সূরা আল-হিজর (আয়াত: 2)
হরকত ছাড়া:
ربما يود الذين كفروا لو كانوا مسلمين ﴿٢﴾
হরকত সহ:
رُبَمَا یَوَدُّ الَّذِیْنَ کَفَرُوْا لَوْ کَانُوْا مُسْلِمِیْنَ ﴿۲﴾
উচ্চারণ: রুবামা-ইয়াওয়াদ্দুল্লাযীনা কাফারূলাও কা-নূমুছলিমীন।
আল বায়ান: কোন কোন সময় কাফিরেরা আকাংখা করবে যে, তারা যদি মুসলিম হত!
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২. কখনো কখনো ররা আকাংখা করবে যে, তারা যদি মুসলিম হত!(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: এমন একটা সময় আসবে যখন কাফিরগণ আক্ষেপ করে বলবে, ‘হায়, আমরা যদি মুসলিম হয়ে যেতাম!’
আহসানুল বায়ান: (২) কোন এক সময় অবিশ্বাসীরা আকাঙ্ক্ষা করবে যে, তারা যদি মুসলিম হত! [1]
মুজিবুর রহমান: যারা কুফরী করেছে, তারা একসময় কামনা করবে যদি তারা মুসলিম হত!
ফযলুর রহমান: (কেয়ামতের দিন নিজেদের পরিণাম জাহান্নাম আর মুসলমানদের পরিণাম জান্নাত দেখে) কাফেররা প্রায়শ কামনা করবে, তারা যদি মুসলমান হত!
মুহিউদ্দিন খান: কোন সময় কাফেররা আকাঙ্ক্ষা করবে যে, কি চমৎকার হত, যদি তারা মুসলমান হত।
জহুরুল হক: সময়কালে যারা অবিশ্বাস করেছিল তারা চাইবে যে যদি তারা মুসলিম হতো!
Sahih International: Perhaps those who disbelieve will wish that they had been Muslims.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ২. কখনো কখনো ররা আকাংখা করবে যে, তারা যদি মুসলিম হত!(১)
তাফসীর:
(১) কখন কাফেরগণ সেটা আকাংখা করবে? কোন কোন মুফাসসির বলেন, তারা এটা মৃত্যুর সময় কামনা করবে। [ইবন কাসীর] তবে এ ব্যাপারে একটি হাদীসের দিকে তাকালে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই যে, সেটা আখেরাতে তারা কামনা করবে। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “জাহান্নামবাসীরা যখন জাহান্নামে একত্রিত হবে, তারা তাদের সাথে কিছু গুনাহগার মুমিনদেরকেও দেখতে পাবে, তখন তারা বলবেঃ তোমাদের ইসলাম তোমাদের কোন কাজে আসলো না, তোমরা তো দেখছি আমাদের সাথে জাহান্নামেই রয়ে গেলে। তারা বলবেঃ আমাদের কিছু গুনাহ ছিল যার কারণে আমাদের পাকড়াও করা হয়েছে। তারা যা বলেছে আল্লাহ তা শুনলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তখন কিবলার অনুসারী মুসলিমগণকে বের করার নির্দেশ দেয়া হবে। আর তখন কাফেরগণ আফসোস করে বলবেঃ হায়! আমরা যদি মুসলিম হতাম তাহলে তারা যেভাবে বের হয়ে গেছে সেভাবে আমরাও বের হতে পারতাম। সাহাবী আবু মূসা আল-আশ'আরী বলেনঃ আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পড়লেনঃ “আলিফ-লাম-রা, এগুলো আয়াত মহাগ্রন্থের, সুস্পষ্ট কুরআনের কখনো কখনো কাফিররা আকাংখা করবে যে, তারা যদি মুসলিম হত।” [মুস্তাদরাকে হাকেমঃ ২/২৪২]
এভাবে কাফেররা যখন প্রকৃত অবস্থা জানতে পারবে তখন লজ্জিত হবে এবং আফসোস করে ঈমান আনার জন্য আকাংখা করতে থাকবে। কিন্তু তাদের সে আকাংখা কোন কাজে লাগবে না। অন্যত্র আল্লাহ বলেনঃ “আপনি যদি দেখতে পেতেন যখন তাদেরকে আগুনের পাশে দাঁড় করানো হবে এবং তারা বলবে, হায়! যদি আমাদেরকে আবার ফেরত পাঠানো হত তবে আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিদর্শনকে অস্বীকার করতাম না এবং আমরা মু'মিনদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। [সূরা আল-আনআমঃ ২৭] “যারা