আল কুরআন


সূরা ইবরাহীম (আয়াত: 32)

সূরা ইবরাহীম (আয়াত: 32)



হরকত ছাড়া:

الله الذي خلق السماوات والأرض وأنزل من السماء ماء فأخرج به من الثمرات رزقا لكم وسخر لكم الفلك لتجري في البحر بأمره وسخر لكم الأنهار ﴿٣٢﴾




হরকত সহ:

اَللّٰهُ الَّذِیْ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضَ وَ اَنْزَلَ مِنَ السَّمَآءِ مَآءً فَاَخْرَجَ بِهٖ مِنَ الثَّمَرٰتِ رِزْقًا لَّکُمْ ۚ وَ سَخَّرَ لَکُمُ الْفُلْکَ لِتَجْرِیَ فِی الْبَحْرِ بِاَمْرِهٖ ۚ وَ سَخَّرَ لَکُمُ الْاَنْهٰرَ ﴿ۚ۳۲﴾




উচ্চারণ: আল্লা-হুল্লাযী খালাকাছছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদা ওয়া আনযালা মিনাছছামাই মাআন ফাআখরাজা বিহী মিনাছছামারা-তি রিযকাল লাকুম ওয়াছাখখারা লাকুমুল ফুলকা লিতাজরিয়া ফিল বাহরি বিআমরিহী ওয়া ছাখখারা লাকুমুল আনহা-র।




আল বায়ান: আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। আর তিনি আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন ফলে তা দ্বারা ফল-ফলাদি থেকে তোমাদের জন্য রিয্ক উৎপাদন করেন এবং তিনি নৌযানকে তোমাদের জন্য নিয়োজিত করেছেন, যাতে তাঁর আদেশে সমুদ্রে তা চলাচল করে এবং নদীসমূহকে তোমাদের জন্য নিয়োজিত করেছেন।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৩২. আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন(১), আর যিনি আকাশ হতে পানি বর্ষণ করে তা দিয়ে তোমাদের জীবিকার জন্য ফলমূল উৎপাদন করেন এবং যিনি নৌযানকে তোমাদের অনুগত করে দিয়েছেন যাতে তার নির্দেশে সেগুলো সাগরে বিচরণ করে এবং যিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন নদীসমূহকে।(২)




তাইসীরুল ক্বুরআন: তিনিই আল্লাহ যিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, তিনি আকাশ হতে পানি বর্ষণ করেন যা দিয়ে নানা প্রকার ফলফলাদি জন্মে তোমাদের জীবিকার জন্য। তিনি নৌযানগুলোকে তোমাদের নিয়ন্ত্রণাধীন করে দিয়েছেন, যাতে সেগুলো তাঁর নির্দেশে সমুদ্রে চলাচল করে আর তিনি নদীগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন।




আহসানুল বায়ান: (৩২) আল্লাহ; যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, যিনি আকাশ হতে পানি বর্ষণ করে তার দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্য ফল-মূল উৎপাদন করেছেন, যিনি নৌযানকে তোমাদের অধীন করেছেন; যাতে তাঁর নির্দেশে তা সমুদ্রে বিচরণ করে এবং যিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন নদীসমূহকে।[1]



মুজিবুর রহমান: তিনিই আল্লাহ যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, যিনি আকাশ হতে পানি বর্ষণ করে তদ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্য ফল-মূল উৎপাদন করেন, যিনি নৌযানকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তাঁর বিধানে ওটা সমুদ্রে বিচরণ করে এবং যিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন নদীসমূহকে।



ফযলুর রহমান: আল্লাহ হচ্ছেন সেই মহান সত্তা যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং আসমান থেকে পানি (বৃষ্টি) বর্ষণ করে তা দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্য ফলফলাদি উৎপন্ন করেছেন। তিনি নৌযানকে তোমাদের কাজে লাগার উপযোগী করেছেন, তাই তাঁর হুকুমেই তা সমুদ্রে (পানিতে) চলতে পারে। তিনি নদ-নদীকেও তোমাদের কাজে লাগিয়েছেন।



