সূরা ইবরাহীম (আয়াত: 35)
হরকত ছাড়া:
وإذ قال إبراهيم رب اجعل هذا البلد آمنا واجنبني وبني أن نعبد الأصنام ﴿٣٥﴾
হরকত সহ:
وَ اِذْ قَالَ اِبْرٰهِیْمُ رَبِّ اجْعَلْ هٰذَا الْبَلَدَ اٰمِنًا وَّ اجْنُبْنِیْ وَ بَنِیَّ اَنْ نَّعْبُدَ الْاَصْنَامَ ﴿ؕ۳۵﴾
উচ্চারণ: ওয়া ইয কা-লা ইবরা-হীমুরাব্বিজ‘আল হা-যাল বালাদা আ-মিনাওঁ ওয়াজনুবনী ওয়া বানিইইয়া আন্না‘বুদাল আসনা-ম।
আল বায়ান: আর স্মরণ কর ‘যখন ইবরাহীম বলল, ‘হে আমার রব, আপনি এ শহরকে নিরাপদ করে দিন এবং আমাকে ও আমার সন্তানদেরকে মূর্তি পূজা থেকে দূরে রাখুন’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩৫. আর স্মরণ করুন(১), যখন ইবরাহীম বলেছিলেন, হে আমার রব! এ শহরকে নিরাপদ করুন(২) এবং আমাকে ও আমার পুত্রদেরকে মূর্তি পূজা হতে দূরে রাখুন।(৩)
তাইসীরুল ক্বুরআন: স্মরণ কর, ইবরাহীম যখন বলেছিল, ‘হে আমার রব্ব! তুমি এ নগরীকে নিরাপদ কর আর আমাকে আর আমার সন্তানদেরকে প্রতিমা পূজা থেকে রক্ষে কর।
আহসানুল বায়ান: (৩৫) আর (স্মরণ কর,) যখন ইব্রাহীম বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! এই শহরকে (মক্কাকে) নিরাপদ কর[1] এবং আমাকে ও আমার পুত্রগণকে প্রতিমা পূজা হতে দূরে রাখ।
মুজিবুর রহমান: স্মরণ কর, ইবরাহীম বলেছিলঃ হে আমার রাব্ব! এই শহরকে নিরাপদ করুন এবং আমাকে ও আমার পুত্রদেরকে মূর্তি পূজা হতে দূরে রাখুন।
ফযলুর রহমান: (স্মরণ করো) যখন ইবরাহীম বলেছিল, “হে আমার প্রভু! এই নগরীকে শান্তিপূর্ণ (ও নিরাপদ) করে দাও এবং আমাকে ও আমার পুত্রদেরকে মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখ।”
মুহিউদ্দিন খান: যখন ইব্রাহীম বললেনঃ হে পালনকর্তা, এ শহরকে শান্তিময় করে দিন এবং আমাকে ও আমার সন্তান সন্ততিকে মূর্তি পূজা থেকে দূরে রাখুন।
জহুরুল হক: আর স্মরণ কর! ইব্রাহীম বলেছিলেন -- "আমার প্রভু! এই শহরটাকে নিরাপদ করো, আর আমাকে ও আমার সন্তান-সন্ততিকে পুতুল প্রতিমা পূজা-অর্চনা থেকে রক্ষা করো।
Sahih International: And [mention, O Muhammad], when Abraham said, "My Lord, make this city [Makkah] secure and keep me and my sons away from worshipping idols.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৩৫. আর স্মরণ করুন(১), যখন ইবরাহীম বলেছিলেন, হে আমার রব! এ শহরকে নিরাপদ করুন(২) এবং আমাকে ও আমার পুত্রদেরকে মূর্তি পূজা হতে দূরে রাখুন।(৩)
তাফসীর:
(১) সাধারণ অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করার পর এবার আল্লাহ কুরাইশদের প্রতি যেসব বিশেষ অনুগ্রহ করেছিলেন সেগুলোর কথা বলছেন। এ সংগে একথাও বলা হচ্ছে যে, তোমাদের প্রপিতা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কোন ধরনের প্রত্যাশা নিয়ে কোন ধরনের অনুগ্রহ বর্ষণ করেছিলাম এবং এখন তোমরা নিজেদের প্রপিতার প্রত্যাশা ও নিজেদের রবের অনুগ্রহের জবাবে কোন ধরনের ভ্রষ্টতা ও দুষ্কর্মের অবতারণা করে যাচ্ছো। তিনি তো এ ঘরকে একমাত্র আমার ইবাদতের জন্য তৈরী করেছিলেন। এ ইবরাহীম যার জন্য এ এলাকা আবাদ হয়েছে তিনি তো প্রচণ্ডভাবেই আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর ইবাদাতের বিরোধিতা করে গেছেন। তিনিই তো মক্কার জন্য নিরাপত্তার দোআ করেছেন। [আল-বাহরুল মুহীত, ইবন কাসীর]
