সূরা আল-হিজর (আয়াত: 24)
হরকত ছাড়া:
ولقد علمنا المستقدمين منكم ولقد علمنا المستأخرين ﴿٢٤﴾
হরকত সহ:
وَ لَقَدْ عَلِمْنَا الْمُسْتَقْدِمِیْنَ مِنْکُمْ وَ لَقَدْ عَلِمْنَا الْمُسْتَاْخِرِیْنَ ﴿۲۴﴾
উচ্চারণ: ওয়া লাকাদ ‘আলিমনাল মুছতাকদিমীনা মিনকুম ওয়ালাকাদ ‘আলিমনাল মুছতা’খিরীন।
আল বায়ান: আর অবশ্যই আমি জানি তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং অবশ্যই জানি পরবর্তীদেরকে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২৪. আর অবশ্যই আমরা তোমাদের মধ্য থেকে যারা অগ্রগামী হয়েছে তাদেরকে জানি এবং অবশ্যই জানি তাদেরকে যারা পশ্চাতে গমনকারী।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তোমাদের মধ্যেকার যারা পূর্বে গত হয়ে গেছে আমি তাদেরকে জানি আর পরে যারা আসবে তাদেরকেও জানি।
আহসানুল বায়ান: (২৪) অবশ্যই আমি তোমাদের অগ্রগামীদেরকে জানি এবং অবশ্যই জানি তোমাদের পশ্চাতগামীদেরকেও।
মুজিবুর রহমান: তোমাদের পূর্বে যারা গত হয়েছে আমি তাদেরকে জানি এবং পরে যারা আসবে তাদেরকেও জানি।
ফযলুর রহমান: আমি তোমাদের মধ্যে পূর্বে আগমনকারীদেরকেও জানি এবং পরে আগমন-কারীদেরকেও জানি।
মুহিউদ্দিন খান: আমি জেনে রেখেছি তোমাদের অগ্রগামীদেরকে এবং আমি জেনে রেখেছি পশ্চাদগামীদেরকে।
জহুরুল হক: আর আমরা নিশ্চয়ই জানি তোমাদের মধ্যের অগ্রগামীদের, আর আমরা অবশ্য জানি পশ্চাতে-পড়ে-থাকাদের।
Sahih International: And We have already known the preceding [generations] among you, and We have already known the later [ones to come].
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২৪. আর অবশ্যই আমরা তোমাদের মধ্য থেকে যারা অগ্রগামী হয়েছে তাদেরকে জানি এবং অবশ্যই জানি তাদেরকে যারা পশ্চাতে গমনকারী।(১)
তাফসীর:
(১) এখানে সাহাবী ও তাবেয়ী তাফসীরবিদদের পক্ষ থেকে الْمُسْتَقْدِمِينَ (অগ্রগামী দল) এবং الْمُسْتَأْخِرِينَ (পশ্চাদগামী দল) এর তাফসীর সম্পর্কে বিভিন্ন উক্তি বর্ণিত রয়েছে।
১) কাতাদাহ ও ইকরিমা বলেনঃ যারা পূর্বে জন্মগ্রহণ করেছে তারা অগ্রগামী। আর যারা এ পর্যন্ত জন্মগ্রহণ করেনি, তারা পশ্চাদগামী।
২) ইবনে আব্বাস ও দাহহাক বলেনঃ যারা মরে গেছে, তারা অগ্রগামী এবং যারা জীবিত আছে, তারা পশ্চাদগামী [ফাতহুল কাদীর]
৩) মুজাহিদ বলেনঃ পূর্ববর্তী উম্মতের লোকেরা অগ্রগামী এবং উম্মতে মুহাম্মদী পশ্চাদগামী। [ফাতহুল কাদীর]
৪) কোন কোন মুফাসসির বলেনঃ ইবাদতকারী ও সংকর্মশীলরা অগ্রগামী আর গোনাহগাররা পশ্চাদগামী। [তাবারী; বাগভী]
৫) সাঈদ ইবনে মুসাইয়িব, কুরতুবী, শা'বী প্রমুখ তাফসীরবিদের মতে যারা সালাতের কাতারে অথবা জিহাদের সারিতে এবং অন্যান্য সৎকাজে এগিয়ে থাকে তারা অগ্রগামী এবং যারা এসব কাজে পেছনে থাকে এবং দেরী করে, তারা পশ্চাদগামী। [ইবন কাসীর; বাগভী]
