আল কুরআন


সূরা আর-রাদ (আয়াত: 22)

সূরা আর-রাদ (আয়াত: 22)



হরকত ছাড়া:

والذين صبروا ابتغاء وجه ربهم وأقاموا الصلاة وأنفقوا مما رزقناهم سرا وعلانية ويدرءون بالحسنة السيئة أولئك لهم عقبى الدار ﴿٢٢﴾




হরকত সহ:

وَ الَّذِیْنَ صَبَرُوا ابْتِغَآءَ وَجْهِ رَبِّهِمْ وَ اَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَ اَنْفَقُوْا مِمَّا رَزَقْنٰهُمْ سِرًّا وَّ عَلَانِیَۃً وَّ یَدْرَءُوْنَ بِالْحَسَنَۃِ السَّیِّئَۃَ اُولٰٓئِکَ لَهُمْ عُقْبَی الدَّارِ ﴿ۙ۲۲﴾




উচ্চারণ: ওয়াল্লাযীনা সাবারুব তিগাআ ওয়াজহি রাব্বিহিম ওয়া আকা-মুসসালা-তা ওয়া আনফাকূ মিম্মা-রাযাকনা-হুম ছিররাওঁ ওয়া ‘আলা-নিয়াতাওঁ ওয়া ইয়াদরাঊনা বিলহাছানাতিছ ছাইয়িআতা উলাইকা লাহুম ‘উকবাদ্দা-র।




আল বায়ান: যারা তাদের রবের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সবর করে, সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদের যে রিয্ক প্রদান করেছি, তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে এবং ভাল কাজের মাধ্যমে মন্দকে দূর করে, তাদের জন্যই রয়েছে আখিরাতের শুভ পরিণাম।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ২২. আর যারা তাদের রবের সন্তুষ্টি লাভের জন্য ধৈর্য ধারণ করে এবং সালাত কায়েম করে, আর আমরা তাদেরকে যে জীবনোপকরণ দিয়েছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে এবং ভাল কাজের দ্বারা মন্দ কাজকে প্রতিহত করে, তাদের জন্যই রয়েছে আখেরাতের শুভ পরিণাম।




তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা তাদের প্রতিপালকের চেহারা (সন্তুষ্টি) কামনায় ধৈর্য ধারণ করে, নামায প্রতিষ্ঠা করে, আর আমি তাদেরকে যে জীবিকা দিয়েছি তাত্থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে। তারা অন্যায়কে ন্যায় দ্বারা প্রতিরোধ করে। পরকালের ঘর প্রাপ্তি এদের জন্যই নির্দিষ্ট।




আহসানুল বায়ান: (২২) আর যারা তাদের প্রতিপালকের মুখমন্ডল (দর্শন বা সন্তুষ্টি) লাভের জন্য ধৈর্য ধারণ করে,[1] নামায সুপ্রতিষ্ঠিত করে,[2] আমি তাদেরকে যে জীবনোপকরণ দিয়েছি তা হতে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে[3] এবং যারা ভাল দ্বারা মন্দকে প্রতিহত করে[4] তাদের জন্য শুভ পরিণাম (পরকালের গৃহ); [5]



মুজিবুর রহমান: আর যারা তাদের রবের সন্তুষ্টি লাভের জন্য ধৈর্য ধারণ করে, সালাত সুপ্রতিষ্ঠিত করে, আমি তাদেরকে যে জীবনোপকরণ দিয়েছি তা হতে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে এবং যারা ভাল দ্বারা মন্দ দূর করে তাদের জন্য শুভ পরিণাম ।



ফযলুর রহমান: আর যারা তাদের প্রভুর সন্তুষ্টির আশায় ধৈর্যধারণ করে, নামায সম্পাদন করে, আমি তাদেরকে যা দান করেছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে এবং ভাল দ্বারা মন্দকে প্রতিরোধ করে পরিণামে তাদের জন্য রয়েছে উৎকৃষ্ট আবাস (জান্নাত);



মুহিউদ্দিন খান: এবং যারা স্বীয় পালনকর্তার সন্তুষ্টির জন্যে সবর করে, নামায প্রতিষ্টা করে আর আমি তাদেরকে যা দিয়েছি, তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্য ব্যয় করে এবং যারা মন্দের বিপরীতে ভাল করে, তাদের জন্যে রয়েছে পরকালের গৃহ।



জহুরুল হক: আর যারা তাদের প্রভুর সন্তষ্টিলাভের অন্বেষণে অধ্যবসায় অবলন্বন করে, আর নামায কায়েম রাখে, আর আমরা তাদের যা জীবনোপকরণ দিয়েছি তা থেকে যারা গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, আর ভাল দিয়ে মন্দকে দূর করে, -- এরাই তারা যাদের জন্য রয়েছে চরমোৎকর্ষ আবাস, --



Sahih International: And those who are patient, seeking the countenance of their Lord, and establish prayer and spend from what We have provided for them secretly and publicly and prevent evil with good - those will have the good consequence of [this] home -



