সূরা আন-নাহাল (আয়াত: 61)
হরকত ছাড়া:
ولو يؤاخذ الله الناس بظلمهم ما ترك عليها من دابة ولكن يؤخرهم إلى أجل مسمى فإذا جاء أجلهم لا يستأخرون ساعة ولا يستقدمون ﴿٦١﴾
হরকত সহ:
وَ لَوْ یُؤَاخِذُ اللّٰهُ النَّاسَ بِظُلْمِهِمْ مَّا تَرَکَ عَلَیْهَا مِنْ دَآبَّۃٍ وَّ لٰکِنْ یُّؤَخِّرُهُمْ اِلٰۤی اَجَلٍ مُّسَمًّی ۚ فَاِذَا جَآءَ اَجَلُهُمْ لَا یَسْتَاْخِرُوْنَ سَاعَۃً وَّ لَا یَسْتَقْدِمُوْنَ ﴿۶۱﴾
উচ্চারণ: ওয়া লাও ইউআ-খিযু ল্লা-হুন্না-ছা বিজুলমিহিম মা-তারাকা ‘আলাইহা-মিন দাব্বাতিওঁ ওয়ালা-কিইঁ ইউআখরিম্নহুম ইলাআজালিম মুছাম্মান ফাইযা-জাআ আজালুহুম লাইয়াছতা’খিরূনা ছা-‘আতাওঁ ওয়ালা-ইয়াছতাকদিমূন।
আল বায়ান: আর আল্লাহ যদি মানবজাতিকে তাদের যুলমের কারণে পাকড়াও করতেন, তবে তাতে (যমীনে) কোনো বিচরণকারী প্রাণীকেই ছাড়তেন না। তবে আল্লাহ তাদেরকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ দেন। যখন তাদের নির্দিষ্ট সময় চলে আসে, তখন এক মুহূর্তও পেছাতে পারে না, এবং আগাতেও পারে না।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬১. আর আল্লাহ যদি মানুষকে তাদের সীমালংঘনের জন্য শাস্তি দিতেন তবে ভূপৃষ্ঠে কোন জীব-জন্তুকেই রেহাই দিতেন না(১); কিন্তু তিনি এক নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকেন। অতঃপর যখন তাদের সময় আসে তখন তারা মুহুর্তকাল আগাতে বা পিছাতে পারে না।
তাইসীরুল ক্বুরআন: আল্লাহ যদি মানুষকে তাদের সীমালঙ্ঘনের জন্য পাকড়াও করতেন, তাহলে যমীনের উপর কোন প্রাণীকেই তিনি রেহাই দিতেন না। কিন্তু তিনি একটা নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত তাদেরকে সময় দেন। তাদের সময় এসে গেলে এক মুহূর্তও অগ্র-পশ্চাৎ করা হয় না।
আহসানুল বায়ান: (৬১) আল্লাহ যদি মানুষকে তাদের সীমালংঘনের জন্য শাস্তি দিতেন, তাহলে ভূপৃষ্ঠে কোন জীব-জন্তুকেই রেহাই দিতেন না,[1] কিন্তু তিনি এক নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকেন;[2] অতঃপর যখন তাদের সময় আসে, তখন তারা মুহূর্তকালও বিলম্ব অথবা অগ্রগামী করতে পারে না।
মুজিবুর রহমান: আল্লাহ যদি মানুষকে তাদের সীমা লংঘনের জন্য শাস্তি দিতেন তাহলে ভূপৃষ্ঠে কোন জীব জন্তুকেই রেহাই দিতেননা; কিন্তু তিনি এক নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকেন। অতঃপর যখন তাদের সময় আসে তখন তারা মুহুর্তকাল বিলম্ব অথবা ত্বরা করতে পারবেনা।
ফযলুর রহমান: আল্লাহ যদি মানুষকে তাদের অন্যায়ের জন্য (সঙ্গে সঙ্গে) পাকড়াও করতেন (শাস্তি দিতেন) তাহলে পৃথিবীতে কোন চলমান (জীবন্ত) প্রাণী রাখতেন না। বস্তুত তিনি তাদেরকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ দেন। যখন তাদের সময় আসে তখন তারা এক মুহূর্তও বিলম্ব করতে কিংবা এগিয়ে আসতে পারে না।