বলাবাহুল্য, এসব উক্তির মধ্যে মৌলিক কোন বিরোধ নেই। সবগুলোর সমন্বয় সাধন করা সম্ভবপর। কেননা, আল্লাহ তা'আলার সর্বব্যাপী জ্ঞান উল্লেখিত সর্বপ্রকার অগ্রগামী ও পশ্চাদগামীতে পরিব্যপ্ত।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২৪) অবশ্যই আমি তোমাদের অগ্রগামীদেরকে জানি এবং অবশ্যই জানি তোমাদের পশ্চাতগামীদেরকেও।
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ২১-২৫ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা‘আলা সংবাদ দিচ্ছেন, সব কিছুর মালিক একমাত্র তিনি। প্রত্যেক বস্তুর ভাণ্ডার তাঁর হাতে। সেখান থেকে যখন যতটা ইচ্ছা তিনি অবতীর্ণ করেন। তাঁর হিকমত ও নিপুণতা তিনিই জানেন। বান্দার কল্যাণ সম্পর্কে তিনিই সম্যক অবগত। কেউ خزائن দ্বারা বৃষ্টি অর্থ নিয়েছেন। কারণ বৃষ্টিই শস্য উৎপাদনের মূল উপাদান। কিন্তু এখানে সঠিক অর্থে পৃথিবীর সকল ভাণ্ডারকে বুঝানো হয়েছে। সে সকল আল্লাহ তা‘আলা নিজ ইচ্ছায় দিয়ে থাকেন। আল্লাহ তা‘আলার এ ভাণ্ডার থেকে তিনি নির্ধারিত পরিমাণ মানুষকে দিয়ে থাকেন। এর অন্যতম একটি হিকমত হল
(وَلَوْ بَسَطَ اللّٰهُ الرِّزْقَ لِعِبَادِه۪ لَبَغَوْا فِي الْأَرْضِ وَلٰكِنْ يُّنَزِّلُ بِقَدَرٍ مَّا يَشَا۬ءُ ط إِنَّه۫ بِعِبَادِه۪ خَبِيْرٌۭ بَصِيْرٌ)
“আল্লাহ তাঁর (সকল) বান্দাদের রুযী বাড়িয়ে দিলে তারা পৃথিবীতে অবশ্যই সীমালঙ্ঘন করত; কিন্তু তিনি তাঁর ইচ্ছামত পরিমাণেই দিয়ে থাকেন। তিনি তাঁর বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক জানেন ও দেখেন।” (সূরা শুরা ৪২:২৭)
لَوَاقِحَ বৃষ্টিসঞ্চারি বায়ু বা ভাপরী বায়ু, যেহেতু বায়ু বৃষ্টিভর্তি মেঘমালাকে বহন করে তাই তাকে لَوَاقِحَ বলা হয়। যেমন لقحة এমন উটনীকে বলা হয় যে পেটে বাচ্চা বহন করে নিয়ে চলে। এ বৃষ্টি যা আল্লাহ তা‘আলা বর্ষণ করেন তা তিনি নিজের কাছে জমা করে রাখতে সক্ষম, তাঁর দয়া যে তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করে বিভিন্ন ঝর্ণা, কূপ ও নদী-নালার মাধ্যমে সংরক্ষণ করে রাখেন। তিনি ইচ্ছা করলে পানি ভূগর্ভে নিয়ে যেতে পারতেন ফলে মানুষ নিচ থেকেও পানি সংগ্রহ করতে পারত না। তিনি ইচ্ছা করলে পানি লবণাক্ত করে দিতে পারতেন কিন্তু এসব তাঁর দয়া।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(اَفَرَءَیْتُمُ الْمَا۬ئَ الَّذِیْ تَشْرَبُوْنَﮓﺚ ءَاَنْتُمْ اَنْزَلْتُمُوْھُ مِنَ الْمُزْنِ اَمْ نَحْنُ الْمُنْزِلُوْنَﮔ لَوْ نَشَا۬ئُ جَعَلْنٰھُ اُجَاجًا فَلَوْلَا تَشْکُرُوْنَﮕ )
