আল কুরআন


সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 1)

সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল) (আয়াত: 1)



হরকত ছাড়া:

سبحان الذي أسرى بعبده ليلا من المسجد الحرام إلى المسجد الأقصى الذي باركنا حوله لنريه من آياتنا إنه هو السميع البصير ﴿١﴾




হরকত সহ:

سُبْحٰنَ الَّذِیْۤ اَسْرٰی بِعَبْدِهٖ لَیْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ اِلَی الْمَسْجِدِ الْاَقْصَا الَّذِیْ بٰرَکْنَا حَوْلَهٗ لِنُرِیَهٗ مِنْ اٰیٰتِنَا ؕ اِنَّهٗ هُوَ السَّمِیْعُ الْبَصِیْرُ ﴿۱﴾




উচ্চারণ: ছুবহা-নাল্লাযীআছরা-বিআ‘বদিহী লাইলাম মিনাল মাছজিদিল হারা-মি ইলাল মাছজিদিল আকসাল্লাযী বা-রাকনা- হাওলাহূলিনুরিয়াহূমিন আ-য়া-তিনা- ইন্নাহূ হুওয়াছছামী‘উল বাসীর।




আল বায়ান: পবিত্র মহান সে সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে নিয়ে গিয়েছেন আল মাসজিদুল হারাম থেকে আল মাসজিদুল আকসা* পর্যন্ত, যার আশপাশে আমি বরকত দিয়েছি, যেন আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১. পবিত্ৰ মহিমাময় তিনি(১), যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের বেলায় ত্ৰমণ করালেন (২) আল-মসজিদুল হারাম (৩) থেকে আল-মসজিদুল আকসা পর্যন্ত (৪) যার আশপাশে আমরা দিয়েছি বরকত, যেন আমরা তাকে আমাদের নিদর্শন দেখাতে পারি (৫); তিনিই সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা (৬)




তাইসীরুল ক্বুরআন: পবিত্র ও মহীয়ান তিনি যিনি তাঁর বান্দাহকে রাতের বেলা ভ্রমণ করিয়েছেন মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার চারপাশকে আমি কল্যাণময় করেছি। তাকে আমার নিদর্শনাবলী দেখানোর জন্য, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।




আহসানুল বায়ান: (১) পবিত্র ও মহিমময় তিনি[1] যিনি তাঁর বান্দাকে রাতারাতি[2] ভ্রমণ করিয়েছেন (মক্কার) মাসজিদুল হারাম হতে (ফিলিস্তীনের) মাসজিদুল আকসায়,[3] যার পরিবেশকে আমি করেছি বরকতময়,[4] যাতে আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাই; [5] নিশ্চয় তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা ।



মুজিবুর রহমান: পবিত্র ও মহিমাময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মাসজিদুল হারাম হতে মাসজিদুল আকসায়, যার পরিবেশ আমি করেছিলাম বারাকাতময়, তাকে আমার নিদর্শন দেখানোর জন্য; তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।



ফযলুর রহমান: পবিত্রতা ও মহিমা সেই মহান সত্তার, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন (মক্কার) মাসজিদুল হারাম থেকে (জেরুজালেমের) মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত—যার আশপাশ আমি বরকতময় করেছি—তাকে আমার নিদর্শনসমূহ দেখানোর জন্য। নিশ্চয়ই তিনি সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন।



মুহিউদ্দিন খান: পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যান্ত-যার চার দিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি যাতে আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। নিশ্চয়ই তিনি পরম শ্রবণকারী ও দর্শনশীল।



জহুরুল হক: সকল মহিমা তাঁর যিনি তাঁর বান্দাকে রাত্রিবেলা ভ্রমণ করিয়েছিলেন পবিত্র মসজিদ থেকে দূরবর্তী মসজিদে -- যার পরিবেশ আমরা মঙ্গলময় করেছিলাম যেন আমরা তাঁকে দেখাতে পারি আমাদের কিছু নিদর্শন। নিঃসন্দেহ তিনি স্বয়ং সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।



Sahih International: Exalted is He who took His Servant by night from al-Masjid al-Haram to al-Masjid al-Aqsa, whose surroundings We have blessed, to show him of Our signs. Indeed, He is the Hearing, the Seeing.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১. পবিত্ৰ মহিমাময় তিনি(১), যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের বেলায় ত্ৰমণ করালেন (২) আল-মসজিদুল হারাম (৩) থেকে আল-মসজিদুল আকসা পর্যন্ত (৪) যার আশপাশে আমরা দিয়েছি বরকত, যেন আমরা তাকে আমাদের নিদর্শন দেখাতে পারি (৫); তিনিই সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা (৬)


তাফসীর:

(১) سبحان শব্দটি মূলধাতু। এর অর্থ, যাবতীয় ত্রুটি ও দোষ থেকে পবিত্র ও মুক্ত। আয়াতে এর ব্যবহারিক অর্থ হচ্ছে, আমি তাঁকে পবিত্র ও মুক্ত ঘোষণা করছি। [ফাতহুল কাদীর]


(২) মূলে أسرى শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যার আভিধানিক অর্থ রাত্রে নিয়ে যাওয়া। এরপর ليلاً শব্দটি স্পষ্টতঃ এ অর্থ ফুটিয়ে তুলেছে। ليلاً শব্দটি نكره ব্যবহার করে এদিকেও ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, সমগ্র ঘটনায় সম্পূর্ণ রাত্রি নয়; বরং রাত্রির একটা অংশ ব্যয়িত হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর] আয়াতে উল্লেখিত মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত সফরকে “ইসরা” বলা হয় এবং সেখান থেকে আসমান পর্যন্ত যে সফর হয়েছে, তার নাম মে'রাজ। ইসরা অকাট্য আয়াত দ্বারা প্ৰমাণিত হয়েছে। আর মে'রাজ সূরা নাজমে উল্লেখিত রয়েছে এবং অনেক মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। সম্মান ও গৌরবের স্তরে بعبده শব্দটি একটি বিশেষ ভালবাসার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে। কেননা, আল্লাহ্ তাআলা স্বয়ং কাউকে ‘আমার বান্দা’ বললে এর চাইতে বড় সম্মান মানুষের জন্যে আর হতে পারে না। [ইবন তাইমিয়্যাহ, আল-উবুদিয়্যাহঃ ৪৭]


(৩) আবু যর গিফারী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলামঃ বিশ্বের সর্বপ্রথম মসজিদ কোনটি? তিনি বললেনঃ মসজিদে-হারাম। অতঃপর আমি আরয করলামঃ এরপর কোনটি? তিনি বললেনঃ মসজিদে আকসা। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ এতদুভয়ের নির্মাণের মধ্যে কতদিনের ব্যবধান রয়েছে? তিনি বললেনঃ চল্লিশ বছর। তিনি আরও বললেনঃ এ তো হচ্ছে মসজিদদ্বয়ের নির্মাণক্রম। কিন্তু আল্লাহ্ তাআলা আমাদের জন্য সমগ্ৰ ভূ-পৃষ্ঠকেই মসজিদ করে দিয়েছেন। যেখানে নামাযের সময় হয়, সেখানেই সালাত পড়ে নাও। [মুসলিমঃ ৫২০]


(৪) ইসরা ও মে'রাজের সমগ্র সফর যে শুধু আত্মিক ছিল না, বরং সাধারণ মানুষের সফরের মত দৈহিক ও আত্মিক ছিল, একথা কুরআনের বক্তব্য ও অনেক মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা প্ৰমাণিত। আলোচ্য আয়াতের প্রথম سبحان শব্দের মধ্যে এদিকেই ইঙ্গিত রয়েছে। কেননা, এ শব্দটি আশ্চর্যজনক ও বিরাট বিষয়ের জন্যে ব্যবহৃত হয়। [ইবন কাসীর; মাজুমা ফাতাওয়া: ১৬/১২৫] মে'রাজ যদি শুধু আত্মিক অর্থাৎ স্বপ্নজগতে সংঘটিত হত, তবে তাতে আশ্চর্যের বিষয় কি আছে? স্বপ্নে তো প্রত্যেক মুসলিম, বরং প্রত্যেক মানুষ দেখতে পারে যে, সে আকাশে উঠেছে, অবিশ্বাস্য বহু কাজ করেছে। عبد শব্দ দ্বারা এদিকেই দ্বিতীয় ইঙ্গিত করা হয়েছে। কারণ, শুধু আত্মাকে দাস বলে না; বরং আত্মা ও দেহ উভয়ের সমষ্টিকেই দাস বলা হয়। [ইবন কাসীর]

তারপর “এক রাতে নিজের বান্দাকে নিয়ে যান” এ শব্দাবলীও দৈহিক সফরের কথাই সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করে। স্বপ্নযোগে সফরের জন্য নিয়ে যাওয়া শব্দাবলী কোনক্রমেই উপযোগী হতে পারে না। তাছাড়া আয়াতে দেখানোর কথা বলা হয়েছে সেটাও শরীর ছাড়া সম্ভব হয় না। অনুরূপভাবে বুরাকে উঠাও প্রমাণ করে যে, ইসরা ও মি'রাজ দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে সংঘটিত হয়েছিল। [দেখুন, ইবন কাসীর]।

এছাড়া রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মে'রাজের ঘটনা উন্মে হানী রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে বর্ণনা করলেন, তখন তিনি পরামর্শ দিলেন যে, আপনি কারও কাছে একথা প্ৰকাশ করবেন না; প্রকাশ করলে কাফেররা আপনার প্রতি আরও বেশী মিথ্যারোপ করবে। ব্যাপারটি যদি নিছক স্বপ্নই হত, তবে মিথ্যারোপ করার কি কারণ ছিল? তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ঘটনা প্রকাশ করলেন, তখন কাফেররা মিথ্যারোপ করল এবং ঠাট্টা বিদ্রুপ করল। এমনকি, অনেকের ঈমান টলায়মান হয়েছিল। ব্যাপারটি স্বপ্নের হলে এতসব তুলাকালাম কান্ড ঘটার সম্ভাবনা ছিল কি? সুতরাং আমাদের জন্য একথা মেনে নেয়া ছাড়া উপায় নেই যে, এটি নিছক একটি রূহানী তথা আধ্যাতিক অভিজ্ঞতা ছিল না। বরং এটি ছিল পুরোদস্তুর একটি দৈহিক সফর এবং চাক্ষুষ পর্যবেক্ষণ। আল্লাহ নিজেই তাঁর নবীকে এ সফর ও পর্যবেক্ষণ করান।