(২) এখানে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর দুটি দোআ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম দো'আঃ (رَبِّ اجْعَلْ هَٰذَا الْبَلَدَ آمِنًا) অৰ্থাৎ হে আমার রব! এ (মক্কা) নগরীকে শান্তির আলয় করে দাও। সূরা আল-বাকারায়ও [১২৬ নং আয়াতে] এ দোআর উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে بلد শব্দটি ألف ও لام ব্যতীত بلدا বলা হয়েছে। এর অর্থ অনির্দিষ্ট নগরী। এর কারণ হিসেবে কোন কোন মুফাসসির যা বলেন তা এই যে, এ দোআটি যখন করা হয়েছিল, তখন মক্কা নগরীর পত্তন হয়নি। তাই ব্যাপক অর্থবোধক ভাষায় দো'আ করেছিলেন যে, এ জায়গাকে একটি শান্তির নগরীতে পরিণত করে দিন। এরপর মক্কায় যখন জনবসতি স্থাপিত হয়ে যায়, তখন এ আয়াতে বর্ণিত দোআটি করেন। কারণ এর পরে তাঁর দু ছেলে ইসমাঈল ও ইসহাকের কথা উল্লেখ করেছেন। যা দ্বারা বোঝা যায় যে, দোআটি পরেই করা হয়েছে। কারণ ইসমাঈল আলাইহিস সালাম ইসহাকের চেয়ে তের বছরের বড় ছিলেন। আর প্রথম যখন দোআ করেছিলেন তখন ইসমাঈল ও তাঁর মা-এ দু’জনই ছিলেন। আর ইসমাঈল তখন ছিলেন দুগ্ধপোষ্য শিশু। [আল-বাহরুল মুহীত; ইবন কাসীর]
কোন কোন মুফাসসির বলেন, সূরা বাকারার আয়াতে সে দেশ ও দেশের বাসিন্দা সবার নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে, পক্ষান্তরে এ সূরায় শুধু দেশের নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর] এ ক্ষেত্রে মক্কাকে নির্দিষ্ট করে প্রথমে যে দোআ করেন তা হচ্ছে, একে শান্তির আবাসস্থল করে দিন। আল্লাহ তা'আলা নবীর এ দোআ কবুল করেছেন। তিনি অন্যত্র বলেন, “তারা কি দেখে না আমরা 'হারামকে নিরাপদ স্থান করেছি, অথচ এর চারপাশে যেসব মানুষ আছে, তাদের উপর হামলা করা হয়।” [সূরা আল-আনকাবুত: ৬৭] এখানে লক্ষণীয় যে, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম সবকিছুর আগে নিরাপত্তার জন্য দোআ করেছেন। কারণ, যদি কোন স্থানে নিরাপত্তার অভাব হয়, সেখানে দ্বীন-দুনিয়ার কোন কাজই সঠিকভাবে আঞ্জাম দেয়া সম্ভব হয় না। [ফাতহুল কাদীর]
(৩) দ্বিতীয় দোআ এই যে, আমাকে ও আমার সন্তান-সন্ততিকে মূর্তিপূজা থেকে বাঁচিয়ে রাখুন। নবীগণ নিস্পাপ। কিন্তু এখানে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম দোআ করতে গিয়ে নিজেকেও অন্তর্ভুক্ত করেন। এর কারণ এই যে, স্বভাবজাত ভীতির প্রভাবে নবীগণ সর্বদা শংকা অনুভব করতেন। অথবা আসল উদ্দেশ্য ছিল সন্তান-সন্ততিকে মূর্তিপূজা থেকে বাঁচানোর দোআ করা। সন্তানদেরকে এর গুরুত্ব বোঝাবার জন্য নিজেকেও দোআয় শামিল করে নিয়েছেন। আল্লাহ্ তা'আলা স্বীয় বন্ধুর দো'আ কবুল করেছেন। ফলে তার সন্তানরা শির্ক ও মূর্তিপূজা থেকে নিরাপদ থাকে। [তাবারী; কুরতুবী] তবে তার বংশধরদের মধ্যে মূর্তিপূজা হবে না এমনটি বলা হয়নি এবং ইবরাহীম আলাইহিস সালামও এমন দোআ করেননি। কারণ, মক্কাবাসীরা সাধারণভাবে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এরই বংশধর। তাদের মধ্যে মূর্তিপূজা বিদ্যমান ছিল। প্রত্যেক দো'আকারীর উচিত তার নিজের ও পিতামাতা ও তার সন্তান-সন্তুতিদের জন্য এ দো'আ করা। [ইবন কাসীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৩৫) আর (স্মরণ কর,) যখন ইব্রাহীম বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! এই শহরকে (মক্কাকে) নিরাপদ কর[1] এবং আমাকে ও আমার পুত্রগণকে প্রতিমা পূজা হতে দূরে রাখ।