মুহিউদ্দিন খান: যদি আল্লাহ লোকদেরকে তাদের অন্যায় কাজের কারণে পাকড়াও করতেন, তবে ভুপৃষ্ঠে চলমান কোন কিছুকেই ছাড়তেন না। কিন্তু তিনি প্রতিশ্রুতি সময় পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দেন। অতঃপর নির্ধারিত সময়ে যখন তাদের মৃত্যু এসে যাবে, তখন এক মুহুর্তও বিলম্বিত কিংবা তরাম্বিত করতে পারবে না।
জহুরুল হক: আর আল্লাহ্ যদি মানুষকে পাকড়াও করতেন তাদের অন্যায়াচারণের জন্যে তবে তিনি এর উপরে কোনো জীবজন্তুকেই রাখতেন না, কিন্তু তিনি তাদের অবকাশ দিয়ে থাকেন একটি নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত, সেজন্যে যখন তাদের মিয়াদ এসে যায় তখন তারা ঘন্টাখানেকের জন্যেও পিছিয়ে দিতে পারে না, আর এগিয়েও আনতে পারে না।
Sahih International: And if Allah were to impose blame on the people for their wrongdoing, He would not have left upon the earth any creature, but He defers them for a specified term. And when their term has come, they will not remain behind an hour, nor will they precede [it].
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৬১. আর আল্লাহ যদি মানুষকে তাদের সীমালংঘনের জন্য শাস্তি দিতেন তবে ভূপৃষ্ঠে কোন জীব-জন্তুকেই রেহাই দিতেন না(১); কিন্তু তিনি এক নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকেন। অতঃপর যখন তাদের সময় আসে তখন তারা মুহুর্তকাল আগাতে বা পিছাতে পারে না।
তাফসীর:
(১) আল্লাহ্ তা'আলা এ আয়াতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা জানিয়ে দিচ্ছেন। তা হচ্ছে, তিনি যদি মানুষকে তাদের অত্যাচার-অনাচারের কারণে পাকড়াও করতেন তবে যমীনের বুকে কোন প্রাণী রাখতেন না। এখানে প্রাণী বলে কাফের উদ্দেশ্য নেয়া হলে কোন সমস্যা নেই। কারণ, তিনি তাদেরকে অবকাশ দেয়ার শাস্তি দিবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যদি প্রাণী বলে যমীনে বিচরণশীল সব প্রাণীই উদ্দেশ্য হয় তবে আল্লাহর পাকড়াও দ্বারা কেবল মানুষই ধ্বংস হতো না বরং তাদের সহ যমীনের উপর যত প্রাণী আছে সবাইকে তা পেয়ে বসত। ফলে যমীন প্রাণীশূণ্য হয়ে পড়ত। কিন্তু আল্লাহ্ তাআলা অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও সহিষ্ণু।
তিনি তাদেরকে একটি সুনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে থাকেন। যাতে যারা তাওবা করার করতে পারে, আর যারা অন্যায়কারী তাদের অন্যায় কাজের পরিপূর্ণতা লাভ করে। [ফাতহুল কাদীর] এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কাফেরকে ধ্বংস করার পাশাপাশি অন্যান্য প্রাণীদেরকে কেন ধ্বংস করা হবে, অথচ তাদের কোন গোনাহ নেই? এর উত্তরে কোন কোন মুফাসসির বলেন, যালেমকে তার শাস্তি বিধান করতে ধ্বংস করবেন। আর যদি অন্যান্য প্রাণী হিসাব-নিকাশ আছে এ রকম হয় তবে তাদের সওয়াব পূর্ণ করার জন্য, আর যদি হিসাব-নিকাশ নেই এ রকম প্রাণী হয়, তবে যালেমদের যুলুমের কু-প্রভাবের কারণে। [ফাতহুল কাদীর]