“তোমরা যে পানি পান কর সে বিষয়ে তোমরা চিন্তা করছ কি? তোমরাই কি তা মেঘ হতে বর্ষণ কর, না আমি বর্ষণ করি। আমি ইচ্ছা করলে তাকে লবণাক্ত বানাতে পারি। তবুও তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে না কেন?” (সূরা ওয়াকিয়াহ ৫৬:৬৮-৭০)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(هُوَ الَّذِيْٓ أَنْزَلَ مِنَ السَّمَا۬ءِ مَا۬ءً لَّكُمْ مِّنْهُ شَرَابٌ وَّمِنْهُ شَجَرٌ فِيْهِ تُسِيْمُوْنَ)
“তিনিই আকাশ হতে বারি বর্ষণ করেন। তাতে তোমাদের জন্য রয়েছে পানীয় এবং তা হতে জন্মায় উদ্ভিদ যাতে তোমরা পশু চারণ করে থাকো।” (সূরা নাহল ১৬:১০)
(وَمَآ اَنْتُمْ لَھ۫ بِخٰزِنِیْنَ)
-এ সমস্ত ভাণ্ডার মানুষের কাছে নেই, তা কেবলমাত্র আল্লাহ তা‘আলার নিকট। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلِلّٰهِ خَزَآئِنُ السَّمٰوٰتِ وَالْأَرْض)
“আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর ধন-ভাণ্ডার তো আল্লাহরই।” (সূরা মুনাফিকূন ৬৩:৭)
(وَاِنَّا لَنَحْنُ نُحْی۪ وَنُمِیْتُ)
এখানে আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করেছেন যে, তিনিই মানুষকে জীবন দান করেন এবং তিনিই মানুষকে মৃত্যু দান করেন। তিনি ছাড়া কেউ জীবন-মৃত্যুর মালিক নয়।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنَّا نَحْنُ نُحْيِيْ وَنُمِيْتُ وَإِلَيْنَا الْمَصِيْرُ)
“আমিই জীবিত করি, আর মৃত্যুও ঘটাই এবং সকলেই ফিরে আসবে আমারই দিকে।” (সূরা ক্বাফ ৫০:৪৩)
জীবন ও মৃত্যুর মালিক কেবল আল্লাহ, অন্য কেউ নয়। আর তিনিই চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী।
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:
(إِنَّا نَحْنُ نَرِثُ الْأَرْضَ وَمَنْ عَلَيْهَا وَإِلَيْنَا يُرْجَعُوْنَ)
“নিশ্চয়ই পৃথিবীর ও তার ওপরে যারা আছে তাদের চূড়ান্ত মালিকানা আমারই রইবে এবং তারা আমারই নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে” (সূরা মারইয়াম ১৯:৪০)
এখানে উত্তরাধিকারী কথার অর্থ হচ্ছে যখন সমস্ত মাখলুক শেষ হয়ে যাবে তখন একমাত্র তিনিই এই আকাশে ও জমিনে অবশিষ্ট থাকবেন এবং তিনিই সকলকে তাদের মৃত্যুর পর একত্রিত করবেন।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. পৃথিবীতে যত কিছু অবতীর্ণ করা হয় সব কিছুর ধনভাণ্ডার আল্লাহ তা‘আলার নিকট। মানুষ কোন কিছুরই প্রকৃত মালিক নয়।
২. আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করা মানুষের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার একটি অনুগ্রহ।
৩. জীবন ও মরণ একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার হাতে।