তাফসীর কুরতুবীতে আছে, ইসরার হাদীসসমূহ সব মুতাওয়াতির। নাক্কাশ এ সম্পর্কে বিশ জন সাহাবীর রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন এবং কাযী ইয়াদ শেফা গ্রন্থে আরও বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। ইমাম ইবনে কাসীর তার তাফসীর গ্রন্থে এসব রেওয়ায়েত পূর্ণরূপে যাচাই-বাছাই করে বর্ণনা করেছেন এবং পঁচিশ জন সাহাবীর নাম উল্লেখ করেছেন, যাদের কাছ থেকে এসব রেওয়ায়েত বৰ্ণিত রয়েছে। যেমন, ওমর ইবনে খাত্তাব, আলী, ইবনে মাসউদ, আবু যর গিফারী, মালেক ইবনে ছ’ছা, আবু হুরায়রা, আবু সায়ীদ আল-খুদরী, ইবনে আব্বাস, শাদ্দাদ ইবনে আউস, উবাই ইবনে ক’ব, আবদুর রহমান ইবনে কুর্ত, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর, জাবের ইবনে আবদুল্লাহ, হুযায়ফা ইবনে ইয়ামান, বুরাইদাহ, আবু আইউব আল-আনসারী, আবু উমামাহ, সামুরা ইবনে জুনদুব, সোহাইব রুমী, উম্মে হানী, আয়েশা, আসমা বিনতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুম। এরপর ইবনে-কাসীর বলেন, ইসরা সম্পর্কে সব মুসলমানের ঐকমত্য রয়েছে। শুধু দ্বীনদ্রোহী যিন্দীকরা একে মানেনি।

মে'রাজের তারিখ সম্পর্কে বিভিন্ন রেওয়ায়েত বর্ণিত রয়েছে। মুসা ইবনে ওকবার রেওয়ায়েত এই যে, ঘটনাটি হিজরতের ছয়মাস পূর্বে খাদীজা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার মৃত্যুর পর সংঘটিত হয়। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেনঃ খাদীজা রাদিয়াল্লাহু আনহার ওফাত সালাত ফরয হওয়ার পূর্বেই হয়েছিল। ইমাম যুহরী বলেনঃ খাদীজার ওফাত নবুওয়াত প্ৰাপ্তির সাত বছর পরে হয়েছিল। কোন কোন রেওয়ায়েত রয়েছে, মে'রাজের ঘটনা নবুওয়ত প্ৰাপ্তির পাঁচ বছর পরে ঘটেছে। ইবনে ইসহাক বলেনঃ মে'রাজের ঘটনা তখন ঘটেছিল, যখন ইসলাম আরবের সাধারণ গোত্ৰসমূহে বিস্তৃতি লাভ করেছিল। এসব রেওয়ায়েতের সারমর্ম এই যে, মে'রাজের ঘটনাটি হিজরতের কয়েক বছর পূর্বে সংঘটিত হয়েছিল। কোন কোন ঐতিহাসিক বলেনঃ ইসরা ও মে'রাজের ঘটনা রবিউসসানী মাসের ২৭তম রাত্রিতে হিজরতের এক বছর পূর্বে ঘটেছে। আবার কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে, নবুওয়ত প্ৰাপ্তির আঠার মাস পর এ ঘটনা ঘটেছে। কারও কারও মতে হিজরতের এক বছর আগে সংঘটিত হয়েছিল। মুহাদ্দিসগণ বিভিন্ন রেওয়ায়েত উল্লেখ করার পরে কোন সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ করেননি। [বিস্তারিত দেখুন, আশশাইখ সফিউর রহমান আল-মুবারকপূৱী: আর-রাহীকুল মাখতূম]


(৫) মে'রাজের সংক্ষিপ্ত ঘটনাঃ ইমাম ইবনে কাসীর তার তাফসীর গ্রন্থে আলোচ্য আয়াতের তাফসীর এবং সংশ্লিষ্ট হাদীসসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করার পর বলেনঃ সত্য কথা এই যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসরা সফর জাগ্রত অবস্থায় করেন; স্বপ্নে নয়। মক্কা মোকাররমা থেকে বাইতুল মোকাদ্দাস পর্যন্ত এ সফর বোরাকযোগে করেন। তারপরের সংক্ষিপ্ত ঘটনা হলো, বায়তুল-মোকাদ্দাসের দ্বারে উপনীত হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বোরাকটি অদূরে বেঁধে দেন এবং বায়তুল মোকাদ্দাসের মসজিদে প্রবেশ করেন এবং কেবলার দিকে মুখ করে দুরাকাআত সালাত আদায় করেন। অতঃপর সিঁড়ি আনা হয়, যাতে নীচ থেকে উপরে যাওয়ার জন্য ধাপ বানানো ছিল। তিনি সিঁড়ির সাহায্যে প্রথমে প্রথম আসমানে, তারপর অবশিষ্ট আসমানসমূহে গমন করেন।

এ সিঁড়িটি কি এবং কিরূপ ছিল, তার প্রকৃতস্বরূপ আল্লাহ্ তাআলাই জানেন। প্রত্যেক আসমানে সেখানকার ফেরেশতারা তাকে অভ্যর্থনা জানায় এবং প্রত্যেক আসমানে সে সমস্ত নবী-রাসূলদের সাথে সাক্ষাত হয়, যাদের অবস্থান কোন নির্দিষ্ট আসমানে রয়েছে। যেমন, ষষ্ঠ আসমানে মূসা আলাইহিস সালাম এবং সপ্তম আসমানে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সাথে সাক্ষাৎ হয়। তারপর তিনি পয়গম্বরগণের স্থানসমূহও অতিক্রম করে এবং এক ময়দানে পৌছেন, যেখানে তাকদীর লেখার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তিনি ‘সিদরাতুল-মুনতাহা’ দেখেন, যেখানে আল্লাহ্ তাআলার নির্দেশে স্বর্ণের প্রজাপতি এবং বিভিন্ন রঙ এর প্ৰজাপতি ইতস্ততঃ ছোটাছুটি করছিল। ফেরেশতারা স্থানটিকে ঘিরে রেখেছিল। এখানে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীলকে তাঁর স্বরূপে দেখেন। তাঁর ছয়শত পাখা ছিল। তিনি বায়তুল-মামুরও দেখেন।

বায়তুল-মামুরের নিকটেই কা'বার প্রতিষ্ঠাতা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম প্রাচীরের সাথে হেলান দিয়ে উপবিষ্ট ছিলেন। এই বায়তুল মামুরে দৈনিক সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করে। কেয়ামত পর্যন্ত তাদের পুর্নবার প্রবেশ করার পালা আসবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বচক্ষে জান্নাত ও জাহান্নাম পরিদর্শন করেন। সে সময় তার উম্মতের জন্য প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্তের সালাত ফরয হওয়ার নির্দেশ হয়। তারপর তা হ্রাস করে পাঁচ ওয়াক্ত করে দেয়া হয়। এ দ্বারা ইবাদতের মধ্যে সালাতের বিশেষ গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। এরপর তিনি বায়তুল-মোকাদ্দাসে ফিরে আসেন এবং বিভিন্ন আসমানে যেসব পয়গম্বরের সাথে সাক্ষাত হয়েছিল তারাও তাকে বিদায় সম্বর্ধনা জানাবার জন্য বায়তুল-মোকাদ্দাস পর্যন্ত আগমন করেন। তখন নামাযের সময় হয়ে যায় এবং তিনি পয়গম্বরগণের সাথে সালাত আদায় করেন।

সেটা সেদিনকার ফজরের সালাতও হতে পারে। ইবনে-কাসীর বলেনঃ নামাযে পয়গম্বরগণের ইমাম হওয়ার এ ঘটনাটি কারও মতে আসমানে যাওয়ার পূর্বে সংঘটিত হয়। কিন্তু বাহ্যতঃ এ ঘটনাটি প্রত্যাবর্তনের পর ঘটে। কেননা, আসমানে নবী-রাসূলগণের সাথে সাক্ষাতের ঘটনায় একথাও বর্ণিত রয়েছে যে, জিবরীল সব পয়গম্বরগণের সাথে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেন। ইমামতির ঘটনা প্ৰথমে হয়ে থাকলে এখানে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কোন প্রয়োজন ছিল না। এছাড়া সফরের আসল উদ্দেশ্য ছিল উর্ধ্ব জগতে গমন করা। কাজেই একাজটি প্রথমে সেরে নেয়াই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত মনে হয়। আসল কাজ সমাপ্ত হওয়ার পর সব পয়গম্বর বিদায় দানের জন্যে তার সাথে বায়তুল-মোকাদ্দাস পর্যন্ত আসেন এবং জিবরীলের ইঙ্গিতে তাকে সবাই ইমাম বানিয়ে কার্যতঃ তার নেতৃত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দেয়া হয়। এরপর তিনি বায়তুল মোকাদ্দেস থেকে বিদায় নেন এবং বোরাক সওয়ার হয়ে অন্ধকার থাকতেই মক্কা মোকার্‌রমা পৌঁছে যান।


৬. জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন, মিরাজের ব্যাপারে কুরাইশরা যখন আমাকে মিথ্যা প্ৰতিপন্ন করতে চেষ্টা করল তখন আমি কাবার হিজর অংশে দাঁড়ালাম। আর আল্লাহ বাইতুল মাকদিসকে আমার সামনে উদ্ভাসিত করলেন। ফলে আমি তার দিকে তাকিয়ে তার চিহ্ন ও নিদর্শনগুলো তাদেরকে বলে দিতে থাকলাম। [বুখারীঃ ৩৮৮৬]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১) পবিত্র ও মহিমময় তিনি[1] যিনি তাঁর বান্দাকে রাতারাতি[2] ভ্রমণ করিয়েছেন (মক্কার) মাসজিদুল হারাম হতে (ফিলিস্তীনের) মাসজিদুল আকসায়,[3] যার পরিবেশকে আমি করেছি বরকতময়,[4] যাতে আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাই; [5] নিশ্চয় তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা ।


তাফসীর:

[1] سُبْحَانَ হল, سَبَّحَ يُسْبِّحُ এর মাসদার (ক্রিয়া বিশেষ্য)। অর্থ হল, أُنَزِّهُ اللهَ تَنْزِيْهًا অর্থাৎ, আমি প্রত্যেক দোষ-ত্রুটি থেকে আল্লাহর পবিত্র ও মুক্ত হওয়ার কথা ঘোষণা করছি। সাধারণতঃ এর ব্যবহার তখনই করা হয়, যখন অতীব গুরুতত্ত্বপূর্ণ কোন ঘটনার উল্লেখ হয়। উদ্দেশ্য এই হয় যে, বাহ্যিক উপায়-উপকরণের দিক দিয়ে মানুষের কাছে এ ঘটনা যতই অসম্ভব হোক না কেন, আল্লাহর নিকট তা কোন কঠিন ব্যাপার নয়। কেননা, তিনি উপকরণসমূহের মুখাপেক্ষী নন। তিনি তো كُنْ শব্দ দিয়ে নিমিষে যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারেন। উপায়-উপকরণের প্রয়োজন তো মানুষের। মহান আল্লাহ এই সব প্রতিবন্ধকতা ও দুর্বলতা থেকে পাক ও পবিত্র।

[2] إِسْراءٌ শব্দের অর্থ হল, রাতে নিয়ে যাওয়া। পরে لَيْلًا উল্লেখ করে রাতের স্বল্পতার কথা পরিষ্কার করা হয়েছে। আর এরই জন্য لَيْلًا ‘নাকেরাহ’ (অনির্দিষ্ট) এসেছে। অর্থাৎ, রাতের এক অংশে অথবা সামান্য অংশে। অর্থাৎ, চল্লিশ রাতের এই সুদীর্ঘ সফর করতে সম্পূর্ণ রাত লাগেনি; বরং রাতের এক সামান্য অংশে তা সুসম্পন্ন হয়।