মুহিউদ্দিন খান: তিনিই আল্লাহ, যিনি নভোমন্ডল ও ভুমন্ডল সৃজন করেছেন এবং আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে অতঃপর তা দ্বারা তোমাদের জন্যে ফলের রিযিক উৎপন্ন করেছেন এবং নৌকাকে তোমাদের আজ্ঞাবহ করেছেন, যাতে তাঁর আদেশে সমুদ্রে চলা ফেরা করে এবং নদ-নদীকে তোমাদের সেবায় নিয়োজিত করেছেন।



জহুরুল হক: আল্লাহ্ তিনিই যিনি মহাকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, আর আকাশ থেকে বর্ষণ করেন পানি, তারপর তার সাহায্যে তিনি উৎপাদন করেন তোমাদের জীবিকার জন্য ফলমূল, আর তোমাদের জন্য তিনি অধীন করেছেন জাহাজ যেন তাঁর বিধান অনুযায়ী তা সমুদ্রে চলাচল করে, আর তোমাদের জন্য তিনি বশীভূত করেছেন নদনদী।



Sahih International: It is Allah who created the heavens and the earth and sent down rain from the sky and produced thereby some fruits as provision for you and subjected for you the ships to sail through the sea by His command and subjected for you the rivers.



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৩২. আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন(১), আর যিনি আকাশ হতে পানি বর্ষণ করে তা দিয়ে তোমাদের জীবিকার জন্য ফলমূল উৎপাদন করেন এবং যিনি নৌযানকে তোমাদের অনুগত করে দিয়েছেন যাতে তার নির্দেশে সেগুলো সাগরে বিচরণ করে এবং যিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন নদীসমূহকে।(২)


তাফসীর:

(১) এ আয়াত এবং এর পরবর্তী কয়েকটি আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর অনেকগুলো নেয়ামত স্মরণ করিয়ে মানুষকে ইবাদাত ও আনুগত্যের দাওয়াত দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, তিনিই এমন সত্তা, যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, যাদের উপর মানুষের অস্তিত্বের সূচনা ও স্থায়ীত্ব নির্ভরশীল। এরপর তিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন, যার সাহায্যে হরেক রকমের ফলফলাদি সৃষ্টি করেছেন। যাতে সেগুলো তাদের রিযক হতে পারে। অথচ তাঁর নিয়ামত অস্বীকার করা হচ্ছে, তাঁর বন্দেগী ও আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া হচ্ছে, তাঁর সাথে জোর করে অংশীদার বানিয়ে দেয়া হচ্ছে। এসব সবই তাঁর দান, যাঁর দানের কোন সীমা-পরিসীমা নেই।


(২) আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ তা'আলাই নৌকা ও জাহাজসমূহকে তোমাদের কাজে নিয়োজিত করেছেন। এরা আল্লাহর নির্দেশে নদ-নদীতে চলাফেরা করে। আয়াতে ব্যবহৃত سَخَّرَ শব্দের অর্থ ذَلَّلَ وَيَسَّرَ অনুগত করেছেন এবং উপকৃত হওয়া সহজ করেছেন। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা কিছু জিনিস তোমাদের অনুগত করে দিয়েছেন। তন্মধ্যে কিছু এমন জিনিসও আছে যেগুলো থেকে কল্যাণ লাভ করা তোমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। সে হিসেবে আয়াতের অর্থ হবে, আল্লাহ তা'আলা ঐ সত্তা যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, অস্তিত্বহীন অবস্থা থেকে অস্তিত্বে নিয়ে এসেছেন। তিনি মেঘ থেকে বৃষ্টি নাযিল করেছেন। যা দ্বারা তিনি মৃত ভূমিকে জীবিত করেছেন। তা থেকে তিনি তোমাদের রিযকের ব্যবস্থা করেছেন। তোমাদের জন্য নৌকা ও জাহাজকে অনুগত ও সহজ করে দিয়েছেন যাতে তার নির্দেশে সেটি সমুদ্রে তোমাদের উপকারার্থে চলাফেরা করে। আর নদীগুলোকে তোমাদের পান করার জন্য, তোমাদের চতুষ্পদ জন্তুদের পানের সুবিধার্থে, তোমাদের ক্ষেত-খামারে পানি দেয়ার স্বার্থে, অনুরূপ তোমাদের যাবতীয় উপকারার্থে অনুগত ও সহজ করে দিয়েছেন। [মুয়াসসার]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৩২) আল্লাহ; যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, যিনি আকাশ হতে পানি বর্ষণ করে তার দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্য ফল-মূল উৎপাদন করেছেন, যিনি নৌযানকে তোমাদের অধীন করেছেন; যাতে তাঁর নির্দেশে তা সমুদ্রে বিচরণ করে এবং যিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন নদীসমূহকে।[1]


