সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 111)
হরকত ছাড়া:
وقل الحمد لله الذي لم يتخذ ولدا ولم يكن له شريك في الملك ولم يكن له ولي من الذل وكبره تكبيرا ﴿١١١﴾
হরকত সহ:
وَ قُلِ الْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِیْ لَمْ یَتَّخِذْ وَلَدًا وَّ لَمْ یَکُنْ لَّهٗ شَرِیْکٌ فِی الْمُلْکِ وَ لَمْ یَکُنْ لَّهٗ وَلِیٌّ مِّنَ الذُّلِّ وَ کَبِّرْهُ تَکْبِیْرًا ﴿۱۱۱﴾
উচ্চারণ: ওয়া কুল্লি হামদুলিল্লা-হিল্লাযী লাম ইয়াত্তাখিযওয়ালাদাওঁ ওয়া লাম ইয়াকুল্লাহূশারীকুন ফিল মুলকি ওয়া লাম ইয়াকুল্লাহূওয়ালিইয়ুম মিনাযযুলিল ওয়া কাব্বিরহু তাকবীরা-।
আল বায়ান: আর বল, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি, রাজত্বে তাঁর কোন শরীক নেই এবং অপমান থেকে বাঁচতে তাঁর কোন অভিভাবকের দরকার নেই।’ সুতরাং তুমি পূর্ণরূপে তাঁর বড়ত্ব ঘোষণা কর।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১১১. বলুন, প্রশংসা আল্লাহরই যিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি(১), তাঁর সার্বভৌমত্ত্বে কোন অংশীদার নেই(২) এবং দুর্দশাগ্ৰস্ততা থেকে বাঁচতে তাঁর অভিভাবকের প্রয়োজন নেই।(৩) আর আপনি সসম্রামে তার মাহাত্য ঘোষণা করুন।
তাইসীরুল ক্বুরআন: বল, ‘সকল প্রশংসাই আল্লাহর যিনি সন্তান গ্রহণ করেন না, যাঁর শাসন-কর্তৃত্বে কোন অংশীদার নেই, দুর্দশাগ্রস্ত হওয়া থেকে বাঁচার জন্য যাঁর কোন অভিভাবকের প্রয়োজন হয় না। অতএব পূর্ণ শ্রেষ্ঠত্বে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর।
আহসানুল বায়ান: (১১১) বল, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি সন্তান গ্রহণ করেননি, তাঁর সার্বভৌমত্বে কোন অংশীদার নেই এবং যিনি দুর্দশাগ্রস্ত হন না; যে কারণে তাঁর অভিভাবকের প্রয়োজন হতে পারে।’ আর সসম্ভ্রমে তাঁর মাহাত্ম্য ঘোষণা কর।
মুজিবুর রহমান: বলঃ প্রশংসা আল্লাহরই যিনি সন্তান গ্রহণ করেননি, তাঁর সার্বভৌমত্বে কোন অংশী নেই এবং তিনি দুর্দশাগ্রস্ত হননা যে কারণে তাঁর অভিভাবকের প্রয়োজন হতে পারে; সুতরাং স্বসম্ভ্রমে তাঁর মাহাত্ম্য ঘোষণা কর।
ফযলুর রহমান: বল, “সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি, কর্তৃেত্ব যার কোন অংশীদার নেই এবং অসম্মান থেকে রক্ষার জন্য যার কোন অভিভাবক নেই (নিজে মহাসম্মানিত হওয়ায় যার তেমন অভিভাবকের প্রয়োজন নেই)।” আর তাঁর যথাযথ মহিমা বর্ণনা কর।
মুহিউদ্দিন খান: বলুনঃ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি না কোন সন্তান রাখেন, না তাঁর সার্বভৌমত্বে কোন শরীক আছে এবং যিনি দুর্দশাগ্রস্ত হন না, যে কারণে তাঁর কোন সাহয্যকারীর প্রয়োজন হতে পারে। সুতরাং আপনি স-সম্ভ্রমে তাঁর মাহাত্ন?2476;র্ণনা করতে থাকুন।
জহুরুল হক: আর তুমি বলো -- "সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্র, যিনি কোনো সন্তান গ্রহণ করেন নি, আর যাঁর জন্য এই সাম্রাজ্যে কোনো শরিক নেই, এবং যাঁর কোনো মনিব নেই দুর্দশা থেকে, সুতরাং তাঁর মাহাত্ম্য ঘোষণা করো সসম্ভ্রমে।"