[3]أَقْصَى  দূরত্বকে বলা হয়। ‘আল-বাইতুল মুকাদ্দাস’ বা ‘বাইতুল মাকদিস’ ফিলিস্তীন বা প্যালেষ্টাইনের কদস অথবা জেরুজালেম বা (পুরাতন নাম) ঈলীয়া শহরে অবস্থিত। মক্কা থেকে ক্বুদ্‌স চল্লিশ দিনের সফর। এই দিক দিয়ে মসজিদে হারামের তুলনায় বায়তুল মাকদিসকে ‘মাসজিদুল আকসা’ (দূরতম মসজিদ) বলা হয়েছে।

[4] এই অঞ্চল প্রাকৃতিক নদ-নদী, ফল-ফসলের প্রাচুর্য এবং নবীদের বাসস্থান ও কবরস্থান হওয়ার কারণে পৃথক বৈশিষ্ট্যের দাবী রাখে। আর এই কারণে একে বরকতময় আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

[5] এটাই হল এই সফরের উদ্দেশ্য। যাতে আমি আমার এই বান্দাকে বিস্ময়কর এবং বড় বড় কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দিই। তার মধ্যে এই সফরও হল একটি নিদর্শন ও মু’জিযা। সুদীর্ঘ এই সফর রাতের সামান্য অংশে সুসম্পন্ন হয়ে যায়। এই রাতেই নবী (সাঃ)-এর মি’রাজ হয় অর্থাৎ, তাঁকে আসমানসমূহে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিভিন্ন আসমানে নবীদের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। সপ্তাকাশের উপরে আরশের নীচে ‘সিদরাতুল মুন্তাহা’য় মহান আল্লাহ অহীর মাধ্যমে নামায এবং অন্যান্য কিছু শরীয়তের বিধি-বিধান তাঁকে দান করেন। এ ঘটনার বিস্তারিত আলোচনা বহু সহীহ হাদীসে রয়েছে এবং সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীন থেকে নিয়ে এ পর্যন্ত উম্মতের অধিকাংশ উলামা ও ফুকহা এই মত পোষণ করে আসছেন যে, এই মি’রাজ মহানবী (সাঃ)-এর সশরীরে এবং জাগ্রত অবস্থায় হয়েছে। এটা স্বপ্নযোগে অথবা আত্মিক সফর ও পরিদর্শন ছিল না, বরং তা ছিল দেহাত্মার সফর ও চাক্ষুষ দর্শন। (তা না হলে এ ঘটনাকে অস্বীকারকারীরা অস্বীকার করবে কেন?) বলা বাহুল্য, এ ঘটনা মহান আল্লাহ (অলৌকিকভাবে) তাঁর পূর্ণ কুদরত দ্বারা ঘটিয়েছেন। এই মি’রাজের দু’টি অংশ। প্রথম অংশকে ‘ইসরা’ বলা হয়; যার উল্লেখ এখানে করা হয়েছে। আর তা হল, মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত সফর করার নাম। এখানে পৌঁছে নবী (সাঃ) সমস্ত নবীদের ইমামতি করেন। বায়তুল মাকদিস থেকে তাঁকে আবার আসমানসমূহে নিয়ে যাওয়া হয়। আর এটা হল এই সফরের দ্বিতীয় অংশ। যাকে ‘মিরাজ’ বলা হয়েছে। এর কিঞ্চিৎ আলোচনা সূরা নাজমে করা হয়েছে এবং বাকী বিস্তারিত আলোচনা হাদীসসমূহে বর্ণিত রয়েছে। সাধারণভাবে সম্পূর্ণ এই সফরকে ‘মি’রাজ’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। ‘মি’রাজ’ সিড়ি বা সোপানকে বলা হয়। আর এটা রসূল (সাঃ)-এর পবিত্র মুখ-নিঃসৃত শব্দ عُرِجَ بِي إِلَى السَّمَاءِ (আমাকে আসমানে নিয়ে যাওয়া হয় বা আরোহণ করানো হয়) হতে গৃহীত। কেননা, এই দ্বিতীয় অংশটা প্রথম অংশের চেয়েও বেশী গুরুতত্ত্বপূর্ণ ও মাহাত্ম্যপূর্ণ ব্যাপার। আর এই কারণেই ‘মিরাজ’ শব্দটাই বেশী প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। মি’রাজের সময়কাল নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে সকলে একমত যে, তা হিজরতের পূর্বে সংঘটিত হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, এক বছর পূর্বে। আবার কেউ বলেছেন, কয়েক বছর পূর্বে এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। অনুরূপ মাস ও তার তারীখের ব্যাপারেও মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন, রবিউল আওয়াল মাসের ১৭ অথবা ২৭ তারীখে হয়েছে। কেউ বলেছেন, রজব মাসের ২৭ তারীখ এবং কেউ অন্য মাস ও অন্য তারীখের কথাও উল্লেখ করেছেন। (ফাতহুল কাদীর) (মহানবী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবা (রাঃ)গণের নিকট তারীখের কোন গুরুতত্ত্ব অথবা এ দিনকে স্মরণ ও পালন করার প্রয়োজনীয়তা ছিল না বলেই, তা সংরক্ষিত হয়নি। -সম্পাদক)


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: নামকরণ:



উক্ত সূরাতে ‘বানী ইসরাঈল’-এর সম্পর্কে আলোচনা থাকার কারণে এ নামে নামকরণ করা হয়েছে। একে ‘সূরাতুস সুবহান’-ও বলা হয়। কেননা সূরার শুরুতে ‘সুবহান’ শব্দের উল্লেখ রয়েছে। আবার একে ‘সূরা ইসরা’-ও বলা হয়। যা অত্র সূরার প্রথম আয়াতে উল্লেখ রয়েছে।



ইবনু মাসউদ (রাঃ) নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করে বলেন: সূরা কাহফ, মারইয়াম এবং বানী ইসরাঈল হল সে পুরাতন সূরাগুলোর অন্তর্ভুক্ত যেগুলো মক্কায় প্রথম প্রথম নাযিল হয় এবং যেগুলো আমার পুরাতন হিফযকৃত সূরা। (সহীহ বুখারী হা: ৪৯৯৪) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সূরা বানী ইসরাঈল এবং সূরা যুমার তেলাওয়াত না করে ঘুমাতেন না। (তিরমিযী হা: ৩৪০৫, সহীহ)



সূরা বানী ইসরাঈল মক্কায় অবতীর্ণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সূরা, সূরার শুরুতে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অন্যতম একটি বড় মু‘জিযাহ ইসরা ও মি‘রাজের আলোচনা করা হয়েছে। পূর্ববর্তী উম্মাত বানী ইসরাঈলদের বিবরণ, কুরআনের মর্যাদা, মানুষের আমল লিপিবদ্ধকরণ, যারা কেবল দুনিয়ার জন্য আমল করে তাদের পরিণতি, পিতা-মাতার সাথে সদাচরণের নির্দেশ এবং ৩১-৩৮ নং আয়াত পর্যন্ত কয়েকটি বিধি-বিধান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সূরার শেষের দিকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মর্যাদা, রূহ সম্পর্কে ইয়াহূদীদের উত্তর, মক্কার মুশরিকদের দাবী খণ্ডন, সর্বশেষ আল্লাহ তা‘আলার একত্ব ও গুণাবলীর কথা বলে ইতি করা হয়েছে।



১ নং আয়াতের তাফসীর:



سُبْحَانَ শব্দটি ক্রিয়ামূল, অর্থ হল



انزه الله تنزيهاً



অর্থাৎ আমি সকল দোষ-ত্র“টি থেকে আল্লাহ তা‘আলাকে পবিত্র ও মহান ঘোষণা করছি। সাধারণত সুবহানাল্লাহ এর ব্যবহার তখন হয় যখন অতীব কোন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ করা হয়। উদ্দেশ্য হল বাহ্যিক উপায় উপকরণের দিক দিয়ে মানুষের কাছে এ ঘটনা অসম্ভব মনে হলেও আল্লাহ তা‘আলার কাছে কোন কঠিন ব্যাপার নয়। কেননা তিনি কোন উপায় উপকরণের মুখাপেক্ষী নন। তিনি কোন কাজ করার ইচ্ছা করলে ‘হও’ বললে হয়ে যায়। সুতরাং সকল অক্ষমতা, দুর্বলতা ও প্রতিবন্ধকতা থেকে আল্লাহ তা‘আলা র পবিত্রতা বর্ণনা করছি।

ইসরা ও মি‘রাজের পরিচয়: ইসরা অর্থ রাতের বেলা ভ্রমণ করা। পরে لَيْلًا উল্লেখ করে রাতের স্বল্পতার কথা পরিস্কার করা হয়েছে। আর এর জন্যই لَيْلًا শব্দকে অনির্দিষ্ট নিয়ে আসা হয়েছে। অর্থাৎ রাতের এক অংশে বা সামান্য সময়ে। চল্লিশ রাতের এ সুদীর্ঘ সফর করতে সম্পূর্ণ রাত লাগেনি বরং রাতের এক সমান্য অংশে সম্পন্ন হয়ে গেছে।



ইসলামের পরিভাষায় নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিশেষ মু‘জিযাহস্বরূপ তাঁকে মাসজিদে হারাম এর চত্বর থেকে মাসজিদে আকসা পর্যন্ত রাত্রিকালে জিবরীলের সাথে বিশেষ বাহনে জাগ্রতাবস্থায় যে ভ্রমণ করানো হয়, তাকে ইসরা বলা হয়।



আর মি‘রাজ হল ঊর্ধ্বগমনের মাধ্যম, যা ঊর্ধ্বগমন অর্থেও ব্যবহৃত হয়। ইসলামী পরিভাষায় নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাসজিদে আকসা হতে সপ্ত আকাশ ও তদুর্ধ্বে স্ব-শরীরে জাগ্রতাবস্থায় বিভিন্ন নিদর্শন পরিদর্শন করার যে মু‘জিযাহ লাভ করেন তাকেই মি‘রাজ বলা হয়। (শরহু আকীদাহ তাহাবীয়্যাহ ২২৩ পৃ:)



ইসরা ও মি‘রাজ স্বশরীরে জাগ্রত অবস্থায় হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে بِعَبْدِه۪ শব্দটির প্রয়োগ করেছেন আর بِعَبْدِه۪ দ্বারা শরীর ও রূহ উভয়টিই অন্তর্ভুক্ত করে। শুধু রূহ নয় বা শুধু শরীর নয়।



ইবনু হাজার আসকালানী (রহঃ) বলেন: নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নুবওয়াত লাভের পর স্ব-শরীরে আত্মা ও দেহসহ জাগ্রতাবস্থায় একই রাতে ইসরা ও মি‘রাজ সংঘটিত হয়। এটাই অধিকাংশ ইসলামী মনীষীদের মত এবং সঠিক মত। (ফাতহুল বারী ১৫/৪৪)