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ২২. আর যারা তাদের রবের সন্তুষ্টি লাভের জন্য ধৈর্য ধারণ করে এবং সালাত কায়েম করে, আর আমরা তাদেরকে যে জীবনোপকরণ দিয়েছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে এবং ভাল কাজের দ্বারা মন্দ কাজকে প্রতিহত করে, তাদের জন্যই রয়েছে আখেরাতের শুভ পরিণাম।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (২২) আর যারা তাদের প্রতিপালকের মুখমন্ডল (দর্শন বা সন্তুষ্টি) লাভের জন্য ধৈর্য ধারণ করে,[1] নামায সুপ্রতিষ্ঠিত করে,[2] আমি তাদেরকে যে জীবনোপকরণ দিয়েছি তা হতে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে[3] এবং যারা ভাল দ্বারা মন্দকে প্রতিহত করে[4] তাদের জন্য শুভ পরিণাম (পরকালের গৃহ); [5]


তাফসীর:

[1] আল্লাহর অবাধ্যতা এবং পাপ থেকে বেঁচে থাকে। এটা এক প্রকার ধৈর্য। দুঃখ-কষ্টে ধৈর্য ধারণ করে। এটা ধৈর্যের দ্বিতীয় প্রকার। জ্ঞানীরা উভয় প্রকার ধৈর্য অবলম্বন করে।

[2] তার সময়-সীমা বহাল রেখে, বিনয়-নম্রতার সাথে এবং ধীর-স্থির চিত্তে, বিশুদ্ধ-চিত্তে, রসূল (সাঃ)-এর পদ্ধতি অনুযায়ী; নিজের মন মত পদ্ধতিতে নয়।

[3] যখন যেখানে ব্যয় করার প্রয়োজন হয়, আত্মীয়-অনাত্মীয়ের মাঝে প্রকাশ্যে ও গোপনে ব্যয় করে থাকে।

[4] অর্থাৎ তাদের সাথে কেউ অসঙ্গত ব্যবহার করলে তারা তার জবাব উত্তম পদ্ধতিতে দিয়ে থাকে, অথবা ক্ষমা করে দিয়ে ধৈর্য ধারণ করে নেয়। যেমন মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন: ﴿ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ﴾ অর্থাৎ, মন্দের জবাব উত্তম পদ্ধতিতে দাও, (যদি তোমরা এমনটি কর) তাহলে যে ব্যক্তি তোমার শত্রু, সে এমন হয়ে যাবে যেন সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু। (সূরা হা-মীম সাজদাহ: ৩৪)

[5] অর্থাৎ যে এই উন্নত চরিত্রের অধিকারী হবে এবং উল্লিখিত গুণাবলীতে গুণান্বিত হবে, তার জন্য রয়েছে শুভ পরিণামের গৃহ (বেহেশত)।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ১৯-২৪ নং আয়াতের তাফসীর:



উক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা ঐ সমস্ত জ্ঞানী ও সৎ লোকদের গুণাবলী বর্ণনা করছেন যারা আখিরাতে সৌভাগ্যবান হবে, তাদের পরিণাম হবে শুভ। তারা তাদের সৎ পিতা-মাতা, স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে জান্নাতে থাকবে। তাদের গুণাবলী হল



(১) তারা কুরআনের সঠিকতা ও সত্যতার উপর বিশ্বাস স্থাপন করে। এরা তাদের মত নয় যারা অন্ধ অর্থাৎ কুরআনের সত্যতার ব্যাপারে সন্দিহান, সত্য সম্পর্কে জ্ঞান রাখে না এবং সে অনুপাতে আমলও করে না।



(২) যারা আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত প্রতিশ্রুতিপূর্ণ করে। অর্থাৎ আল্লাহ যেসকল বিধি-নিষেধ দিয়েছেন তারা তা মেনে চলে। অথবা সে অঙ্গীকার যা আদম (عليه السلام) এর পৃষ্টদেশ থেকে বের করে সকল আদম সন্তানের নিকট থেকে নিয়েছেন “আমি কি তোমাদের প্রতিপালনকারী নই?” (সূরা আ‘রাফ ৭:১৭২)



بِعَهْدِ اللّٰهِ অর্থাৎ সে সকল সন্ধি, চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি যা মানুষ পরস্পর করে থাকে। অথবা তাদের মাঝে এবং আল্লাহ তা‘আলার মাঝে স্বেচ্ছায় যেসকল প্রতিশ্রুতি রয়েছে।



(৩) আল্লাহ যাদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন তারা তাদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে। তথা নাবী-রাসূল, মু’মিন মু’মিনাত, আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশিসহ সকলেই এতে শামিল।



(৪) তারা তাদের প্রতিপালক আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে এবং ভয় করে কঠোর শাস্তিকে। তাই শাস্তির ভয়ে এবং প্রতিদানের আশায় তারা ভাল আমল করে।