Sahih International: And say, "Praise to Allah, who has not taken a son and has had no partner in [His] dominion and has no [need of a] protector out of weakness; and glorify Him with [great] glorification."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১১১. বলুন, প্রশংসা আল্লাহরই যিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি(১), তাঁর সার্বভৌমত্ত্বে কোন অংশীদার নেই(২) এবং দুর্দশাগ্ৰস্ততা থেকে বাঁচতে তাঁর অভিভাবকের প্রয়োজন নেই।(৩) আর আপনি সসম্রামে তার মাহাত্য ঘোষণা করুন।
তাফসীর:
(১) এখানে প্রত্যক্ষভাবে রাসূলকে নির্দেশ দেয়া হলেও নির্দেশটি সমস্ত উম্মতের জন্যও প্রযোজ্য। সবাইকে তাওহীদের ঘোষণা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করার আদেশ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে তাওহীদের এ অংশের নির্দেশ সম্বলিত আয়াতসমূহ এসেছে। [যেমন, সূরা ইখলাস, সূরা আল জিনঃ ৩, সূরা আল-মু'মিনূনঃ ৯১, সূরা আল-আনআমঃ ১০১, সূরা আল-বাকারাহ ১১৬, সূরা ইউনুসঃ ৬৮, সূরা আল-কাহফঃ ৪, সূরা মারইয়ামঃ ৮৮–৯২, সূরা আল আম্বিয়াঃ ২৬, সূরা আল-ফুরকানঃ ২]
এ সমস্ত আয়াতে যে সত্যটি তুলে ধরা হয়েছে তা হলো, দয়াময় আল্লাহর জন্য সন্তান গ্ৰহণ অসম্ভব। সন্তান তো তারাই আশা করে যারা তাদের অবর্তমানে তাদের কাজকারবার দেখাশুনা, তাদের নাম টিকিয়ে রাখা, তাদের চাহিদা পূরণ, তাদের কর্মকাণ্ডে সাহায্য-সহযোগিতার প্রয়োজন পড়ে। মহান আল্লাহ্ তা'আলা এ সমস্ত কিছু থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। তিনি সর্বদা আছেন ও থাকবেন। তার কোন অভাব নেই। সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী। সুতরাং আল্লাহর কোন সন্তান হতে পারে না। এতে ইয়াহুদী ও নাসারাদের দাবীর রদ করা হয়েছে। [দেখুন, ফাতহুল কাদীর]
(২) এখানে আরও যে সমস্ত কারণে মানুষ তাওহীদ থেকে বিচ্যুত হয় তা হচ্ছে, কোন কোন মানুষ মনে করে থাকে যে, যদি তার সন্তান নাও থাকে তার রাজত্বে ও রাবুবিয়াতে অন্য কেউ শরীক আছে। সুতরাং তাদেরকেও সন্তুষ্ট করা উচিত। যেমন, মাজুস সম্প্রদায় মনে করে থাকে। তারা দু’জন ইলাহ নির্ধারণ করে থাকে। [ফাতহুল কাদীর] অনুরূপভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেও অনেকে এ ধরনের বিশ্বাস করে থাকে।
(৩) এখানে সে সমস্ত মুশরিকদের কথা বলা হয়েছে যারা বিভিন্ন দেবতা ও জ্ঞানী গুণী মহামানবদের সম্পর্কে বিশ্বাস করতো যে, আল্লাহ নিজের সার্বভৌম কর্তৃত্বের বিভিন্ন বিভাগ এবং নিজের রাজত্বের বিভিন্ন এলাকা তাদের ব্যবস্থাপনায় দিয়ে দিয়েছেন। এখানে তাদের এ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে প্রমাণ পেশ করা হয়েছে যে, আল্লাহ এমন নন যে, তিনি কোন কাজ করতে গিয়ে অপর কাজ করতে অপারগ হয়ে পড়েন।
সুতরাং তার সহকারী কেন লাগবে? সুতরাং তাদের যে বিশ্বাস ছিল, আল্লাহ নিজে তাঁর সার্বভৌম কর্তৃত্বের বোঝা বহন করতে অক্ষম, তাই তিনি নিজের জন্য কোন সাহায্যকারী ও নির্ভর তালাশ করে বেড়াচ্ছেন। এটা একান্ত ভ্ৰান্ত ধারণা ও বিশ্বাস। তাই বলা হয়েছে, আল্লাহ অক্ষম নন। তাঁর কোন ডেপুটি, সহকারী ও সাহায্যকারীর প্রয়োজন নেই। [দেখুন, ইবন কাসীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১১১) বল, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি সন্তান গ্রহণ করেননি, তাঁর সার্বভৌমত্বে কোন অংশীদার নেই এবং যিনি দুর্দশাগ্রস্ত হন না; যে কারণে তাঁর অভিভাবকের প্রয়োজন হতে পারে।’ আর সসম্ভ্রমে তাঁর মাহাত্ম্য ঘোষণা কর।
