব্যস্ত করো না; করলে নিন্দিত ও লাঞ্ছিত হয়ে বসে পড়বে।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহর সাথে অন্য কোন ইলাহ সাব্যস্ত করো না, করলে তিরস্কৃত হতভাগ্য হয়ে পড়ে থাকবে।
আহসানুল বায়ান: (২২) আল্লাহর সাথে অপর কোন উপাস্য স্থির করো না; করলে নিন্দিত ও নিঃসহায় হয়ে যাবে।
মুজিবুর রহমান: আল্লাহর সাথে অপর কোন মা‘বূদ স্থির করনা; তাহলে নিন্দিত ও নিঃসহায় হয়ে পড়বে।
ফযলুর রহমান: আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্য সাব্যস্ত করো না। তাহলে তুমি নিন্দিত ও লাঞ্ছিত হয়ে পড়বে।
মুহিউদ্দিন খান: স্থির করো না আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্য। তাহলে তুমি নিন্দিত ও অসহায় হয়ে পড়বে।
জহুরুল হক: আল্লাহ্র সাথে অন্য উপাস্য খাড়া করো না, পাছে তুমি বসে থাক নিন্দিত নিঃসহায় হয়ে।
Sahih International: Do not make [as equal] with Allah another deity and [thereby] become censured and forsaken.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২২. আল্লাহর সাথে অন্য কোন ইলাহ সাব্যস্ত করো না; করলে নিন্দিত ও লাঞ্ছিত হয়ে বসে পড়বে।(১)
তাফসীর:
১. সাধারণত যারা আল্লাহর সাথে শির্ক করে তাদের বেশিরভাগেই বিপদাপদে আল্লাহকে ভুলে বিভিন্ন পীর-ফকীর, আলী, দরগাহ ইত্যাদিকে ডাকে এবং তাদের কাছে নিজের অভাব গোছানো বা বিপদমুক্তির আহবান জানাতে থাকে। এতে তারা শির্ক করার কারণে আখেরাতে নিন্দিত ও লাঞ্ছিত হবে। কারণ, আল্লাহর সাথে কেউ শরীক করলে আল্লাহ তাকে আর সাহায্য করবেন না। বরং তাকে সে শরীকের কাছে ন্যস্ত করে দেন যাকে সে আল্লাহর সাথে শরীক করেছে। অথচ সে তার কোন ক্ষতি কিংবা উপকারের মালিক নয়। কারণ, ক্ষতি বা উপকারের মালিক তো আল্লাহ তা’আলাই।
সুতরাং আল্লাহর সাথে শরীক করার কারণে তাকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়েই থাকতে হবে। [ইবন কাসীর] এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “অভাব ও সমস্যাগ্ৰস্ত কেউ যখন তার অভাব ও সমস্যা মানুষের কাছে ব্যক্ত করে তখন তার সে অভাব পূর্ণ হয় না, পক্ষান্তরে যে আল্লাহর দরবারে পেশ করে অচিরেই আল্লাহ তাকে অমুখাপেক্ষী করে দেয়। দ্রুত মৃত্যুর মাধ্যমে অথবা দ্রুত ধনী করার মাধ্যমে।” [আবু দাউদঃ ১৬৪৫, তিরমিযীঃ ২৩২৬, মুসনাদে আহমাদঃ ১/৪০৭]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২২) আল্লাহর সাথে অপর কোন উপাস্য স্থির করো না; করলে নিন্দিত ও নিঃসহায় হয়ে যাবে।
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২২-২৪ নং আয়াতের তাফসীর:
(لَا تَجْعَلْ مَعَ اللّٰهِ إلٰهًا اٰخَرَ.... )
উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্বোধন করে সকলকে এ নির্দেশ দিচ্ছেন যে, এ বিশ্বাস কর না যে, আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কেউ ইবাদত পাওয়ার হকদার আছে, অথবা আল্লাহ তা‘আলার সাথে অন্য কেউ ইবাদত পাওয়ার হকদার আছে। বরং একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই সকল ইবাদত পাওয়ার হকদার, তাঁর জন্যই সকল ইবাদত করতে হবে। যদি এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত না করে, অন্য কোন মা‘বূদের ইবাদত কর তাহলে অবশ্যই নিন্দিত ও লাঞ্ছিত হবে। দুনিয়াতে তোমাকে তোমার বাতিল মা‘বূদেরা কোন উপকার করবে না, আখিরাতেও তারা কোন উপকার করতে পারবে না, তাদেরকে নিয়ে জাহান্নামে যেতে হবে। এই শিরক ও তার পরিণতি সম্পর্কে সূরা নিসায় আলোচনা করা হয়েছে।
(وَقَضٰي رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوْا....)
