আল কুরআন


সূরা আন-নাহাল (আয়াত: 18)

সূরা আন-নাহাল (আয়াত: 18)



হরকত ছাড়া:

وإن تعدوا نعمة الله لا تحصوها إن الله لغفور رحيم ﴿١٨﴾




হরকত সহ:

وَ اِنْ تَعُدُّوْا نِعْمَۃَ اللّٰهِ لَا تُحْصُوْهَا ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَغَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ ﴿۱۸﴾




উচ্চারণ: ওয়া ইন তা‘উদ্দূনি‘মাতাল্লা-হি লা-তুহসূহা- ইন্নাল্লা-হা লাগাফরুর রাহীম।




আল বায়ান: আর যদি তোমরা আল্লাহর নিআমত গণনা কর, তবে তার ইয়ত্তা পাবে না। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৮. আর তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গুণলে তার সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাপরায়ণ, পরম দয়ালু।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: তোমরা আল্লাহর নি‘মাতসমূহকে গণনা করলে তার সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না; আল্লাহ অবশ্যই বড়ই ক্ষমাশীল, বড়ই দয়ালু।




আহসানুল বায়ান: (১৮) তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা করলে ওর সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না; আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমাপরায়ণ, পরম দয়ালু।



মুজিবুর রহমান: তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা করলে ওর সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবেনা; আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমা পরায়ণ, পরম দয়ালু।



ফযলুর রহমান: তোমরা যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা করতে চাও তাহলে তা গণনা করতে পারবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।



মুহিউদ্দিন খান: যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা কর, শেষ করতে পারবে না। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।



জহুরুল হক: আর তোমরা যদি আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ গণনা করতে যাও তোমরা তা গণতে পারবে না। নিঃসন্দেহ আল্লাহ্‌ই তো পরিত্রাণকারী, অফুরন্ত ফলদাতা।



Sahih International: And if you should count the favors of Allah, you could not enumerate them. Indeed, Allah is Forgiving and Merciful.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ১৮. আর তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গুণলে তার সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাপরায়ণ, পরম দয়ালু।(১)


তাফসীর:

(১) আল্লাহর অপরিসীম অনুগ্রহের কথা বর্ণনা করার পরপরই তাঁর ক্ষমাশীল ও করুণাময় হবার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তার যে নেয়ামত মানুষের উপর আছে তা দাবী করছে যে মানুষ সর্বদা তাঁর শোকরগুজার হবে। কিন্তু আল্লাহ তাঁর অপার মহিমায় তাদের অপরাধ মার্জনা করেন। যদি তোমাদেরকে তার প্রতিটি নেয়ামতের শোকরিয়া আদায় করতে বাধ্য করা হতো, তবে তোমরা কেউই সেটা করতে সক্ষম হতে না। যদি এ ধরণের নির্দেশ আসতো তবে তোমরা দুর্বল হয়ে যেতে এবং তা করা ছেড়ে দিতে আর যদি তিনি এর জন্য তোমাদেরকে আযাব দিতেন তবে তিনি যালেম বিবেচিত হতেন না।

কিন্তু আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল। অনেক কিছুই তিনি ক্ষমা করে দেন, অল্প কিছুরই শাস্তি দিয়ে থাকেন। [ইবন কাসীর] তোমরা যদি তার কোন কোন নেয়ামতের শোকর আদায় করতে কিছুটা কসূর করে ফেল, তারপর তাওবাহ করো এবং তাঁর আনুগত্য ও সস্তুষ্টির দিকে ফিরে আসো তবে তিনি তোমাদেরকে অবশ্যই ক্ষমা করে দিবেন। তাওবাহ ও তার দিকে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি তো তোমাদের জন্য অতিশয় দয়ালু। [তাবারী]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (১৮) তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা করলে ওর সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না; আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমাপরায়ণ, পরম দয়ালু।


তাফসীর:

-


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১২-২০ নং আয়াতের তাফসীর:



অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা পাঁচটি বড় বড় সৃষ্টি মানুষের কল্যাণার্থে নিয়োজিত ও অনুগত করে দিয়েছেন সে কথা বলা হয়েছে। এ বড় বড় পাঁচটি সৃষ্টি হল রাত, দিন, সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্র । এসব সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন। আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশেই চন্দ্র-সূর্য নির্দিষ্ট কক্ষপথে বিচরণ করছে, দিবা-রাত্রি আবর্তিত হচ্ছে, কোন সময় ছোট, কোন সময় বড় হচ্ছে, একটি অপরটিকে অতিক্রম করে চলছে না। এসবের মাঝে কোনরকম পার্থক্য সূচিত হয় না। নক্ষত্রমালা দ্বারা আকাশ সুসজ্জিত করেছেন এবং এর দ্বারা পথভোলা পথিক পথ খুঁজে পায়। এগুলো আল্লাহ তা‘আলার পরিপূর্ণ শক্তি ও সার্বভৌমত্বের প্রমাণ বহন করে।



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(اِنَّ رَبَّکُمُ اللہُ الَّذِیْ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضَ فِیْ سِتَّةِ اَیَّامٍ ثُمَّ اسْتَوٰی عَلَی الْعَرْشِﺤ یُغْشِی الَّیْلَ النَّھَارَ یَطْلُبُھ۫ حَثِیْثًاﺫ وَّالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُوْمَ مُسَخَّرٰتٍۭ بِاَمْرِھ۪ﺚ اَلَا لَھُ الْخَلْقُ وَالْاَمْرُﺚ تَبٰرَکَ اللہُ رَبُّ الْعٰلَمِیْنَﮅ)



“নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি ‘আরশে সমুন্নত হয়েছেন। তিনিই দিবসকে রাত্রি দ্বারা আচ্ছাদিত করেন যাতে তাদের একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে, আর সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি, যা তাঁরই আজ্ঞাধীন, জেনে রাখ যে, সৃষ্টি তাঁর, হুকুমও (চলবে) তাঁর। বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ তিনি বরকতময়।” (সূরা আ‘রাফ ৭:৫৪)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:



(وَلَقَدْ زَيَّنَّا السَّمَا۬ءَ الدُّنْيَا بِمَصَابِيْحَ وَجَعَلْنٰهَا رُجُوْمًا لِّلشَّيٰطِيْنِ وَأَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابَ السَّعِيْر)



“আমি নিকটবর্তী আকাশকে সুশোভিত করেছি প্রদীপমালা (তারকারাজী) দ্বারা আর ওগুলোকে শয়তানদেরকে প্রহার করার উপকরণ করেছি এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি জাহান্নামের আযাব।” (সূরা মুলক ৬৭:৫)



এসব প্রত্যেকটি মাখলুক আল্লাহ তা‘আলার একত্বের ওপর প্রমাণ বহন করে যে, প্রতিপালক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, অন্য কেউ নয়। অতএব যারা এর বিপরীত মনে করবে অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার সাথে অন্যকে প্রতিপালক হিসেবে বিশ্বাস করবে তারা মুশরিক আর তারাই হবে জাহান্নামী।



পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা করেন যে, তিনি মানুষের উপকারার্থে পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরণের ও রঙের বস্তু সৃষ্টি করেছেন। খনিজ সম্পদ, গাছপালা, জড় পদার্থ ও জীবজন্তু এমন কি মানুষের মাঝেও ভিন্ন ভিন্ন রঙ সৃষ্টি করেছেন।



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: “তুমি কি লক্ষ্য করনি? আল্লাহ আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেন। তারপর আমি তা দিয়ে নানা বর্ণের ফলমূল উৎপন্ন করি। আর পর্বতমালারও রয়েছে বিভিন্ন বর্ণের গিরিপথ সাদা, লাল ও ঘোর কাল। আর এভাবে মানুষ, প্রাণী ও চতুষ্পদ জন্তু বিভিন্ন বর্ণের হয়ে থাকে। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাপ্রতাপশালী, পরম ক্ষমাশীল।” (সূরা ফাতির ৩৫/২৭-২৮)