তাফসীর:
[1] এই শহর অর্থাৎ মক্কা। ‘এই শহরকে নিরাপদ কর’ অন্যান্য দু’আর পূর্বে এই দু’আ করলেন এই কারণে যে, নিরাপত্তা ও শান্তি কায়েম থাকলে মানুষ অন্যান্য নিয়ামত থেকেও ঠিকভাবে উপকৃত হতে পারবে, নচেৎ শান্তি-স্বস্তি ব্যতীত সমস্ত সুখ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ভয় ও আতঙ্ক মানুষকে কাতর ও পেরেশান করে রাখে। যেমন বর্তমানে সঊদী আরব ছাড়া অন্যান্য দেশের অবস্থা। সঊদী আরবে আজও সেই দু’আর বর্কতে এবং ইসলামী আইন চালু থাকার কারণে দৃষ্টান্তমূলক শান্তি বিরাজ করছে। আল্লাহ এ দেশকে যাবতীয় অমঙ্গল ও ফিতনা থেকে রক্ষা করুন। আমীন। এখানে মহান আল্লাহর নানা অনুগ্রহের অন্তর্গত নিরাপত্তার মত একটি বড় অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে ইঙ্গিত করেছেন যে, কুরাইশ যেরূপ আল্লাহর অন্যান্য নিয়ামত থেকে উদাসীন, অনুরূপ এই বিশেষ নিয়ামত থেকেও উদাসীন যে, তিনি তাদেরকে মক্কার মত নিরাপদ ও শান্তিময় শহরের বাসিন্দা বানিয়েছেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৩৫-৪১ নং আয়াতের তাফসীর:
মক্কার নিরাপত্তা ও শির্ক থেকে নিজে ও সন্তানদেরকে বাঁচার জন্য আল্লাহ তা‘আলার দরগাহে মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহীম (عليه السلام) যে দু‘আ করেছিলেন সে কথা অত্র আয়াতগুলোতে তুলে ধরা হয়েছে। উক্ত আয়াতে هذا البلد দ্বারা মক্কা নগরীকে বোঝানো হয়েছে। ইবরাহীম (عليه السلام) প্রথমেই নিরাপত্তার দু‘আ করলেন এজন্য যে, কোন স্থানে নিরাপত্তা না থাকলে সে স্থান যতই মূল্যবান হোক আর যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক তাতে কেউ যেতে চাইবে না। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর দু‘আ কবূল করলেন যার ফলে আজও সেখানে নিরাপত্তা বিরাজ করছে, কোন হত্যা, খুন, রাহাজানি, বিবাদ নেই ইত্যাদি ইত্যাদি; এমনকি পশুপাখি পর্যন্তও নিরাপদে থাকে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا جَعَلْنَا حَرَمًا اٰمِنًا وَّيُتَخَطَّفُ النَّاسُ مِنْ حَوْلِهِمْ)
“তারা কি দেখে না আমি ‘হারাম'কে নিরাপদ স্থান করেছি, অথচ তার চতুষ্পার্শ্বে যেসব মানুষ আছে, তাদেরকে ছিনিয়ে নেয়া হয় (হামলা করা হয়)।” (সূরা আনকাবুত ২৯:৬৭)
যারা অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এ ঘরের দিকে অগ্রসর হয়েছে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ধূলিস্যাৎ করে দিয়েছেন, কিয়ামত পর্যন্ত এ ঘর এবং এ ঘরে যারা আসবে সবাই নিরাপদে থাকবে।
(وَّاجْنُبْنِيْ وَبَنِيَّ)