তাফসীর:

[1] মহান আল্লাহ সৃষ্টিকুলের প্রতি যেসব অনুগ্রহ ও সম্পদ দান করেছেন, সেসবের মধ্যে কিছুর বর্ণনা এখানে করা হচ্ছে। বলেছেন, তিনি আকাশকে ছাদ এবং যমীনকে বিছানা বানিয়েছেন। আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করে বিভিন্ন প্রকারের গাছপালা এবং ফসল উৎপন্ন করেছেন; যার মধ্যে রয়েছে স্বাদ উপভোগ ও শক্তি সঞ্চয়ের জন্য ফলমূল এবং নানা ধরনের শস্য; যার রং ও আকার এক অপর থেকে ভিন্ন এবং স্বাদ, সুগন্ধি ও উপকারিতাও পৃথক পৃথক। নৌকা ও জলজাহাজকে মানুষের খিদমতে লাগিয়ে দিয়েছেন, যা উত্তাল তরঙ্গ ভেদ করে চলে, মানুষকে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পৌঁছে দেয় এবং পণ্যসামগ্রীও এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বহন করে। ভূপৃষ্ঠ ও পাহাড় থেকে ঝর্ণাধারা ও নদী-নালা প্রবাহিত করেছেন, যাতে করে তোমরা নিজেরাও পানি পান করতে পার এবং বাগান-ক্ষেতও সেচতে সক্ষম হও।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৩২-৩৪ নং আয়াতের তাফসীর:



উক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা মানুষের প্রতি যে অগণিত নেয়ামত দান করেছেন তারই কয়েকটির বর্ণনা দিয়েছেন।



তিনি আকাশকে সৃষ্টি করে একটি সুরক্ষিত ছাদস্বরূপ বানিয়ে রেখেছেন, আকাশকে সুশোভিত করেছেন তারকা দ্বারা, জমিন সৃষ্টি করে বিছানার মত বিছিয়ে বসবাসের উপযোগী করে দিয়েছেন। আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করে জমিনে বিভিন্ন ফলফলাদি, শস্য ও ফসল উৎপন্ন করে জীবিকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তিনি নৌযান ও নদীসমূহকে মানুষের অনুগত করে দিয়েছেন যাতে তারা সমুদ্রে বিচরণ করে একস্থান থেকে অন্যস্থানে যেতে পারে, তাঁর অনুগ্রহ অর্জন করতে পারে। এ ছাড়াও আরো বড় নেয়ামত চন্দ্র-সূর্য, দিবা-রাত্রি সকল জিনিসকে মানুষের কল্যাণার্থে নিয়োজিত রেখেছেন। তারা প্রত্যেকেই নিজ কক্ষ পথে অবিরাম বিচরণ করে, একে আপরকে অতিক্রম করে না, পরস্পর ধাক্কা খায় না।



আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(لَا الشَّمْسُ یَنْۭبَغِیْ لَھَآ اَنْ تُدْرِکَ الْقَمَرَ وَلَا الَّیْلُ سَابِقُ النَّھَارِﺚ وَکُلٌّ فِیْ فَلَکٍ یَّسْبَحُوْنَﭷ)



“সূর্যের সাধ্য নেই যে, সে চন্দ্রকে ধরে ফেলে এবং রাতও দিনের পূর্বে আসতে পারে না। প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষে চলছে।” (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৪০)



আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:



(يُغْشِي اللَّيْلَ النَّهَارَ يَطْلُبُه۫ حَثِيْثًا لا وَّالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُوْمَ مُسَخَّرٰتٍۭ بِأَمْرِه۪ ط أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ ط تَبٰرَكَ اللّٰهُ رَبُّ الْعٰلَمِيْنَ)



“তিনিই দিবসকে রাত্রি দ্বারা আচ্ছাদিত করেন যাতে তাদের একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে, আর সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি, যা তাঁরই আজ্ঞাধীন, জেনে রাখ যে, সৃষ্টি তাঁর, হুকুমও (চলবে) তাঁর। বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ, তিনি বরকতময়।” (সূরা আ’রাফ ৭:৫৪)



এ ছাড়াও সূর্যের আলোর অনেক উপকার রয়েছে। সূর্যের আলো না হলে কোন কিছু জন্মাবে না, দিন-রাতের পার্থক্য বুঝা যাবে না। মূলত প্রত্যেক বস্তু—কে আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টি করেছেন মানুষের উপকারার্থে।



এসব ছাড়াও মানুষ যা চায় আল্লাহ তা‘আলা সব দিয়েছেন। সুতরাং তিনি আমাদেরকে যে অফুরন্ত নেয়ামত দান করেছেন, তা গণনা করে শেষ করতে পারবো না। সুন্দর একটি শরীর দিয়েছেন, সুস্থতা দিয়েছেন, কাজ করার ক্ষমতা দিয়েছেন, এ ছাড়াও কত নেয়ামত দিয়েছেন যার হিসাব আমরা করতে পারব না।



ইমাম বুখারী (রহঃ) এ প্রসঙ্গে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন, “রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, সমস্ত প্রশংসা ও গুণগান আল্লাহ তা‘আলারই জন্য। আমাদের প্রশংসা মোটেই যথেষ্ট নয় এবং তা পূর্ণ ও বেপরোয়াকারীও নয়। সুতরাং হে আমাদের প্রতিপালক! (আমাদের অপারগতার জন্য আমাদেরকে ক্ষমা করুন)। (সহীহ বুখারী হা: ৫৪৫৮)



একদা দাঊদ (عليه السلام) বললেন: হে রব! আমি তোমার নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা কিভাবে প্রকাশ করব? অথচ স্বয়ং কৃতজ্ঞতা প্রকাশই তোমার পক্ষ থেকে আমার প্রতি নেয়ামত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: হে দাঊদ! তখন তুমি আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে যখন তুমি স্বীকার করে বলবে যে, হে আল্লাহ তা‘আলা! আমি তোমার নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে অপারগ। (তাফসীর ইবনু কাসীর )



ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেন: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্যই, যার অসংখ্য নেয়ামতরাজির মধ্যে একটি হচ্ছে নেয়ামতের শুকরিয়া যা নতুন একটি নেয়ামত ছাড়া করা যায় না। ঐ নতুন নেয়ামতের ওপর আবার আরেকটি শুকরিয়া আদায় করা ওয়াজিব হয়ে যায়। এভাবে আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামত অসংখ্য যার পূর্ণ শুকরিয়া আদায় করা অসম্ভব।