এর দ্বারা বোঝা গেল যে, মানুষ অন্যায়ের কারণে অন্যান্য প্রাণীজগতকেও কষ্টে নিক্ষেপ করে। আর যদি ভাল কাজ করে তখন অন্যান্য প্রাণীকুলও তাদের ভালকাজের সুফল ভোগ করে। এ জন্যই যারা দ্বীনের জ্ঞানে জ্ঞানী তাদের জন্য পানির মাছ এবং আকাশের পাখিও দো'আ করে। কারণ তারা দ্বীনি জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে অন্যায় আচরণ থেকে নিজেরা দূরে থাকবে অন্যদেরকেও দূরে রাখবে। ফলে আল্লাহর রহমত নাযিল হওয়ার কারণ হবে। যা মানুষ ও সবার জন্য সমভাবে আসে। আল্লাহ্ তা'আলা মানুষের গুনাহর কারণে তাদেরকে অনাবৃষ্টির মাধ্যমে শাস্তি দেন। এ শাস্তি মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীজগত সবাইকে শামিল করে। তাই মানুষের উচিত যাবতীয় অন্যায়-অনাচার থেকে দূরে থাকা। যাতে তাদের আচরণে এমন প্রাণীদের কষ্ট না হয় যারা কোন অন্যায় করেনি। [কুরতুবী ইবনুল কাইয়্যেম, মিফতাহু দারিস সা’আদাহ: ১/৬৫]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৬১) আল্লাহ যদি মানুষকে তাদের সীমালংঘনের জন্য শাস্তি দিতেন, তাহলে ভূপৃষ্ঠে কোন জীব-জন্তুকেই রেহাই দিতেন না,[1] কিন্তু তিনি এক নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকেন;[2] অতঃপর যখন তাদের সময় আসে, তখন তারা মুহূর্তকালও বিলম্ব অথবা অগ্রগামী করতে পারে না।
তাফসীর:
[1] এটি মহান আল্লাহর সহনশীলতা এবং তাঁর হিকমত ও সুকৌশলের দাবী যে, তিনি পাপ করতে দেখেও নিজ অনুগ্রহ ছিনিয়ে নেন না অথবা সত্ত্বর পাকড়াও করেন না। পক্ষান্তরে যদি তিনি পাপ সংঘটিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাকড়াও শুরু করেন, তাহলে যুলুম, পাপ, কুফরী ও শিরক পৃথিবীতে এত ব্যাপক হয়ে গেছে যে, কোন জীবই অবশিষ্ট থাকত না। কারণ যখন পাপ ব্যাপক হয়ে পড়ে, তখন আযাবে সৎ লোকদেরকেও ধ্বংস করে দেওয়া হয়। তবে তারা পরকালে আল্লাহর নিকট পুরস্কারপ্রাপ্ত হবে। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। (দ্রঃ বুখারী ২১১৮, মুসলিম ২২০৬, ২২১০নং)
[2] এটি সেই হিকমত ও যৌক্তিকতার বিবরণ, যার কারণে এক বিশেষ সময় পর্যন্ত অপরাধীকে অবকাশ দেওয়া হয়, প্রথমতঃ যাতে তাদের কোন ওযর-আপত্তি না থেকে যায়। আর দ্বিতীয়তঃ যাতে তাদের সন্তানদের মধ্যে কিছু ঈমানদার ও সৎশীল হতে পারে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৬১-৬২ নং আয়াতের তাফসীর:
উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর দয়া, অনুগ্রহ ও ধৈর্য সম্পর্কে অবগত করছেন যে, আল্লাহ তা‘আলা মানুষের অপরাধের কারণে তাদেরকে সাথে সাথে শাস্তি প্রদান করেন না। যদি তাদের অপরাধের কারণে সাথে সাথে শাস্তি প্রদান করতেন তবে জমিনে কোন একটি প্রাণী জীবিত থাকত না। সকল বস্তুই ধ্বংস হয়ে যেত। কারণ যখন পাপ কাজ ব্যাপক হয়ে পড়ে, তখন আযাবে সৎ লোকদেরও ধ্বংস করে দেয়া হয়। তবে আখিরাতে সৎ লোকেরা আল্লাহ তা‘আলার নিকট পুরস্কারপ্রাপ্ত হবে। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। (সহীহ বুখারী হা: ২১১৮, সহীহ মুসলিম হা: ২২০৬)
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَوْ یُؤَاخِذُ اللہُ النَّاسَ بِمَا کَسَبُوْا مَا تَرَکَ عَلٰی ظَھْرِھَا مِنْ دَا۬بَّةٍ وَّلٰکِنْ یُّؤَخِّرُھُمْ اِلٰٓی اَجَلٍ مُّسَمًّیﺆ فَاِذَا جَا۬ئَ اَجَلُھُمْ فَاِنَّ اللہَ کَانَ بِعِبَادِھ۪ بَصِیْرًاﭼﺟ)
“আর যদি আল্লাহ মানুষকে তাদের কাজ-কর্মের দরুণ পাকড়াও করতেন তবে দুনিয়ার বুকে একটি প্রাণীকেও রেহাই দিতেন না। কিন্তু তিনি তাদেরকে এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ দেন। অতঃপর যখন এসে পড়বে তাদের সেই নির্র্দিষ্ট সময়, (তখন তিনি তাদের কর্মের প্রতিফল দেবেন) আল্লাহ তো তাঁর বান্দাদের (বিষয়ে) সর্বদ্রষ্টা।” (সূরা ফাতির ৩৫:৪৫)
বরং আল্লাহ তা‘আলার হিকমত ও যৌক্তিকতার কারণে এক বিশেষ সময় পর্যন্ত অপরাধীকে অবকাশ দেয়া হয়, প্রথমতঃ যাতে তারা কোন ওযর-আপত্তি করতে না পারে। আর দ্বিতীয়তঃ যাতে তাদের সন্তানদের মধ্যে কিছু ঈমানদার ও সৎ হতে পারে। সুতরাং যখন সময় চলে আসবে তখন একটু অগ্র-পশ্চাত করা হবে না। এ সম্পর্কে সূরা ইউনুসে ও হিজর এ আলোচনা করা হয়েছে।
আর তারা আল্লাহ তা‘আলার জন্য এমন সব জিনিস সাব্যস্ত করে যা তাদের নিজেদের জন্যও পছন্দ করে না। তা হল তারা আল্লাহ তা‘আলার জন্য কন্যা সন্তান সাব্যস্ত করে, অথচ তাদেরকে সে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দিলে চেহারা মলিন হয়ে যায়।
আর তারা মুখ দিয়ে মিথ্যা কথা বলে, মিথ্যা কথাটি হল: দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম পরিণাম আমাদের জন্যই। অথচ তারা আল্লাহর সাথে শিরক করছে, আল্লাহ তা‘আলার সন্তান সাব্যস্ত করছে।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(وَّلَئِنْ رُّدِدْتُّ إِلٰي رَبِّيْ لَأَجِدَنَّ خَيْرًا مِّنْهَا مُنْقَلَبًا)
“আর আমাকে যদি আমার প্রতিপালকের নিকট ফিরিয়ে নেয়া হয়ই তবে আমি নিশ্চয়ই এটা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট স্থান পাব।’’ (সূরা কাহ্ফ ১৮:৩৬) তারা আরো বলে যে, আমরা শাস্তি প্রাপ্ত হব না।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(وَقَالُوْا نَحْنُ أَكْثَرُ أَمْوَالًا وَّأَوْلَادًا لا وَّمَا نَحْنُ بِمُعَذَّبِيْنَ)
“তারা বলত: আমরা ধনে-জনে সমৃদ্ধশালী; সুতরাং আমাদেরকে কিছুতেই শাস্তি দেয়া হবে না।” (সূরা সাবা ৩৪:৩৫)