এ সমস্ত নিদর্শনগুলো এটাই প্রমাণ বহন করে যে, আল্লাহ তা‘আলা একক তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি ছাড়া আর কেউ ইবাদতের যোগ্য নয়। আর আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত বিভিন্ন প্রকার রঙের এসব জিনিস সৃষ্টি করার ক্ষমতা কারো নেই। সুতরাং সকলের উচিত তাঁরই ইবাদত করা।



পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, ঐ সমস্ত অধীনস্থ জিনিসগুলোর মত সমুদ্রকেও তিনি মানুষের অধীনস্থ করে দিয়েছেন, যাতে সমুদ্রে ভ্রমণ করা, শিকার করা, পরিধেয় অলঙ্কার বের করে আনা এবং এক স্থান থেকে অন্যস্থানে মালামাল স্থানান্তরিত করা সম্ভব হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(اَللّٰهُ الَّذِيْ سَخَّرَ لَكُمُ الْبَحْرَ لِتَجْرِيَ الْفُلْكُ فِيْهِ بِأَمْرِهٰ وَلِتَبْتَغُوْا مِنْ فَضْلِهٰ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُوْنَ)



“আল্লাহ, তিনি সমুদ্রকে তোমাদের জন্য নিয়োজিত করেছেন, যাতে তাঁর আদেশে তাতে নৌযানসমূহ চলাচল করতে পারে এবং যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করতে পার ও তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হও।” (সূরা জাসিয়া ৪৫:১২)



অত্র আয়াতে সমুদ্রকে মানুষের অনুগত করে দেয়ার মাধ্যমে চারটি নেয়ামত বর্ণনা করেছেন।



(১) طَرِيًّا অর্থ তাজা, অর্থাৎ মানুষ সমুদ্রে জাল ফেলে তাজা মাছ সংগ্রহ করে খেয়ে থাকে।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَمِنْ كُلٍّ تَأْكُلُوْنَ لَحْمًا طَرِيًّا)



“তোমরা প্রত্যেকটি থেকেই টাটকা গোশত খাও” (সূরা ফাতির ৩৫:১২)



(২) মানুষ সমুদ্র থেকে মূল্যবান পরিধেয় অলঙ্কার বের করে আনে। যেমন মণিমুক্তা, প্রবাল ইত্যাদি।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



يَخْرُجُ مِنْهُمَا اللُّؤْلُؤُ وَالْمَرْجَانُ‏



“উভয় সমুদ্র হতে বের করেন মুক্তা ও প্রবাল।” (সূরা রহমান ৫৫:২২)



(৩) সমুদ্রের পাহাড় সমান ঢেউ চিরে মানুষ তাতে ভ্রমণ করে, অথচ আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা করলে তাতে ডুবিয়ে মারতে পারেন।



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:



(وَخَلَقْنَا لَهُمْ مِّنْ مِّثْلِه۪ مَا يَرْكَبُوْنَ -‏ وَإِنْ نَّشَأْ نُغْرِقْهُمْ فَلَا صَرِيْخَ لَهُمْ وَلَا هُمْ يُنْقَذُوْنَ)‏



“এবং তাদের জন্য আমি এর অনুরূপ যানবাহন সৃষ্টি করেছি যাতে তারা আরোহণ করে। আর আমি ইচ্ছা করলে তাদেরকে ডুবিয়ে দিতে পারি, তখন কেউ তাদের আর্তনাদে সাড়া দেবে না এবং তাদেরকে উদ্ধারও করা হবে না।” (সূরা ইয়াসিন ৩৬:৪২-৪৩)



(৪) মানুষ সমুদ্র পথে ব্যবসায়-বাণিজ্য করে আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ অন্বেষণ করে থাকে। হাজার হাজার টন মালামাল আমদানি ও রপ্তানি করে থাকে।