সুতরাং মানুষের উচিত হবে না, আল্লাহ তা‘আলার অকৃতজ্ঞ হয়ে নিজের প্রতি জুলুম করা। বরং কর্তব্য হল তিনি যে নেয়ামত দান করেছেন সে জন্য তাঁর শুকরিয়া আদায় করা, শুকরিয়া আদায় করলে তিনি আরো নেয়ামত বৃদ্ধি করে দেবেন।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. আকাশ থেকে পানি বর্ষণের মাধ্যমে জমিন থেকে খাদ্য দ্রব্য উৎপন্ন হয়।

২. পৃথিবীর সকল বস্তু মানুষের উপকারার্থে সৃষ্ট।

৩. আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে অগণিত নেয়ামত দান করেন।

৪. সকলের উচিত নেয়ামত পেয়ে শুকরিয়া আদায় করা।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৩২-৩৪ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তাআলা তাঁর অসংখ্য নিয়ামতের কথা বলছেন যা তাঁর মাখলুকাতের উপর রয়েছে। আকাশকে তিনি একটি সুরক্ষিত ছাদ বানিয়ে রেখেছেন। যমীনকে উত্তম বিছানারূপে বিছিয়ে রেখেছেন। আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করে যমীন থেকে সুস্বাদু ফল মূল, ফসলের ক্ষেত এবং বাগ-বাগিচা তৈরী করে দিয়েছেন। তাঁরই নির্দেশক্রমে নৌকাসমূহ পানির উপর ভাসমান অবস্থায় চলাফেরা করছে এবং মানুষকে নদীর এক পার থেকে আর এক পারে নিয়ে যাচ্ছে। এভাবে মানুষ এক দেশ হতে অন্য দেশে ভ্রমণ করছে। তারা এক জায়গার মাল অন্য জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে এবং এইভাবে বেশ লাভবানহচ্ছে। আর এইভাবে তাদের অভিজ্ঞতাও বাড়ছে। নদীগুলিকেও তিনি তাদের কাজে লাগিয়ে রেখেছেন। তারা এর পানি নিজেরা পান করছে, অপরকে পান করাচ্ছে, জমিতে সেচন করছে, গোসল করছে, কাপড় চোপড় ধৌত করছে। এবং এই ধরনের বিভিন্ন প্রকারের উপকার লাভ করছে।

মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত রেখেছেন সূর্য ও চন্দ্রকে যারা অবিরাম একই নিয়মের অনুবর্তী। অর্থাৎ তারা দিন রাত্রি অবিরাম গতিতে চলতে রয়েছে, অথচ ক্লান্ত হচ্ছে না। আল্লাহ তাআলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চন্দ্রের নাগাল পাওয়া এবং রজনীর পক্ষে সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষ পথে সন্তরণ করে।” (৩২:৪০)

আর এক জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “সূর্য, চন্দ্র ও তারকারাজি অধীন হয়েছে তাঁরই বিধানে, জেনে রেখো যে, সৃষ্টি ও বিধান তাঁরই, বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহ কতই না মহান।” তিনি আরো বলেনঃ “তিনি রাতকে দিনের মধ্যে প্রবিষ্ট করেন এবং দিনকে রাতের মধ্যে প্রবিষ্ট করেন, আর সূর্য ও চন্দ্রকে করেছেন তিনি নিয়মাধীন; প্রত্যেকেই পরিভ্রমণ করে এক নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত; জেনে রেখো, তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।”

মহান আল্লাহর উক্তিঃ তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন তোমরা তাঁর কাছে যা কিছু চেয়েছে তা হতে।' অর্থাৎ হে মানবমণ্ডলী! তোমরা আল্লাহ তাআলার কাছে যে সব জিনিসের মুখাপেক্ষী ছিলে তিনি তোমাদেরকে তা সব কিছুই দিয়েছেন। তিনি চাইলেও দেন, না চাইলেও দেন। তাঁর দানের হাত কখনো বন্ধ থাকে না। সুতরাং তোমরা তাঁর কৃতজ্ঞতা পূর্ণরূপে প্রকাশ করতে পারবে কি? তোমরা যদি তার নিয়ামতগুলি এক এক করে গণনা করতে শুরু কর তবে। গুণে শেষ করতে পারবে না।

