সূরা আল-হিজর (আয়াত: 34)
হরকত ছাড়া:
قال فاخرج منها فإنك رجيم ﴿٣٤﴾
হরকত সহ:
قَالَ فَاخْرُجْ مِنْهَا فَاِنَّکَ رَجِیْمٌ ﴿ۙ۳۴﴾
উচ্চারণ: কা-লা ফাখরুজ মিনহা-ফাইন্নাকা রাজীম।
আল বায়ান: তিনি বললেন, ‘তাহলে তুমি এখান থেকে বেরিয়ে যাও, তুমি বিতাড়িত’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৪. তিনি বললেন, তবে তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও, কারণ নিশ্চয় তুমি বিতাড়িত;
তাইসীরুল ক্বুরআন: তিনি বললেন, ‘বেরিয়ে যাও এখান থেকে, কারণ তুমি হলে অভিশপ্ত।
আহসানুল বায়ান: (৩৪) তিনি (আল্লাহ) বললেন, ‘তাহলে তুমি এখান হতে বের হয়ে যাও। কারণ, নিশ্চয়ই তুমি অভিশপ্ত।
মুজিবুর রহমান: (আল্লাহ) বললেনঃ তাহলে তুই এখান হতে বের হয়ে যা, কারণ তুই অভিশপ্ত।
ফযলুর রহমান: আল্লাহ বললেন, “তাহলে তুমি জান্নাত থেকে বেরিয়ে যাও, কারণ তুমি বিতাড়িত (অভিশাপপ্রাপ্ত)।”
মুহিউদ্দিন খান: আল্লাহ বললেনঃ তবে তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও। তুমি বিতাড়িত।
জহুরুল হক: তিনি বললেন -- "তাহলে বেরিয়ে যাও এখান থেকে, কেননা নিঃসন্দেহ তুমি বিতাড়িত,
Sahih International: [Allah] said, "Then get out of it, for indeed, you are expelled.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩৪. তিনি বললেন, তবে তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও, কারণ নিশ্চয় তুমি বিতাড়িত;
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩৪) তিনি (আল্লাহ) বললেন, ‘তাহলে তুমি এখান হতে বের হয়ে যাও। কারণ, নিশ্চয়ই তুমি অভিশপ্ত।
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২৬-৫০ নং আয়াতের তাফসীর:
প্রথম দু’ আয়াতে মূলত মানুষ ও জিনকে কোন্ পদার্থ থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে সে কথা বলা হয়েছে। মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে শুস্ক ঠনঠনে মাটি থেকে আর জিনকে সৃষ্টি করা হয়েছে প্রখর শিখাযুক্ত অগ্নি হতে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ صَلْصَالٍ كَالْفَخَّارِ وَخَلَقَ الْجَآنَّ مِنْ مَّارِجٍ مِّنْ نَّارٍ)
“মানুষকে (আদমকে) তিনি সৃষ্টি করেছেন পোড়া মাটির মত শুকনো মাটি হতে, আর জিনকে সৃষ্টি করেছেন অগ্নি শিখা হতে।” (সূরা আর রহমান: ৫৫:১৪-১৫)
অর্থাৎ মানুষ হল মাটির তৈরি জাতি আর জিন হল আগুনের তৈরি জাতি।
صَلْصَالٍ হল এমন মাটি যা শুকিয়ে গেলে তাতে ঠনঠন শব্দ হয়।
(حَمَإٍ مَّسْنُوْنٍ)
হল এমন মাটি যা দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার ফলে তার রং ও গন্ধ পরিবর্তন হয়ে গেছে। جن অর্থ ঢাকা, জিনেরা যেহেতু মানুষের চোখের আড়ালে থাকে তাই তাদেরকে الْجَآنَّ বা জিন বলা হয়। السَّمُوْمِ বলা হয় আগুন যার কোন ধোঁয়া নেই। مِنْ قَبْلُ বলতে মানুষের পূর্বে, অর্থাৎ মানুষের পূর্বে আল্লাহ তা‘আলা প্রখর আগুন থেকে জিন জাতিকে সৃষ্টি করেছেন। হাদীসে এসেছে: ফেরেশতাদেরকে নূর হতে সৃষ্টি করা হয়েছে, জিনকে সৃষ্টি করা হয়েছে শিখাযুক্ত আগুন হতে আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে যা তোমাদের সামনে বর্ণনা করা হল। (সহীহ বুখারী হা: ২৯৯৬)