আল্লাহর সম্মুখীন হওয়াকে মিথ্যা বলেছে তারা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এমনকি হঠাৎ তাদের কাছে যখন কিয়ামত উপস্থিত হবে তখন তারা বলবে, হায়! এটাকে আমরা যে অবহেলা করেছি তার জন্য আক্ষেপ। তারা তাদের পিঠে নিজেদের পাপ বহন করবে; দেখুন, তারা যা বহন করবে তা খুবই নিকৃষ্ট। [সূরা আল-আনআমঃ ৩১] “যালিম ব্যক্তি সেদিন নিজের দু'হাত দংশন করতে করতে বলবে, হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে সৎপথ অবলম্বন করতাম। [সূরা আল-ফুরকানঃ ২৭]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (২) কোন এক সময় অবিশ্বাসীরা আকাঙ্ক্ষা করবে যে, তারা যদি মুসলিম হত! [1]
তাফসীর:
[1] এই আকাঙ্ক্ষা কখন করবে? মৃত্যুর সময় যখন ফিরিশতারা জাহান্নামের আগুন দেখাবেন তখন, নাকি যখন জাহান্নামে চলে যাবে তখন। অথবা যখন গোনাহগার মু’মিনদেরকে কিছুদিন জাহান্নামে শাস্তি স্বরূপ রাখার পর বের করে নেওয়া হবে তখন, নাকি যখন হাশরের মাঠে বিচার চলবে আর কাফেররা দেখবে যে, মু’মিনরা জান্নাতে যাচ্ছে তখন কাফেররা আকাঙ্ক্ষা করবে, হায় তারাও যদি মুসলমান হতো। ربما অধিকাংশ ‘অধিক’ অর্থে ব্যবহার হয়, তবে কখনো কখনো ‘অল্প’ অর্থেও ব্যবহার হয়ে থাকে। কেউ কেউ বলেন, তারা এই আকাঙ্ক্ষা সর্ব অবস্থায় করবে কিন্তু তাদের এই আকাঙ্ক্ষা কোন কাজে লাগবে না।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: নামকরণ:
الْحِجْرِ আল হিজর হল হিজায ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী এলাকায় একটি জনবসতি। সালেহ (عليه السلام)-এর জাতি এ এলাকায় বসবাস করত। অত্র সূরার ৮০ নং আয়াতে হিজর শব্দটি উল্লেখ রয়েছে, এখান থেকেই সূরার নামকরণ করা হয়েছে।
অত্র সূরার শুরুর দিকে কিয়ামত দিবসে কাফিরদের মনবাসনা, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সত্যায়ন স্বরূপ ফেরেশতাদের আগমন দাবী, আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক ওয়াহী সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি প্রদান, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভূ-তত্ত্ববিজ্ঞান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তারপর আল্লাহ তা‘আলার রুবুবিয়্যাহ, মানব ও জিন সৃষ্টির উপাদান ও আল্লাহ তা‘আলা এবং ইবলিশ শয়তানের মাঝে কথোপকথনের বিস্তারিত বিবরণ বর্ণিত হয়েছে। সূরার শেষের দিকে ইবরাহীম (عليه السلام)-কে ফেরেশতা কর্তৃক ইসহাকের সুসংবাদ এবং লূত (عليه السلام)-এর জাতিকে ধ্বংসকরণ সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে।
১-৫ নং আয়াতের তাফসীর:
الٓرٰ - (আলিফ-লাম-রা) এ জাতীয় “হুরূফুল মুক্বাত্বআত” বা বিচ্ছিন্ন অক্ষরসমূহ সম্পর্কে সূরা বাকারার শুরুতে আলোচনা করা হয়েছে। এগুলোর সঠিক উদ্দেশ্য আল্লাহ তা‘আলাই ভালো জানেন।
প্রথম আয়াতে কিতাব ও কুরআনে মুবীন দ্বারা কুরআনুল কারীমকেই বুঝানো হয়েছে। যেমন অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قَدْ جَا۬ءَكُمْ مِّنَ اللّٰهِ نُوْرٌ وَّكِتٰبٌ مُّبِيْنٌ)
“আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট জ্যোতি ও স্পষ্ট কিতাব এসেছে।” (সূরা মায়িদাহ ৫:১৫)
এখানেও নূর এবং কিতাবুম মুবীন দ্বারা কুরআনুল কারীমকে বুঝানো হয়েছে। আর আয়াতে কুরআন শব্দটি নাকেরা (অনির্দিষ্ট) ব্যবহার করা হয়েছে কুরআনের মর্যাদা বুঝানোর জন্য।
