আল কুরআন


সূরা আল-হিজর (আয়াত: 87)

সূরা আল-হিজর (আয়াত: 87)



হরকত ছাড়া:

ولقد آتيناك سبعا من المثاني والقرآن العظيم ﴿٨٧﴾




হরকত সহ:

وَ لَقَدْ اٰتَیْنٰکَ سَبْعًا مِّنَ الْمَثَانِیْ وَ الْقُرْاٰنَ الْعَظِیْمَ ﴿۸۷﴾




উচ্চারণ: ওয়ালাকাদ আ-তাইনা-কা ছাব‘আম মিনাল মাছা-নী ওয়াল কুরআ-নাল ‘আজীম।




আল বায়ান: আর আমি তো তোমাকে দিয়েছি পুনঃপুনঃ পঠিত সাতটি আয়াত ও মহান কুরআন।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮৭. আর আমরা তো আপনাকে দিয়েছি পুনঃ পুনঃ পঠিত সাতটি আয়াত ও মহান কুরআন।(১)




তাইসীরুল ক্বুরআন: আমি তোমাকে দিয়েছি পুনঃ পুনঃ আবৃত্ত সপ্ত আয়াত আর মহা কুরআন।




আহসানুল বায়ান: (৮৭) অবশ্যই আমি তোমাকে দিয়েছি পুনঃ পুনঃ পঠিতব্য সাতটি আয়াত[1] এবং মহা কুরআন।



মুজিবুর রহমান: আমিতো তোমাকে দিয়েছি সাত আয়াত যা পুনঃ পুনঃ আবৃত্তি করা হয় এবং দিয়েছি মহান কুরআন।



ফযলুর রহমান: আমি তো তোমাকে বারবার পাঠ করার সাতটি আয়াত (সূরা ফাতিহা) ও মহান কোরআন দান করেছি।



মুহিউদ্দিন খান: আমি আপনাকে সাতটি বার বার পঠিতব্য আয়াত এবং মহান কোরআন দিয়েছি।



জহুরুল হক: আর নিশ্চয়ই তোমাকে আমরা দিয়েছি বারবার-পঠিত সাতটি, আর এক সুমহান কুরআন।



Sahih International: And We have certainly given you, [O Muhammad], seven of the often repeated [verses] and the great Qur'an.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৮৭. আর আমরা তো আপনাকে দিয়েছি পুনঃ পুনঃ পঠিত সাতটি আয়াত ও মহান কুরআন।(১)


তাফসীর:

(১) অর্থাৎ সূরা ফাতিহার সাতটি আয়াত। এর প্রমাণ হলো আবু সাঈদ আল-মু'আল্লা বর্ণিত হাদীস। তিনি বলেনঃ আমি সালাত আদায় করছিলাম এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছ দিয়ে গমন করার সময় আমাকে ডাকলেন। আমি আসলাম না। সালাত শেষ করে তার কাছে আসলে তিনি বললেনঃ আমার ডাকে সাড়া দিতে তোমাকে কে নিষেধ করল? আমি বললামঃ আমি সালাত আদায় করছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ কি বলেননিঃ হে ঈমানদারগণ তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ডাকে সাড়া দিও? তারপর তিনি বললেনঃ আমি কি তোমাকে মাসজিদ থেকে বের হওয়ার আগে কুরআনের সবচেয়ে বড় সূরা কি তা জানিয়ে দেব না?

তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাসজিদ থেকে বের হতে যাচ্ছিলেন তখন আমি তাকে স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি বললেনঃ “আলহামদু লিল্লাহ রাব্বিবল আলামীন” এটাই “সাবউল মাসানী” বা সাতটি আয়াত যা বার বার পড়া হয়, এবং কুরআনে কারীম যা আমাকে দেয়া হয়েছে।” [বুখারীঃ ৪৭০৩] অন্য বর্ণনায় আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “উম্মুল কুরআন” বা সূরা আল-ফাতিহা হলো “সাবউল মাসানী” এবং মহান কুরআন। [বুখারীঃ ৪৭০৪]