মি‘রাজের দিন-তারিখ: মি‘রাজ একটি সত্য ও সুপ্রসিদ্ধ ঘটনা যা কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে প্রমাণিত। কিন্তু এ ইসরা ও মি‘রাজ সংঘটিত হওয়ার নির্দিষ্ট দিন-তারিখ কুরআন ও সুন্নায় উল্লেখ না থাকায় বিদ্বানগণ অনেক মতামত ব্যক্ত করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দশটি মত আল ইয়ালা গ্রন্থের ৩৫৯-৩৬০, আর রাহীকুল মাখতুম প্রন্থের ১৩৭ এবং আল বিদাআল হাওলিয়া গ্রন্থের ২৭০-২৭৪ নং পৃষ্ঠায় আলোচনা করেছেন। এসব মতামত পর্যালোচনা করলে এটাই প্রমাণিত হয় যে, ইসরা ও মি‘রাজের নির্দিষ্ট কোন দিন-তারিখ জানা নেই। ইমাম ইবনু কাসীর বলেন: যে হাদীসে বলা হয়েছে ইসরা ও মি‘রাজ রজব মাসের ২৭শে রাত্রিতে সংঘটিত হয়েছে সে হাদীস সঠিক নয়। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ ৩/১০৭)



ইমাম আবূ শামাহ বলেন: অনেক আলোচক বলে থাকেন যে, ইসরা ও মি‘রাজ রজব মাসে সংঘটিত হয়েছে। মূলত এটা হাদীস শাস্ত্রের পণ্ডিতদের কাছে এক ডাহা মিথ্যা কথা। (আল বায়েস ফী ইনাকারিল বিদা পৃ: ৭১)



ইমাম ইবনু তাইমিয়া (রহঃ) বলেন: মি‘রাজ সংঘটিত হওয়ার মাস, দশক বা নির্ধারিত দিনের কোন অকাট্য প্রমাণ নেই। (যাদুল মা‘আদ ১/৫৭)



উক্ত আলোচনা থেকে প্রমাণিত হয় ইসরা ও মি‘রাজ ২৭শে রজব হয়নি। তাছাড়া সবার জানা মি‘রাজের রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয হয়। খাদিজা (রাঃ) মারা যান নবুওয়াতের ১০ম বছর রমযান মাসে। তখনও পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয পাননি। তাহলে কিভাবে সে রমযান মাসের দু’মাস আগে রজব মাসে মি‘রাজ হতে পারে? সুতরাং প্রচলিত সমাজে শবে মি‘রাজ উদ্যাপনের রাত বা মাসটি কুরআন, সহীহ হাদীস ও বাস্তব ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী এক বানোয়াট মিথ্যা তারিখ ছাড়া কিছুই নয়। তাই এ রাতকে কেন্দ্র করে সালাতুর রাগাইব, বিশেষ সিয়াম পালন, রাত ভর সবাই মিলে ইবাদত করা, সিন্নী বিতরণ ও আনন্দ উৎসব করার কোন প্রমাণ নেই। এ সবই বিদআত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে, কোন সাহাবী ও তাবেয়ী এবং প্রসিদ্ধ ইমামগণ করেননি।



ইসরা ও মি‘রাজের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন মক্কায় প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াতী কাজ শুরু করেন তখন কাফির-মুশরিকদের থেকে বিভিন্ন বাধা-বিপত্তি আসে এবং নানা নির্যাতনের শিকার হন। এতদসত্ত্বেও তিনি দাওয়াতী কাজ করেই যেতেন। নিজের দুঃখ-কষ্ট প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজার সাথে ভাগ করে নিতেন, সাথে দাওয়াতী কাজের বাধা-বিপত্তিতে সাহায্য করতেন প্রাণপ্রিয় চাচা আবূ তালেব। কিন্তু নবুওয়াতের দশম বছরের রজব মাসে চাচা আবূ তালেব মারা যান, চাচা আবূ তালেবের মৃত্যুর তিন দিন, মতান্তরে দু’মাস পর প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজাও মারা যান। এখন মক্কাতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আশ্রয়স্থল বলতে কোন জায়গা রইল না। (আর-রাহীকুল মাখতুম ) তাই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মনবেদনাকে দূর করে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য আল্লাহ তা‘আলা মি‘রাজের ব্যবস্থা করেন।



অন্য আরেকটি উদ্দেশ্য আল্লাহ তা‘আলা কুরআনেই উল্লেখ করেছেন, তা হল “যাতে আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাই।” এছাড়াও রাসূলের মু’জিযাহ, সালাত ফরযসহ বিভিন্ন বিধান প্রদানের উদ্দেশ্যেই মি‘রাজ হয়।



মি‘রাজে বিভিন্ন নিদর্শন দর্শন:



রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাসজিদে হারামের চত্বর হতে বোরাক নামক (খচ্চর আর গাধার মাঝারি সাইজের) একটি প্রাণীতে আরোহণপূর্বক মাসজিদে আকসা (জেরুযালেম) পর্যন্ত রাতে আগমন করেন। সেখানে সকল নাবীদের ইমামতি করেন (এ ইমামতি যাওয়ার পথে করেছেন, না আসার পথে করেছেন তা নিয়ে ইমাম ইবনু কাসীর ও ইবনু হাজার আসকালানী ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন)। অতঃপর সেখান থেকে ঊর্ধ্বাকাশে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রতি আকাশে অবস্থানরত নাবীর সাথে দেখা করেন এবং পরিচয় হয়। তারপর সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছেন। সেখানে আল্লাহ তা‘আলার সাথে কথা হয়, কিন্তু দেখা হয়নি। আয়েশা (রাঃ) বলেন: যে ব্যক্তি বলবে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ তা‘আলাকে দেখেছেন সে মিথ্যা বলবে। (সহীহ বুখারী হা: ৪৮৫৫) তারপর জান্নাত জাহান্নাম দেখেন, অধিকাংশ জান্নাতী দরিদ্র গরীব লোকেরা আর অধিকাংশ জাহান্নামী মহিলা দেখতে পেলেন।



এ আয়াতের তাফসীরে ঈমাম বুখারী (عليه السلام) তার সহীহুল বুখারী গ্রন্থে উল্লেখ করেন। আবু হুরাইরা < বলেন, মি‘রাজের রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট দুটো পাত্র পেশ করা হল। একটি ছিল মদের আর অপরটি ছিল দুধের। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উভয় পাত্র দেখলেন, অতঃপর দুধের পাত্রটি গ্রহণ করলেন। তখন জিবরীল (عليه السلام) বললেন: সকল প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার, যিনি আপনাকে সঠিক পথের হেদায়েত দিয়েছেন। যদি আপনি মদের পাত্র গ্রহণ করতেন তাহলে আপনার উম্মত বিভ্রান্ত হয়ে যেত। (সহীহ বুখারী: ৪৭০৯, সহীহ মুসলিম: ১৬৮-১৭২)



অন্য একটি হাদীসে রয়েছে, “জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেন, যখন কুরাইশরা আমাকে মিথ্যাবাদী বলতে লাগল তখন আমি একটি পাথরের ওপর উঠে দাঁড়ালাম। আর আল্লাহ তা‘আলা আমার জন্য বাইতুল মাকদাস উন্মুক্ত করে দিলেন। আমি তা দেখছিলাম এবং তাঁর নিদর্শন সম্পর্কে তাদেরকে সংবাদ দিচ্ছিলাম।” (সহীহ বুখারী: ৪৭১০) এছাড়াও অনেক নিদর্শন রয়েছে যা বিস্তারিত হাদীস গ্রন্থে বিদ্যমান।



(الَّذِيْ بَارَكْنَا حَوْلَه)



এখানে বায়তুল মাকদাস এর মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে যে, তার চতুর্দিক দিয়ে বরকতে ভরপুর। তা হল গাছ-গাছালি, নদ-নদী, ফল-মূল, শস্য ইত্যাদি।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন,



(وَنَجَّيْنٰهُ وَلُوْطًا إِلَي الْأَرْضِ الَّتِيْ بٰرَكْنَا فِيْهَا لِلْعٰلَمِيْنَ)‏



“এবং আমি তাকে ও লূতকে উদ্ধার করে নিয়ে গেলাম সে দেশে, যেথায় আমি কল্যাণ রেখেছি বিশ্ববাসীর জন্য। ”(সূরা আম্বিয়া ২১:৭১)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,



(وَلِسُلَيْمٰنَ الرِّيْحَ عَاصِفَةً تَجْرِيْ بِأَمْرِه۪ٓ إِلَي الْأَرْضِ الَّتِيْ بَارَكْنَا فِيْهَا ط وَكُنَّا بِكُلِّ شَيْءٍ عٰلِمِيْنَ)



“এবং সুলায়মানের বশীভূত করে দিয়েছিলাম প্রচণ্ড বায়ূকে; সে বায়ু তার আদেশত্র“মে প্রবাহিত হতো সে দেশের দিকে যেখানে আমি কল্যাণ রেখেছি; প্রত্যেক বিষয় সম্পর্কে আমি সম্যক অবগত।” (সূরা আম্বিয়া ২১:৮১)



সুতরাং প্রত্যেক মু’মিনের বিশ্বাস করতে হবে ইসরা ও মি‘রাজ সত্য, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ব-শরীরে হয়েছিল, কিন্তু কোন নির্দিষ্ট দিন-তারিখ জানা নেই। এ মি‘রাজকে কেন্দ্র করে কোন বিশেষ ইবাদত শরীয়তসম্মত নয়। তাই এসব থেকে বেঁচে থাকা কর্তব্য।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. ইসরা ও মি‘রাজ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর একটি বড় মু‘জিযাহ।

২. মি‘রাজ স্বশরীরে ও জাগ্রত অবস্থায় হয়েছে ।

৩. বায়তুল মাকদাস এর মর্যাদা সম্পর্কে অবগত হলাম।

৪. মি‘রাজের রাতে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ তা‘আলার বড় বড় নিদর্শন দেখেছেন।

৫. মি‘রাজ এর অন্যতম শিক্ষা হল আল্লাহ তা‘আলা ঊর্ধ্বে রয়েছেন, তিনি স্বসত্ত্বায় সর্বত্র বিরাজমান নন। কেননা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঊর্ধ্বগমন ছাড়া পৃথিবীতে কখনো তাঁর কাছে যেতে পারেননি।

৬. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মি‘রাজের রাতে আল্লাহ তা‘আলাকে স্বচক্ষে দেখেননি।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরায়ে বাণী ইসরাঈল, সূরায়ে কাহাফ এবং সূরায়ে মারইয়াম সর্বপ্রথম, সর্বোত্তম এবং ফযীলতপূর্ণ সূরা।

হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) কখনো কখনো নফল রোযা এমনভাবে পর্যায়ক্রমে রেখে যেতেন যে, আমরা মনে মনে বলতাম, সম্ভবতঃ তিনি এই পুরো মাসটি রোযার অবস্থাতেই কাটিয়ে দিবেন। আবার কখনো কখনো মোটেই রোযা রাখতেন না। শেষ পর্যন্ত আমরা ধারণা করতাম যে, সম্ভবতঃ তিনি এই মাসে রোযা রাখবেনই না। তাঁর অভ্যাস ছিল এই যে, প্রত্যেক রাত্রে তিনি সূরায়ে বাণী ইসরাঈল ও সূরায়ে যুমার পাঠ করতেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদ' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)