দ্বিতীয় আয়াতে বলা হচ্ছে, কাফিররা যখন প্রকৃত অবস্থা জানতে পারবে এবং তারা দেখবে, মুসলিমরা জান্নাতে প্রবেশ করছে, তখন তারা লজ্জিত হবে এবং এ আশা করবে যদি আমরা মুসলিম হতাম।
কিন্তু তখন তাদের এ আশা কোন ফলদায়ক হবে না বরং অতিশয় লজ্জার কারণ হবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَوْ تَرٰٓي إِذْ وُقِفُوْا عَلَي النَّارِ فَقَالُوْا يٰلَيْتَنَا نُرَدُّ وَلَا نُكَذِّبَ بِاٰيٰتِ رَبِّنَا وَنَكُوْنَ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ)
“তুমি যদি দেখতে পেতে যখন তাদেরকে অগ্নির পার্শ্বে দাঁড় করান হবে এবং তারা বলবে, ‘হায়! যদি আমাদেরকে (পৃথিবীতে) আবার ফিরিয়ে দেয়া হত তবে আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিদর্শনকে অস্বীকার করতাম না এবং আমরা মু’মিনদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।” (সূরা আন‘আম ৬:২৭)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, তারা বলবে:
(وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلٰي يَدَيْهِ يَقُوْلُ يٰلَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُوْلِ سَبِيْلًا)
“জালিম ব্যক্তি সেদিন নিজ দু’ হাত দংশন করতে করতে বলবে, ‘হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে সৎপথ অবলম্বন করতাম!” (সূরা ফুরকান ২৫:২৭)
জাবের (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন:
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: আমার উম্মাতের কতক মানুষকে অপরাধের কারণে শাস্তি দেয়া হবে, আল্লাহ তা‘আলা যত দিন চান তারা জাহান্নামে থাকবে, তারপর সেখানে থেকে বের হয়ে আসবে। মুশরিকরা তাদের সাথে হিংসে করে বলবে, তোমরা যে সত্যে বিশ্বাসী ছিলে আজ তা উপকার দিচ্ছে। এভাবে সকল তাওহীদবাদী জাহান্নাম থেকে বের হয়ে যাবে, কেউ বাকি থাকবে না।
(সহীহ, রুহুল মাআনী, অত্র আয়াতের তাফসীর)
এ আফসোস কখন করবে? কেউ কেউ বলেছেন যখন জাহান্নাম দেখতে পাবে তখন এ আফসোস করবে। কেউ বলেছেন যখন তাওহীদবাদীদের জাহান্নাম থেকে বের করা হবে তখন। কেউ বলেছেন, যখন তাদের মৃত্যু উপস্থিত হবে তখন। কেউ বলেছেন, বেশ কয়েক বার এরূপ আফসোস করবে। তবে সব কথার মূল হল একটাই তা হল, যখন প্রকৃত সত্য দেখতে পাবে ও বুঝতে পারবে। সুতরাং প্রতিটি মানুষের উচিত মৃত্যুর পূর্বেই সৎ আমল করা এবং মন্দ আমল করা থেকে বেঁচে থাকা।
তারপর আল্লাহ তা‘আলা কাফিরদের তিরস্কার ও ধমক দিয়ে বলেন; তাদেরকে ছেড়ে দাও, তারা খেতে থাকুক, ভোগ করতে থাকুক এবং আশা করতে থাকুক, তারা অচিরেই জানতে পারবে তাদের এই ভোগ-বিলাসের পরিণাম কত ভয়াবহ।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(قُلْ تَمَتَّعُوْا فَإِنَّ مَصِيْرَكُمْ إِلَي النَّارِ)
“বল: ‘ভোগ করে নাও, নিশ্চয়ই তোমাদের প্রত্যাবর্তনস্থল জাহান্নাম।’’ (সূরা ইবরাহীম ১৪:৩০)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
(كُلُوْا وَتَمَتَّعُوْا قَلِيْلًا إِنَّكُمْ مُّجْرِمُوْنَ)
“তোমরা খাও, আর আনন্দ-ফুর্তি কর অল্প কিছুদিন, প্রকৃতপক্ষে তো তোমরা অপরাধী।” (সূরা মুরসালাত ৭৭:৪৬)