তবে কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন দু’শ আয়াত বিশিষ্ট সাতটি বড় বড় সূরা। অর্থাৎ আল-বাকারাহ, আলে ইমরান, আন-নিসা, আল-মায়েদাহ, আল-আনআম, আল-আরাফ ও ইউনুস অথবা আল-আনফাল ও আততাওবাহ। [বাগভী; ইবন কাসীর] কিন্তু পূর্ববতী আলেমগণের অধিকাংশই এ ব্যাপারে একমত যে, এখানে সূরা ফাতিহার কথাই বলা হয়েছে। যা সরাসরি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্বোক্ত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। হাদীসের ভাষ্যসমূহ থেকে এটাও প্রমাণিত হয় যে, এখানে মহান কুরআন বলেও সূরা আল-ফাতিহাকেই উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। সে হিসেবে সূরা ফাতেহাকে মহান কুরআন বলার মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, সূরা ফাতিহা এক দিক দিয়ে সমগ্র কুরআন। কেননা ইসলামের সব মূলনীতি এতে ব্যক্ত হয়েছে। [কুরতুবী] যদিও কোন কোন মুফাসসিরের মতে, কুরআনকে ভিন্নভাবে উল্লেখ করার অর্থ হলো, “আমরা আপনাকে সাবাউল মাসানী সূরা ফাতেহা এবং পূর্ণ কুরআন দান করেছি। তখন দুটির অর্থ ভিন্ন ভিন্ন হবে।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৮৭) অবশ্যই আমি তোমাকে দিয়েছি পুনঃ পুনঃ পঠিতব্য সাতটি আয়াত[1] এবং মহা কুরআন।


তাফসীর:

[1] سبع مثاني (পুনঃপুনঃ পঠিতব্য সাতটি আয়াত) থেকে উদ্দেশ্য কি? এ সর্ম্পকে মুফাসসিরীনদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। এর উদ্দেশ্য সূরা ফাতেহা এটাই সঠিক। যেহেতু এটি সাত আয়াতবিশিষ্ট এবং তা প্রত্যেক নামাযে বার বার পাঠ করা হয়। (মাসানীর অর্থ একাধিকবার পড়া।) হাদীসেও এর সমর্থন পাওয়া যায়। সুতরাং একটি হাদীসে নবী (সাঃ) বলেন, ‘‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ-লামীন। এটি সাবএ মাসানী ও কুরআন আযীম, যা আমাকে দেওয়া হয়েছে।’’ (বুখারীঃ তাফসীর সূরা হিজ্র) অন্য এক হাদীসে নবী (সাঃ) বলেছেন, ‘‘উম্মুল কুরআনই হল সাবএ মাসানী ও কুরআনে আযীম।’’ (ঐ)  সূরা ফাতেহা কুরআনের একটি অংশ, সেই জন্য সাথে সাথে কুরআন আযীমের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৮৭-৯৩ নং আয়াতের তাফসীর:



(وَلَقَدْ آتَيْنَاكَ سَبْعًا)



এখানে স্বাব-এ মাছানী দ্বারা কী উদ্দেশ্য এ বিষয়ে আলেমদের মতামত পাওয়া গেলেও সঠিক কথা হল এই যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য সূরা ফাতিহা। কারণ এতে সাতটি আয়াত রয়েছে আর এটা সালাতে প্রত্যেক রাকাআতে পাঠ করা হয়। আর এটিই সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।



“আবূ সাঈদ বিন মুয়াল্লা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন এমতাবস্থায় আমি সালাতরত ছিলাম, সে সময় তিনি আমাকে আহ্বান করলেন কিন্তু আমি তাঁর ডাকে সাড়া দেইনি। অতঃপর আমি সালাত শেষ করে তাঁর নিকট আসলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন: আমার নিকট আসতে কিসে তোমাকে বারণ করল? আমি উত্তরে বললাম যে, আমি সালাতরত অবস্থায় ছিলাম, তখন তিনি বলেন, আল্লাহ তা‘আলা কি বলেননি?



(يٰٓأَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوا اسْتَجِيْبُوْا لِلّٰهِ وَلِلرَّسُوْلِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيْكُمْ)



“হে মু’মিনগণ! রাসূল যখন তোমাদেরকে এমন কিছুর দিকে আহ্বান করে যা তোমাদেরকে প্রাণবন্ত করে, তখন আল্লাহ ও রাসূলের আহ্বানে সাড়া দাও।” (সূরা আনফাল ৮:২৪)



অতঃপর তিনি বললেন: আমি কি মাসজিদ থেকে বের হবার পূর্বে কুরআনে মর্যাদার দিক দিয়ে কোন্ সূরাটি সবচেয়ে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন সে সম্পর্কে তোমাকে অবগত করব না? অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বের হবার সময় আমি তাকে এ কথা স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি বলেন, এটা হল



(اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِيْنَ)‏



“সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক।”



সূরা ফাতিহা হল বার বার পঠিত সাতটি আয়াত ও কুরআনুল আযীম যা আমাকে দেয়া হয়েছে। (সহীহ বুখারী: ৪৭০৩)



পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন যে, যেহেতু তিনি নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তাঁর নিকট হতে সবচেয়ে বড় ও মহান একটি জিনিস দিয়েছেন তাই তাঁকে নিষেধ করছেন তিনি কাফির-মুশরিকদের এই তুচ্ছ অংশ দেখে আকৃষ্ট না হওয়ার জন্য।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “তুমি তোমার চক্ষুদ্বয় কখনও প্রসারিত কর‎ না তার প্রতি, যা আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যস্বরূপ উপভোগের উপকরণ হিসেবে দিয়েছি, তার দ্বারা তাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য। তোমার প্রতিপালক প্রদত্ত জীবনোপকরণ উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী। এবং তোমার পরিবারবর্গকে সালাতের আদেশ দাও ও তাতে অবিচল থাক, আমি তোমার নিকট কোন জীবনোপকরণ চাই না; আমিই তোমাকে জীবনোপকরণ দেই এবং শুভ পরিণাম তো মুত্তাকীদের জন্য।” (সূরা ত্বহা ২০:১৩১-১৩২) এবং তিনি তাঁর নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নিষেধ করলেন তিনি যেন তাদের ব্যাপারে দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত না হন।



আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:



(وَاصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ إِلَّا بِاللّٰهِ وَلَا تَحْزَنْ عَلَيْهِمْ وَلَا تَكُ فِيْ ضَيْقٍ مِّمَّا يَمْكُرُوْنَ)‏



“তুমি ধৈর্য ধারণ কর‎, তোমার ধৈর্য তো আল্লাহরই সাহায্যে। তাদের দরুন দুঃখ কর না এবং তাদের ষড়যন্ত্রে তুমি মনঃক্ষুণত্ন হয়ো না।” (সূরা নাহল ১৬:১২৭)



আর তিনি তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নির্দেশ দিলেন তিনি যেন মু’মিনদের জন্য তার বিনয়ের ডানাকে অবনমিত করেন। অর্থাৎ তাদের সাথে উত্তম আচরণ করেন।



যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ)‏



“এবং যারা তোমার অনুসরণ করে সে সমস্ত‎ মু’মিনদের প্রতি বিনয়ী হও।” (সূরা শু‘আরা ২৬:২১৫)



সুতরাং মানুষের উচিত মু’মিন ব্যক্তিবর্গের সাথে বিনয়ের সাথে কথা বলা। উচ্চৈঃস্বরে হৈ-হুল্লোড় করে নয়। মানুষকে দাওয়াত দিতে গেলে তাকে নম্র ভাষায় দাওয়াত দিতে হবে, তা না হলে মানুষ তার দাওয়াতে সাড়া দেবে না।