৪. মৃত্যুর পর সকল মানুষকে বিচারের জন্য একত্রিত করা হবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ২১-২৫ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তাআলা খবর দিচ্ছেন যে, সমস্ত জিনিসের তিনি একাই মালিক। প্রত্যেক কাজই তাঁর কাছে সহজ। সমস্ত কিছুর ভাণ্ডার তাঁর কাছে বিদ্যমান রয়েছে। যেখানে যখন যতটা ইচ্ছা তিনি অবতীর্ণ করে থাকেন। তাঁর হিকমত ও নিপুণতা তিনিই জানেন। বান্দার কল্যাণ সম্পর্কে তিনিই সম্যক অবগত। এটা একমাত্র তাঁর মেহেরবানী, নচেৎ এমন কে আছে যে তাকে বাধ্য করতে বা তার উপর জোর খাটাতে পারে? হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, প্রতি বছর বৃষ্টি বরাবর বর্ষিত হতেই আছে। হাঁ, তবে বন্টন আল্লাহ তাআলার হাতে রয়েছে। অতঃপর তিনি এই আয়াতটিই পাঠ করেন। হাকীম ইবনু উয়াইনা (রঃ) হতেও এই উক্তিই বর্ণিত আছে। তিনি বলেনঃ “বৃষ্টির সাথে এতো ফেরেস্তা অবতীর্ণ হন যাদের সংখ্যা সমস্ত মানবও দানব অপেক্ষা বেশী। তাঁরা বৃষ্টির এক একটি ফোঁটার খেয়াল রাখেন যে, ওটা কোথায় বর্ষিত হচ্ছে এবং তা থেকে কি উৎপন্ন হচ্ছে।”
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলার ভাণ্ডার হচ্ছে কালাম বা কথা মাত্র। সুতরাং যখন তিনি কোন কিছুর ইচ্ছা করেন তখন বলেনঃ ‘হও, তখন হয়ে যায়।” (এ হাদীসটি বাযয়ার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর একজন বর্ণনাকারী হচ্ছেন আগনাব। তিনি খুব বিশ্বাসযোগ্য বর্ণনাকারী নন)
মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি মেঘমালাকে বৃষ্টি দ্বারা ভারী করে দিই। তখন তার থেকে বৃষ্টি বর্ষণ হতে শুরু করে। এই বাতাসই প্রবাহিত হয়ে গাছপালাকে সিক্ত করে দেয়। ফলে ওগুলিতে পাতা ও কুঁড়ি ফুটে ওঠে।” এটাও লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, এখানে (আরবি) বলা হয়েছে অর্থাৎ এর বিশেষণকে বহু বচন ব্যবহার করা হয়েছে। আর বৃষ্টি শূন্য বায়ুকে বলা হয়েছে। অর্থাৎ (আরবি) এর বিশেষণকে একবচন রূপে ব্যবহার করা হয়েছে। বৃষ্টি পূর্ণ বায়ুর বিশেষণকে বহু বচনরূপে ব্যবহারের উদ্দেশ্য হচ্ছে বেশী ফলদায়ক হওয়া। বৃষ্টি বহন কম পক্ষে দুটি জিনিস ছাড়া সম্ভব নয়। বাতাস প্রবাহিত হয় এবং তা আকাশ থেকে পানি উঠিয়ে নেয়, আর মেঘমালাকে পরিপূর্ণ করে দেয়। এক বায়ু এমন হয় যা যমীনের উৎপাদন শক্তি সৃষ্টি করে। আর এক বায়ু। মেঘমালাকে এদিকে ওদিকে চালিয়ে নিয়ে যায়। আর এক বায়ু ওগুলিকে একত্রিত করে স্তরে স্তরে সাজিয়ে নেয়। আর এক বায়ু ওগুলিকে পানি দ্বারা ভারী করে দেয়। আর এক বায়ু এমন হয় যে, তা গাছপালা ও বৃক্ষরাজিকে ফলদানকারী হওয়ার যোগ্য করে তোলে।
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “দক্ষিণা বায়ু জান্নাত হতে প্রবাহিত হয়ে থাকে এবং তাতে জনগণের উপকার লাভ হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম বনুজারীর (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর ইসনাদ দুর্বল)