অতএব কাফিররা যতই দুনিয়ার জীবনে আরাম-আয়েশ ও স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করুক, তাতে ধোঁকায় পড়ার কিছু নেই। অচিরেই তাদের উপযুক্ত প্রতিদান দেয়া হবে।
আর আল্লাহ তা‘আলা তাদের অপরাধের কারণে তৎক্ষণাৎ তাদের ধ্বংস না করার কারণ হল এই যে, তিনি তাদের জন্য একটি সময় নির্ধারণ করে রেখেছেন। যদি এ সময় নির্ধারণ করা না থাকত তাহলে তাদের অপরাধের কারণে সাথে সাথে ধ্বংস করে দিতেন। সুতরাং পাপ সংঘটনের সাথে সাথেই শাস্তি না দেয়ার অর্থ এমন নয় যে, তারা শাস্তিপ্রাপ্ত হবে না। বরং তাদেরকে অবকাশ দেয়া হয়ে থাকে, হয় ফিরে আসবে অথবা কঠিন শাস্তির দিকে ধাবিত করা হবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. কাফির-মুশরিকরা প্রকৃত অবস্থা জানার পর লজ্জিত হবে এবং আকাক্সক্ষা করবে যদি তারা ইহজীবনে মুসলিম হত।
২. আল্লাহ তা‘আলা নির্ধারিত সময়ের পূর্বে কোন জাতিকে তাদের অপরাধের কারণে ধ্বংস করেন না।
৩. যারা দুনিয়াতে ভোগ-বিলাসে আছে তারা যে পরকালে নাজাত পাবে এমনটি নয় বরং তার বিপরীতও হতে পারে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১-৩ নং আয়াতের তাফসীর
সূরা সমূহের শুরুতে যে হুরূফে মুকাত্তাআ’ত এসেছে সেগুলির বর্ণনা ইতিপূর্বেই গত হয়েছে। এ আয়াতে কুরআন কারীম একখানা সুস্পষ্ট আসমানী গ্রন্থ হওয়া এবং প্রত্যেকের অনুধাবন যোগ্য হওয়ার বর্ণনা দেয়া হয়েছে।
কাফিররা তাদের কুফরীর কারণে সত্বরই লজ্জিত হবে। তারা মুসলমানরূপে জীবন যাপন করার আকাংখা করবে। তারা কামনা করবে যে, দুনিয়ায় যদি তারা মুসলিমরূপে থাকতো, তবে কতই না ভাল হতো! হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) প্রভৃতি সাহাবীবর্গ হতে বর্ণিত আছে যে, কুরাইশ কাফিরদেরকে যখন জাহান্নামের সামনে পেশ করাহবে, তখন তারা আকাংখা করবে যে, যদি তারা দুনিয়ায় মুমিন হয়ে থাকতো! এটাও রয়েছে যে, প্রত্যেক কাফির তার মৃত্যু দেখে নিজের মুসলমান হওয়ার আকাংখা করে থাকে। অনুরূপভাবে কিয়ামতের দিনও প্রত্যেক কাফির এই আকাংখাই করবে। জাহান্নামের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে তারা বলবেঃ “যদি আমরা পুনরায় দুনিয়ায় ফিরে যেতে পারতাম তবে আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকারও করতাম না এবং ঈমানও পরিত্যাগ করতাম না।”
জাহান্নামী লোকেরা অন্যদেরকে জাহান্নাম থেকে বের হতে দেখেও নিজেদের ঈমানদার হওয়ার কামনা করবে। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) এবং হযরত আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) বলেন যে, পাপী মুসলমানদেরকে আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের সাথে জাহান্নামে আটক করে দিবেন। তখন মুশরিকরা ঐ মুসলমানদেরকে বলবেঃ “দুনিয়ায় যে আল্লাহর তোমরা ইবাদত করতে তিনি তোমাদের আজ কি উপকার করলেন?” তাদের এ কথা শুনে আল্লাহর রহমত উথলিয়ে উঠবে এবং তিনি মুসলমানদেরকে জাহান্নাম হতে বের করে নিবেন। তখন কাফিররা আকাংখা করবে যে, তারাও যদি মুসলমান হতো (তবে কতভাল হতো)! অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, মুসলমানদের প্রতি মুশরিকদের এই ভৎসনা শুনে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিবেনঃ ‘যার অন্তরে অনুপরিমাণও ঈমান রয়েছে তাকেও জাহান্নাম হতে বের করে নাও। ঐ সময় কাফিররা কামনা করবে যে, যদি তারাও মুসলমান হতো!