(وَتَرَي الْفُلْكَ فِيْهِ مَوَاخِرَ لِتَبْتَغُوْا مِنْ فَضْلِه۪ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُوْنَ )



“তুমি দেখতে পাও ঢেউয়ের বুক চিরে জাহাজ চলাচল করে যাতে তোমরা তার অনুগ্রহ তালাশ করতে পার এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।” (সূরা ফাতির ৩৫:১২)



তারপর আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীতে পাহাড় সৃষ্টির হিকমত ও উপকারিতা বর্ণনা করছেন। ভূ-তত্ত্ব বিজ্ঞানে “ভাঁজ করার” বিষয়টি একটি সাম্প্রতিক আবিষ্কৃত সত্য। ভাঁজ করা বিষয়টি পাহাড়-পর্বতের বিন্যাসের জন্য দায়ী। পৃথিবীর যে কঠিন পৃষ্ঠের ওপর আমরা বসবাস করি তা শক্ত খোসার ন্যায়, অথচ এর গভীরের স্তরগুলো উত্তপ্ত ও তরল। ফলে যে কোন প্রাণীর জন্য তা বসবাসের অনুপযোগী। এটাও জানা যায় যে, পাহাড়-পর্বতের স্থায়িত্ব ভাঁজ করার মত বিস্ময়কর ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত। কারণ অস্থিতিশীল অবস্থা থেকে পরিত্রাণের মাধ্যমে পাহাড়-পর্বতের ভিত্তি স্থাপন করাই ছিল এ ভাঁজগুলোর উদ্দেশ্য। সুতরাং পাহাড়গুলো স্থাপন করেছেন কীলক (পেরেক) স্বরূপ যাতে করে পৃথিবী নড়াচাড়া করতে না পারে। ক্ষণিকের ভূমিকম্প থেকে এর অনুভব করা যেতে পারে। ভূমিকম্প মুহূর্তের মধ্যে বিশাল বিশাল ঘরবাড়ি মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় এবং শহর ও গ্রামকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



أَلَمْ نَجْعَلِ الْأَرْضَ مِهَادًا) - (وَّالْـجِبَالَ أَوْتَادًا



“আমি কি জমিনকে বিছানাস্বরূপ করিনি? এবং পাহাড়সমূহকে পেরেকস্বরূপ?” (সূরা নাবা ৭৮:৬-৭)



আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:



(خَلَقَ السَّمٰوٰتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا وَأَلْقٰي فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَنْ تَمِيْدَ بِكُمْ)



“তিনি আসমান সৃষ্টি করেছেন স্তম্ভ ব্যতিরেকে, তোমরা তা দেখছ। তিনি পৃথিবীতে সুউচ্চ পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, যাতে পৃথিবী তোমাদেরকে নিয়ে ঢলে না পড়ে।” (সূরা লুকমান ৩১:১০)



আর আল্লাহ তা‘আলা এতে নদী ও চলার পথ তৈরী করে দিয়েছেন যাতে করে মানুষেরা সহজেই গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারে।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَجَعَلْنَا فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَنْ تَمِيْدَبِهِمْ وَجَعَلْنَا فِيْهَا فِجَاجًا سُبُلًا لَّعَلَّهُمْ يَهْتَدُوْنَ)



“এবং আমি পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছি সুদৃঢ় পর্বত, যাতে পৃথিবী তাদেরকে নিয়ে এদিক-ওদিক ঢলে না যায় এবং আমি তাতে করে দিয়েছি প্রশস্ত পথ, যাতে তারা গন্ত‎ব্যস্থলে পৌঁছতে পারে” (সূরা আম্বিয়া ২১:৩১)



আর রাস্তা খুঁজে বের করার নিদর্শন স্বরূপ তিনি আকাশে সৃষ্টি করেছেন নক্ষত্ররাজী।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَهُوَ الَّذِيْ جَعَلَ لَكُمُ النُّجُوْمَ لِتَهْتَدُوْا بِهَا فِيْ ظُلُمٰتِ الْبَرِّ وَالْبَحْرِ)