তালাক ইবনু হাবীব (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তাআলার হক এর চেয়ে অনেক বেশী যে, বান্দা তা আদায় করতে পারে। আর তাঁর নিয়ামত এর চেয়ে অনেক বেশী যে, বান্দা তা গণনা করতে পারে। সুতরাং হে লোক সকল! সকাল-সন্ধ্যায় তোমরা তার কাছে তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকো।

সহীহ বুখারীতে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “হে আল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা ও গুণগান আপনারই জন্যে। আমাদের প্রশংসা মোটেই যথেষ্ট নয় এবং তা পূর্ণ ও বেপরোয়াকারীও নয়। সুতরাং হে আমাদের প্রতিপালক! (আমাদের অপারগতার জন্যে আমাদেরকে ক্ষমা করুন)”

হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আদম সন্তানের জন্যে তিনটি রেজিস্টার বই বের হবে। একটিতে লিখা থাকবে পুণ্য, একটিতে পাপ এবং তৃতীয়টিতে লিখিত থাকবে আল্লাহ তাআলার নিয়ামত সমূহ। আল্লাহ পাক স্বীয় নিয়ামত সমূহের মধ্য হতে সর্বাপেক্ষা ছোট নিয়ামতকে বলবেনঃ “ওঠো এবং তোমার প্রতিদান তার নেক আমল সমূহ হতে নিয়ে নাও।” এতে তার সমস্ত আমল শেষ হয়ে যাবে, অথচ ঐ ছোট নিয়ামতটি সেখান হতে সরে গিয়ে বলবেঃ “(হে আল্লাহ!) আপনার মর্যাদার শপথ! আমার পূণ্যমূল্য এখনো আমি পাইনি।”এখন পাপসমূহের রেজিস্টার বহি অবশিষ্ট থাকবে, আর ওদিকে নিয়ামতরাজির বহি বাকী থাকবে। অতঃপর যদি বান্দার উপর আল্লাহ তাআলার করুণা হয় তবে তিনি তার পূণ্য বাড়িয়ে দিবেন পাপরাশি ক্ষমা করে দিবেন। আর বলবেনঃ “আমি তোমাকে আমার নিয়ামতরাজির বিনিময় ছাড়াই দান করলাম।” (এ হাদীসটি হাফিয আবু বকর আল বাযার (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছে। কিন্তু এর সনদ দুর্বল)

বর্ণিত আছে যে, হযরত দাউদ (আঃ) বলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমি কি করে আপনার নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করবো? শুকর করাও তো আপনার একটা নিয়মিত।” উত্তরে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “হে দাউদ (আঃ) । এখন তো তুমি আমার শুকরিয়া করেই ফেললে। কেননা, তুমি জানতে পারলে এবং স্বীকার করলে যে, তুমি আমার নিয়ামতসমূহের শুকরিয়া আদায় করতে অপারগ।”

ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেনঃ “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই জন্যে, যার অসংখ্য নিয়ামতরাজির মধ্যে একটি নিয়ামতের শুকরও নতুন একটি নিয়ামত ছাড়া আমরা আদায় করতে পারি না। ঐ নতুন নিয়ামতের উপর আবার একটা শুকর ওয়াজিব হয়ে যায়। আবার ঐ নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করার তাওফীক লাভের উপর আর একটি নিয়ামত লভি হয় যার উপর আবার শুকরিয়া আদায় করা ওয়াজিব হয়ে যায়। একজন কবি এই বিষয়টিকেই নিজের কবিতার মধ্যে প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যদি আমার দেহের প্রতিটি লোমের ভাষা থাকতো এবং আপনার নিয়ামতরাজির শুকরিয়া আদায় করতো তবুও তা শেষ হতো না, বরং নিয়ামত আরো বেড়েই যেতো। আপনার ইহসান ও নিয়ামত অসংখ্য।”





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।