সূরা ইবরাহীম (আয়াত: 49)
হরকত ছাড়া:
وترى المجرمين يومئذ مقرنين في الأصفاد ﴿٤٩﴾
হরকত সহ:
الْقَهَّارِ ﴿۴۸﴾ وَ تَـرَی الْمُجْرِمِیْنَ یَوْمَئِذٍ مُّقَرَّنِیْنَ فِی الْاَصْفَادِ ﴿ۚ۴۹﴾
উচ্চারণ: ওয়া তারাল মুজরিমীনা ইয়াওমাইযিম মুকাররানীনা ফিল আসফা-দ ।
আল বায়ান: আর সে দিন তুমি অপরাধীদের দেখবে তারা শিকলে বাঁধা।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪৯. আর সেদিন আপনি অপরাধীদেরকে দেখেবেন পরস্পর শৃংখলিত অবস্থায়(১),
তাইসীরুল ক্বুরআন: সেদিন তুমি অপরাধীদেরকে দেখবে শৃঙ্খলে তাদের হাত পা শক্ত করে বাঁধা।
আহসানুল বায়ান: (৪৯) সেদিন তুমি অপরাধীদেরকে দেখবে শিকল দ্বারা বাঁধা অবস্থায়।
মুজিবুর রহমান: সেদিন তুমি অপরাধীদেরকে দেখবে শৃংখলিত অবস্থায়।
ফযলুর রহমান: সেদিন তুমি পাপীদেরকে একত্রে শিকল-পরানো অবস্থায় দেখতে পাবে।
মুহিউদ্দিন খান: তুমি ঐদিন পাপীদেরকে পরস্পরে শৃংখলা বদ্ধ দেখবে।
জহুরুল হক: আর তুমি দেখতে পাবে -- অপরাধীরা সেইদিন শিকলের মধ্যে বাঁধা অবস্থায়, --
Sahih International: And you will see the criminals that Day bound together in shackles,
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪৯. আর সেদিন আপনি অপরাধীদেরকে দেখেবেন পরস্পর শৃংখলিত অবস্থায়(১),
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ যেদিন সমস্ত মানুষ মহান বিচারপতি আল্লাহর সামনে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশিত হবে। তখন যদি আপনি অপরাধীদের দিকে দেখতেন যারা কুফরি ও ফাসাদ সৃষ্টি করে অপরাধ করে বেড়িয়েছে, তারা সেদিন শৃঙ্খলিত অবস্থায় থাকবে। [ইবন কাসীর] এখানে কয়েকটি অর্থ হতে পারে, একঃ কাফেরগণকে তাদের সমমনা সাথীদের সাথে একসাথে শৃংখলিত অবস্থায় রাখা হবে। [ইবন কাসীর] যেমন অন্য আয়াতে এসেছে, “(ফেরেশতাদেরকে বলা হবে,) একত্র কর যালিম ও তাদের সহচরদেরকে এবং তাদেরকে যাদের ইবাদাত করত তারা—” [সূরা আস-সাফফাত: ২২] আরও এসেছে, “আর যখন দেহে আত্মাসমূহ সংযোজিত হবে।” [সূরা আত-তাকওয়ীরঃ ৭] যাতে করে শাস্তি বেশী ভোগ করতে পারে। কেউ কারো থেকে পৃথক হবে না। পরস্পরকে কঠোর শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। দুইঃ তারা নিজেদের হাত ও পা শৃংখলিত অবস্থায় জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে থাকবে। [কুরতুবী] তিনঃ কাফের ও তাদের সাথে যে শয়তানগুলো আছে সেগুলোকে একসাথে শৃংখলিত করে রাখা হবে। [বাগভী; কুরতুবী] এমনও হতে পারে যে, সব কয়টি অর্থই এখানে উদ্দেশ্য।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৪৯) সেদিন তুমি অপরাধীদেরকে দেখবে শিকল দ্বারা বাঁধা অবস্থায়।
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৪৯-৫১ নং আয়াতের তাফসীর:
প্রথম আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করেছেন, কিয়ামতের দিন পাপিষ্ট কাফিররা শিকলে বাঁধা থাকবে, অপমানস্বরূপ তাদেরকে এ শাস্তি দেয়া হবে। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা তাদের এরূপ অপমানকর অবস্থা তুলে ধরে বলেন:
(وَإِذَآ أُلْقُوْا مِنْهَا مَكَانًا ضَيِّقًا مُّقَرَّنِيْنَ دَعَوْا هُنَالِكَ ثُبُوْرًا)
“এবং যখন তাদেরকে শৃংখলিত অবস্থায় কোন সংকীর্ণ স্থানে নিক্ষেপ করা হবে তখন তারা তথায় ধ্বংস কামনা করবে।” (সূরা ফুরকান ২৫:১৩) الْأَصْفَادِ অর্থ শিকল, বেড়ী।