“তিনিই তোমাদের জন্য নক্ষত্র সৃষ্টি করেছেন যেন তার দ্বারা স্থলের ও সমুদ্রের অন্ধকারে তোমরা পথ পাও।” (সূরা আনয়াম ৬:৯৭)



এই সব মানুষের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ। এখানে এ সমস্ত অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে তাওহীদের গুরুত্ব বুঝানো হচ্ছে যে, আল্লাহ তা‘আলাই সকল কিছুর স্রষ্টা। আর তোমরা আল্লাহ তা‘আলাকে ছেড়ে যাদের ইবাদত করছ তারা কিছুই সৃষ্টি করেনি; বরং তারাও আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্ট। অতএব স্রষ্টা ও সৃষ্ট বস্তু কখনো এক হতে পারে না। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলাকে বাদ দিয়ে যাদেরকে মা‘বূদ হিসেবে আহ্বান করা হয় তারা কোন কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না, বরং তারা আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টি।



এই সমস্ত নেয়ামত ছাড়া আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে আরো অসংখ্য নেয়ামত দান করেছেন। যা মানুষ গণনা করে শেষ করতে পারবে না। তবুও তারা ঈমান আনে না। বস্তুত তারাই মূর্খ বা নির্বোধ।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَإِنْ تَعُدُّوْا نِعْمَتَ اللّٰهِ لَا تُحْصُوْهَا ط إِنَّ الْإِنْسَانَ لَظَلُوْمٌ كَفَّارٌ )‏



“তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা করলে তার সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না। মানুষ অবশ্যই অতি মাত্রায় জালিম, অকৃতজ্ঞ।” (সূরা ইবরাহীম ১৪:৩৪)



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. চন্দ্র-সূর্য, দিবা-রাত্রি সকল কিছুকে আল্লাহ তা‘আলা মানুষের অনুগত করে দিয়েছেন।

২. পর্বত পৃথিবীতে স্থাপন করা হয়েছে যাতে করে পৃথিবী নড়াচড়া না করে।

৩. নক্ষত্র সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষকে পথ দেখানোর জন্য।

৪. সমুদ্রে মণি-মুক্তা রয়েছে।

৫. আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামত গণনা করে শেষ করা যাবে না।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ১৪-১৮ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তাআলা নিজের অরো অনুগ্রহ ও মেহেরবাণীর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছেনঃ “হে মানবমণ্ডলী! সমুদ্রের উপরেও তিনি তোমাদেরকে আধিপত্য দান করেছেন। নিজের গভীরতা ও তরঙ্গমালা সত্ত্বেও ওটা তোমাদের অনুগত। তোমাদের নৌকাগুলি তাতে চলাচল করে। অনুরূপভাবে তোমরা ওর মধ্য হতে মৎস্য বের করে ওর তাজা গোশত ভক্ষণ করে থাকো। মাছ (হজ্জের ইহরামহীন অবস্থায় এবং ইহরামের অবস্থায় জীবিত হোক বা মৃত। হোক সব সময় হালাল। মহান আল্লাহ এই সমুদ্রের মধ্যে তোমাদের জন্যে জওহর ও মনিমুক্তা সৃষ্টি করেছেন, যেগুলি তোমরা অতি সহজে বের করতঃ অলংকারের কাজে ব্যবহার করে থাকে। এই সমুদ্রে নৌকাগুলি বাতাস সরিয়ে এবং পানি ফেড়ে বুকের ভরে চলে থাকে।

সর্বপ্রথম হযরত নুহ (আঃ) নৌকায় আরোহণ করেন। তাকেই আল্লাহ তাআ’লী নৌকা তৈরীর কাজ শিখিয়ে দিয়েছিলেন। তখন থেকেই মানুষ নৌকা তৈরী করে আসছে এবং আরোহণ করে তারা বড় বড় সফর করতে রয়েছে। এপারের জিনিস ওপারে এবং ওপারের জিনিস এপারে নিয়ে যাওয়া-আসা করছে। ঐ কথাই এখানে বলা হচ্ছেঃ ‘তা এই জন্যে যে, যেন তোমরা তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার এবং তোমরা যেন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।”