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা আদমের সৃষ্টি সমাপ্ত করার পর সকল ফেরেশতাকে নির্দেশ দিলেন তাকে সিজদা করার জন্য। সকল ফেরেশতা সিজদা করেছে শুধুমাত্র ইবলীস তাকে সিজদা করেনি। এখানে সিজদা মূলত ইবাদত করার উদ্দেশ্যে ছিল না, বরং আদমের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা বুঝানোর জন্য এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
ইবলীস সে অহংকার করল, সিজদা করতে অস্বীকার করল এবং যুক্তি পেশ করল যে, আমাকে আগুন দ্বারা তৈরি করা হয়েছে আর আদমকে মাটি দ্বারা, আগুনের কাজ ওপরে উঠা আর মাটির কাজ নিচে নামা। সুতরাং আমি তাকে সিজদা করতে পারি না।
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সম্পর্কে বলেন:
(وَاِذْ قُلْنَا لِلْمَلٰ۬ئِکَةِ اسْجُدُوْا لِاٰدَمَ فَسَجَدُوْٓا اِلَّآ اِبْلِیْسَﺚ اَبٰی وَاسْتَکْبَرَﺡ وَکَانَ مِنَ الْکٰفِرِیْنَ)
“আর (স্মরণ কর) আমি যখন ফেরেশতাগণকে বললাম, তোমরা আদমকে সিজদা কর, তখন ইবলিস ব্যতীত সকলে সিজদা করেছিল। সে অস্বীকার করল ও অহংকার করল এবং কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।” (সূরা বাক্বারাহ ২:৩৪)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(إِلَّآ إِبْلِيْسَ ط اِسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكٰفِرِيْنَ)
“কেবল ইবলীস ব্যতীত। সে অহঙ্কার করল এবং কাফিরদের দলভুক্ত হয়ে গেল।” (সূরা সোয়াদ ৩৮:৭৪)
ইবলীসের যুক্তি সম্পর্কে মহান আল্লাহর বাণী:
(قَالَ مَا مَنَعَكَ أَلَّا تَسْجُدَ إِذْ أَمَرْتُكَ ط قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ ج خَلَقْتَنِيْ مِنْ نَّارٍ وَّخَلَقْتَه۫ مِنْ طِيْنٍ)
“তিনি (আল্লাহ) বললেন: ‘আমি যখন তোমাকে আদেশ দিলাম তখন কিসে তোমাকে সিজদা দিতে বারণ করল?’ সে বলল: ‘আমি তার অপেক্ষা উত্তম; আপনি আমাকে অগ্নি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে কর্দম দ্বারা সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আ‘রাফ ৭:১২)
এরূপ সূরা সোয়াদের ৭৫-৭৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে।
আল্লাহ তা‘আলা ইবলীসকে যে জান্নাতে বসবাস করতে দিয়েছিলেন তার এই অবাধ্য হওয়ার কারণে তাকে সেই জান্নাত থেকে বের করে দিলেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قَالَ فَاهْبِطْ مِنْهَا فَمَا يَكُوْنُ لَكَ أَنْ تَتَكَبَّرَ فِيْهَا فَاخْرُجْ إِنَّكَ مِنَ الصّٰغِرِيْنَ)
“তিনি বললেন: ‘এ স্থান হতে নেমে যাও, এখানে থেকে অহঙ্কার করবে, এটা হতে পারে না। সুতরাং বের হয়ে যাও, তুমি অধমদের অন্তর্ভুক্ত।’’ (সূরা আ‘রাফ ৭:১৩) এবং আল্লাহ তা‘আলা তার ওপর অভিশম্পাত করলেন।
যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَّإِنَّ عَلَيْكَ لَعْنَتِيْٓ إِلٰي يَوْمِ الدِّيْنِ)
“এবং তোমার প্রতি আমার অভিশাপ ক্বিয়ামত দিবস পর্যন্ত।” (সূরা স্ব-দ ৩৮:৭৮)