হযরত আবু যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “বাতাস সৃষ্টির সাত বছর পরে আল্লাহ তাআলা জান্নাতে এক বায়ু সৃষ্টি করেছেন যা একটি দরজা দ্বারা বন্ধ করা আছে। ঐ দরজা দ্বারাই তোমাদের কাছে বায়ু পৌছে থাকে। যদি ঐ দরজাটি খুলে দেয়া হয় তবে যমীন ও আসমানের সমস্ত জিনিস ওলট পালট হয়ে যাবে। আল্লাহর কাছে ওর নাম হচ্ছে আযইয়াব। তোমরা ওকে দক্ষিণা বায়ু বলে থাকো।” (এ হাদীসটি ইমাম আবু বকর আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর আল হুমাইদী (রঃ) তাঁর ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)
এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আমি তোমাদেরকে তা পান করতে দিই।' অর্থাৎ আমি তোমাদের উপর মিষ্টি পানি বর্ষণ করি, যাতে তোমরা তা পান করতে পার এবং অন্য কাজে লাগাতে পার। আমি ইচ্ছা করলে ওকে তিক্ত ও লবণাক্ত করে দিতে পারি। যেমন সূরায়ে ওয়াকিয়ার আয়াতে রয়েছেঃ “তোমরা যে পানি পান কর তা সম্পর্কে কি তোমরা চিন্তা করেছো? তোমরাই কি তা মেঘ হতে নামিয়ে আন, না আমি তা বর্ষণ করি? আমি ইচ্ছা করলে তা লবণাক্ত করে দিতে পারি, তবুও কেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর না?” আর এক জায়গায় রয়েছেঃ “তিনিই আকাশ হতে বারি বর্ষণ করেন; তাতে তোমাদের জন্যে রয়েছে পানীয় এবং তা হতে জন্মে উদ্ভিদ যাতে তোমরা পশু চারণ করে থাকো ।”
(আরবি) (ওর ভাণ্ডার তোমাদের কাছে নেই)। সুফইয়ান সাওয়ারী (রঃ) এর ভাবার্থ করেছেনঃ “তোমরা ওকে আবদ্ধকারী নও।” আর এর ভাবার্থ এও হতে পারে। “তোমরা ওর রক্ষক নও। বরং আমিই তা বর্ষণ করি ও রক্ষা করে থাকি। আমি ইচ্ছা করলে ওটা যমীনে ঢুকিয়ে দিতে পারি। এটা শুধু মাত্র আমার করুণা যে, আমি ওকে বর্ষণ করি, রক্ষা করি, মিষ্ট করি এবং স্বচ্ছ ও নির্মল করি, যেমন তোমরা নিজেরা পান কর এবং তোমাদের জন্তু গুলিকে পান করাও। আর তা জমিতে সেচন কর, বাগান তৈরী কর এবং অন্যান্য প্রয়োজনে ব্যবহার কর।”
মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমিই জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই এবং আমিই চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী। অর্থাৎ সৃষ্টির সূচনা আমিই করেছি এবং পুনরায় সৃষ্টি করতে আমিই সক্ষম। আমিই সব কিছু অস্তিত্বহীনতা থেকে অস্তিত্বে আনয়ন করেছি। আবার সবকে আমি অস্তিত্বহীন করে দেবো। এরপর কিয়ামতের দিন সবকে উঠাবো। যমীন ও যমীনবাসীদের ওয়ারিস আমিই। সবকে-ই আমার কাছে ফিরে আসতে হবে। আমার জ্ঞানের কোন শেষ নেই। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সবারই খবর আমি রাখি।