আল্লাহ তাআলা স্বীয় সত্তার পবিত্রতা, মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব এবং ক্ষমতার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি সবকিছুর উপর পুর্ণক্ষমতাবান। তার ন্যায় ক্ষমতা কারো মধ্যে নেই। তিনিই ইবাদতের যোগ্য এবং একমাত্র তিনিই সমস্ত সৃষ্টজীবের লালনপালনকারী। তিনি তাঁর বান্দা অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদকে (সঃ) একই রাত্রির একটা অংশে মক্কা শরীফের মসজিদ হতে বায়তুল মুকাদ্দাসের মসজিদ পর্যন্ত নিয়ে যান, যা হযরত ইবরাহীমের (আঃ) যুগ হতে নবীদের (আঃ) কেন্দ্রস্থল ছিল। এ কারণেই সমস্ত নবীকে (আঃ) সেখানে তাঁর পাশে একত্রিত করা হয় এবং তিনি সেখানে তাঁদেরই জায়গায় তাঁদের ইমামতি করেন। এটা একথাই প্রমাণ করে যে, বড় ইমাম ও অগ্রবর্তী নেতা তিনিই। আল্লাহর দুরূদ ও সালাম তাঁর উপর ও তাঁদের সবারই উপর বর্ষিত হোক।

মহান আল্লাহ বলেনঃ এই মসজিদের চতুষ্পৰ্শ আমি ফল-ফুল, ক্ষেতখামার, বাগ-বাগিচা ইত্যাদি দ্বারা বরকতময় করে রেখেছি। আমার এই মর্যাদা সম্পন্ন নবীকে (সঃ) আমার বড় বড় নিদর্শনাবলী প্রদর্শন করা-ই ছিল আমার উদ্দেশ্য, যেগুলি তিনি ঐ রাত্রে দর্শন করেছিলেন।।

আল্লাহ তাআলা তাঁর মু'মিন, কাফির, বিশ্বাসকারী এবং অস্বীকারকারী সমস্ত বান্দার কথা শুনে থাকেন এবং দেখে থাকেন। প্রত্যেককে তিনি ওটাই দেন যার সে হকদার, দুনিয়াতেও এবং আখেরাতেও।

মি'রাজ সম্পর্কে বহু হাদীস রয়েছে যেগুলি এখন বর্ণনা করা হচ্ছেঃ

হযরত আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মিরাজের রাত্রে যখন কা’বাতুল্লাহ শরীফ হতে রাসূলুল্লাহকে (সঃ) ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় সেই সময় তাঁর নিকট তিনজন ফেরেশতা আগমন করেন, তাঁর কাছে ওয়াহী করার পূর্বে। ঐ সময় তিনি বায়তুল্লাহ শরীফে শুয়ে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রথম জন জিজ্ঞেস করেনঃ “ইনি এই সবের মধ্যে কে?” মধ্যজন উত্তরে বলেনঃ “ইনি এসবের মধ্যে উত্তম।” তখন সর্বশেষজন বলেনঃ “তা হলে তাঁকে নিয়ে চল।” ঐ রাত্রে এটুকুই ঘটলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদেরকে দেখতে পেলেন না। দ্বিতীয় রাত্রে আবার ঐ তিনজন ফেরেশতা আসলেন। ঘটনাক্রমে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ সময়েও ঘুমিয়ে ছিলেন। কিন্তু তাঁর ঘুমন্ত অবস্থা এমনই ছিল যে, তাঁর চক্ষুদ্বয় ঘুমিয়েছিল বটে, কিন্তু তাঁর অন্তর ছিল জাগ্রত। নবীদের (আঃ) নিদ্রা এরূপই হয়ে থাকে। ঐ রাত্রে তাঁরা তাঁর সাথে কোন আলাপ আলোচনা করেন নাই। তাঁরা তাঁকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে যমযম কূপের নিকট শায়িত করেন এবং হযরত জিবরাঈল (আঃ) স্বয়ং তাঁর বক্ষহতে গ্রীবা পর্যন্ত বিদীর্ণ করে দেন এবং বক্ষ ও পেটের সমস্ত জিনিস বের করে নিয়ে যমযমের পানি দ্বারা ধৌত করেন।

যখন খুব পরিষ্কার হয়ে যায় তখন তাঁর কাছে একটা সোনার থালা আনয়ন করা হয় যাতে বড় একটি সোনার পেয়ালা ছিল। ওটা ছিল হিকমত ও ঈমানে পরিপূর্ণ। ওটা দ্বারা তাঁর বক্ষ ও গলার শিরাগুলিকে পূর্ণ করে দেন। তারপর বক্ষকে শেলাই করে দেয়া হয়। তারপর তাঁকে দুনিয়ার আকাশের দিকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তথাকার দরজাগুলির একটিতে করাঘাত করা হয়। ফেরেশতাগণ জিজ্ঞেস করেনঃ “কে?” উত্তরে বলা হয়ঃ “জিবরাঈল (আঃ)।” আবার তাঁরা প্রশ্ন করেনঃ “আপনার সাথে কে আছেন?” জবাবে তিনি বলেনঃ “আমার সাথে রয়েছেন হযরত মুহাম্মদ (সঃ)।” পুনরায় তারা জিজ্ঞেস করেনঃ “তঁাকে কি ডাকাহয়েছে?” হযরত জিবরাঈল (আঃ) উত্তর দেনঃ “হ” এতে সবাই খুবই খুশী হন এবং ‘মারহাবা’ বলে অভ্যর্থনা জানিয়ে তাঁকে নিয়ে যান। যমীনে যে আল্লাহ তাআলা কি করতে চান তা আকাশের ফেরেশতারাও জানতে পারেন না। যে পর্যন্ত না তাদেরকে জানানো হয়। দুনিয়ার আকাশের উপর হযরত আদমের (আঃ) সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর সাথে রাসূলুল্লাহর (সঃ) পরিচয় করিয়ে দেন। তাঁকে বলেনঃ “ইনি আপনার পিতা হযরত আদম (আঃ)। তাঁকে সালাম দিন।” তিনি তাঁকে সালাম দেন। হযরত আদম (আঃ) সালামের জবাব দেন এবং মারহাবা বলে অভ্যর্থনা জানান ও বলেনঃ “আপনি আমার খুবই উত্তম ছেলে। সেখানে প্রবাহিত দু'টি নহর দেখে তিনি হযরত জিবরাঈলকে (আঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “এ নহর দু'টি কি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “এ দু'টো হলো নীল ও ফোরাতের উৎস। তারপর তাঁকে আসমানে নিয়ে যান। তিনি আর একটি নহর দেখতে পান। তাতে ছিল মনিমুক্তার প্রাসাদ এবং ওর মাটি ছিল খাটি মিশকে আম্বর। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কি নহর?” উত্তরে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেনঃ “এটি হচ্ছে নহরে কাওসার। এটা আপনার প্রতিপালক আপনার জন্যে তৈরী করে রেখেছেন।” এরপর তাঁকে দ্বিতীয় আকাশে নিয়ে যান। তথাকার ফেরেশতাদের সাথেও অনুরূপ কথাবার্তা চলে। তারপর তাঁকে নিয়ে তৃতীয় আকাশে উঠে যান। সেখানকার ফেরেশতাদের সাথেও ঐরূপ প্রশ্ন ও উত্তরের আদান প্রদান হয় যেরূপ প্রথম ও দ্বিতীয় আকাশে হয়েছিল। অতঃপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহকে (সঃ) নিয়ে চতুর্থ আকাশে উঠে যান। তথাকার ফেরেশতাগণও অনুরূপ প্রশ্ন করেন ও উত্তর পান। তারপর পঞ্চম অকাশে তাঁকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও অনুরূপ কথা শোনা যায়।

এরপর তাঁরা ষষ্ট আকাশে উঠে যান। সেখানেও এরূপই কথাবার্তা চলে। তারপর সপ্তম আকাশে গমন করেন এবং তথায়ও এরূপই কথাবার্তা হয়। (বর্ণনাকারী হযরত আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) বলেনঃ প্রত্যেক আকাশে তথাকার নবীদের (আঃ) সাথে রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাক্ষাৎ হয়। তিনি তাদের নাম করেছিলেন। যাঁদের নাম আমার স্মরণ আছে তারা হলেনঃ দ্বিতীয় আকাশে হযরত ইদরীস (আঃ), চতুর্থ আকাশে হযরত হারূণ (আঃ), পঞ্চম আকাশে যিনি ছিলেন তাঁর নাম আমার মনে নেই, ষষ্ট আকাশে ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ) এবং সপ্তম আকাশে ছিলেন হযরত মূসা (আঃ)। হযরত মুহাম্মদের (সঃ) উপর এবং অন্যান্য সমস্ত নবীর উপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।

যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এখান হতেও উপরে উঠতে থাকেন তখন হযরত মূসা (আঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমার ধারণা ছিল যে, আমার চেয়ে বেশী উপরে আপনি আর কাউকেও উঠাবেন না। এখন ইনি (হযরত মুহাম্মদ (সঃ)। যে কত উপরে উঠাবেন তা একমাত্র আপনিই জানেন।” শেষ পর্যন্ত তিনি সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছে যান। অতঃপর তিনি আল্লাহ তাআলার অতি নিকটবর্তী হন। ফলে তাঁদের মধ্যে দু' ধনুকের ব্যবধান থাকে বা তাঁর চেয়েও কম। অতঃপর আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাঁর কাছে ওয়াহী করা হয়, যাতে তাঁর উম্মতের উপর প্রত্যহ দিনরাত্রে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরয করা হয়। যখন তিনি সেখান হতে নেমে আসেন তখন হযরত মূসা (আঃ) তাকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহ তাআলার নিকট থেকে আপনি কি হুকুম প্রাপ্ত হলেন?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “দিন রাত্রে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায।” হযরত মূসা (আঃ) এ হুকুম শুনে বললেনঃ “এটা আপনার উম্মতের ক্ষমতার বাইরে। আপনি ফিরে যান এবং কমানোর জন্যে প্রার্থনা করুন।” তাঁর একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত জিবরাঈলের (আঃ) দিকে পরামর্শ চাওয়ার দৃষ্টিতে তাকান এবং তিনি ইঙ্গিতে সম্মতি দান করেন। সুতরাং তিনি পুনরায় আল্লাহ তাআলার নিকট গমন করেন এবং স্বস্থানে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করেনঃ “হে আল্লাহ! হালকা করে দিন। এটা পালন করা আমার উম্মতের সাধ্য হবে না।” আল্লাহ তাআলা তখন দশ ওয়াক্ত নামায কমিয়ে দেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফিরে আসলেন। হযরত মূসা (আঃ) আবার তাকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ “কি হলো?” জবাবে তিনি বললেনঃ “দশ ওয়াক্ত নামায কমিয়ে দিলেন।” একথা শুনে হযরত মূসা (আঃ) তাঁকে বললেনঃ “যান, আরো কমিয়ে আনুন।” তিনি আবার গেলেন। আবার কম করা হলো এবং শেষ পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামায থাকলো। হযরত মূসা (আঃ) তাঁকে আবারও বললেনঃ “দেখুন, বাণী ইসরাঈলের মধ্যে আমি আমার জীবন কাটিয়ে এসেছি। তাদের উপর এর চেয়েও কমের নির্দেশ ছিল, তবুও তারা ওর উপর ক্ষমতা রাখে নাই। ওটা পরিত্যাগ করেছে। আপনার উম্মত তো তাদের চেয়েও দুর্বল, দেহের দিক দিয়েও, অন্তরের দিক দিয়েও এবং চক্ষু কর্ণের দিক দিয়েও। সুতরাং আপনি আবার যান এবং আল্লাহ তাআলার নিকট এটা আরো কমানোর জন্যে আবেদন করুন।” অভ্যাস অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত জিবরাঈলের (আঃ) দিকে তাকালেন। হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁকে উপরে নিয়ে গেলেন। তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট আবেদন জানালেনঃ “হে আল্লাহ! আমার উম্মতের অন্তর, কর্ণ, চক্ষু এবং দেহ দুর্বল। সুতরাং দয়া করে এটা আরো কমিয়ে দিন” তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলা বললেনঃ “হে মুহাম্মদ (সঃ)! “রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “লাব্বায়কা ওয়া সা’দায়কা (আমি আপনার নিকট হাজির আছি)।” আল্লাহ তাআলা বললেনঃ “জেনে রেখো যে, আমার কথার কোন পরিবর্তন নাই। আমি যা নির্ধারণ করেছি তাই আমি উম্মুল কিতাবে লিখে দিয়েছি। পড়ার হিসেবে এটা পাচই থাকলো, কিন্তু সওয়াবের হিসেবে পঞ্চাশই রইলো।” যখন তিনি ফিরে আসলেন তখন হযরত মূসা (আঃ) তাঁকে বললেনঃ “প্রার্থনা মঞ্জুর হলো কি?” তিনি উত্তরে বললেনঃ “হাঁ, কম করা হয়েছে অর্থাৎ পাঁচ ওয়াক্তের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্তের সওয়াব পূর্ণ হয়েছে। প্রত্যেক সৎ কাজের সওয়াব দশগুণ করা হয়েছে।” হযরত মূসা (আঃ) আবার বললেনঃ “আমি বাণী ইসরাঈলকে পরীক্ষা করেছি। তারা এর চেয়ে হালকা হুকুমকেও পরিত্যাগ করেছে। সুতরাং আপনি আবার গিয়ে প্রতিপালকের কাছে এটা আরো কমানোর আবেদন করুন। এবার রাসূলুল্লাহ (সঃ) জবাব দিলেনঃ “হে কালীমুল্লাহ (আঃ)! এখন তো আমি আবার তাঁর কাছে যেতে লজ্জা পাচ্ছি।” তখন তিনি বললেনঃ “ঠিক আছে। তাহলে যান ও আল্লাহর নামে শুরু করে দিন।” অতঃপর তিনি জেগে দেখেন যে, তিনি মসজিদে হারামে রয়েছেন। (এ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে। সহীহ বুখারীর কিতাবুত তাওহীদ এবং সিফাতুন্নবী (সঃ)-এর মধ্যেও রয়েছে। এই রিওয়াইয়াতটিই শুরায়েক ইবনু আবদিল্লাহ ইবনু আবূ নামর (রাঃ) হতেও বর্ণিত আছে। কিন্তু নিজের স্মরণ শক্তির ত্রুটির কারণে সঠিকভাবে বর্ণনা করতে পারেন নাই)

কেউ কেউ এটাকে স্বপ্নের ঘটনা বলেছেন যা এর শেষে এসেছে। এ সব। ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।

এই হাদীসের “তিনি আল্লাহর অতি নিকটবর্তী হন, এমনকি তাঁদের মধ্যে দু’ধনুকের ব্যবধান থাকে বা তার চেয়েও কম” এই কথাগুলিকে ইমাম হাফিয আবু বকর বায়হাকী (রঃ) শুরায়েক নামক বর্ণনাকারীর বাড়াবাড়ি বলে উল্লেখ করেছেন এবং এতে তিনি একাকী রয়েছেন। এজন্যেই কোন কোন গুরুজন বলেছেন যে, এ রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আল্লাহ তাআলাকে দেখেছিলেন। কিন্তু হযরত আয়েশা (রাঃ) , হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) এবং হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) আয়াতগুলিকে এর উপর স্থাপন করেছেন যে, তিনি হযরত জিবরাঈলকে (আঃ) দেখেছিলেন। এটাই সঠিকতম উক্তি এবং ইমাম বায়হাকীর (রঃ) কথা সম্পূর্ণরূপে সত্য।

অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন হযরত আবু যার (রাঃ) রাসূলুল্লাহকে (সঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কি আল্লাহ তাআলাকে দেখেছেন?” তখন উত্তরে তিনি বলেনঃ “তিনি তো নূর! সুতরাং আমি কি করে তাঁকে দেখতে পারি?” আর একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি নূর (জ্যোতি দেখেছি।” যা সূরায়ে নাজমে রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “অতঃপর সে তার নিকটবর্তী হলো, অতি নিকটবর্তী।” (৫৩:৮) এর দ্বারা হযরত জিবরাঈলকে (আঃ) বুঝানো হয়েছে, যেমন উক্ত তিনজন সাহাবী বর্ণনা করেছেন। সাহাবীদের মধ্যে কেউই এই আয়াতের এই তাফসীরে তাঁদের বিরুদ্ধাচরণ করেন নাই।

রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার কাছে ‘বুরাক’ আনয়ন করা হয়, যা গাধার চেয়ে উঁচু ও খচ্চরের চেয়ে নীচু ছিল। ওটা ওর এক এক কদম এতো দূরে রাখছিল যত দূর ওর দৃষ্টি যায়। আমি ওর উপর সওয়ার হলাম এবং সে আমাকে নিয়ে চললো। আমি বায়তুল মুকাদ্দাস পৌঁছে গেলাম এবং ওকে দ্বারের ঐ শিকলের সাথে বেঁধে দিলাম যেখানে নবীগণ বাধতেন। তারপর আমি মসজিদে প্রবেশ করে দু রাক'আত নামায পড়লাম। যখন সেখান থেকে বের হলাম তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমার কাছে একটি পাত্রে সূরা ও একটি পাত্রে দুধ আনলেন। আমি দুধ পছন্দ করলাম। জিবরাঈল (আঃ) বললেনঃ “আপনি ফিরত (প্রকৃতি) পর্যন্ত পৌঁছে গেছেন।` তারপর উপরোক্ত হাদীসের বর্ণনার মতই তিনি প্রথম আকাশে পৌঁছলেন, ওর দর উন্মুক্ত করালেন, ফেরেশতাগণ প্রশ্ন করলেন, জবাব পেলেন। প্রত্যেক আকাশেই অনুরূপ হওয়ার কথা বর্ণিত আছে। প্রথম আকাশে হযরত আদমের (আঃ) সাথে সাক্ষাৎ হলো। তিনি মারহাবা বললেন এবং কল্যাণের জন্যে দুআ করলেন। দ্বিতীয় আকাশে হযরত ইয়াহইয়া (আঃ) ও হযরত ঈসার (আঃ) সাথে সাক্ষাৎ হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। যারা একে অপরের খালাতো ভাই ছিলেন। তাঁরা দুজনও তাঁকে মারহাবা বললেন এবং কল্যাণের জন্যে প্রার্থনা করলেন। তৃতীয় আকাশে সাক্ষাৎ হলো হযরত ইউসুফের (আঃ) সাথে যাকে অর্ধেক সৌন্দর্য দেয়া হয়েছিল। তিনিও মারহাবা বললেন ও মঙ্গলের দুআ করলেন। তারপর চতুর্থ আকাশে হযরত ইদরীসের (আঃ) সাথে সাক্ষাৎ হলো, যাঁর সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আমি তাকে উন্নীত করেছিলাম উচ্চ মর্যাদায়।” পঞ্চম আকাশে সাক্ষাৎ হয় হযরত হারূণের (আঃ) সাথে। ষষ্ঠ আকাশে হযরত মূসার (আঃ) সাথে। সপ্তম আকাশে হযরত ইবরাহীমকে (আঃ) বায়তুল মা'মূরে হেলান দেয়া অবস্থায় দেখতে পান। বায়তুল মা'মূর প্রত্যহ সত্তর হাজার ফেরেশতা গমন করে থাকেন, কিন্তু আজ যারা যান তাঁদের পালা কিয়ামত পর্যন্ত আর আসবে না। তারপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছেন, যার পাতা ছিল হাতীর কানের সমান এবং যার ফল ছিল বৃহৎ মৃৎপাত্রের মত। ওটাকে আল্লাহ তাআলার আদেশে ঢেকে রেখেছিল। ওর সৌন্দর্যের বর্ণনা কেউই দিতে পারে না। তারপর ওয়াহী হওয়া, পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরয হওয়া এবং হযরত মূসার (আঃ) পরামর্শক্রমে ফিরে গিয়ে কমাতে কমাতে পাঁচ ওয়াক্ত পর্যন্ত পৌঁছার বর্ণনা রয়েছে। তাতে এও রয়েছে যে, পরিশেষে রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলা হয়ঃ “যে ব্যক্তি কোন ভাল কাজের ইচ্ছা করে, যদি সে ওটা করতে না পারে তবুও তার জন্যে একটি নেকী লিখা হয়। আর যদি করে ফেলে তবে দশটি নেকী সে পেয়ে থাকে। পক্ষান্তরে কেউ যদি কোন পাপ কার্যের ইচ্ছা করে অতঃপর তা না করে তবে তার জন্যে কোন পাপ লিখা হয় না। আর যদি করে বসে তবে একটি মাত্র পাপ লিখা হয়। (এ হাদীসটি এভাবে মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে। সহীহ মুসলিমেও এভাবে বর্ণিত আছে) এ হাদীস দ্বারা এটাও জানা যাচ্ছে যে, যেই রাত্রে রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বায়তুল্লাহ হতে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত ভ্রমণ করানো হয় সেই রাত্রেই মি'রাজও হয় এবং এটা সত্যও বটে এতে সন্দেহের লেশ মাত্র নেই।

মুসনাদে আহমদে রয়েছে যে, বুরাকের লাগামও ছিল এবং জিন বা গদীও ছিল। রাসূলুল্লাহর (সঃ) সওয়ার হওয়ার সময় যখন সে ছটফট করতে থাকে তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাকে বলেনঃ “তুমি এটা কি করছো? আল্লাহর কসম! তোমার উপর ইতিপূর্বে এঁর চেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি কখনো সওয়ার হয় নাই।” একথা শুনে বুরাক সম্পূর্ণরূপে শান্ত হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যখন আমাকে আমার মহামহিমান্বিত প্রতিপালকের দিকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় তখন আমার গমন এমন কতকগুলি লোকের পার্শ্ব দিয়ে হয় যাদের তামার নখ ছিল, যার দ্বারা তারা নিজেদের মুখমণ্ডল ও বক্ষ নুচতে ছিল।” আমি। হযরত জিবরাঈলকে (আঃ) জিজ্ঞেস করলামঃ “এরা কারা?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “এরা হচ্ছে ওরাই যারা লোকের গোশত ভক্ষণ করতো (অর্থাৎ গীবত করতো) এবং তাদের মর্যাদার হানি করতো।”