তিনি আরো দু‘আ করলেন তাঁর জন্য এবং তাঁর সন্তানদের জন্য যেন তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা মূর্তি পূজা থেকে বাঁচিয়ে রাখেন। এখানে তৎকালীন মক্কার মুশরিকদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয়া হয়েছে। তারা দাবী করত আমরা ইবরাহীমের মিল্লাতের অনুসারী, ইবরাহীম (عليه السلام) তো প্রতিমা পূজারী ছিলেন না, তিনি কাবা নির্মাণ করলেন তাওহীদের ওপর ভিত্তি করে। ভবিষ্যতে কখনো যাতে শির্ক না হয় সে জন্য তিনি আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করলেন যেন তিনি তাঁকে ও তাঁর সন্তানদেরকে শির্ক থেকে রক্ষা করেন। অথচ তোমরা কাবা ঘরে মূর্তি রেখে পূজা করছ আর বলছ, আমরা ইবরাহীম (عليه السلام) এর অনুসারী।
আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম (عليه السلام)-এর এই দু‘আ তাঁর কিছু সন্তানের জন্য কবূল করলেন এবং কিছু সন্তানের জন্য কবূল করেননি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِمَا مُحْسِنٌ وَّظٰلِمٌ لِّنَفْسِه۪ مُبِيْنٌ)
“তাদের বংশধরদের মধ্যে কতক ছিল সৎ লোক এবং কতক নিজেদের ওপর প্রকাশ্য অত্যাচারী।” (সূরা স্বফ্ফাত ৩৭:১১৩)
অর্থাৎ সবাই তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারবে না, কেবল আল্লাহ তা‘আলা যাদেরকে তাওফীক দান করবেন তারাই পারবে।
সন্তানের ভবিষ্যত মঙ্গল কামনা করে সব পিতা-মাতাই দু‘আ করে থাকে। পিতা-মাতার উচিত সন্তানকে শির্ক থেকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করা যেমন ইবরাহীম (عليه السلام) করেছেন।
(إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيْرًا)
অর্থাৎ এসব মূর্তি, প্রতিমা অনেক মানুষকে পথভ্রষ্ট করেছে। প্রশ্ন হতে পারে এরা তো জড় পদার্থ, এরা পথভ্রষ্ট করল কিভাবে? উত্তর এরা পথভ্রষ্ট করেনি, কিন্তু এদের কারণে মানুষ পথভ্রষ্ট হয়েছে। এদেরকে অনেকে কল্যাণদাতা, অকল্যাণ প্রতিরোধকারী মনে করে ইবাদত করে। তাই ইবরাহীম (عليه السلام) বললেন: যারা তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে তারাই আমার অন্তর্ভুক্ত, আমার মিল্লাতভুক্ত। আর যারা আমার অবাধ্য হবে তথা আমি যে তাওহীদের বাণী নিয়ে এসেছি তা বর্জন করবে তাদের দায়িত্ব তোমার হাতে, তুমি ক্ষমাশীল দয়ালু। যেমন
ঈসা (عليه السلام)-ও বলেছিলেন:
(إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ ج وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيْزُ الْحَكِيْمُ)
“তুমি যদি তাদেরকে শাস্তি দাও তবে তারা তো তোমারই বান্দা, আর যদি তাদেরকে ক্ষমা কর তবে তুমি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’’ (সূরা মায়িদা ৫:১১৮)
সুতরাং কেউ কথা অমান্য করলে রাগের বশবর্তী হয়ে তার ওপর বদ্দু‘আ করা যাবেনা বরং তার ওপর রহমতের দু‘আ করতে হবে। যেন আল্লাহ তা‘আলা তাকে সঠিক জিনিস বোঝার জ্ঞান দান করেন।
হাজেরার ঘরে যখন ইসমাঈল (عليه السلام) জন্ম নিলেন তখন ইবরাহীম (عليه السلام) কে আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিলেন তিনি যেন হাজেরা ও সন্তান ইসমাঈলকে নির্জন মরুভূমি মক্কায় রেখে আসে। বৃদ্ধ বয়সে একটি সন্তান পেলেন তাও নিজের কাছে রাখার সুযোগ পেলেন না। আল্লাহ তা‘আলার আদেশ পেতে দেরী, পালন করতে দেরী নয়। সকল মায়া মমতা বর্জন করে স্ত্রী হাজেরা ও কলিজার টুকরা ইসমাঈলকে রেখে আসলেন। যখন রেখে চলে আসেন তখন হাজেরা বললেন: আপনি কি নিজের পক্ষ থেকে রেখে যাচ্ছেন, না কি আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে?