পরবর্তীতে আল্লাহ তা‘আলা অবগত করছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সতর্ককারী রূপে প্রেরণ করেছেন। সুতরাং যারা শাস্তির কথা শোনার পরও সতর্ক হবে না, ঈমান আনবে না তাদের অবস্থা হবে ঐ সম্প্রদায়ের মত যারা আল্লাহ তা‘আলার বিধান ও রাসূলের ব্যপারে মিথ্যা শপথ করত আর তার ফলে তাদের যে করুণ পরিণতি হয়েছিল তাদেরও সেরূপই হবে।



এখানে الْمُقْتَسِمِيْنَ দ্বারা কাদেরকে বুঝানো হয়েছে তা নিয়ে মতানৈক্য বিদ্যমান থাকলেও সঠিক কথা হল, এরা হল তারা যারা কুরআনের ব্যাপারে শপথ করত, কুরআনের কিছু অংশের প্রতি ঈমান আনত আর কিছু অংশের প্রতি কুফরী করত। চাই তারা ইয়াহূদী, খ্রিস্টান বা অন্য যারাই হোক না কেন। (তাফসীর মুয়াসসার, অত্র আয়াতের তাফসীর)



তাদেরকে الْمُقْتَسِمِيْنَ বলার কারণ হল যে, তারা কথায় কথায় মিথ্যা শপথ করত এর দ্বারা মানুষদেরকে আল্লাহর পথ থেকে বাধা প্রদান করার জন্য। যার ফলে তাদের الْمُقْتَسِمِيْنَ বলা হত।



অতএব তারা যদি সতর্ক না হয় তাহলে অবশ্যই তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. সূরা ফাতিহা অন্যতম একটি মর্যাদাসম্পন্ন সূরা।

২. পার্থিব কোন জিনিসের প্রতি লোভ করা যাবে না।

৩. মানুষকে নম্র ভাষায় ঈমানের দিকে ডাকতে হবে।

৪. মিথ্যা শপথ করা যাবে না।

৫. মানুষকে মৃত্যুর পর তার কার্য-কলাপ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৮৭-৮৮ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীকে (সঃ) বলছেনঃ “হে নবী (সঃ)! আমি যখন তোমাকে কুরআন কারীমের ন্যায় অবিনশ্বর ও চিরস্থায়ী সম্পদ দান করেছি। তখন তোমার জন্যে মোটেই শোভনীয় নয় যে, তুমি কাফিরদের পার্থিব ধনসম্পদের প্রতি লোভনীয় দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে। এ সব কিছু তো ক্ষণস্থায়ী মাত্র। শুধু পরীক্ষা স্বরূপ কয়েকদিনের জন্যে মাত্র তাদেরকে এগুলি দেয়া হয়েছে। সাথে সাথে তোমার পক্ষে এটাও সমীচীন নয় যে, তুমি তাদের ঈমান না আনার কারণে দুঃখিত, হবে। হ্যা, তবে তোমার উচিত যে, তুমি মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত নম্র ও কোমল হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ বলেনঃ “হে লোক সকল! তোমাদের কাছে তোমাদেরই মধ্য হতে একজন রাসূল আগমন করেছে, যার কাছে তোমাদের কষ্ট প্রদান কঠিন ঠেকে, যে তোমাদের শুভাকাংখী এবং যে মুমিনদের উপর অত্যন্ত দয়ালু।”

(আরবি) সম্পর্কে একটি উক্তি তো এই যে, এর দ্বারা কুরআন কারীমের প্রথম দিকের দীর্ঘ ৭(সাত)টি সূরাকে বুঝানো হয়েছে। সূরা গুলিহচ্ছেঃ বাকারা, আল-ইমরান, নিসা, মায়েদাহ, আনআম, ‘আরাফ এবং ইউসুফ। কেননা, এই সূরাগুলিতে ফারায়িয, হুদূদ, ঘটনাবলী এবং নির্দেশনাবলী বিশেষ পন্থায় বর্ণনা রয়েছে। অনুরূপভাবে দৃষ্টান্তসমূহ, খবরসমূহ এবং উপদেশাবলীও বহুল পরিমাণে রয়েছে। কেউ কেউ সূরায়ে ‘আরাফ পর্যন্ত ছ’টি সূরা গণনা করে সূরায়ে আনফাল ও তাওবা’কে সপ্তম সূরা বলেছেন। তাঁদের মতে এই দু'টি সূরা মিলিতভাবে একটি সূরাই বটে।

