আল কুরআন


সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 14)

সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 14)



হরকত ছাড়া:

اقرأ كتابك كفى بنفسك اليوم عليك حسيبا ﴿١٤﴾




হরকত সহ:

اِقْرَاْ کِتٰبَکَ ؕ کَفٰی بِنَفْسِکَ الْیَوْمَ عَلَیْکَ حَسِیْبًا ﴿ؕ۱۴﴾




উচ্চারণ: ইকরা’ কিতা-বাকা কাফা-বিনাফছিকাল ইয়াওমা ‘আলাইকা হাছীবা-।




আল বায়ান: পাঠ কর তোমার কিতাব, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব-নিকাশকারী হিসেবে যথেষ্ট।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৪. তুমি তোমার কিতাব পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসেব-নিকেশের জন্য যথেষ্ট।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: (তাকে বলা হবে) ‘পাঠ কর তোমার কিতাব, আজ তোমার হিসাব নেয়ার ব্যাপারে তুমিই যথেষ্ট।’




আহসানুল বায়ান: (১৪) (তাকে বলা হবে,) ‘তুমি তোমার কিতাব (আমলনামা) পাঠ কর; আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব-নিকাশের জন্য যথেষ্ট।’



মুজিবুর রহমান: (আমি বলব) তুমি তোমার কিতাব পাঠ কর; আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব নিকাশের জন্য যথেষ্ট।



ফযলুর রহমান: (তাকে বলা হবে) “তোমার কিতাবটি পড়। আজ তোমার বিরুদ্ধে হিসাব গ্রহণকারী হিসেবে তুমি নিজেই যথেষ্ট।”



মুহিউদ্দিন খান: পাঠ কর তুমি তোমার কিতাব। আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্যে তুমিই যথেষ্ট।



জহুরুল হক: পড় তোমার গ্রন্থ, -- আজকের দিনে তোমার আ‌ত্মাই তোমার উপরে হিসাব-তলবকারীরূপে যথেষ্ট।



Sahih International: [It will be said], "Read your record. Sufficient is yourself against you this Day as accountant."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৪. তুমি তোমার কিতাব পাঠ কর, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসেব-নিকেশের জন্য যথেষ্ট।(১)


তাফসীর:

১. হাসান বসরী রাহেমাহুল্লাহ বলেনঃ “আল্লাহর শপথ করে বলছি, যিনি তোমার হিসাবের ভার তোমার কাছেই অৰ্পণ করেছেন তিনি অবশ্যই তোমার সাথে সবচেয়ে বড় ইনসাফের কাজ করেছেন।” [ইবন কাসীর] কাতাদা রাহেমাহুল্লাহ বলেনঃ সেদিন সবাই তাদের আমলনামা পড়তে পারবে। যদিও সে দুনিয়াতে নিরক্ষর ছিল। [তাবারী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৪) (তাকে বলা হবে,) ‘তুমি তোমার কিতাব (আমলনামা) পাঠ কর; আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব-নিকাশের জন্য যথেষ্ট।’


তাফসীর:

-


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৩-১৪ নং আয়াতের তাফসীর:



طَآئِرَ শব্দের শাব্দিক অর্থ: পাখি, আর عُنُقِ অর্থ: ঘাড়, গ্রীবা। বিদ্বানগণ এখানে طَآئِرَ এর দুটি তাফসীর উল্লেখ করেছেন। (১) এর উদ্দেশ্য হল আমল, যা প্রতিনিয়ত মানুষ করে থাকে। অর্থাৎ মানুষ যে সকল আমল করে থাকে তা তাদের গ্রীবার সাথে সংযুক্ত থাকা আবশ্যক করে দিয়েছি। গলার হার যেমন গলার সাথে সংযুক্ত থাকে কখনো বিচ্ছিন্ন হয় না তেমনি মানুষের আমল তার গলার সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া হয়েছে যা কখনো আলাদা হবে না। অর্থাৎ ভাল-মন্দ সকল আমল লিপিবদ্ধ করে রাখা হয় কিয়ামতের দিন সেই লিপিবদ্ধ কিতাব তার সামনে উন্মুক্ত করে দেয়া হবে এবং বলা হবে আজ তুমি নিজেই তোমার আমলের তালিকা পড়, আমল হিসাব-নিকাশ করে জান্নাতী হবে, না জাহান্নামী হবে তার ফায়সালার জন্য তুমিই যথেষ্ট। এ অর্থে কুরআনে অনেক আয়াত রয়েছে,



যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(لَيْسَ بِأَمَانِيِّكُمْ وَلَآ أَمَانِيِّ أَهْلِ الْكِتٰبِ ط مَنْ يَّعْمَلْ سُوْ۬ءًا يُّجْزَ بِه۪)



“তোমাদের বাসনা ও আহলে কিতাবীদের বাসনা অনুসারে কাজ হবে না; কেউ মন্দ কাজ করলে তার প্রতিফল সে পাবে” (সূরা নিসা ৪:১২৩)



এ ছাড়াও সূরা তুরের ১৬ নং, সূরা ইনশিকাকের ৬ নং সূরা ফুসসিলাতের ৪৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে।



(২) طَآئِرَ অর্থ মানুষের ভাগ্য যা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর জ্ঞানানুযায়ী প্রথমেই লিপিবদ্ধ করে দিয়েছেন। যারা সৌভাগ্যবান ও আল্লাহ তা‘আলার অনুগত হওয়ার ছিল, তা আল্লাহ তা‘আলার জানা ছিল এবং যারা অবাধ্য ও দুর্ভাগা হওয়ার তাও তাঁর জানা ছিল। এ ভাগ্যই প্রত্যেক মানুষের সাথে গলার হারের মত লেগে আছে। সে অনুযায়ী হবে তার আমল এবং কিয়ামতের দিন সে অনুযায়ীই তার ফায়সালা হবে। এ অর্থে কুরআনের অনেক আয়াত রয়েছে- যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(هُوَ الَّذِيْ خَلَقَكُمْ فَمِنْكُمْ كٰفِرٌ وَّمِنْكُمْ مُّؤْمِنٌ ط وَاللّٰهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ بَصِيْرٌ )‏



“তিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাদের মধ্যে কেউ হয় কাফির এবং কেউ হয় মু’মিন। তোমরা যা কর আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।” (সূরা তাগাবুন ৬৪:২)



অতএব আল্লাহ তা‘আলা মানুষের সকল আমল লিপিবদ্ধ করে রাখছেন যাতে করে মানুষ বলতে না পারে যে, তার প্রতি জুলুম করা হয়েছে। বরং আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেকের প্রতি সুবিচার করবেন।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. মানুষের আমলসমূহ লিখে রাখা হয়।

২. কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক ব্যক্তিকে দিয়ে তার আমলনামা পাঠ করাবেন।

৩. কিয়ামতের দিন মানুষ তার অপরাধ বুঝতে পারবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৩-১৪ নং আয়াতের তাফসীর

উপরের আয়াতে সময়ের বর্ণনা দেয়া হয়েছে যার মধ্যে মানুষ আমল করে থাকে। এখানে আল্লাহ তাআলা বলছেন যে, মানুষ ভাল মন্দ যা কিছু আমল করে তা তার সাথেই সংলগ্ন হয়ে যায়। ভাল কাজের প্রতিদান ভালহবে এবং মন্দ কাজের প্রতিদান মন্দ হবে, তা পরিমাণে যতই কম হোক না কেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যেই ব্যক্তি অনুপরিমাণ সৎ কাজ করবে সে তা দেখতে পাবে। আর যেই ব্যক্তি অনুপরিমাণ মন্দ কাজ করবে সে তা তথায় দেখতে পাবে।” (৯৯: ৭-৮) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যখন গ্রহণকারী ফেরেস্তারা (মানুষের কার্যাবলী) গ্রহণ করতে থাকে, যারা ডানে ও বামে উপবিষ্ট আছে। সে কোন কথা মুখ হতে বের করা মাত্র তার নিকটেই একজন রক্ষক (ফেরে) প্রস্তুত রয়েছে (সে লিপিবদ্ধ করে)।” (৫০:১৭-১৮) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমাদের উপর নিযুক্ত রয়েছে সংরক্ষক ফেরেশতাগণ, সম্মানিত লেখকগণ, যারা তোমাদের সমুদয় কার্যকলাপ অবগত আছে।” (৮২:১০-১২) অন্য এক জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “তোমাদেরকে শুধু তোমাদের কৃত কর্মেরই প্রতিদান দেয়া হবে।” আর এক জায়গায় বলেনঃ “প্রত্যেক মন্দকর্মকারীকে শাস্তি দেয়া হবে।” উদ্দেশ্য এই যে, আদম সন্তানের ছোট বড়, গোপনীয়, প্রকাশ্য, ভাল, মন্দ কাজ , সকাল, সন্ধ্যা, দিন ও রাত অনবরতই লিখে নেয়া হয়।