সুনানে আবি দাউদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন আমি হযরত মূসার (আঃ) কবরের পার্শ্ব দিয়ে গমন করি তখন তাঁকে ওখানে নামাযে দণ্ডায়মান অবস্থায় দেখতে পাই।” হযরত আবু বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহকে (সঃ) মাসজিদুল আকসার (বায়তুল মুকাদ্দাসের চিহ্নগুলি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতে শুরু করে দেন। তিনি বলতেই আছেন এমতাবস্থায় হযরত আবু বকর (রাঃ) তাকে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি সত্য বর্ণনাই দিচ্ছেন এবং আপনি চরম সত্যবাদী। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল।” হযরত আবু বকর (রাঃ) মাসজিদুল আকসা পূর্বে দেখেছিলেন।

মুসনাদে বায্যারে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি শুয়েছিলাম এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) আগমন করেন এবং আমার দু’কাঁধের মাঝে হাত রাখেন। আমি তখন দাঁড়িয়ে গিয়ে এক গাছে বসে যাই যাতে পাখীর বাসার মত কিছু ছিল। একটিতে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বসে যান। তখন ঐ গাছটি ফুলে উঠলো ও উঁচু হতে শুরু হলো, এমনকি আমি ইচ্ছা করলে আকাশ ছুঁয়ে নিতে পারতাম। আমি তো আমার চাদর ঠিক করছিলাম, কিন্তু দেখলাম যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) অত্যন্ত বিনীত অবস্থায় রয়েছেন। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে, আল্লাহর মারেফাতের জ্ঞানে তিনি আমার চেয়ে উত্তম। আকাশের একটি দরজা আমার জন্যে খুলে দেয়া হলো। আমি এক যবরদস্ত ও জাঁকজমকপূর্ণ নূর দেখলাম যা পর্দার মধ্যে ছিল। আর ওর ঐদিকে ছিল ইয়াকূত ও মণিমুক্তা তারপর আমার কাছে অনেক কিছু ওয়াহী করা হয়।”

দালায়েলে বায়হাকীতে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সাহাবীদের জামাআতে বসে ছিলেন, এমন সময় হযরত জিবরাঈল (আঃ) আগমন করলেন এবং অঙ্গুলি দ্বারা পিঠে ইশারা করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর একটি গাছের দিকে চললেন যাতে পাখীর বাসার মত বাসা ছিল। (শেষপর্যন্ত) তাতে এও আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যখন আমাদের দিকে নূর অবতীর্ণ হলো তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ) বেহুশ হয়ে পড়ে গেলেন। (শেষ পর্যন্ত)।” অতঃপর তিনি বলেনঃ“ এরপর আমার কাছে ওয়াহী আসলো “নবী এবং বাদশাহ হতে চাও, না নবীও বান্দা হয়ে জান্নাতী হতে চাও?” হযরত জিবরাঈল (আঃ) ঐভাবেই বিনয়ের সাথে পড়ে ছিলেন, ইশারায় তিনি আমাকে বললেনঃ “বিনয় অবলম্বন করুন।” আমি তখন উত্তরে বললাম :হে আল্লাহ! আমি নবী ও বান্দা হতে চাই।” (দালায়েলে বায়হাকীর এই রিওয়াইয়াত যদি সঠিক হয় তবে সম্ভবতঃ এটা মিরাজের ঘটনা না হয়ে অন্য কোন ঘটনা হবে। কেননা, এতে বায়তুল মুকাদ্দাসের কোন উল্লেখ নেই এবং আকাশের আরোহণেরও কোন কথা নেই। এসব ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ)
মুসনাদে বায্যারে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) আল্লাহ তাআলাকে দেখেছিলেন। কিন্তু এ রিওয়াইয়াতটিও গারীব। (যে সহীহ হাদীসে মাত্র একজন বর্ণনাকারী থাকেন তাকে গারীব হাদীস বলা হয়)

তাফসীরে ইবনু জারীরে বর্ণিত আছে যে, বুরাক যখন হযরত জিবরাঈলের (আঃ) কথা শুনে এবং রাসূলুল্লাহকে (সঃ) সওয়ার করিয়ে নিয়ে চলতে শুরু করে তখন তিনি পথের এক ধারে এক বুড়িকে দেখতে পান। এই বুড়িটি কে তা তিনি হযরত জিবরাঈলের (আঃ) কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেনঃ চলুন।”
আবার চলতে চলতে পথে কোন একজনকে দেখতে পান যে তাঁকে ডাকতে রয়েছে। আরো কিছু দূর গিয়ে তিনি আল্লাহর এক মাখলূখককে দেখতে পান, যে উচ্চ স্বরে বলতে রয়েছেঃ (আরবি) হযরত জিবরাঈল (আঃ) সালামের জবাব দিলেন। দ্বিতীয়বারও এইরূপই ঘটলো এবং তৃতীয়বারও এটাই ঘটলো। শেষ পর্যন্ত তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসে। পৌঁছে গেলেন। সেখানে তাঁর সামনে পানি, মদ ও দুধ হাজির করা হলো। তিনি দুধ গ্রহণ করলেন। হযরত জিবরাঈল (আঃ) বললেনঃ “আপনি ফিতরাতের (প্রকৃতির) রহস্য পেয়ে গেছেন। যদি আপনি পানির পাত্র নিয়ে পান করতেন তবে আপনার উম্মত ডুবে যেতো। পথভ্রষ্ট হয়ে যেতো।” অতঃপর রাসূলুল্লাহর (সঃ) সামনে হযরত আদম (আঃ) থেকে নিয়ে তাঁর যুগের পূর্ব পর্যন্ত সমস্ত নবীকে পেশ করা হলো। তিনি তাঁদের সবারই ইমামতি করলেন। ঐ রাত্রে সমস্ত নবী নামাযে তাঁর ইকতিদা করলেন। এরপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁকে বলেনঃ “যে বুড়িকে আপনি পথের ধারে দেখেছিলেন, তাকে যেন এজন্যেই দেখানো হয়েছিল যে, দুনিয়ার বয়স ততটুকুই বাকী আছে যতটুকু বাকী আছে এই বুড়ীর বয়স। আর যে শব্দের দিকে আপনি মনোযোগ দিয়েছিলেন সে ছিল আল্লাহর শত্রু ইবলীস। যাদের সালামের শব্দ আপনার কাছে পৌঁছেছিল তারা ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ) এবং হযরত ঈসা আঃ)।” (এবৰ্ণনাতেও গারাবাত (অস্বাভাবিকতা) ও নাকারাত বা অস্বীকৃতি রয়েছে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার জ্ঞানই সবচেয়ে বেশী)

অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন আমি হযরত জিবরাঈলের (আঃ) সাথে বুরাকে চলি তখন এক জায়গায় তিনি আমাকে বলেনঃ “এখানে নেমে নামায আদায় করে নিন।” নামায শেষে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “এটা কোন জায়গা তা জানেন কি?” আমি উত্তরে বলিঃ না। তিনি বলেনঃ “এটা তায়্যেবা অর্থাৎ মদীনা। এটাই হচ্ছে হিজরতের জায়গা।” তারপর তিনি আমাকে আর এক জায়গায় নামায পড়ান এবং বলেনঃ “এটা হচ্ছে ভূরে সাইনা”। এখানে আল্লাহ তাআ’লাহযরত মূসার (আঃ) সাথে কথা বলেন। তারপর তিনি আমাকে আর এক স্থানে নামায পড়ান ও বলেনঃ “এটা হলো বায়তে লাহাম। এখানে হযরত ঈসা (আঃ) জন্ম গ্রহণ বরেন। এরপর আমি বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছি। সেখানে সমস্ত নবী একত্রিত হন। হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমাকে ইমাম নির্বাচন করেন। আমি তাঁদের ইমামতি করি। অতঃপর তিনি আমাকে নিয়ে আকাশে উঠে যান।” এরপর তাঁর এক এক আকাশে পৌছা এবং বিভিন্ন আকাশে বিভিন্ন নবীদের সাথে সাক্ষাৎ হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “যখন আমি সিদরাতুল মুনতাহায় পৌছলাম তখন আমাকে একটি নূরানী মেঘে ঢেকে নেয়। তখনই আমি সিজদায় পড়ে গেলাম।”

তারপর তার উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরয হওয়া এবং পরে কমে যাওয়া ইত্যাদির বর্ণনা রয়েছে। শেষে হযরত মূসার (আঃ) বর্ণনায় রয়েছেঃ “আমার উম্মতের উপর তো মাত্র দু'ওয়াক্ত নামায নির্ধারণ করা হয়েছিল, কিন্তু ওটাও তারা পালন করে নাই।” তাঁর এই কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) পাঁচ ওয়াক্ত হতে আরো কমাবার জন্যে গেলেন। তখন আল্লাহ তাআলা তাকে বললেনঃ “আমি তো আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করার দিনই তোমার উপর ও তোমার উম্মতের উপর পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করে রেখেছিলাম। এটা পড়তে পাঁচ ওয়াক্ত, কিন্তু সওয়াব হবে পঞ্চাশ ওয়াক্তের সমান। সুতরাং তুমি ও তোমার উম্মত যেন এর রক্ষণাবেক্ষণ কর।” আমার তখন দৃঢ় প্রত্যয় হলো যে, এটাই আল্লাহ তাআলার শেষ হুকুম। অতঃপর আবার যখন আমি হযরত মূসার (আঃ) কাছে পৌছলাম তখন আবার তিনি আমাকে আল্লাহ তাআলার নিকট ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন, কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস হিসেবে এটাই ছিল আল্লাহ তাআলার অকাট্য হুকুম, তাই আমি আর তাঁর কাছে ফিরে গেলাম না।”