আল্লাহ তা‘আলা বলেন: হ্যাঁ, তাদের পরিণাম ভাল হবে, তবে সে পরিণাম হল জাহান্নামের আগুন। জাহান্নামে তারাই হবে অগ্রগামী। مُّفْرَطُوْنَ অর্থ অগ্রগামী হওয়া, আগে আগে চলা। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: আমি হাওযে কাউসারে তোমাদের অগ্রগামী হব। (সহীহ বুখারী হা: ৬৫৮৪, সহীহ মুসলিম হা: ১৭৯৩)
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَقِيْلَ الْيَوْمَ نَنْسٰكُمْ كَمَا نَسِيْتُمْ لِقَا۬ءَ يَوْمِكُمْ هٰذَا وَمَأْوَاكُمُ النَّارُ)
“আর বলা হবেঃ আজ আমি তোমাদেরকে ভুলে যাব যেমন তোমরা এই দিবসের সাক্ষাতকে ভুলে গিয়েছিলে। তোমাদের আশ্রয়স্থল জাহান্নাম।” (সূরা জাসিয়া ৪৫:৩৪)
অতএব মানুষের প্রতি আল্লাহর দয়া যে, তিনি তাদের অপরাধের কারণে তাড়াতাড়ি শাস্তি দেন না। তাই মানুষের উচিত আল্লাহ তা‘আলার এ দয়াকে কাজে লাগিয়ে নিজের গুনাহ ক্ষমা করিয়ে নেয়া।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. মানুষের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার দয়া যে, তিনি অপরাধের কারণে সাথে সাথে শাস্তি দেন না।
২. মানুষ অপরাধ করেও আল্লাহ তা‘আলার কাছে ভাল প্রতিদানের আশা করে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৬১-৬২ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তাআলা নিজের ধৈর্য, দয়া, স্নেহ এবং করুণা সম্পর্কে এখানে খবর দিচ্ছেন যে, তিনি বান্দাদের পাপকার্য দেখার পরেও তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকেন, সাথে সাথে পাকড়াও করেন না। যদি তিনি সাথে সাথেই ধরে ফেলতেন তবে আজ ভূ-পৃষ্ঠে কাউকেও চলতে-ফিরতে দেখা যেতো না। মানুষের পাপের কারণে জীব-জন্তুও ধ্বংস হয়ে যেতো, দুষ্টদের সাথে শিষ্টেরাও ধরা পড়ে যেতো। কিন্তু মহামহিমান্বিত আল্লাহ নিজের সহনশিলতা, দয়া, স্নেহ এবং মহানুভবতার গুণে বান্দাদের পাপ ঢেকে একটা নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত তিনি অবকাশ দিয়ে রেখেছেন, অন্যথায় একটা পোকা মাকড়ও বাঁচতো না। আদম সন্তানের পাপের আধিক্যের কারণে আল্লাহর শাস্তি এমনভাবে আসতো যে, সবকেই ধ্বংস করে দিতো।
হযরত আবু সালমা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) একটি লোককে বলতে শুনেনঃ “অত্যাচারী ব্যক্তি নিজেরই ক্ষতি সাধন করে।” তখন হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেনঃ “না, না। বরং তার অত্যাচারের কারণে পাখী তার বাসায় ধ্বংস হয়ে যায়।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত আবু দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ “একদা আমরা রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট কিছু আলোচনা করছিলাম। তিনি বলেনঃ “আল্লাহ কাউকে অবকাশ দেন না যখন তার নির্ধারিত সময় এসে পড়ে। বয়স বৃদ্ধি সৎ সন্তানের মাধ্যমে হয়ে থাকে। যে সন্তান তিনি বান্দাকে দান করেন ঐ সন্তানের দুআ’ তার কবরে পৌঁছে থাকে এবং এটাই হচ্ছে তার বয়স বৃদ্ধি।” (এ হাদীসটি ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