মুসনাদে আহমদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “অবশ্যই প্রত্যেক মানুষের আমলের বোঝা তার গ্রীবাদেশে রয়েছে।” ইবনু লাহীআহ বলেন যে, এমন কি ভাবী শুভাশুভের লক্ষণ গ্রহণ করাও।” (হাদীসের এই ব্যাখ্যা গারীব বা দুর্বল)

মানুষের আমলের সমষ্টির কিতাবখানা (আমলনামা) কিয়ামতের দিন তার ডান হাতে দেয়া হবে অথবা বাম হাতে দেয়া হবে। সৎ লোকদেরকে তাদের। আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে এবং মন্দলোকদেরকে তাদের আমলনামা। বাম হাতে দেয়া হবে। এই আমলনামা খোলা থাকবে, যেন সে নিজে পাঠ করে এবং অন্যেরাও দেখে নেয়। তার সারা জীবনের সমস্ত আমল তাতে লিখিত থাকবে। যেমন মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সেই দিন মানুষকে তার সমস্ত পূর্বকৃত ও পরেকৃত কার্যাবলী জানিয়ে দেয়া হবে। বরং মানুষ নিজেই নিজের অবস্থা সম্বন্ধে খুব অবহিতহবে, যদিও সে নিজের ওজরসমূহ পেশ করবে।” (১৩:১৪-১৫) ঐ সময় তাকে বলা হবেঃ তুমি ভালরূপেই জান যে, তোমার উপর জুলুম করা হবে না। এতে ওটাই লিখা আছে যা তুমি করেছে। সেই বিস্মরণ হওয়া জিনিসও স্মরণ হয়ে যাবে সেই কারণে প্রকৃতপক্ষে কোন ওযর পেশ করার সুযোগই থাকবে না। তাছাড়া সামনে কিতাব (আমলনামা) থাকবে যা সে পড়ে থাকবে। যদিও দুনিয়ায় সে মুখ ও নিরক্ষর থেকে থাকে, তথাপি সেই দিন সে পড়তে পারবে।

এখানে গ্রীবাকে বিশিষ্ট করার কারণ এই যে, ওটা এমন একটা বিশেষ অংশ যাতে যে জিনিস লটকিয়ে দেয়া হয় তা ওর সাথে সংলগ্ন থাকে। কবিরাও এই ধারণা প্রকাশ করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন যে, রোগ সংক্রামক হওয়া কোন কথা নয় এবং শুভাশুভ নিরূপণও কোন জিনিস নয়। প্রত্যেক মানুষের আমল তার গলার হার স্বরূপ।”

আর একটি রিওয়াইয়াতে রয়েছে যে, শুভাশুভ নিরূপণ হচ্ছে প্রত্যেক মানুষের গলার হার। রাসূলুল্লাহর (সঃ) উক্তি রয়েছে যে, প্রত্যেক দিনের আমলের উপর মোহর মেরে দেয়া হয়। যখন মু'মিন রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে তখন ফেরেস্তাগণ বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি তো অমুককে আমল থেকে বিরত রেখেছেন?” উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ“ যার যে আমল ছিল তা বরাবর লিখেই যাও, যে পর্যন্ত না আমি তাকে সুস্থ করে তুলি অথবা তার মৃত্যু ঘটাই।”

কাতাদা (রঃ) বলেন যে, এই আয়াত (আরবি) দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে আমল। হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, আদম সন্তানকে সম্বোধন করে বলা হয়ঃ “হে আদম সন্তান! তোমার ডানে ও বামে ফেরে বসে রয়েছে এবং সহীফা (ক্ষুদ্র পুস্তিকা) খুলে রেখেছে। ডান দিকের ফেরেস্তারা পূণ্য লিখছে এবং বাম দিকের গুলো পাপ লিখছে। এখন তোমার ইচ্ছা, হয় তুমি বেশী পূণ্যের কাজ কর অথবা বেশী পাপের কাজ কর। তোমার মৃত্যুর পর এই দফতর জড়িয়ে নেয়া হবে এবং তোমার কবরে তোমার গ্রীবাদেশে লটকিয়ে দেয়া হবে। কিয়ামতের দিন খোলা অবস্থায় তোমার সামনে পেশ করা হবে এবং তোমাকে বলা হবেঃ “তোমার আমলনামা তুমি স্বয়ং পাঠ কর এবং তুমি নিজেই তোমার হিসাব ও বিচার কর।” আল্লাহর কসম! তিনি বড়ই ন্যায় বিচারক, যিনি তোমার কাজ কারবার তোমার উপর অর্পণ করেছেন।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।