পূর্ববর্তীদের দ্বারা এই যামানার পূর্ববর্তী সকল লোককেই বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ হযরত আদম (আঃ) পর্যন্ত সবাই। আর পরবর্তীদের দ্বারা এই যুগ এবং এই যুগের পরবর্তী সমস্ত যুগের লোককে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ কিয়ামত পর্যন্ত যত লোক আসবে সবাই। ইকরামা (রাঃ) , মুজাহিদ (রঃ), যাহহাক (রঃ), কাতাদা (রঃ) মুহাম্মদ ইবনু কা'ব (রঃ), শাবী (রঃ) প্রভৃতি গুরুজন হতে এইরূপ বর্ণিত আছে। এটাই ইমাম ইবনু জারীরের (রঃ) পছন্দনীয় মত মারওয়ান ইবনুল হাকাম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, কতকগুলি লোক (নামাযে) স্ত্রী লোকদের কারণে পিছনের কাতারে থাকতো। তখন আল্লাহ তাআ’লা (আরবি) এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। (এটা ইবনু জারীর (রঃ) স্বীয় তাফসীরের বর্ণনা করেছেন)
এ সম্পর্কে একটি অত্যন্ত গারীব বা দুর্বল হাদীসও বর্ণিত হয়েছে। তা এই যে, হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “একটি অত্যন্ত সুন্দরী মহিলা নবীর (সঃ) পিছনে নামায পড়তে আসতো।” হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ আল্লাহর শপথ! আমি ওর মত (সুন্দরী মহিলা কখনো দেখি নাই। কতকগুলি মুসলমান নামায পড়ার সময় এই উদ্দেশ্যে সামনে বেড়ে যেতেন যে, যেন তাকে (মহিলাটিকে দেখতে না পান। আর কতকগুলি লোক পিছনে সরে আসতো। অতঃপর যখন তারা সিজদা করতো তখন তাদের হাতের নীচে দিয়ে তার দিকে তাকাতো।” ঐ সময় আল্লাহ তাআলা (আরবি) এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। (এটা ইবনু জারীর (রঃ) স্বীয় তাফসীরে, ইমাম আহমদ (রঃ) তাঁর মুসনাদে, ইবনু আবি হাতিম (রঃ) স্বীয় তাফসীরে, এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) ও ইমাম নাসায়ী (রঃ) তাঁদের সুনান গ্রন্থের কিতাবুত তাফসীরে বর্ণনা করেছেন। তবে এতে কঠিন নাকারাত বা অস্বীকৃতি রয়েছে)
এই আয়াতের ব্যাপারে আবুল জাওযার (রঃ) -এর উক্তি বর্ণিত আছে যে, এরা হচ্ছে ওরাই যারা নামাযের কাতারসমূহে আগে বেড়ে যায় এবং পিছনে সরে আসে। (এটা আবদুর রায্যাক (রঃ) বর্ণনা করেছেন) এটা শুধু মাত্র আবুল জাওযার (রঃ)-এর উক্তি। এতে হযরত ইবনু আব্বাসের (রাঃ) কোন উল্লেখ নেই। ইমাম তিরমিযী (রঃ) বলেন, এটাই বেশী সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।
মুহাম্মদ ইবনু কা'বের (রঃ) সামনে আউন ইবনু আবদিল্লাহ (রঃ) এই ভাবার্থ বর্ণনা করলে তিনি বলেনঃ “ভাবার্থ এটা নয়। বরং অগ্রবর্তীদের দ্বারা বুঝানো হয়েছে এ লোকদেরকে যারা মৃত্যুবরণ করেছে। আর পরবর্তীদের দ্বারা বুঝানো হয়েছে তাদেরকে যারা এখন সৃষ্ট হয়েছে এবং পরে সৃষ্ট হবে। আর তোমার প্রতিপালকই তাদেরকে সমবেত করবেন; তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ।” এ কথা শুনে হযরত আউন (রাঃ) মুহাম্মদ ইবনু কা'বকে (রঃ) লক্ষ্য করে বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আপনাকে তাওফীক ও জাযায়ে খায়ের দান করুন।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।