হযরত ইবনু আব্বাসের (রাঃ) উক্তি এই যে, একমাত্র হযরত মূসা (আঃ) এগুলির মধ্যে দু'টি সূরা লাভ করেছিলেন। আর আমাদের নবী (সঃ) ছাড়া বাকী অন্যান্য নবীদের কেউই এগুলি প্রাপ্ত হন নাই। একটা উক্তি রয়েছে যে, প্রথমতঃ হযরত মূসা (আঃ) ছ'টি লাভ করেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি তার প্রতি অবতারিত লিখিত ফলকগুলি ছুঁড়ে ফেলেছিলেন তখন দুটি উঠে। গিয়েছিল এবং চারটি রয়েছিল। একটি উক্তি এই আছে যে, “কুরআন আযীম দ্বারাও এটাই উদ্দেশ্য।

যিয়াদ (রঃ) বলেনঃ “এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ আমি তোমাকে সাতটি অংশ দিয়েছি।” সেগুলি হচ্ছেঃ “আদেশ, নিষেধ, শুভসংবাদ, ভয়, দৃষ্টান্ত, নিয়ামত রাশির হিসাব এবং কুরআনিক খবরসমূহ”।

(আরবি) দ্বিতীয় উক্তি এই যে, দ্বারা সূরায়ে ফাতেহা’কে বুঝানো হয়েছে, যার সাতটি আয়াত রয়েছে। বিসমিল্লাহসহ এই সাতটি আয়াত। সুতরাং ভাবার্থ হচ্ছেঃ “এগুলি দ্বারা আল্লাহ তাআলা তোমাকে বিশিষ্ট করেছেন। এটা দ্বারা কিতাবকে শুরু করা হয়েছে এবং প্রত্যেক রাকআতে এটা পঠিত হয়, তা ফরয, নফল ইত্যাদি যেই নামাযই হোক না কেন।” ইমাম ইবনু জারীর (রাঃ) এই উক্তিটিই পছন্দ করেছেন এবং এই ব্যাপারে যে হাদীসগুলি বর্ণিত হয়েছে সেগুলিকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আমরা ঐ সমূদয় হাদীস সূরায়ে ফাতেহার ফযীলতের বর্ণনায় এই তাফসীরের শুরুতে লিখে দিয়েছি। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্যেই।

এই জায়গায় ইমাম বুখারী (রাঃ) দুটি হাদীস এনেছেন। একটি হাদীসে হযরত আবু সাঈদ মুআল্লা (রাঃ) বলেনঃ “একদা আমি নামায পড়ছিলাম। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) এসে আমাকে ডাক দেন। কিন্তু আমি (নামাযে ছিলাম বলে) তাঁর কাছে গেলাম না। নামায শেষে যখন আমি তাঁর কাছে হাজির হই তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “ঐ সময়েই তুমি আমার কাছে আস নাই কেন?” আমি উত্তরে বললামঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি নামাযে ছিলাম।” তিনি বললেনঃ “আল্লাহ তাআলা কি (আরবি) (হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) যখন তোমাদেরকে ডাক দেন তখন তোমরা তাদের তাকে সাড়া দাও) (৮:২৪) এ কথা বলেন নাই? জেনে রেখো যে, মসজিদ হতে বের হওয়ার পূর্বেই আমি তোমাকে কুরআন। কারীমের একটি খুব বড় সূরার কথা বলবো।” কিছুক্ষণ পর যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদ থেকে বের হতে উদ্যত হলেন, তখন আমি তাঁকে ঐ ওয়াদাটি স্মরণ করিয়ে দিলাম। তিনি তখন বললেনঃ “ওটা হচ্ছে (আরবি) এই সূরাটি। এটাই হচ্ছে (আরবি) এবং এটাই বড় কুরআন যা আমাকে প্রদান করা হয়েছে।”