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১১০-১১১ নং আয়াতের তাফসীর:
মক্কার মুশরিকরা আল্লাহর ‘রহমান, রহীম’ গুণবাচক নামের সাথে পরিচিত ছিল না। যেমন সূরা ফুরকানের ৬০ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে। বিশিষ্ট তাবেয়ী মাকহুল (রহঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: জনৈক মুশরিক নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সিজদারত অবস্থায় আল্লাহকে ‘ইয়া রহমান, ইয়া রহীম’ নামে ডাকতে শুনলেন। তখন সে মুশরিক বলল: সে দাবী করে একমাত্র আল্লাহকেই আহ্বান করে, এখন তো দেখছি সে দু’জন মাবুদকে ডাকছে। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। (ইবনু জারীর ১৫/১২১, ইবনু কাসীর ৫/১৩৫)
তাই আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলছেন: বলে দাও তোমরা আল্লাহ তা‘আলাকে তাঁর যে কোন নামেই ডাকতে পারো। ইচ্ছা করলে আল্লাহ বলে ডাকতে পারো, ইচ্ছা করলে রহমান নামে ডাকতে পারো। এছাড়াও তাঁর অনেক সুন্দর সুন্দর নাম রয়েছে সেগুলো উল্লেখ করে ডাকতে পারো।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلِلہِ الْاَسْمَا۬ئُ الْحُسْنٰی فَادْعُوْھُ بِھَا وَذَرُوا الَّذِیْنَ یُلْحِدُوْنَ فِیْٓ اَسْمَا۬ئِھ۪ سَیُجْزَوْنَ مَا کَانُوْا یَعْمَلُوْنَ)
“আল্লাহর জন্য রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। অতএব তোমরা তাঁকে সে সকল নামেই ডাক, যারা তাঁর নাম বিকৃত করে তাদেরকে বর্জন কর, অচিরেই তাদেরকে দেয়া হবে তাদের কৃতকর্মের ফল।” (সূরা আ‘রাফ ৭:১৮০)
আল্লাহ তা‘আলার সুন্দর সুন্দর নামগুলো বিভিন্ন সূরায় যেমন সূরা হাশরে কিছু রয়েছে। এ সম্পর্কে সূরা আ‘রাফের ১৮০ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
অতঃপর আল্লাহ তাঁর রাসূলকে নির্দেশ দিলেন তিনি যেন সালাতে উচ্চস্বরে কুরআন তেলাওয়াত না করেন। কারণ কুরআন শুনে ইয়াহূদী খ্রিস্টানরা আল্লাহ তা‘আলাকে, রাসূলকে এবং কুরআনকে গালি-গালাজ করত এবং খুব নিম্ন স্বরেও পড়তে নিষেধ করেছেন। কারণ এতে যারা সালাতে পেছনে থাকে তারা তেলাওয়াত শুনতে পায় না। বরং মধ্যমপন্থা অবলম্বন করার নির্দেশ দিয়েছেন।
একদা রাতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবূ বকর (রাঃ) এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখলেন যে, আবূ বকর (রাঃ) খুব মৃদু আওয়াজে সালাত আদায় করছেন। অতঃপর উমার (রাঃ) এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন; দেখলেন যে, তিনি উঁচু আওয়াজে তেলাওয়াত করে সালাত আদায় করছেন। তিনি তাদের উভয়কে কারণ জিজ্ঞেস করলেন। আবূ বকর (রাঃ) বললেন: আমি যার সাথে মুনাজাতে ব্যস্ত ছিলাম তিনি আমার শব্দ শুনছিলেন। আর উমার (রাঃ) উত্তরে বললেন: আমার উদ্দেশ্য ঘুমন্তদেরকে জাগিয়ে দেয়া এবং শয়তানকে তাড়ানো। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবূ বকর (রাঃ) কে বললেন: তুমি তোমার শব্দ একটু উঁচু করবে আর উমার (রাঃ) কে বললেন: তুমি তোমার শব্দ একটু নিচু করবে। (আবূ দাঊদ হা: ১৩২৯, সহীহ)