হযরত আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যারা “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলেছে তাদের মধ্যে কতক লোক পাপের কারণে জাহান্নামে যাবে। তখন লাত ও উয্যার পূজারীরা তাদেরকে বলবেঃ “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলায় তোমাদের কি উপকার হলো? তোমরা তো আমাদের সাথেই জাহান্নামে পুড়ছো?” তাদের এ কথা শুনে আল্লাহ তাআলার করুণা উথলিয়ে উঠবে। তিনি তাদের সকলকেই সেখান থেকে বের করিয়ে আনবেন এবং জীবন নহরে তাদেরকে নিক্ষেপ করবেন। তখন তাদেরকে এমনই দেখা যাবে যেমন চন্দ্রকে ওর গ্রহণের পরে দেখা যায়। অতঃপর তারা সবাই জান্নাতে যাবে।” এ হাদীসটি শুনে কেউ একজন হযরত আনাসকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনি কি এটা রাসুলুল্লাহর (সঃ) মুখ থেকে শুনেছেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “জেনে রেখো যে, আমি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলতে শুনেছিঃ “যে ব্যক্তি আমার উপর মিথ্যা আরোপ করে (অর্থাৎ আমি বলি নাই, অথচ আমার উদ্ধৃতি দেয়), সে যেন জাহান্নামে নিজের স্থান বানিয়ে নেয়।” এতদসত্ত্বেও আমি বলছি যে, আমি এ হাদীস স্বয়ং রাসূলুল্লাহর (সঃ) মুখ থেকে শুনেছি।” (এ হাদীসটি হাফিজ আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত আবু মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জাহান্নামবাসী যখন জাহান্নামে একত্রিত হবে এবং তাদের সাথে। আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী কিছু আহলে কিবলাও থাকবে তখন কাফিররা ঐ মুসলমানদেরকে বলবেঃ “তোমরা কি মুসলমান ছিলে না?” তারা উত্তরে বলবেঃ “হা।” তারা তখন বলবেঃ “ইসলাম তো তোমাদের কোন উপকারে আসলো না, তোমরা আমাদের সাথেই তো জাহান্নামে রয়েছো?” তারা এ কথা শুনে বলবেঃ “আমাদের গুনাহ ছিল বলে আমাদেরকে পাকড়াও করা হয়েছে।” আল্লাহ তাআলা তাদের কথা শুনার পর হুকুম করবেনঃ “জাহান্নামে যত আহলে কিবলা রয়েছে তাদের সকলকেই বের করে আন।” এ অবস্থা দেখে জাহান্নামে অবস্থানরত কাফিররা বলবেঃ “হায়! আমরা যদি মুসলমান হতাম তবে আমরাও (জাহান্নাম থেকে বের হয়ে যেতাম যেমন এরা বের হয়ে গেল।”
বর্ণনাকারী বলেন, এরপর রাসুলুল্লাহ (সঃ) পাঠ করেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আলিফ-লাম- রা, এগুলি আয়াত মহাগ্রন্থের, সুস্পষ্ট কুরআনের। কখনো কখনো কাফিররা আকাংখা করবে, যে, তারা যদি মুসলিম হতো!” (এ হাদীসটিও হাফি আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলতে শুনেছিঃ “কতকগুলি মু'মিনকে পাপের কারণে পাকড়াও করতঃ জাহান্নামে নিক্ষেপ করার পর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তা হতে বের করবেন। যখন তিনি তাদেরকে মুশরিকদের সাথে জাহান্নামে প্রবিষ্ট করবেন। তখন মুশরিকরা তাদেরকে বলবেঃ “তোমরা তো দুনিয়ায় ধারণা করতে যে, তোমরা আল্লাহর বন্ধু, অথচ আজ আমাদের সাথে এখানে কেন?” একথা শুনে আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে সুপারিশের অনুমতি দিবেন। তখন ফেরেশতামণ্ডলী, নবীগণ ও মু'মিনরা তাদের জন্যে সুপারিশ করবেন। ফলে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জাহান্নাম হতে মুক্তি দিতে থাকবেন। এ সময় মুশরিকরা বলবেঃ “হায়! আমরা যদি এদের মত (মুমিন) হতাম তবে আমাদের জন্যেও সুপারিশ করা হতো এবং আমরাও এদের সাথে বের হতে. পারতাম।” আল্লাহ পাকের (আরবি) এ উক্তির ভাবার্থ এটাই। এই লোকগুলি যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন তাদের চেহারায় কিছুটা কালিমা থেকে যাবে। কাজেই তাদেরকে জাহান্নামী বলা হবে। অতঃপর তারা প্রার্থনা করবেঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! এ নামটিও বা উপাধিটিও আমাদের থেকে দূর করে দিন।” তখন তাদেরকে জান্নাতের একটি নহরে গোসল করতে বলা হবে এবং এরপর ঐ উপাধিও দূর করে দেয়া হবে।” (এটাও তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
মুহাম্মদ ইবনু আলী (রঃ) তাঁর পিতা থেকে, তিনি তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “(জাহান্নামের) আগুণ তাদের কারো কারো হাঁটু পর্যন্ত ধরবে, কারো ধরবে কোমর পর্যন্ত এবং কারো ধরবে স্কন্ধ পর্যন্ত। এটা হবে পাপ ও আমল অনুযায়ী। কেউ কেউ এক মাস শাস্তি ভোগের পর বেরিয়ে আসবে। আবার কেউ কেউ বেরিয়ে আসবে এক বছর শাস্তি ভোগের পর। দীর্ঘ মেয়াদী শাস্তি ঐ ব্যক্তির হবে, যে দুনিয়ার সময় কাল পর্যন্ত জাহান্নামে থাকবে। অর্থাৎ দুনিয়ার প্রথম দিন থেকে নিয়ে শেষ দিন পর্যন্ত সময়। যখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করার ইচ্ছা করবেন তখন ইয়াহুদী, নাসারা ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী জাহান্নামীরা ঐ (পাপী) একত্ববাদীদেরকে বলবেঃ “তোমরা তো আল্লাহর উপর তাঁর কিতাবসমূহের উপর তাঁর রাসূলদের উপর ঈমান এনেছিলে, তথাপি আজ আমরা ও তোমরা জাহান্নামে সমান (ভাবে শাস্তি ভোগ করছি)।” তাদের এই কথায় আল্লাহ তাআলা এতো বেশী রাগান্বিত হবেন যে, আর কোন কথায় তিনি এতো রাগান্বিত হবেন না। অতপর তিনি এ সময় একত্ববাদীদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করার নির্দেশ দিবেন। তখন তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতের নহরের নিকট নিয়ে যাওয়া হবে।” (আরবি) এর ভাবার্থ। এটাই।” (এ হাদীসটি ইবনু আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
পরিশেষে আল্লাহ তাআ'লা ধমকের সুরে বলেনঃ “হে নবী (সঃ)! তাদেরকে ছেড়ে দাও, তারা খেতে (পরতে) থাকুক, ভোগ বিলাস করতে থাকুক এবং আশা তাদেরকে মোহাচ্ছন্ন রাখুক, পরিণামে তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। তাদেরকে তাদের বহু দূরের আকাংখা কামনা ও বাসনা তাওবা করা ও আল্লাহ তাআলার দিকে ঝুঁকে পড়া হতে উদাসীন ও ভুলিয়ে রাখবে। সত্বরই প্রকৃত অবস্থা খুলে যাবে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।