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আল্লাহ তাআলা পশ্চিমা সমুদ্রকে বলেনঃ “আমার বান্দাদেরকে আমি তোমার মধ্যে আরোহণ করাতে চাই। সুতরাং তুমি তাদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করবে?” উত্তরে সে বলেঃ “আমি তাদেরকে ডুবিয়ে দেবো।” তখন আল্লাহ তাআলা তাকে বলেনঃ “তোমার তীব্রতা তোমার কিনারা বা ধারের উপরই থাক। আমি তাদেরকে আমার হাতে নিয়ে চলবো। তোমাকে আমি প্রলংকার ও শিকার হতে বঞ্চিত করে দিলাম। অতঃপর তিনি পূর্বা সমুদ্রকে অনুরূপ কথাই বললেন। সে বললোঃ “আমি তাদেরকে স্বীয় হাতে উঠিয়ে নিবো এবং মা যে ভাবে নিজের সন্তানের খোঁজ খবর নিয়ে থাকে সেই ভাবে আমিও তাদের খোঁজ খবর নিতে থাকবে।” তার এ কথা শুনে মহান আল্লাহ তাদের অলংকারও দিলেন এবং শিকারও দিলেন। (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন। এর রিওয়াইয়াতকারী শুধু আবদুর রহমান ইবনু আবদিল্লাহ। তবে হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতেও এ হাদীসটি মারূফ রূপে বর্ণিত হয়েছে)

এরপর যমীনের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এটাকে থামিয়ে রাখা এবং হেলাদোলা হতে রক্ষা করার জন্যে এর উপর মযবুত ও ওজনসই পাহাড় স্থাপন করা হয়েছে। যাতে এর নড়াচড়া করার কারণে এর উপর অবস্থানকারীদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে না পড়ে। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তিনি পর্বতসমূহকে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করেছেন।”

হযরত হাসান (রঃ) বলেন, আল্লাহ তাআলা যখন যমীন সৃষ্টি করেন তখন তা হেলা-দোলা করছিল। শেষ পর্যন্ত ফেরেশতারা বলতে শুরু করেন, এর উপর তো কেউ অবস্থান করতে পারবে না। সকালেই তাঁরা দেখতে পান যে, এতে পাহাড়কে গেড়ে দেয়া হয়েছে এবং ওর হেলা-দোলাও বন্ধ হয়ে গেছে। সুতরাং পাহাড়কে কোন জিনিস দ্বারা বানানো হয়েছে সেটাও ফেরেস্তাগণ অবগত হন। কায়েস ইবনু উবাদাহ (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। হযরত আলী (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। হযরত আলী (রাঃ) বলেন যে, যমীন বলেঃ “হে আল্লাহ! আপনি আমার উপর বণী আদমকে বসবাস করার অধিকার। দিচ্ছেনঃ যারা আমার পিঠের উপর গুনাহ করবে এবং অশ্লীলতা ছড়াবে।” একথা বলে সে কাঁপতে শুরু করে। তখন আল্লাহ পাক ওর উপর পর্বতসমূহ মযবুত ভাবে প্রোথিত করেন যেগুলি তোমরা দেখতে পাচ্ছ এবং কতকগুলিকে দেখতেও পাচ্ছ না।”