শানে নুযূল:
ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, ‘তোমার সালাতে স্বর উচ্চ করো না এবং অতিশয় ক্ষীণও করো না’ এ আয়াত এমন সময় অবতীর্ণ হয় যখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কায় অপ্রকাশ্যে অবস্থান করছিলেন। অতঃপর যখন তিনি সাহাবীদের নিয়ে সালাত আদায় করতেন এবং উঁচু আওয়াজে কুরআন তেলাওয়াত করতেন তখন মুশরিকরা তা শুনে কুরআনকে গালি দিত, যিনি কুরআন অবতীর্ণ করেছেন তাঁকে (আল্লাহ তা‘আলাকে) গালি দিত এবং যে কুরআন নিয়ে এসেছেন (জিবরীল (عليه السلام))কে গালি দিত। তখন আল্লাহ তা‘আলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেন। এতে তিনি এমনভাবে কুরআন পাঠ করতে বলেছেন যাতে মুশরিকরা তা শুনতে না পায় এবং যারা মুক্তাদী তাদেরও যেন শুনতে কষ্ট না হয়। মধ্যমপন্থা অবলম্বন করার নির্দেশ প্রদান করেছেন। (সহীহ বুখারী: ৪৭২২-৭৪৯০, সহীহ মুসলিম হা: ৪৪৬)
(وَقُلِ الْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِيْ.....) শানে নুযূল:
ইবনু জারীর মুহাম্মাদ ইবনু কা‘ব আল কুরাযী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানরা বলত যে, আল্লাহ তা‘আলা সন্তান গ্রহণ করেন। আরবের মুশরিকরা বলত, “হে আল্লাহ তা‘আলা আমরা আপনার কাছে হাযির আছি, আপনার কোন অংশীদার নেই, শুধু একজন অংশীদার রয়েছে, তারও মালিক আপনিই। সে যা কিছুর মালিক তারও মালিক আপনিই।” সাবী এবং মাজুসীরা বলত: যদি আল্লাহ তা‘আলার ওয়ালী না থাকত তবে তিনি একাই সমস্ত ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করতে পারতেন না। نعوذ بالله তাদের এই সকল কথা খণ্ডন করার জন্য আল্লাহ তা‘আলা উক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। (লুবাবুন নুকূল ফী আসবাবিন নুযূল: পৃ. ১৭৬)
সুতরাং প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার যিনি কোন দিক থেকে কোন প্রকার অংশীদার গ্রহণ করেননি। তাঁর কোন স্ত্রী-সন্তান নেই, তাঁর রাজত্বে কোন শরীক নেই এবং তাঁর কোন অভিভাবক ও উপদেষ্টা নেই। তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ। তিনি একাই বিশ্ব জগৎ পরিচালনার জন্য যথেষ্ট।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
(قُلْ ھُوَ اللہُ اَحَدٌﭐﺆاَللہُ الصَّمَدُﭑﺆلَمْ یَلِدْﺃ وَلَمْ یُوْلَدْﭒﺫ وَلَمْ یَکُنْ لَّھ۫ کُفُوًا اَحَدٌ)
“বল: তিনিই আল্লাহ একক। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি। আর তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।” (সূরা ইখলাস: ১-৪)
সকল ক্ষমতার মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। যেমন তিনি অন্যত্র বলেন,
(تَبَارَكَ الَّذِيْ بِيَدِهِ الْمُلْكُ ز وَهُوَ عَلٰي كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرُ )
“বরকতময় সেই স্বত্ত্বা, যাঁর হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব; তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।” (সূরা মুলক ৬৭:১)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. আল্লাহ তা‘আলার সুন্দর সুন্দর নাম রয়েছে, সেগুলোর যে কোন নাম ধরে ডাকলে তিনি সাড়া দেবেন।
২. কোন প্রেক্ষাপট বা কোন স্থানে আল্লাহ তা‘আলা ও রাসূল অথবা দীনের কোন নিদর্শনের মানহানি হতে পারে সেখানে ভাল কাজও করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
৩. আল্লাহ তা‘আলার কোন শরীক, স্ত্রী-সন্তান ও ওয়ালী নেই।
৪. আল্লাহ তা‘আলার কোন নাম ও গুণাবলীকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই বরং ঈমান আনার সাথে সাথে সে সকল নাম ও গুণাবলীর মর্যাদা দিতে হবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১১০-১১১ নং আয়াতের তাফসীর
কাফিররা আল্লাহ তাআলার করুণার বিশেষণে অস্বীকারকারী ছিল। তার একটি গুণবাচক নাম যে রহমান তা তারা মানতো না বা বুঝতো না। তখন আল্লাহ তাআলা নিজের জন্যে এটা সাব্যস্ত করছেন এবং বলছেনঃ এটা নয় যে, তাঁর নাম শুধু আল্লাহই হবে এবং শুধু রহমানই হবে, অন্য কিছু হবে না। বরং এ ছাড়াও তার আরো বহু উত্তম ও সুন্দর নাম রয়েছে। যে পবিত্র নামের মাধ্যমেই ইচ্ছা তাঁর কাছে প্রার্থনা কর। সূরায়ে হাশরের শেষেও তিনি তাঁর অনেক নাম বর্ণনা করেছেন।
একজন মুশরিক রাসূলুল্লাহকে (সঃ) সিজদার অবস্থায় (আরবি) ও (আরবি) বলতে শুনে বলে ওঠেঃ “এই একত্ববাদীকে দেখো, দুই খোদাকে ডাকছে!” ঐ সময় এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।
এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ নামাযে স্বর খুব উচ্চও করো না এবং খুব ক্ষীণও করো না। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কায় গোপনীয়ভাবে ছিলেন। যখন তিনি সাহাবীদেরকে নামায পড়াতেন এবং তাতে উচ্চ শব্দে কিরআত পড়তেন তখন মুশরিকরা কুরআনকে, আল্লাহকে এবং রাসূলকে (সঃ) গালি দিতো। তাই, উচ্চ শব্দে কিরআত পড়তে নিষেধ করলেন। এরপর বললেনঃ এতো ক্ষীণ স্বরেও পড়ো না যে, তোমার সাথীরাও শুনতে পায় না। বরং এ দুয়ের মধ্যপথ অবলম্বন কর। অতঃপর যখন তিনি হিজরত করে মদীনায় আসলেন, তখন এই বিপদ কেটে গেল। তখন যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই কিরআত পাঠের অধিকার থাকলো। যেখানে কুরআন পাঠ করা হতো সেখান থেকে মুশরিকরা পালিয়ে যেতো কেউ শুনবার ইচ্ছা করলে লুকিয়ে ও নিজেকে বাঁচিয়ে শুনে নিতো। কিন্তু মুশরিকরা জানতে পারলে তাকে কঠিন শাস্তি দিতো। এখন খুব জোরে পড়লে মুশরিকদের গালির ভয় এবং খুবই আস্তে পড়লে যারা লুকিয়ে শুনতে চায় তারা বঞ্চিত থেকে যায়। তাই, মধ্যপথ অবলম্বন করার নির্দেশ দেয়া হয়। মোট কথা, নামাযের কিরআতের ব্যাপারে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) নামাযে কিরআত খুব ক্ষীণস্বরে পাঠ করতেন। তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “আমি আমার প্রতিপালকের সাথে সলা-পরামর্শ করে থাকি। তিনি আমার প্রয়োজনের খবর রাখেন।” তখন তাঁকে বলা হয়ঃ “এটা খুব উত্তম।” আর হযরত উমার (রাঃ) নামাযে কিরআত উচ্চ স্বরে পড়তেন। তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “আমি শয়তানকে তাড়াই ও ঘুমন্তকে জাগ্রত করি।” তাঁকেও বলা হলোঃ “এটা খুব ভাল।” কিন্তু যখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হলো তখন হযরত, আবু বকর (রাঃ) স্বর কিছু উঁচু করেন এবং হযরত উমার (রাঃ) স্বর কিছু ক্ষীণ করেন।
হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াতটি দুআ’র ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। অনুরূপভাবে সুফইয়ান ছাওরী (রঃ), মালিক (রঃ) হতে, তিনি হিশাম (রঃ) হতে, তিনি উরওয়া (রাঃ) হতে, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, এই আয়াতটি দুআ’র ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনু যুবাইর (রঃ), হযরত আবু আইয়া (রঃ), হযরত মাকহুল (রঃ) এবং হযরত উরওয়া ইবনু যুবাইরেরও (রঃ) এটাই উক্তি।
বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখনই সালাম ফিরাতেন তখনই একজন বেদুঈন বলতোঃ “হে আল্লাহ! আমাকে উট দান করুন!” তখন এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। অন্য একটি উক্তি এও আছে যে, এই আয়াতটি তাশাহহুদের সম্পর্কে নাযিল হয়। এও একটি উক্তি আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ রিয়াকারী আমল করো না এবং আমল ছেড়েও দিয়ো না। আর এটাও করো না যে, উচ্চস্বরে পড়ার সময় ভাল করে পড়বে এবং ক্ষীণস্বরে পড়ার সময় মন্দ করে পড়বে।
আহলে কিতাব ক্ষীণ স্বরে তাদের কিতাব পাঠ করতো এবং এরই মাঝে কোন কোন বাক্য উচ্চ স্বরে পড়তো। তখন সবাই মিলিতভাবে চীৎকার ও গোলমাল করতো। তখন তাদের সাথে সাদৃশ্য রাখতে নিষেধ করে দেয়া হয় আর অন্য লোক যেমন ক্ষীণ স্বরে পড়তো তার থেকেও বাধা দেয়া হয়। অতঃপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) এসে মধ্যপথ বাতলিয়ে দেন, যা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সুন্নাত বলে ঘোষণা দেন।
এরপর মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ “তোমরা এমনভাবে আল্লাহর প্রশংসা কর, যাতে তাঁর সমস্তগুণ ও পবিত্রতা বিদ্যমান থাকে। এইভাবে তার প্রশংসা ও গুণকীর্তণ করতে হবে, যে, তাঁর সমস্ত নাম উত্তম ও সুন্দর, তিনি সম্পূর্ণরূপে ত্রুটিমুক্ত, তাঁর সন্তান নেই, তার কোন অংশীদার নেই, তিনি এক ও একক। তিনি অভাবমুক্ত তাঁর পিতা মাতা নেই ও সন্তানও নেই, তাঁর সমকক্ষও কেউ নেই। তিনি এমন তুচ্ছ নন যে, তিনি কারো সাহায্যের মুখাপেক্ষী। তাঁর কোন পরামর্শদাতারও প্রয়োজন নেই। বরং সমস্ত কিছুর সৃষ্টিকর্তা ও মালিক একমাত্র তিনিই। তিনি সবারই উপর পূর্ণক্ষমতাবান এবং তিনিই সবার ব্যবস্থাপক। তিনি সৃষ্টজীবের উপর যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারেন। তিনি এক ও অংশী বিহীন। তিনি কারো সাথে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেন না এবং তিনি কারো সাহায্যেরও আশাধারী নন। তোমরা সব সময় তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব, বড়ত্ব, পবিত্রতা ও বুযর্গী বর্ণনা করতে থাকো। আর মুশরিকরা তার উপর যে অপবাদ লেপন করে তার থেকে তিনি যে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র তা তোমরা ঘোষণা করে