ইবরাহীম ভারাক্রান্ত মনে কথা বলতে পারছেন না, হাত দিয়ে আকাশের দিকে ইশারা করে বললেন, আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে। তখন হাজেরা বললেন: তাহলে কোন চিন্তা নেই, যে আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে রেখে যাচ্ছেন সে আল্লাহ তা‘আলাই আমাদের ব্যবস্থা করবেন। তখন ইবরাহীম (عليه السلام) এ দু‘আ করলেন ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমি আমার বংশধরদের কতককে বসতি করলাম অনুর্বর (চাষাবাদহীন) উপত্যকায় তোমার পবিত্র গৃহের নিকট, হে আমাদের প্রতিপালক! তারা যেন সালাত কায়েম করে।’
مِنْ এখানে تبعضية বা আংশিক অর্থে ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ কিছু লোক, উদ্দেশ্য হল মুসলিমগণ। আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম (عليه السلام) এর দু‘আ কবূল করে নিলেন, ফলে সারা পৃথিবী থেকে মুসিলমরা দলে দলে হজ্জের মওসুমে উপস্থিত হয়, হজ্জের মওসুম ছাড়াও এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে। এমনকি যাদের হজ্জ করার সামর্থ নেই তাদের মনে আগ্রহ থাকে, যদি একবার সেখানে যেতে পারতাম। এভাবে আল্লাহ তা‘আলা মুসিলমদের মনে মক্কার প্রতি একটি আগ্রহ সৃষ্টি করে দিয়েছেন।
(وَارْزُقْهُمْ مِّنَ الثَّمَرٰتِ)
এ দু‘আরও প্রভাব লক্ষ্যণীয়, মক্কার মত বৃক্ষ-লতাহীন মরুভূমি, যেখানে কোন ফলফলাদি আবাদ হয় না সেখানে আজ বিভিন্ন রকমের ফলফলাদি সর্বদা পর্যাপ্ত পরিমাণ পাওয়া যায়, যদিও মওসুম না হয়।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “আর স্মরণ কর! যখন ইবরাহীম বললেন: হে আমার রব! এ স্থানকে তুমি নিরাপত্তাময় শহরে পরিণত কর এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছে, তাদেরকে জীবিকার জন্য ফল-শস্য প্রদান কর। আল্লাহ বলেন, যারা অবিশ্বাস করে তাদেরকে আমি অল্পদিন ভোগ করতে দেব। পরে তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে বাধ্য করব, এটি নিকৃষ্টতম গন্তব্যস্থল! ” (সূরা বাক্বারাহ ২:১২৬)
(رَبَّنَآ إِنَّكَ تَعْلَمُ مَا نُخْفِيْ وَمَا نُعْلِنُ)
অর্থাৎ হে আল্লাহ তা‘আলা যেহেতু তুমি সব জান, কোন কিছুই তোমার কাছে গোপন নেই সেহেতু তুমি আমার দু‘আর উদ্দেশ্যও জান। সুতরাং তুমি আমার দু‘আ কবূল করে নিও।
বৃদ্ধ বয়সে সন্তান ইসমাঈল ও ইসহাককে পেয়ে ইবরাহীম (عليه السلام) আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করলেন, আর তিনি প্রার্থনা করলেন যেন তিনি সালাত কায়েম করতে পারেন এবং তাঁর উত্তরসূরীগণ। আরো দু‘আ করলেন যাতে তাঁকে, পিতা-মাতাকে এবং সকল মু’মিনদেরকে হিসাবের দিন আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা করে দেন। তবে তাঁর পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা তখন করেছিলেন যখন তিনি জানতেন না যে, তার পিতা আল্লাহ তা‘আলার দুশমন। যখন জানতে পারলেন তখন এ দু‘আ থেকে বিরত থাকলেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَمَا كَانَ اسْتِغْفَارُ إِبْرٰهِيْمَ لِأبِيْهِ إِلَّا عَنْ مَّوْعِدَةٍ وَّعَدَهَآ إِيَّاهُ ج فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَه۫ أَنَّه عَدُوٌّ لِّـلّٰهِ تَبَرَّأَ مِنْهُ ط إِنَّ إِبْرٰهِيْمَ لَأَوَّاهٌ حَلِيْمٌ)