ইবলীস অভিশপ্ত হয়ে জান্নাত থেকে যখন বহিষ্কৃত হল তখন আল্লাহ তা‘আলার কাছে সে কিয়ামত পর্যন্ত জীবন আয়ুর অবকাশ দেয়ার জন্য প্রার্থনা করল। আল্লাহ তা‘আলা তাকে الْوَقْتِ الْمَعْلُوْمِ বা কিয়ামত পর্যন্ত জীবন আয়ুর অবকাশ দিলেন। ইবলীস শপথ করে বলেছিল, ‘‘হে আমার প্রতিপালক! আপনি যে জন্য আমাকে বিপথগামী করেছেন সেজন্য আমি পৃথিবীতে মানুষের নিকট পাপকর্মকে অবশ্যই শোভন করে তুলব এবং আমি তাদের সকলকেই বিপথগামী করব।”
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قَالَ فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِيْنَ)
“সে বলল: তোমার ইযযতের শপথ! আমি তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করবই।” (সূরা স্ব-দ ৩৮:৮২)
কিভাবে পথভ্রষ্ট করবে তা অন্যত্র বলা হয়েছে, সে মানুষের কাছে পাপ কাজসমূহকে সৌন্দর্যমণ্ডিত ও চাকচিক্যময় করে তুলে ধরবে। ফলে মানুষ তাতে লিপ্ত হবে।
আল্লাহ তা‘আলা ইবলীসের কথা তুলে ধরে বলেন:
(ثُمَّ لَاٰتِيَنَّهُمْ مِّنْۭ بَيْنِ أَيْدِيْهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَنْ شَمَا۬ئِلِهِمْ ط وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شٰكِرِيْنَ)
“অতঃপর আমি তাদের নিকট আসবই তাদের সম্মুখ, পশ্চাৎ , ডান ও বাম দিক হতে এবং তুমি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবে না।’’ (সূরা আ‘রাফ ৭:১৭)
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:
(قَالَ أَرَأَيْتَكَ هٰذَا الَّذِيْ كَرَّمْتَ عَلَيَّ ز لَئِنْ أَخَّرْتَنِ إِلٰي يَوْمِ الْقِيَامَةِ لَأَحْتَنِكَنَّ ذُرِّيَّتَه۫ٓ إِلَّا قَلِيْلًا)
“সে বলেছিল: আপনি কি বিবেচনা করেছেন, আপনি আমার ওপর এ ব্যক্তিকে মর্যাদা দান করলেন, কিয়ামতের দিন পর্যন্ত যদি আমাকে অবকাশ দেন তাহলে আমি অল্প কয়েকজন ব্যতীত তার বংশধরগণকে অবশ্যই কর্তৃত্বাধীন করে ফেলব।’’ (সূরা ইসরা ১৭:৬২)
তবে যারা আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা তারা শয়তানের ধোঁকায় পড়ে পথভ্রষ্ট হবে না।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِيْنَ)
“কিন্তু তাদের মধ্যে যারা তোমার একনিষ্ঠ বান্দা, তাদের ছাড়া।” (সূরা সোয়াদ ৩৮:৮৩)
সে কেবল যারা অন্যায় কাজে লিপ্ত থাকবে তাদেরকেই পথভ্রষ্ট করবে, অন্যদেরকে নয়।
আল্লাহ তা‘আলার সৎ বান্দাদের ওপর তার কোনই কর্তৃত্ব থাকবেনা। এর অর্থ এই নয় যে, তাদের দ্বারা কোন পাপ কাজ হবে না। বরং উদ্দেশ্য হল তারা এমন কোন পাপ করবে না, যার পর তারা লজ্জিত হবে না বা তাওবা করবে না। কারণ সে পাপই মানুষের ধ্বংসের কারণ হয় যার পর মানুষ অনুতপ্ত হয় না এবং তাওবাও করে না। মানুষ পাপ করতে পারে এটাই স্বাভাবিক, তবে পাপ কাজ করার পর তাওবা করলে তাকে পাকড়াও করা হবে না। কোন ব্যক্তির ভুলবশত পাপ হয়ে যাওয়ার পর তাওবা করলে আল্লাহ তা‘আলা তার চেয়ে বেশি খুশি হন যেমন মরুভূমিতে কারো খাদ্য ও পানীয়সহ বাহন হারিয়ে যাওয়ার পর তা ফিরে পেলে খুশি হয়।