দাও। ইয়াহুদী ও খৃষ্টানরা তো বলতো যে, আল্লাহর সন্তান রয়েছে। (নাউযুবিল্লাহ)। আর মুশরিকরা বলতোঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে হাযির আছি, আপনার কোন অংশীদার নেই, শুধু একজন অংশীদার রয়েছে, তারও মালিক আপনিই।” সে যা কিছুর মালিক তারও মালিক আপনিই।” সাবী’ মাজুসীরা বলতোঃ “যদি আল্লাহর ওয়ালীরা না থাকতো তবে তিনি একাই সমস্ত ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করতে পারতেন না (নাঊযুবিল্লাহ)।” ঐ সময় এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। এর দ্বারা বাতিলপন্থীদের সমস্ত দাবী খণ্ডন করা হয়েছে।
নবী (সঃ) তাঁর বাড়ীর ছোট বড় সকলকেও এই আয়াতটি শিখাতেন। তিনি এই আয়াতটির নাম রেখেছিলেন (আরবি) অর্থাৎ সম্মানিত আয়াত।
কোন কোন হাদীসে আছে যে, যে বাড়ীতে রাত্রে এই আয়াত পাঠ করা হয় সেই বাড়ীতে কোন বিপদ আসতে এবং চুরি হতে পারে না।
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “আমি একদা রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে বের হই। আমার হাতখানা তাঁর হাতের মধ্যে অথবা তাঁর হাতখানা আমার হাতের মধ্যে ছিল। পথে চলতে চলতে একটি লোককে তিনি অত্যন্ত দুরাবস্থায় দেখতে পান। তাকে তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার অবস্থা এমন কেন?” উত্তরে লোকটি বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! রোগ-শোক ও ক্ষয়-ক্ষতি আমার এই দূরাবস্থা ঘটিয়েছে। তিনি তখন তাকে বললেনঃ “আমি তোমাকে এমন কিছু অযীফা শিখিয়ে দেবো কি যার ফলে তোমার রোগ-শোক ও দুঃখদৈন্য সব দূর হয়ে যাবে?” উত্তরে লোকটি বললোঃ হা, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অবশ্যই বলুন। এতে বদর ও উহুদ যুদ্ধে আপনার সাথে হাযির হতে না পারার সমস্ত দুঃখ আমার দূর হয়ে যাবে।” তার একথায় নবী (সঃ) হেসে ওঠেন এবং বলেনঃ “বদরী ও উহুদী সাহাবীদের মর্যাদা তুমি কবে লাভ করবে? তুমি তো তাদের তুলনায় সম্পূর্ণ শূন্যহস্ত ও পুঁজিহীন?” তখন আমি (আবূ হুরাইরা (রাঃ) বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তাকে যেতে দিন! বরং আমাকে ঐ অযীফাটি শিখিয়ে দিন। তিনি বললেনঃ তুমি নিম্নের দুআটি পাঠ করবেঃ (আরবি) অর্থাৎ আমি ঐ চিরঞ্জীবের ভরসা করছি যিনি মৃত্যু বরণ করেন না। সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি সন্তান গ্রহণ করেন নাই।” আমি তখন এই অযীফা পাঠ করতে শুরু করে দিই কয়েকদিন অতিবাহিত হতেই আমার অবস্থা সুন্দর হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে দেখে বললেনঃ “হে আবু হুরাইরা (রাঃ) ! তোমার অবস্থা কিরূপ?” আমি উত্তরে বলিঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আমাকে যে অযীফা শিখিয়ে দিয়েছিলেন তা আমি পাঠ করার কারণে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে বরকত লাভ করেছি। (এই হাদীসটির সনদ দুর্বল এবং এর মতনেও ‘নাকারাত' বা অস্বীকৃতি রয়েছে।হাফিয আবু ইয়ালা (রঃ) এটাকে নিজের কিতাবে আনয়ন করেছেন। এ সব ব্যাপারে একমাত্র আল্লাহ তাআলার সঠিক জ্ঞান রয়েছে)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।