সূরা আন-নাহাল (আয়াত: 99)
হরকত ছাড়া:
إنه ليس له سلطان على الذين آمنوا وعلى ربهم يتوكلون ﴿٩٩﴾
হরকত সহ:
اِنَّهٗ لَیْسَ لَهٗ سُلْطٰنٌ عَلَی الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَ عَلٰی رَبِّهِمْ یَتَوَکَّلُوْنَ ﴿۹۹﴾
উচ্চারণ: ইন্নাহূলাইছা লাহূছুলতা-নুন ‘আলাল্লাযীনা আ-মানূওয়া ‘আলা রাব্বিহীম ইয়াতাওয়াক্কালূন।
আল বায়ান: নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের রবের উপর তাওয়াক্কুল করেছে, তাদের উপর শয়তানের কোন ক্ষমতা নেই।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৯৯. নিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও তাদের রবেরই উপর নির্ভর করে তাদের রবেরই উপর নির্ভর করে তাদের উপর তার কোন আধিপত্য নেই।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: যারা ঈমান এনেছে তাদের উপর তার কোন প্রভাব খাটে না, আর তারা তাদের প্রতিপালকের উপর নির্ভর করে।
আহসানুল বায়ান: (৯৯) নিশ্চয় যারা বিশ্বাস করেছে ও তাদের প্রতিপালকের উপরই নির্ভর করে তাদের উপর তার কোন আধিপত্য নেই।
মুজিবুর রহমান: তার কোন আধিপত্য নেই তাদের উপর যারা ঈমান আনে ও তাদের রবের উপরই নির্ভর করে।
ফযলুর রহমান: আসলে তার (শয়তানের) সেই সব লোকদের ওপর কোন আধিপত্য নেই যারা (সত্যকে) বিশ্বাস করে এবং তাদের প্রভুর ওপর ভরসা করে।
মুহিউদ্দিন খান: তার আধিপত্য চলে না তাদের উপর যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আপন পালন কর্তার উপর ভরসা রাখে।
জহুরুল হক: নিঃসন্দেহ সে -- তার কোনো আধিপত্য নেই তাদের উপরে যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের প্রভুর উপরেই নির্ভর করছে।
Sahih International: Indeed, there is for him no authority over those who have believed and rely upon their Lord.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৯৯. নিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও তাদের রবেরই উপর নির্ভর করে তাদের রবেরই উপর নির্ভর করে তাদের উপর তার কোন আধিপত্য নেই।(১)
তাফসীর:
(১) এ আয়াতে ব্যক্ত হয়েছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা শয়তানকে এমন শক্তি দেননি যাতে সে যে কোন মানুষকে মন্দ কাজে বাধ্য করতে পারে। মানুষ স্বয়ং নিজের ক্ষমতা ও শক্তি অসাবধানতাবশতঃ কিংবা কোন স্বার্থের কারণে প্রয়োগ না করলে সেটা তারই দোষ। তাই বলা হয়েছেঃ যারা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং যাবতীয় অবস্থা ও কাজকর্মে স্বীয় ইচ্ছাশক্তির পরিবর্তে আল্লাহর উপর ভরসা রাখে (কেননা, তিনিই সৎকাজের তাওফীকদাতা এবং প্রত্যেকটি অনিষ্ট থেকে রক্ষাকারী) এ ধরণের লোকের উপর শয়তান আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না।
সুফিয়ান সাওরী বলেন, এর অর্থ, যারা আল্লাহর উপর ভরসা রাখে শয়তান তাদেরকে এমন গোনাহে লিপ্ত করতে পারে না যা থেকে সে তাওবাহ করে না। কেউ কেউ বলেন, এর অর্থ, যারা আল্লাহর উপর ভরসা রাখে শয়তান তাদের কাছে কোন প্রমাণ দিয়ে টিকে থাকতে পারে না। কারও কারও মতে, এ আয়াতটি অন্য আয়াত “তবে আমার মুখলিস বান্দাদের ব্যতীত।” [সূরা আল-হিজর: ৪০: সূরা ছোয়াদ: ৮৩] এর অর্থের অনুরূপ। [ইবন কাসীর] (সূরা আল-হিজরের তাফসীরে এর ব্যাখ্যা গত হয়েছে।)