এখানে আল্লাহ তা‘আলা একমাত্র তাঁর ইবাদত করার নির্দেশ দেয়ার সাথে সাথে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছেন। কুরআনের প্রত্যেক স্থানে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নিজের হকের (একমাত্র তাঁর ইবাদতের নির্দেশের) সাথে সাথে মানুষের মধ্যে যারা সবচেয়ে বেশি সৎ ব্যবহার পাওয়ার হকদার তথা পিতা-মাতা তাদের কথা উল্লেখ করেছেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَاعْبُدُوا اللّٰهَ وَلَا تُشْرِكُوْا بِه۪ شَيْئًا وَّبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا)
“তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর ও কোন কিছুকে তাঁর সাথে শরীক কর না; এবং পিতা-মাতার সাথে সৎ ব্যবহার কর” (সূরা নিসা ৪:৩৬)
এরূপ কুরআনে অসংখ্য আয়াত রয়েছে যেখানে পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এমনকি যদি পিতা-মাতা মুশরিকও হয় তাহলেও তাদের সাথে সৎ ব্যবহার করতে হবে, তবে আল্লাহর আনুগত্য বহির্ভূত কোন কাজ বা তাঁর সাথে শিরক করার নির্দেশ দিলে তাদের কথা মানা যাবে না, কিন্তু বিআদবীও করা যাবে না, সুন্দরপন্থায় বর্জন করতে হবে। হাদীসেও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর ইবাদতের পর পিতা-মাতার হকের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন কবীরাহ গুনাহ হল আল্লাহর সাথে শিরক করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। (সহীহ বুখারী হা: ৬৮৭০, সহীহ মুসলিম হা: ৮৭)
বিশেষ করে তারা উভয়ে বা একজন বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের সাথে ভাল আচরণ করতে হবে, তাদের খেদমত করতে হবে এবং তাদের কথায় বা আচরণে কষ্ট পেয়ে মুখ দিয়ে উফ শব্দটিও উচ্চারণ করবে না, এমন কি ধমকস্বরেও কথা বলবে না। এসময় তারা খেদমতের বেশি মুখাপেক্ষী থাকে, কারণ নিজেরা স্বয়ংসম্পন্নভাবে চলতে ফিরতে পারে না, ঔষধ-ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হয়, কাপড় নষ্ট করে ফেলে ইত্যাদি। তাই এ সময়টির কথা আল্লাহ তা‘আলা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। এবং সর্বদা তাদের সাথে উত্তম ভাষায় সম্মান দিয়ে কথা-বার্তা বলতে হবে। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ভাষায় পিতা-মাতা সন্তানের জান্নাতে ও জাহান্নামে যাওয়ার মাধ্যম। কেউ যদি তাদের সেবা করে সন্তুষ্ট করতে পারে তাহলে আল্লাহ তা‘আলা সন্তুষ্ট হন, আর সে জান্নাতে যাওয়ার সৌভাগ্য লাভ করবে আর যদি কেউ তাদেরকে কষ্ট দেয় তাহলে আল্লাহ তা‘আলাও কষ্ট পান, এ জন্য তাকে জাহান্নামে যেতে হবে। হাদীসে এসেছে
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা মিম্বরে আরোহণ করে তিনবার বললেন, আমীন, আমীন, আমীন। তখন সাহাবারা এর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন । তিনি বললেন: আমার নিকট জিবরীল এসেছিল। সে বলল, হে মুহাম্মাদ! ঐ ব্যক্তির নাক ধূলোমলিন হোক যার নিকট আমার নাম স্মরণ করার পর সে আমার ওপর দরূদ পাঠ করে না। বলুন আমীন। আমি বললাম, আমীন। অতঃপর সে বলল: ঐ ব্যক্তির নাক ধূলোমলিন হোক যার কাছে রমযান মাস এসেছে আবার চলেও গেছে কিন্তু তাকে ক্ষমা করা হয়নি। বলুন আমীন। আমি বললাম, আমীন। অতঃপর সে আবার বলল: ঐ ব্যক্তির নাক ধূলোমলিন হোক যে, তার পিতা-মাতাকে অথবা তাদের একজনকে তার জীবদ্দশায় পেয়েছে কিন্তু সে জান্নাতে যেতে পারল না। বলুন আমীন। আমি বললাম, আমীন। (তিরমিযী-৩৫৪৫, যাওয়ায়েদুল মুসনাদ হা: ৭৪৪৪, সহীহ)