“ইব্রাহীম তার পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল, তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বলে; অতঃপর যখন এটা তার নিকট সুস্পষ্ট হল যে, সে আল্লাহর শত্র“ তখন ইব্রাহীম তার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করল। ইব্রাহীম তো কোমল হৃদয়সম্পন্ন ও সহনশীল।” (সূরা তাওবা ৯:১১৪)
কারণ কাফির-মুশরিকদের জন্য দু‘আ করা কোন নবী-রাসূলের জন্য সমীচীন নয়।
আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْآ أَنْ يَّسْتَغْفِرُوْا لِلْمُشْرِكِيْنَ وَلَوْ كَانُوْا أُولِيْ قُرْبٰي مِنْۭ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحٰبُ الْجَحِيْمِ)
“নিকট আত্মীয়-স্বজন হলেও মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা নাবী এবং মু’মিনদের জন্য সংগত নয় যখন এটা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, নিশ্চিতই তারা জাহান্নামী।” (সূরা তাওবাহ ৯:১১৩)
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. পিতা-মাতার উচিত সন্তানের জন্য ভাল দু‘আ করা।
২. কোন মানুষের জন্য বদদু‘আ করা উচিত নয়।
৩. মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করে, তাই ইসলাম সন্ন্যাসী জীবন পছন্দ করে না।
৪. কোন খুশির সংবাদ পেলে আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা আদায় করতে হবে। যেমন ইবরাহীম (عليه السلام) সন্তান লাভ করার পর আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করেছেন।
৫. ভালো কাজ করার জন্য আল্লাহ তা‘আলার তাওফীক কামনা করতে হবে।
৬. সন্তান পিতা-মাতার জন্য উত্তম দু‘আ করবে।
৭. মক্কা ও পার্শ্ববর্তী হারাম এলাকা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে নিরাপত্তাপ্রাপ্ত। সেখানে কোন মারামারি, হানাহানি ইত্যাদি কিছুই হবে না।
৮. মু’মিন ব্যক্তিদের উচিত পরস্পরের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা ।
৯. কোন কাফির-মুশরিকদের জন্য ক্ষমা চাওয়া জায়েয নয়।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৩৫-৩৬ নং আয়াতের তাফসীর
এই স্থলে আল্লাহ তাআলা আরবের মুশরিকদের বিরুদ্ধে হুজ্জত হিসেবে বর্ণনা করেছেন যে, পবিত্র ও মর্যাদাসম্পন্ন শহর মক্কা প্রথম সূচনাতেই আল্লাহ তাআলার তাওহীদ বা একত্ববাদের উপরেই নির্মাণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ এটা নির্মাণের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল এই যে, এখানে শুধুমাত্র একক ও শরীকহীন আল্লাহরই ইবাদত করা হবে। এর প্রথম নির্মাতা হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহ ছাড়া অন্যদের উপাসনাকারীদের থেকে ছিলেন সম্পূর্ণ রূপে মুক্ত ও পৃথক। এটা যেন নিরাপদ শহর হয় এজন্যে তিনি আল্লাহ তাআলা নিকট প্রার্থনা করেছিলেন এবং তিনি