এটাও আল্লাহ তাআলার দয়া ও মেহেরবাণী যে, তিনি চতুর্দিকে নদ-নদী ও প্রস্রবণ প্রবাহিত রেখেছেন। কোনটি তেজ, কোনটি মন্দা, কোনটি দীর্ঘ এবং কোনটি খাটো। কখনো পানি কমে যায় এবং কখনো বেশী হয় এবং কখনো সম্পূর্ণরূপে শুকিয়ে যায়। পাহাড়-পর্বতে, বনে-জঙ্গলে, মরূ প্রান্তরে এবং পাথরে বরাবরই এই প্রস্রবণগুলি প্রবাহিত রয়েছে এবং এক স্থান হতে অন্যস্থানে চলে যাচ্ছে। এ সবই হচ্ছে মহান আল্লাহর ফযল ও করম, করুণা ও দয়া। না আছে তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ এবং না আছে কোন প্রতিপালক। তিনি ছাড়া অন্য কেউই ইবাদতের যোগ্য নয়। তিনিই প্রতিপালক এবং তিনিই মাবুদ। তিনিই রাস্তা বানিয়ে দিয়েছেন স্থলে ও জলে, পাহাড়ে ও জঙ্গলে, লোকালয়ে এবং বিজনে। তাঁর দয়া ও অনুগ্রহে সর্বত্রই রাস্তা বিদ্যমান রয়েছে, যাতে এদিক থেকে ওদিকে লোক যাতায়াত করতে পারে। কোন পথ প্রশস্ত, কোনটা সংকীর্ণ এবং কোনটা সহজ, কোনটা কঠিন। তিনি আরো নিদর্শন রেখেছেন। যেমন পাহাড়, টিলা ইত্যাদি, যেগুলির মাধ্যমে পথচারী মসাফির পথ জানতে বা-চিনতে পারে। তারা পথ ভুলে যাওয়ার পর সোজা সঠিক পথ পেয়ে যায়। নক্ষত্ররাজি পথ প্রদর্শকরূপে রয়েছে। রাত্রির অন্ধকারে ওগুলির মাধ্যমেই রাস্তা ও দিক নির্ণয় করা যায়।

ইমাম মালিক (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (আরবি) দ্বারা পাহাড়কে বুঝানো হয়েছে।

এরপর মহান আল্লাহ নিজের বড়ত্বের শ্রেষ্ঠত্বের, বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেনঃ “ইবাদতের যোগ্য তিনি ছাড়া আর কেউই নেই। আল্লাহ ছাড়া লোকেরা যাদের ইবাদত করছে তারা একেবারে শক্তিহীন। কোন কিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতা তাদের নেই। পক্ষান্তরে সব কিছুরই সৃষ্টিকর্তা হচ্ছেন আল্লাহ।”

এটা স্পষ্ট কথা যে, সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টি করতে অক্ষম কখনো সমান হতে পারে না। সুতরাং উভয়ের ইবাদত করা বড়ই যুলুমের কাজ। এতোটা বেহুশ হওয়া মানুষের জন্যে মোটেই শোভনীয় নয়।

অতপরঃ আল্লাহ তাআলা স্বীয় নিয়ামতের প্রাচুর্য ও আধিক্যের বর্ণনা দিচ্ছেন। তিনি বলেনঃ “আমি তোমাদেরকে এতো বেশী নিয়ামত দান করেছি। যে, তোমরা সেগুলি গণে শেষ করতে পার না। আমি তোমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করে থাকি। যদি আমি আমার সমস্ত নিয়ামতের পুরোপুরি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দাবী করতাম তবে তোমাদের দ্বারা তা পূরণ করা মোটেই সম্ভব ছিল না যদি আমি এই নিয়ামতরাশির বিনিময়ে তোমাদের সকলকে শাস্তি প্রদান করি তবুও তা আমার পক্ষে যুলুম হবে না। কিন্তু তোমাদের অপরাধ ও পাপসমূহ ক্ষমা করে থাকি। তোমাদের দোষ-ত্রুটি আমি দেখেও দেখি না। পাপ হতে তাওবা, আনুগত্যের দিকে প্রত্যাবর্তন এবং আমার সন্তুষ্টির কামনার পর কোন গুনাহ হয়ে গেলে আমি তা ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখে থাকি। আমি অত্যন্ত দয়ালু। তাওবার পর আমি শাস্তি প্রদান করি না।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।