অন্য হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “উম্মুল কুরআন অর্থাৎ সূরায়ে ফাতেহাই হলো (আরবি) এবং এটাই কুরআনে আযীম। সুতরাং এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হলো যে, (আরবি) এবং (আরবি) দ্বারা সূরায়ে ফাতেহাকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু এটাও মনে রাখা উচিত যে, এটা ছাড়া অন্যটাও উদ্দেশ্য হতে পারে এবং এহাদীসগুলি ওর বিপরীত নয়, যখন অন্যগুলোতেও এই মূল তত্ত্ব পাওয়া যাবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন উত্তম বাণী সম্বলিত কিতাব যা সুসামঞ্জস্য এবং যা পুনঃপুনঃ আবৃত্তি করা হয়।” (৩৯:২৩) সুতরাং এই আয়াতে সম্পূর্ণ কুরআনকে বলা হয়েছে এবং ও বলা হয়েছে। কাজেই এটা এক দিক দিয়ে এবং অন্য দিক দিয়ে হলো। আর কুরআন আযীমও এটাই। যেমন নিম্নের রিওয়াইয়াত দ্বারা এটা প্রমাণিত হয়ঃ রাসূলুল্লাহকে (সঃ) জিজ্ঞেস করা হয়ঃ “যে মসজিদের ভিত্তি তাকওয়ার উপর স্থাপিত ওটা কোন্ মসজিদ?” উত্তরে তিনি নিজের মসজিদের (মসজিদে নববী) দিকে ইশারা করেন। অথচ এটাও প্রমাণিত বিষয় যে, ঐ আয়াতটি কুবার মসজিদ সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়। সুতরাং নিয়ম এই যে, কোন জিনিসের উল্লেখ অন্য জিনিসকে অস্বীকার করে না, যদি ওর মধ্যেও ঐরূপ গুণ থাকে। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।

সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঐ ব্যক্তি আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে কুরআন পেয়ে নিজেকে অন্য কিছু থেকে অমুখাপেক্ষী মনে করে না।” এই হাদীসের তাফসীরে বলা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি কুরআন পেলো অথচ এটা ছাড়া অন্য কিছু থেকে বেপরোয়া হলো না সে মুসলমান নয়। এই তাফসীর সম্পূর্ণরূপে সঠিক বটে, কিন্তু এই হাদীসের দ্বারা উদ্দেশ্য এটা নয়। এ হাদীসের সঠিক ভাব ও উদ্দেশ্য আমরা আমাদের এই তাফসীরের শুরুতে বর্ণনা করেছি।

হযরত আবু রাফে’ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহর (সঃ) বাড়ীতে এক মেহমান আগমন করে। ঐ দিন তার বাড়ীতে কিছুই ছিল না। তিনি রজব মাসে পরিশোধের অঙ্গীকারে একজন ইয়াহূদীর কাছে কিছু আটা ধার চাইতে পাঠান। কিন্তু ইয়াহূদী বলেঃ “আমার কাছে কোন জিনিস বন্ধক রাখা ছাড়া আমি ধার দেবো না।” ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমি আকাশবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আমানতদার এবং যমীনবাসীদের মধ্যেও। সে যদি আমাকে ধার দিতো অথবা বিক্রী করতো তবে আমি অবশ্য অবশ্যই ওটা আদায় করে দিতাম।” তখন (আরবি) এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। (এ হাদীসটি ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) তাঁকে যেন পার্থিব জগতের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তোলা হয়েছে। হযরত ইবনু আ স (রাঃ) বলেনঃ “মানুষের জন্যে এটা নিষিদ্ধ যে, সে কারো ধন-সম্পদের প্রতি লোভের দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে। আল্লাহ পাক যে বলেছেনঃ “আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি এর দ্বারা সম্পদশালী কাফিরদেরকে বুঝানো হয়েছে”।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।