তাঁর প্রার্থনা কবুল করেছিলেন। সর্বপ্রথম বরকত ও হিদায়াতপূর্ণ আল্লাহর যে ঘর তা মক্কার এই ঘরটিই বটে। সেখানে অন্যান্য বহু নিদর্শন ছাড়াও মাকামে ইবরাহীম (আঃ) রয়েছে। এই শহরে যে পৌছবে। সে নিরাপত্তা লাভ করবে। এই শহরটি বানানোর পর হযরত ইবরাহীম খলীল (আঃ) প্রার্থনা করেছিলেনঃ “হে আল্লাহ! এটাকে আপনি নিরাপত্তাপূর্ণ শহর বানিয়ে দিন। এ জন্যেই তিনি বলেনঃ “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্যে যিনি আমাকে বৃদ্ধ বয়সে ইসমাঈল (আঃ) ও ইসহাককে (আঃ) দান করেছেন।” হযরত ইসমাঈল (আঃ) বয়সে হযরত ইসহাক (আঃ) অপেক্ষা তের বছরের বড় ছিলেন। দুগ্ধপোষ্য শিশু অবস্থায় যখনহযরত ইসমাঈলকে (আঃ) তাঁর মাতাসহ হযরত ইবরাহীম (আঃ) এখানে এনেছিলেন তার পূর্বেও তিনি এটা নিরাপত্তাপূর্ণ শহর হওয়ার প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু ঐ সময় প্রার্থনার শব্দগুলি ছিল নিম্নরূপঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ! আপনি এটাকে নিরাপদ শহর করে দিন।” এই দুআ’য় (আরবি) ও (আরবি) নেই। কেননা, এই প্রার্থনা ছিল এই শহরটি জনবসতিপূর্ণ হওয়ার পূর্বে। আর এর পর শহরটি আবাদ হয়ে গিয়েছিল বলে । শব্দকে আনা হয়েছে। সূরায়ে বাকারায় আমরা এগুলি বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করেছি। দ্বিতীয় দুআ’য় তিনি তাঁর সন্তানদেরকেও শরীক করেন। অতঃপর তিনি প্রতিমাগুলির পথভ্রষ্টতা ও ওগুলির ফিৎনা অধিকাংশ লোককে বিভ্রান্ত করার কথা বর্ণনা করতঃ তাদের প্রতি (অর্থাৎ প্রতিমা পূজকদের প্রতি) নিজের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং তাদেরকে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেন যে, তিনি ইচ্ছা করলে তাদেরকে ক্ষমা করবেন এবং ইচ্ছা করলে শাস্তি দিবেন। যেমন হযরত ঈসা (আঃ) বলেছিলেনঃ “যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি দেন তবে তারা তো আপনারই বান্দা, আর যদি তাদেরকে ক্ষমা করেন তবে আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” এটা স্মরণ রাখা দরকার যে, এটা শুধু আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় প্রত্যাবর্তন করা মাত্র। এটা নয় যে, ওটা সংঘটিতহওয়াকে বৈধ মনে করা। হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইবরাহীমের (আঃ) (আরবি) এই উক্তিটি এবং হযরত ঈসার (আঃ) (আরবি) (৫:১২৮) এই উক্তিটি পাঠ করেন। অতঃপর হাত উঠিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহ! আমার উম্মত (এর কি হবে!)” এটা তিনি তিনবার বলেন। এবং কাঁদতে থাকেন। তখন আল্লাহ তাআলা হযরত জিবরাঈলকে (আঃ) তাঁর কাছে পাঠিয়ে তাঁকে তাঁর কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করতে বললেন। তিনি তখন হযরত জিবরাঈলকে (আঃ) তাঁর কাঁদার কারণ বললেন। তখন আল্লাহ তাআলা হযরত জিবরাঈলকে (আঃ) হুকুম করলেনঃ “তুমি মুহাম্মদের (সঃ) কাছে গিয়ে বলঃ “আমি (আল্লাহ) তাকে তার উম্মতের ব্যাপারে খুশী করবো, অসন্তুষ্ট করবো না।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।