(جَنَاحَ الذُّلِّ) ‘নম্রতার বাহু’ অর্থাৎ পাখি যখন তার বাচ্চাদেরকে নিজ করুণার ছায়ায় রাখতে চায়, তখন তাদের জন্য নিজের ডানাকে নত করে দেয়। অর্থাৎ তুমিও তোমার পিতা-মাতার সাথে ঐরূপ উত্তম এবং করুণাসিক্ত আচরণ কর। আর তাদের ঐরূপ সেবাযত্ন কর যেরূপ সেবা-যত্ন তারা তোমার শিশুকালে করেছিল। আর তাদের মৃত্যুর পর তাদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করে বল:
(رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِيْ صَغِيْرًا)
‘হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া কর যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।’
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:
(رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ)
‘হে আমাদের প্রতিপালক! যেদিন হিসেব অনুষ্ঠিত হবে সেদিন আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং মু’মিনগণকে ক্ষমা করে দাও।’ (সূরা ইবরাহীম ১৪:৪১)
তবে যদি পিতা-মাতা বিধর্মী হয় তাহলে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা যাবে না। যেমনিভাবে ইবরাহীম (عليه السلام) তাঁর পিতার অবস্থা জানার পর তার জন্য দু‘আ করা থেকে বিরত থাকলেন। (তাওবা ৯:১০৩) তবে ভাল ব্যবহার করতে হবে এবং সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. আল্লাহ তা‘আলার পরিবর্তে অন্যের ইবাদত করা যাবে না।
২. পিতা-মাতার সাথে ভাল ব্যবহার করতে হবে। তাদের অবাধ্য হওয়া যাবে না।
৩. পিতা-মাতা বিধর্মী হলে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা যাবে না, তবে ভাল আচরণ করতে হবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ইবাদতের চাপ যাদের উপর রয়েছে, তাদের প্রত্যেককেই আল্লাহ তাআলা এখানে সম্বোধন করেছেন। রাসূলুল্লাহর (সঃ) সমস্ত উম্মতকেই তিনি সম্বোধন করে বলছেনঃ তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করো। তাঁর ইবাদতে অন্য কাউকে শরীক করো না। যদি এরূপ কর তবে লাঞ্ছিত হয়ে যাবে এবং তোমাদের উপর থেকে আল্লাহর সাহায্য সরে যাবে। এ সময় তোমাদেরকে তারই কাছে সমর্পণ করা হবে যার তোমরা ইবাদত করবে। আর এটা প্রকাশ্য কথা যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ লাভ ও ক্ষতির মালিক নয়। আল্লাহ এক ও অংশীবিহীন।
মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ক্ষুধার্ত হয় এবং লোকদের কাছে ঐ ক্ষুধা মিটাবার জন্যে প্রার্থনা করতে চায়, আল্লাহ তার ক্ষুধা নিবারণ করেন না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি এ জন্যে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করে, তিনি তাকে সম্পদশালী করে দেন, তাড়াতাড়ি হোক অথবা বিলম্বেই হোক।” (এই হাদীসটি সুনানে আবি দাউদ ও জামে ও তিরমিযীতেও রয়েছে। সহীহ ও গারীব বলা হয়েছে)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।