আর যারা ইবলীসের অনুসরণ করবে তারাই হবে বিভ্রান্ত। আর তারাই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
سَبْعَةُ أَبْوَابٍ
অর্থাৎ প্রত্যেক দরজা এক এক ধরনের বিশেষ লোকদের জন্য নির্দিষ্ট হবে। যেমন একটি হবে মুশকিরকদের জন্য, একটি হবে নাস্তিকদের জন্য, একটি হবে ধর্মদ্রোহীদের জন্য, একটি হবে ব্যভিচারীদের জন্য, একটি হবে সুদখোর ও চোর-ডাকাতদের জন্য, এরূপ আলাদা আলাদা হবে। অথবা সাতটি দরজা বলতে জাহান্নামের সাতটি স্তরকে বুঝানো হয়েছে। প্রথমটির নাম জাহান্নাম, তারপর লাযা, তারপর হুতামাহ, তারপর সায়ীর, তারপর সাকার, তারপর জাহীম, তারপর হাবিয়াহ। সবার উপরের স্তরটি আল্লাহ তা‘আলার একত্বে বিশ্বাসীদের জন্য হবে। তাদেরকে পাপ অনুপাতে কিছুদিন শাস্তি দিয়ে অথবা সুপারিশ করার পর বের করা হবে। দ্বিতীয়টি ইয়াহূদী, তৃতীয়টি খ্রিস্টান, চতুর্থটি সাবী, পঞ্চমটি অগ্নিপূজক, ষষ্ঠটি মুশরিকদের জন্য এবং সর্বনিম্ন স্তর সপ্তমটি মুনাফিকদের জন্য। (ফাতহুল কাদীর, অত্র আয়াতের তাফসীর)
পক্ষান্তরে আল্লাহ তা‘আলার সৎ বান্দাগণ নেয়ামতপূর্ণ জান্নাতে থাকবে, সকল বিপদাপদ থেকে শান্তি এবং সকল প্রকার ভয় হতে নিরাপত্তায় থাকবে।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
“যা তাদের প্রতিপালক তাদেরকে প্রদান করবেন; তা তারা গ্রহণ করবে। নিশ্চয়ই তারা ইতোপূর্বে সৎকর্মপরায়ণ ছিল। তারা রাতের সামান্য অংশই নিদ্রাবস্থায় অতিবাহিত করত। রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত। এবং তাদের ধন-সম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতের হক্ব।” (সূরা যারিআত ৫১:১৫-১৯)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
“মুত্তাকীরা থাকবে নিরাপদ স্থানে উদ্যান ও ঝর্ণার মাঝে, তারা পরিধান করবে মিহি ও পুরু রেশমী বস্ত্র এবং তারা মুখোমুখী হয়ে বসবে, এরূপই ঘটবে; তাদেরকে বিবাহ দিয়ে দেব বড় বড় চক্ষুবিশিষ্ট পরমা সুন্দরীদের সাথে। সেখানে তারা প্রশান্ত চিত্তে বিবিধ ফল-মূল আনতে বলবে। প্রথম মৃত্যুর পর তারা সেখানে আর মৃত্যু আস্বাদন করবে না। তিনি তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা করবেন তোমার প্রতিপালকের নিজ অনুগ্রহে। এটাই তো মহা সাফল্য।” (সূরা দুখান ৪৪:৫১-৫৭)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
“নিশ্চয়ই মুত্তাকীরা থাকবে জান্নাতে ও ভোগ-বিলাসে, তাদের প্রতিপালক তাদেরকে যা দিবেন তারা তা উপভোগ করবে এবং তিনি তাদেরকে রক্ষা করবেন জাহান্নামের আযাব হতে তোমরা তৃপ্তির সাথে পানাহার কর, তোমরা যা করতে তার প্রতিদানস্বরূপ। তারা শ্রেণীবদ্ধভাবে সজ্জিত আসনে হেলান দিয়ে বসবে; আমি তাদের বিয়ে দেব সুনয়না (বড় বড় চক্ষুবিশিষ্ট) হূরের সঙ্গে।” (সূরা তুর ৫২:১৭-২০) এছাড়া অসংখ্য আয়াত রয়েছে।
(وَنَزَعْنَا مَا فِيْ صُدُوْرِهِمْ مِّنْ غِلٍّ)
অর্থাৎ পৃথিবীতে তাদের মধ্যে যে হিংসে-বিদ্বেষ, ঘৃণা বা শত্র“তা ছিল, তা তাদের অন্তর থেকে বের করে নেয়া হবে। যার ফলে তাদের অন্তর হবে একে অপরের জন্য আয়নার মত স্বচ্ছ ও পরিস্কার।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَنَزَعْنَا مَا فِيْ صُدُوْرِهِمْ مِّنْ غِلٍّ تَجْرِيْ مِنْ تَحْتِهِمُ الْأَنْهٰرُ ج وَقَالُوا الْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِيْ هَدٰنَا لِهٰذَا)