দ্বিতীয় আয়াতে বলেন যে, তাদের জামা হবে আলকাতরার যাতে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং আগুনের তাপ খুব কঠিন হয়। আগুন তাদের মুখমণ্ডল পর্যন্ত আচ্ছন্ন করে নিবে, ফলে পুড়ে এমন অবস্থা হবে যে, তাদেরকে চেনা যাবে না।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(تَلْفَحُ وُجُوْهَهُمُ النَّارُ وَهُمْ فِيْهَا كٰـلِحُوْنَ)
“অগ্নি তাদের মুখমণ্ডল দগ্ধ করবে এবং তারা তথায় থাকবে বীভৎস চেহারায়; (সূরা মু’মিনুন ২৩:১০৪)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন আমার উম্মাতের মাঝে জাহিলী যুগের চারটি বৈশিষ্ট্য থাকবে যা তারা বর্জন করবে না। তা হল
(১) আভিজাত্যের গৌরব করা,
(২) বংশকে গালিগালাজ করা,
(৩) তারকার মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা করা এবং
(৪) মৃত ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে বিলাপ করা। জেনে রেখ, মৃত ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে বিলাপকারিণী মহিলা যদি মৃত্যুর পূর্বে তাওবা না করে মারা যায় তাহলে তাকে আলকাতরার জামা এবং খোস-পাঁচড়ার দোপাট্টা পরিধান করানো হবে।
(সহীহ মুসলিম হা: ৯৩৪)
তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তিনি এ কাজগুলো এ জন্য করবেন, যাতে তিনি প্রত্যেককে তাদের যথাযথ প্রতিদান দিতে পারেন। কারো প্রতি যেন জুলুম না হয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেককে তাদের কৃত-কর্মের ফলাফল পূর্ণ মাত্রায় দান করবেন। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(فَمَنْ يَّعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَّرَه۫ ط وَمَنْ يَّعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَّرَه۫)
“অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলেও তা দেখতে পাবে, এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও দেখতে পাবে।” (সূরা যিলযাল ৯৯:৭-৮)
সুতরাং যে ব্যক্তি যে প্রতিদান পেয়েছে সে জন্য যেন অন্য কাউকে তিরস্কার না করে। কারণ আল্লাহ তা‘আলা কারো প্রতি অনুপরিমাণও জুলুম করবেন না।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. অপরাধীদেরকে কিয়ামতের দিন শিকল দ্বারা বেঁধে রাখা হবে।
২. জাহান্নামীদের পোশাক হবে আলকাতরার।
৩. অগ্নি তাদের মুখমণ্ডল বেষ্টন করে রাখবে।
৪. প্রত্যেককে তার কাজের সঠিক ফলাফল দান করা হবে।
৫. মৃত ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে কান্নাকাটি করা, বিলাপ করা জাহেলী যুগের কাজ, যা ইসলামে হারাম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৪৯-৫১ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তাআলা বলছেনঃ “কিয়ামতের দিন যমীন ও আসমান তো পরিবর্তিত হয়ে যাবে এবং সমস্ত মাখলূক আল্লাহ তাআলার সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে। হে নবী (সঃ)! ঐ দিন তুমি পাপী ও অপরাধীদেরকে শৃংখলিত অবস্থায় দেখতে পাবে। সর্বপ্রকারের গুনাহগার পরস্পরের সাথে মিলিতভাবে থাকবে। যেমন মহান আল্লাহ বলেন (আরবি) অর্থাৎ “একত্রিত কর যালিম ও ওদের সহচরদেরকে।” (৩৭:২২) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “দেহে যখন আত্মা পুনঃসংযোজিত হবে।” (৮১:৭)
অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আর যখন তাদেরকে শৃংখলিত অবস্থায় ওর কোন সংকীর্ণ স্থানে। নিক্ষেপ করা হবে তখন তারা তথায় ধ্বংস কামনা করবে।” (২৫:১৩) আরো বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ এবং শয়তানদেরকে যারা সবাই ছিল প্রাসাদ নির্মাণকারী ও ডুবুরী। আর শৃংখলে আবদ্ধ আরো অনেক কে।” (৩৮:৩৭-৩৮) (আরবি) বলা হয়। বন্দীত্বের শৃংখলকে। ইবনু কুলসুমের কবিতায় (আরবি) এর অর্থ করা হয়েছে শৃংখলে আবদ্ধ বন্দী তাদেরকে যে কাপড় পরিধান করানো হবে তাহবে গন্ধক বা আলকাতরা দ্বারা তৈরী, যা উঁটকে লাগানো হয়। তাতে তাড়াতাড়ি আগুন ধরে যায়। এ শব্দটি (আরবি) ও (আরবি) আছে এবং ও আছে। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, গলিত তামাকে ‘কাতরান’ বলে। ঐ কঠিন গরম আগুনের মত তামা জাহান্নামীদের পোষাক হবে। আগুন তাদের মুখমণ্ডলকে আচ্ছন্ন করবে। মাথা থেকে অগ্নিশিখা উপরের দিকে উঠতে থাকবে। চেহারা বিকৃত হয়ে যাবে।
হযরত আবু মালিক আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমার উম্মতের মধ্যে এমন চারটি কাজ রয়েছে যা তারা পরিত্যাগ করবে না। ১, আভিজাত্যের গৌরব করা, ২, অন্যের বংশকে বিদ্রুপ করা, ৩. নক্ষত্রের মাধ্যমে পানি চাওয়া, ৪. মৃতের উপর বিলাপ করা। জেনে রেখো যে, মৃতের উপর বিলাপকারিণী মহিলা যদি তার মৃত্যুর পূর্বে তাওবা না করে তবে কিয়ামতের দিন তাকে আলকাতরার জামা ও খোস পাচড়ার দোপাট্টা (উত্তরীয়) পরানো হবে।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে এবং ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)
অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “বিলাপকারিণী যদি তাওবা না করেন তবে তাকে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যস্থলে দাঁড় করানো হবে, আর তাকে পরানো হবে আলকাতরার জামা এবং অগ্নি তার মুখমণ্ডলকে আচ্ছন্ন করবে।”
মহান আল্লাহর উক্তিঃ “এটা এই জন্যে যে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন) প্রত্যেকের কৃতকর্মের প্রতিফল দিবেন। মন্দ লোকদের মন্দ কর্ম তাদের সামনে এসে যাবে। আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদের হিসাব গ্রহণে খুবই তৎপর সত্বরই তিনি তাদের হিসাব গ্রহণ পর্ব শেষ করবেন।” সম্ভবতঃ এটা আল্লাহ তাআলার নিম্নের উক্তির মতইঃ (আরবি) অর্থাৎ “মানুষের হিসাব নিকাশের সময় আসন্ন, কিন্তু তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে।” (২১:১) আবার এরও সম্ভাবনা রয়েছে যে, এটা বান্দার হিসাব গ্রহণের সময়ের বর্ণনা অর্থাৎ তাড়াতাড়ি হিসাব গ্রহণ পর্ব শেষ হয়ে যাবে। কেন না, তিনি সব কিছুই জানেন এবং তাঁর কাছে কোন কিছুই গোপন নেই। সারা মাখলুককে সৃষ্টি করা ও তাদের মৃত্যু ঘটিয়ে পুনরুত্থান করা তাঁর কাছে একজনের মতই। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমাদের সকলের সৃষ্টি ও মৃত্যুর পরে পুনরুত্থান আমার কাছে এমনই (সহজ) যেমন তোমাদের একজনকে মারা ও জীবিত করা।” (৩১:২৮) হযরত মুজাহিদের (রঃ) উক্তির অর্থ এটাই যে, হিসাব গ্রহণে আল্লাহ তাআ’লা খুবই তাড়াতাড়িকারী। আবার অর্থ দু'টোই হতে পারে। অর্থাৎ হিসাবের সময়ও নিকটবর্তী এবং হিসাবে আল্লাহ তাআলার বিলম্বও নেই। এদিকে শুরু হলো এবং ওদিকে শেষ হয়ে গেল। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।