মুসনাদে ইবনু আবি হাতিমেও মিরাজের ঘটনাটির সুদীর্ঘ হাদীস রয়েছে। তাতে এও রয়েছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বায়তুল মুকাদ্দাসের মসজিদের পার্শ্বে ঐ দরজার কাছে পৌঁছেন যাকে ‘বাবে মুহাম্মদ (সঃ) বলা হয়, ওখানে একটি পাথর ছিল যাতে হযরত জিবরাঈল (আঃ) অঙ্গুলি লাগিয়েছিলেন, তখন তাতে ছিদ্র হয়ে যায়। সেখানে তিনি বুরাকটি বাঁধেন এবং এর পর মসজিদে প্রবেশ করেন। মসজিদের মধ্যভাগে পৌঁছলে হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁকে বলেনঃ “আপনি কি আল্লাহ তাআলার কাছে এই আকাংখা করছেন যে, তিনি আপনাকে হ্র দেখাবেন?” উত্তরে তিনি বলেন, “হ্যা” তিনি তখন বলেনঃ “তা হলে আসুন। এই যে তারা। তাদেরকে সালাম করুন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তারা সাখরার বাম পার্শ্বে বসেছিল। আমি তাদের কাছে গিয়ে সালাম করলাম। সবাই সালামের জবাব দিলো। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ তোমরা কে? উত্তরে তারা বললোঃ “আমরা হলাম চরিত্রবতী সুন্দরী হুর। আল্লাহর পরহেযগার ও নেককার বান্দাদের আমরা স্ত্রী। যারা পাপকার্য থেকে দুরে থাকে এবং যাদেরকে পবিত্র করে আমাদের কাছে আনয়ন করা হবে। অতঃপর আর তারা কখনো বের হবে না। তারা সদা আমাদের কাছেই অবস্থান করবে। আমাদের থেকে কখনো তারা পৃথক হবে না। চিরকাল তারা জীবিত থাকবে, কখনো মৃত্যু বরণ করবেনা।” অতঃপর আমি তাদের নিকট থেকে চলে আসলাম। সেখানে মানুষ জমা হতে শুরু করলো এবং অল্পক্ষণের মধ্যে বহু লোক জমা হয়ে গেল এবং আমরা সবাই দাঁড়িয়ে গেলাম। ইমামতি কে করবেন এজন্যে আমরা অপেক্ষা করছিলাম। এমন সময় হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমার হাত ধরে সামনে বাড়িয়ে দিলেন। আমি তাদেরকে নামায পড়ালাম। নামায শেষে হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “যাদের আপনি ইমামতি করলেন তাঁরা কে তা জানেন কি? আমি জবাব দিলামঃ না। তখন তিনি বললেনঃ “আপনার এই সব মুকতাদী ছিলেন আল্লাহর নবী যাদেরকে তিনি প্রেরণ করে ছিলেন। তারপর তিনি আমার হাত ধরে অসমানের দিকে নিয়ে চললেন।” এরপর বর্ণনা আছে যে, আকাশের দরজাগুলি খুলিয়ে দেয়া হয়। ফেরেশতাগণ প্রশ্ন করেন, উত্তর পান, দরজা খুলে দেন ইত্যাদি। প্রথম আকাশে হযরত আদমের (আঃ) সাথে সাক্ষাৎ হয়। তিনি বলেনঃ “হে আমার উত্তম পুত্র! (হে উত্তম নবী (সঃ)! আপনার আগমন শুভ হোক।” এতে চতুর্থ আকাশে হযরত ইদরীসের (আঃ) সাথে সাক্ষাৎ হওয়ারও উল্লেখ রয়েছে। সপ্তম আকাশে হযরত ইবরাহীমের (আঃ) সাথে সাক্ষাৎ হওয়া এবং হযরত আদমের (আঃ) মত তাঁরও তাকে উত্তম পুত্র ও উত্তম নবী (সঃ) বলে সম্ভাষণ জানানোর বর্ণনা রয়েছে। তারপর আমাকে (নবী সঃ কে) হযরত জিবরাঈল (আঃ) আরো উপরে নিয়ে গেলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি একটি নদী দেখলাম। যাতে মণিমুক্তা, ইয়াকূত ও যবরজদের পানপাত্র ছিল এবং উত্তম ও সুন্দর রঙ-এর পাখী ছিল। আমি বললামঃ এতো খুবই সুন্দর পাখী! আমার একথার জবাবে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বললেনঃ “এটা যারা খাবে তারা আরো উত্তম।” অতঃপর তিনি বললেনঃ “এটা কোন নহর তা জানেন কি?” আমি জবাব দিলামঃ “না”। তিনি তখন বললেনঃ “এটা হচ্ছে। নহরে কাওসার। এটা আল্লাহ তাআলা আপনাকে দান করার জন্য রেখেছেন।” তাতে স্বর্ণ ও রৌপ্যের পানপাত্র ছিল যাতে ইয়াকূত ও মণিমাণিক্য জড়ানো ছিল। ওর পানি ছিল দূধের চেয়েও বেশী সাদা। আমি একটি সোনার পেয়ালা নিয়ে তা ঐ পানি দ্বারা পূর্ণ করে পান করলাম। ঐপানি ছিল মধুর চেয়েও বেশী মিষ্ট এবং মিক আম্বারের চেয়েও বেশী সুগন্ধময়। আমি যখন এর চেয়েও আরো উপরে উঠলাম তখন এক অত্যন্ত সুন্দর রঙ-এর মেঘ এসে। আমাকে ঘিরে নিলো, যাতে বিভিন্ন রঙছিল। জিবরাঈল (আঃ) তো আমাকে ছেড়ে দিলেন এবং আমি আল্লাহ তাআলার সামনে সিজদায় পড়ে গেলাম।” অতঃপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরয হওয়ার বর্ণনা রয়েছে। তারপর তিনি ফিরে আসেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তো কিছুই বললেন না। কিন্তু হযরত মূসা (আঃ) নামায হালকা করবার জন্যে তাঁকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আল্লাহ তাআলার নিকট ফিরিয়ে পাঠালেন। মোট কথা, অনুরূপভাবে তাঁর মহান আল্লাহর কাছে বারবার যাওয়া, মেঘের মধ্যে পরিবেষ্টিত হওয়া, নামাযের ওয়াক্ত হালকা হয়ে যাওয়া, হযরত ইবরাহীমের (আঃ) সাথে মিলিত হওয়া, হযরত মূসার (আঃ) ঘটনার বর্ণনা দেয়া, শেষ পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামায থেকে যাওয়া ইত্যাদির বর্ণনা রয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “এরপর হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমাকে নিয়ে নীচে অবতরণ করেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলামঃ যে সব আকাশে আমি গিয়েছি সেখানকার ফেরেশতাগণ আনন্দ প্রকাশ করেছেন এবং হাসিমুখে আমার সাথে মিলিত হয়েছেন। কিন্তু শুধুমাত্র একজন ফেরেস্তা হাসেন নাই। তিনি আমার সালামের জবাব দিয়েছেন এবং মারহাবা বলে অভ্যর্থনাও জানিয়েছেন বটে, কিন্তু তার মুখে আমি হাসি দেখি নাই। তিনি কে?” আর তার না হাসার কারণই বা কি? উত্তরে তিনি বললেনঃ “তার নাম মালিক। তিনি জাহান্নামের দারোগা। জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত তিনি কোন হাস্য করেন। নাই এবং কিয়ামত পর্যন্ত হাসবেনও না। কারণ তাঁর খুশীর এটাই ছিল একটা বড় সময়।” ফিরবার পথে আমি কুরায়েশের এক যাত্রী দলকে খাদ্য সম্ভার নিয়ে যেতে দেখলাম। তাদের সাথে এমন একটি উট দেখলাম যার উপর একটি সাদা ও একটি কালো চটের বস্তা ছিল। যখন হযরত জিবরাঈল (আঃ) এবং আমি ওর নিকটবর্তী হলাম তখন সে ভয় পেয়ে পড়ে গেল এবং এর ফলে সে খোঁড়া হয়ে গেল। এভাবে আমাকে আমার স্বস্থানে পৌঁছিয়ে দেয়াহলো।” সকালে তিনি জনগণের সামনে মিরাজের ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। মুশরিকরা এ খবর শুনে সরাসরি হযরত আবু বকরের (রাঃ) নিকট গমন করলো এবং তাঁকে বললোঃ “তোমার সঙ্গী কি বলছে শুনেছো কি? সে নাকি আজ রাত্রেই একমাসের পথ ভ্রমণ করে এসেছে।” উত্তরে হযরত আবূ বকর (রাঃ) বললেনঃ “যদি প্রকৃতই তিনি একথা বলে থাকেন তবে তিনি সত্য কথাই বলছেন। এর চেয়ে আরো বড় কথা বললেও তো আমরা তাঁকে সত্যবাদী বলেই জানবো। আমরা জানি যে, তাঁর কাছে মাঝে মাঝে আকাশের খবর এসে থাকে।

মুশরিকরা রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বললোঃ “তুমি আমাদের কাছে তোমার সত্যবাদিতার কোন প্রমাণ পেশ করতে পার কি?” তিনি জবাবে বললেনঃ “হাঁ, পারি। আমি অমুক অমুক জায়গায় কুরায়েশদের যাত্রীদলকে দেখেছি। তাদের একটি উট, যার উপর সাদা ও কালো দু'টি বস্তা ছিল, আমাদেরকে দেখে উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং চক্কর খেয়ে পড়ে যায়, ফলে তার পা ভেঙ্গে যায়।” ঐ যাত্রীদল আগমন করলে জনগণ তাদেরকে জিজ্ঞেস করেঃ “পথে নতুন কিছু ঘটে ছিল কি?” তারা উত্তরে বললোঃ “হাঁ, ঘটেছিল। অমুক উট উমুক জায়গায় এইভাবে খোঁড়া হয়ে যায় ইত্যাদি।” বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহর (সঃ) মিরাজের ঘটনাকে সত্য বলে স্বীকার করার কারণেও হযরত আবু বকরের (রাঃ) উপাধি হয় সিদ্দীক। জনগণ রাসূলুল্লাহকে (সঃ) জিজ্ঞেস করেঃ “আপনি তো হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত ঈসার (আঃ) সাথে সাক্ষাৎ করেছেন, সুতরাং তাদের আকৃতির বর্ণনা দিন তো?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “হাঁ বলছি। হযরত মূসা (আঃ) গোধূম বর্ণের লোক, যেমন ইদে অম্মািনের লোক হয়ে থাকে। আর হযরত ঈসার (আঃ) অবয়ব মধ্যম ধরণের এবং রঙ ছিল কিছুটা লালিমা যুক্ত। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল যে, তাঁর চুল দিয়ে যেন পানি। ঝরে পড়ছে।” (এই বর্ণনাতেও অস্বাভাবিকতা ও অদ্ভুত বস্তুনিচয় পরিলক্ষিত হয়)

মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) শুয়ে ছিলেন (কা’বা শরীফের) হাতীম’ নামক স্থানে। অন্য রিওয়াইয়াতে আছে যে, তিনি সখরের উপর শুয়েছিলেন। এমন সময় আগমনকারীরা আগমন করেন। একজন অপরজনকে আদেশ করেন এবং তিনি তাঁর কাছে এসে এখান থেকে এখান। পর্যন্ত বিদীর্ণ করে দেন অর্থাৎ গলার পার্শ্ব থেকে নিয়ে নাভী পর্যন্ত। তারপর উপরে বর্ণিত হাদীসগুলির বর্ণনার মতই বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “ষষ্ঠ আকাশে আমি হযরত মূসাকে (আঃ) সালাম করি এবং তিনি সালামের জবাব দেন। অতঃপর বলেনঃ “সৎ ভাই ও সৎ নবীর (সঃ) আগমন শুভ হোক।” আমি সেখান হতে আগে বেড়ে গেলে তিনি কেঁদে ফেলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ “আপনি কাঁদছেন কেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “এই জন্যে যে, যে ছেলেটিকে আমার পরে নবী করে পাঠান হয়েছে তাঁর উম্মত আমার উম্মতের তুলনায় অধিক সংখ্যক জান্নাতে যাবে।” তাতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সিদরাতুল মুনতাহার নিকট চারটি নহর দেখেন। দুটি যাহির ও দুটি বাতিন। তিনি বলেনঃ “আমি বললামঃ হে জিবরাঈল (আঃ)! এই চারটি নহর কি? তিনি উত্তরে বললেনঃ “বাতিনী নহর দু’টি হচ্ছে জান্নাতের নহর এবং যাহিরী নহর দুটি হলো নীল ও ফুরাত।” অতঃপর আমার সামনে বায়তুল মা'মূর’ উঁচু করা হলো। তারপর আমার সামনে মদ, দূধ ও মধুর পাত্র পেশ করা হলো। আমি দূধের পাত্রটি গ্রহণ করলাম। হযরত জিবরাঈল (আঃ) বললেনঃ “এটাই





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।