“আমি তাদের অন্তর হতে হিংসে-বিদ্বেষ দূর করে দিব, তাদের পাদদেশে প্রবাহিত হবে নদী এবং তারা বলবে, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই যিনি আমাদেরকে এর পথ দেখিয়েছেন।” (সূরা আ‘রাফ ৭:৪৩)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: মু’মিনদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দানের পর জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যস্থলে অবস্থিত পুলের উপর আটক করা হবে এবং দুনিয়ায় যে তারা একে অপরের উপর জুলুম করেছিল তারা একে অপর হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। অতঃপর তারা যখন হিংসে-বিদ্বেষ মুক্ত অন্তরের অধিকারী হয়ে যাবে তখন তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে। (সহীহ বুখারী হা: ৬৫৩৫)
مُّتَقٰبِلِيْنَ অর্থাৎ জান্নাতীরা জান্নাতের খাটের ওপর মুখোমুখি হয়ে বসবে।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(عَلٰی سُرُرٍ مَّوْضُوْنَةٍﭞﺫ مُّتَّکِئِیْنَ عَلَیْھَا مُتَقٰبِلِیْنَﭟ یَطُوْفُ عَلَیْھِمْ وِلْدَانٌ مُّخَلَّدُوْنَﭠﺫ بِاَکْوَابٍ وَّاَبَارِیْقَﺃ وَکَاْسٍ مِّنْ مَّعِیْنٍﭡ)
“তারা থাকবে স্বর্ণখচিত আসনসমূহে, তার ওপরে হেলান দিয়ে পরস্পর মুখোমুখি হয়ে বসবে। তাদের সেবায় ঘোরাফেরা করবে চির কিশোরেরা। পানপাত্র, ঘটি ও শরাবে পরিপূর্ণ পেয়ালা নিয়ে, (এরা হাজির হবে।) (সূরা ওয়াকিয়া ৫৬:১৫-১৮)
জান্নাতে মু’মিনদের কোন কষ্ট থাকবে না, তারা সেখানে চিরস্থায়ীরূপে থাকবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(الَّذِيْٓ أَحَلَّنَا دَارَ الْمُقَامَةِ مِنْ فَضْلِه۪ ج لَا يَمَسُّنَا فِيْهَا نَصَبٌ وَّلَا يَمَسُّنَا فِيْهَا لُغُوْبٌ)
“যিনি স্বীয় অনুগ্রহে আমাদেরকে অনন্ত নির্বাসে স্থান দিয়েছেন, সেখানে আমাদেরকে কোন কষ্টও স্পর্শ করে না এবং সেথায় আমাদেরকে কোন ক্লান্তিও স্পর্শ করে না।” (সূরা ফাতির ৩৫:৩৫)
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(اِنَّ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ کَانَتْ لَھُمْ جَنّٰتُ الْفِرْدَوْسِ نُزُلًا﮺ﺫ خٰلِدِیْنَ فِیْھَا لَا یَبْغُوْنَ عَنْھَا حِوَلًا﮻)
“নিশ্চয়ই যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদের আপ্যায়নের জন্য আছে ফিরদাউসের উদ্যান, সেথায় তারা স্থায়ী হবে, তা হতে স্থানান্তর কামনা করবে না।” (সূরা কাহফ ১৮:১০৭-১০৮)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: জান্নাতীদেরকে বলা হবে যে, হে জান্নাতীগণ! তোমরা চিরকাল সুস্থ থাকবে, কখনো রোগাক্রান্ত হবে না; সর্বদা জীবিত থাকবে কখনো মৃত্যুবরণ করবে না; সর্বদা যুবকই থাকবে কখনো বৃদ্ধ হবে না; চিরকাল এখানেই থাকবে কখনো বের হবে না। (সহীহ মুসলিম হা: ২৮৩৭)