মহান আল্লাহ বলেনঃ “তারা নিজেরা যা অপছন্দ করে তা-ই আল্লাহর প্রতি তারা আরোপ করে, আর তারা ধারণা করে যে, এই দুনিয়াতেও তারা কল্যাণ লাভ করছে আর যদি কিয়ামত সংঘটিত হয় তবে সেখানেও রয়েছে তাদের জন্যে কল্যাণ।” যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ “যদি আমি মানুষকে আমার পক্ষ হতে করুণার স্বাদ গ্রহণ করাই, অতঃপর তা টেনে নিই তবে সে নিরাশ ও অকৃতজ্ঞ হয়ে যায়। আর যাকে যে কষ্ট স্পর্শ করেছিল তা দূর করার পরে যদি আমি তাকে নিয়ামতের স্বাদ গ্রহণ করাই তবে সে অবশ্যই বলে ওঠেঃ আমার উপর থেকে কষ্ট দূর হয়ে গেছে, আর সে তখন খুশী ও অহংকারী হয়ে যায়।”
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “তাকে কষ্ট স্পর্শ করার পর যদি আমি তাকে আমার রহমতের স্বাদ গ্রহণ করাই তবে অবশ্যই সে বলেঃ এটা আমারই জন্যে, আর আমি ধারণা করি না যে,কিয়ামত সংঘটিত হবে। আর যদি আমি আমার প্রতিপালকের কাছে ফিরেও যাই, তবে অবশ্যই তাঁর কাছে আমার জন্যে কল্যাণই রয়েছে। সুতরাং অবশ্যই আমি কাফিরদেরকে তাদের কৃতকর্মের খবর দিয়ে দেবো এবং অবশ্যই তাদেরকে ভীষণ শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাবো।”
সূরায়ে কাহাফে দু’জন সঙ্গীর বর্ণনা দিতে গিয়ে কুরআন কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “নিজের প্রতি জুলুম করা অবস্থায় সে তার উদ্যানে প্রবেশ। করলো এবং (তার সৎ সঙ্গীকে) বললোঃ আমি মনে করি না যে, এটা কখনো ধ্বংস হয়ে যাবে। আর আমি মনে করি না যে, কিয়ামত সংঘটিত হবে, আর যদি আমি আমার প্রতিপালকের কাছে প্রত্যাবর্তিত হই-ই তবে আমি তো নিশ্চয় এটা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট স্থান পাবো।” (কি জঘন্য কথা!) কাজ করবে মন্দ আর আশা রাখবে ভাল! বপন করবে কাঁটা আর আশা করবে ফলের! কথিত আছে যে, কাবা ঘরের ইমারত নতুন ভাবে বানাবার জন্যে যখন ওটাকে ভেঙ্গে ফেলা হয়, তখন ওর ভিত্তির মধ্য হতে একটি পাথর বের হয় যার উপর কতকগুলি উপদেশমূলক কথা লিখিত ছিল। তন্মধ্যে নিম্নলিখিত কথাগুলিও ছিলঃ
“তোমরা অসৎকাজ করছে অথচ পূণ্যের আশা করছে। এটা হচ্ছে কাঁটা বপন করে আঙ্গুরের আশা করার মত।” সুতরাং তাদের আশা তো ছিল যে, দুনিয়াতেও মাল-ধন, জমি-জায়গা, দাস-দাসী, ইত্যাদি লাভ করবে এবং আখেরাতেও কল্যাণ লাভ করবে। কিন্তু আল্লাহপাক বলেনঃ “প্রকৃতপক্ষে
তাদের জন্যে তৈরী হয়ে আছে জাহান্নামের আগুন। সেখানে তারা আল্লাহর রহমত থেকে দূরে থাকবে এবং ধ্বংস হয়ে যাবে। আজ তারা আমার আহকাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। কাজেই কাল (কিয়ামতের দিন) আমিও তাদেরকে আমার নিয়ামত হতে বিমুখ করে দেবো। সত্বরই তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।