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৯৯) নিশ্চয় যারা বিশ্বাস করেছে ও তাদের প্রতিপালকের উপরই নির্ভর করে তাদের উপর তার কোন আধিপত্য নেই।
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৯৭-১০০ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করেন যে, কোন পুরুষ বা নারী যদি ঈমানের সাথে সৎ আমল করে তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তাকে দুটি উপহার দেবেন একটি দুনিয়াতে অপরটি আখিরাতে। দুনিয়াতে তাকে حَيٰوةً طَيِّبَةً তথা সুখী-সুন্দর জীবন দান করবেন। অর্থাৎ দুনিয়াতে পবিত্র ও হালাল রিযিক, সুখ সম্ভোগ, মনের তৃপ্তি, ইবাদতের স্বাদ, আনুগত্যের মজা ইত্যাদি সবই দেবেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: ঐ ব্যক্তি সফলকাম হয়েছে যে ইসলাম গ্রহণ করেছে, তাকে যথেষ্ট পরিমাণ রিযিক দান করা হয়েছে এবং আল্লাহ তা‘আলা তাকে যা দিয়েছেন তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থেকেছে। (তিরমিযী হা: ২৩৪৮, সহীহ)
আর আখিরাতে তাকে কাজের চেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রতিদান দেবেন। হাদীসে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
أَعْدَدْتُ لِعِبَادِيَ الصَّالِحِينَ مَا لَا عَيْنٌ رَأَتْ، وَلَا أُذُنٌ سَمِعَتْ، وَلَا خَطَرَ عَلَي قَلْبِ بَشَرٍ)
আমি আমার সৎ বান্দাদের জন্য এমন কিছু তৈরি করে রেখেছি যা কোন চক্ষু দেখেনি, কোন কান শ্রবণ করেনি এবং কোন মানুষের অন্তর কল্পনাও করেনি। (সহীহ বুখারী হা: ৩২৪৪, সহীহ মুসলিম হা: ২৮২৪)
তবে কোন আমল সৎ আমল হিসেবে গণ্য হবার জন্য দুটি শর্ত রয়েছে
১. একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্য করতে হবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَآ أُمِرُوْآ إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللهَ مُخْلِصِيْنَ لَهُ الدِّيْنَ حُنَفَا۬ءَ وَيُقِيْمُوا الصَّلٰوةَ وَيُؤْتُوا الزَّكٰوةَ وَذٰلِكَ دِيْنُ الْقَيِّمَةِ)
“তাদেরকে এছাড়া কোন নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা বিশুদ্ধচিত্তে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে, সালাত কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। এটাই সঠিক ধর্ম। ” (সূরা বাইয়্যেনাহ ৯৮:৫)
২. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাত অনুযায়ী হতে হবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَآ اٰتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ ج وَمَا نَهٰكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوْا)
“রাসূল তোমাদেরকে যা দেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করেন তা হতে বিরত থাক।”(সূরা হাশর ৫৯:৭)
সুতরাং কোন মুসলিম ব্যক্তি উক্ত শর্ত ছাড়া আমল করলে তা গ্রহণযোগ্য হবার আশা করা যায় না।
(فَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ...)