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন সকলকে জানিয়ে দেয়ার জন্য যে, আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমাশীল ও দয়ালু, আবার তিনি কঠিন শাস্তিদাতাও।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
لَوْ يَعْلَمُ الْمُؤْمِنُ مَا عِنْدَ اللّٰهِ مِنَ الْعُقُوبَةِ، مَا طَمِعَ بِجَنَّتِهِ أَحَدٌ، وَلَوْ يَعْلَمُ الْكَافِرُ مَا عِنْدَ اللّٰهِ مِنَ الرَّحْمَةِ، مَا قَنَطَ مِنْ جَنَّتِهِ أَحَدٌ
মু’মিন যদি জানত আল্লাহর কাছে কত কঠিন শাস্তি রয়েছে তাহলে কেউ জান্নাতের আশা করত না। কাফির যদি জানত আল্লাহর কাছে কত রহমত রয়েছে তাহলে কেউ জান্নাত থেকে নিরাশ হত না। (সহীহ মুসলিম হা: ২৭৫৫)
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
أَعْدَدْتُ لِعِبَادِي الصَّالِحِينَ مَا لاَ عَيْنٌ رَأَتْ، وَلاَ أُذُنٌ سَمِعَتْ، وَلاَ خَطَرَ عَلَي قَلْبِ بَشَرٍ
আমি আমার বান্দার জন্য এমন কিছু তৈরি করে রেখেছি যা কোন চক্ষু দেখেনি, কোন কান শোনেনি এমনকি কোন মানুষের অন্তরে কল্পনায় আসেনি। (সহীহ বুখারী হা: ৩২৪৪, সহীহ মুসলিম হা: ২৮২৪)
সুতরাং এ নেয়ামতপূর্ণ জান্নাত তাদের জন্যই প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে যারা আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে চলবে এবং সৎআমল করবে। সুতরাং আমাদের উচিত সর্বদা আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে চলা এবং বেশি বেশি সৎ আমল করা।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. মানুষকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে আর জিনকে সৃষ্টি করা হয়েছে আগুন থেকে।
২. সর্বপ্রথম যুক্তি পেশ করেছিল ইবলীস।
৩. আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ মানার ব্যাপারে কোন প্রকার যুক্তি-তর্ক পেশ করা চলবে না।
৪. জাহান্নামের সাতটি দরজা রয়েছে।
৫. শয়তান মানুষের মাধ্যমে খারাপ কাজ করানোর জন্য সর্বদা ওঁৎ পেতে রয়েছে।
৬. ইবলীস থেকে আল্লাহ তা‘আলার সৎ বান্দাদের ক্ষমতা অনেক বেশি।
৭. মুত্তাকিদের জন্য আল্লাহ তা‘আলা এমন নেয়ামতপূর্ণ জান্নাত তৈরি করে রেখেছেন যা কল্পনাতীত।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: অতঃপর আল্লাহ তাআলা নিজের শাসনের নির্দেশ জারী করলেন যা কখনো টলতে পারে না। তিনি ইবলীসকে নির্দেশ দিলেনঃ ‘তুমি এই উত্তম ও মর্যাদা সম্পন্ন দল থেকে দূর হয়ে যাও। তুমি অভিশপ্ত হয়ে গেলে। কিয়ামত পর্যন্ত তোমার উপর সব সময় লানত বর্ষিত হতে থাকবে। বর্ণিত আছে যে, তৎক্ষণাৎ তার আকৃতি পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং সে বিলাপ করতে শুরু করে। দুনিয়ার সমস্ত শোক ও বিলাপের সূচনা হয়েছে ইবলীসের ঐ বিলাপ থেকেই। সে বিতাড়িত ও অভিশপ্ত হয়ে ফিরতে থাকে এবং হিংসার আগুনে দগ্ধিভূত হয়ে আকাংখা প্রকাশ করে যে, তাকে যেন কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ দেয়া হয়। এটাকেই পুনরুত্থান দিবস বলা হয়েছে। তার আবেদন কবুল করা হয়। এবং তাকে অবকাশ দেয়া হয়।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।