এখানে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্বোধন করে উম্মতের সকলকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, কুরআন পাঠ করার শুরুতে
أعوذ باللّٰه من الشيطان الرجيم
বিতাড়িত শয়তান হতে আশ্রয় প্রার্থনা করে শুরু করতে হবে। এটা পাঠ করা ওয়াজিব; নফল বা মুস্তাহাব নয়। সুতরাং যখনই কেউ কুরআন পাঠ করবে তখনই আউযুবিল্লাহ........বলে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে শুরু করতে হবে। এ সম্পর্কে সূরা ফাতিহার শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যারা ঈমান আনে ও তাদের প্রতিপালকের ওপর ভরসা করে শয়তান তার ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না। বরং যারা তাকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে সেই তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে এবং তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنَّ عِبَادِيْ لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطٰنٌ إِلَّا مَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْغٰوِيْنَ)
‘‘বিভ্রান্তদের মধ্যে যারা তোমার অনুসরণ করবে তারা ব্যতীত আমার বান্দাদের ওপর তোমার কোনই ক্ষমতা থাকবে না; (সূরা হিজর ১৫:৪২)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(قَالَ فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِيْنَ- إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِيْنَ)
“সে বলল: তোমার ইযযতের শপথ! আমি তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করবই। কিন্তু তাদের মধ্যে যারা তোমার একনিষ্ঠ বান্দা, তাদেরকে ছাড়া।” (সূরা স্ব-দ ৩৮:৮২-৮৩)
শয়তানের আধিপত্য বলতে বিষয়টি এমন যে, শয়তান সবধরণের মানুষের উপরই কর্তৃত্ব খাটাতে এমনকি একনিষ্ঠ মু’মিনদেরকেও পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা করবে। কিন্তু সাধারণ লোকদের মাধ্যমে যেভাবে সে অন্যায় কাজ করানোর ব্যাপারে সফল হবে একনিষ্ঠ মু’মিনদের বেলায় সে তা পারবে না, তাদের বেলায় সে ব্যর্থ হবে। কারণ তারা সর্বদাই আল্লাহ তা‘আলার উপর ভরসা করে এবং তাঁরই আনুগত্যে ব্যস্ত থাকে, শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে না। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে শয়তানের কুমন্ত্রণা হতে রক্ষা করুন। আমীন! (তাফসীর আযয়াউল বায়ান)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. যারা সৎ আমল করবে তারা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে সফলকাম হবে।
২. কুরআন পাঠের পূর্বে اَعُوْذُ بِاللّٰهِ পাঠ করতে হবে।
৩. ঈমানদারের ওপর শয়তান প্রাধান্য লাভ করতে পারে না।
৪. কোন আমল গ্রহণযোগ্য হতে হলে তা দুটি শর্ত সাপেক্ষে হতে হবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৯৮-১০০ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীর (সঃ) ভাষায় তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন কুরআন পাঠের পূর্বে ‘আঊযুবিল্লাহ’ পাঠ করে নেয়। ইবনু জারীর (রঃ) প্রভৃতি ইমাম এর উপর ইজমা হওয়ার কথা বর্ণনা করেছেন। আউযু-এর অর্থ ইত্যাদিসহ আলোচনা আমরা এই তাফসীরের শুরুতে লিপিবদ্ধ করেছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর।
এই হুকুমের উপযোগিতা এই যে, এর মাধ্যমে পাঠক কুরআন কারীমের মধ্যে গবড়-জবড় হয়ে যাওয়া এবং আজে বাজে চিন্তা থেকে মাহফুজ থাকে এবং শয়তানী কুমন্ত্রণা থেকে বেঁচে যায়। এ জন্যেই জামহ্র আলেমগণ বলেন, কুরআন পাঠের শুরুতেই আউযুবিল্লাহ পড়ে নিতে হবে। কেউ কেউ এ কথাও বলেন যে, কুরআনপাঠের শেষে পড়তে হবে। তাদের দলীল এই আয়াতটিই। কিন্তু প্রথম উক্তিটিই সঠিক আর হাদীসসমূহের দ্বারাও এটাই প্রমাণিত হয়। এসব ব্যাপারে সর্বাধিক সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলারই রয়েছে।
এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “তার কোন আধিপত্য নেই তাদের উপর, যারা ঈমান আনে ও তাদের প্রতিপালকের উপরই নির্ভর করে। মহান। আল্লাহর এই খাঁটি বান্দারা শয়তানের গভীর চক্রান্ত থেকে রক্ষা পেয়ে থাকে। তবে যারা তার আনুগত্য করে, তার কথা মত চলে, তাকে নিজেদের বন্ধু ও সাহায্যকারী মনে করে এবং তাকে আল্লাহর ইবাদতে শরীক করে নেয় তাদের উপর তার অধিপত্য হয়ে যায়। আবার ভাবার্থ এও হতে পারে যে, এখানে (আরবি) অক্ষরকে (আরবি) বা কারণবোধক ধরা হবে। অর্থাৎ তারা তার অনুগত হওয়ার কারণে আল্লাহর সঙ্গে শিরক করতে শুরু করে। এও ভাবার্থ হতে পারে যে, তারা তাদেরকে মাল ও সন্তান-সন্ততিতে তাকে আল্লাহর শরীক মনে করে বসে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।