(৫) তারা আল্লাহ তা‘আলাকে আখিরাতে দেখার জন্য বা তাঁর সন্তুষ্টি লাভের জন্য সকল আদেশ পালনে এবং নিষেধ বর্জনে ধৈর্য ধারণ করে। কাউকে দেখানোর জন্য কোন আমল করে না।



(৬) আর তারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে, সালাতের সময়-সীমা বহাল রাখে, বিনয়-নম্রতার সাথে এবং ধীর-স্থির চিত্তে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পদ্ধতিতে আদায় করে, নিজের মনগড়া পদ্ধতিতে নয়।



(৭) প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে তাদেরকে যে রিযিক দেয়া হয়েছে তা হতে তারা আল্লাহ তা‘আলার পথে ব্যয় করে। এতে ওয়াজিব ও নফল সকল দান শামিল।



(৮) তাদের সাথে কেউ কোন মন্দ ব্যবহার করলে তারা উত্তমভাবে তার জবাব দেয় কিংবা ধৈর্য ধারণ করে। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ط اِدْفَعْ بِالَّتِيْ هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِيْ بَيْنَكَ وَبَيْنَه۫ عَدَاوَةٌ كَأَنَّه۫ وَلِيٌّ حَمِيْمٌ)



“ভাল এবং মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহত কর উৎকৃষ্ট দ্বারা; ফলে, তোমার সাথে যার শত্র“তা আছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মত।” (হা-মীম-সাজদাহ ৪১:৩৪)



সুতরাং যারা এই সমস্ত গুণ অর্জন করতে পারবে তাদের জন্যই রয়েছে শুভ পরিণাম। তারা এবং তাদের সৎ স্ত্রী-পুত্র, পিতা-মাতাসহ জান্নাতে প্রবেশ করবে। দুনিয়াতে যারা সৎকর্ম করে জান্নাতে তাদের সৎ কর্মশীল আত্মীয়-স্বজনদের সাথে আল্লাহ তা‘আলা সাক্ষাত করিয়ে দিবেন যাতে তাদের চক্ষু শীতল হয়।



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُمْ بِإِيْمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَآ أَلَتْنٰهُمْ مِّنْ عَمَلِهِمْ مِّنْ شَيْءٍ ط كُلُّ امْرِئٍۭ بِمَا كَسَبَ رَهِيْنٌ)‏



“এবং যারা ঈমান আনে আর তাদের সন্তান-সন্ততিও ঈমানে তাদের অনুসারী হয়, তাদের সাথে মিলিত করব তাদের সন্তান-সন্ততিকে এবং আমি তাদের কর্মফলের ঘাটতি করব না, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী।” (সূরা তুর ৫২:২১)



সুতরাং যারা ঈমান আনবে ও সৎ আমল করবে তাদের আত্মীয়-স্বজনরা জান্নাতে গেলে একত্রে বসবাস করতে পারবে। আর ঈমান না থাকলে আত্মীয়-স্বজন যতই জান্নাতে যাক তাদের পক্ষে কোন দিন জান্নাতে যাওয়া সম্ভব হবে না।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. জান্নাতী সৌভাগ্যশীল ব্যক্তিদের ৮টি গুণ পেলাম।

২. যার আমল কাউকে পিছে ফেলে রেখেছে তার বংশ-মর্যাদা তাকে এগিয়ে নিতে পারবে না।

৩. যারা দুনিয়াতে সৎআমল করেছে তারা আখিরাতে সৎ আত্মীয়দের সাথে জান্নাতে থাকবে।

৪. পিতা-মাতা ও সন্তান-সন্ততির সাথে ভাল ব্যবহার করতে হবে।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ২০-২৪ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তাআ’লা ঐ মহান ব্যক্তিদের প্রশংসনীয় গুণাবলীর বর্ণনা দিচ্ছেন এবং তাঁদের ভাল পরিণামের খবর দিচ্ছেন যারা আখেরাতে বেহেশতের মালিক হবেন এবং দুনিয়াতেও যাদের পরিণাম হবে অতি উত্তম। তাঁরা মুনাফিকদের মত নন যারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতা করে। এটা মুনাফিকদেরই স্বভাব যে, তারা কোন ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করবে, ঝগড়ায় কটু বাক্য প্রয়োগ করবে, কথা মিথ্যা বলবে এবং আমানতে খিয়ানত করবে। আর ঐ উত্তম গুণের অধিকারী মুমিনমু’মিনদের স্বভাব এই যে, তারা আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্ত রাখেন, তাদের সাথে সদাচরণ করেন, অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্র লোকদেরকে দান করেন এবং সকলের সাথে সদয় ব্যবহার করেন। তারা আল্লাহর নির্দেশ ক্রমেই এগুলো করে থাকেন।

আল্লাহ তাআ’লার উক্তিঃ ‘তারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে’ অর্থাৎ তারা সৎ কাজ করেন আল্লাহর নির্দেশ মনে করে এবং অসৎ কার্য পরিত্যাগ করেন আল্লাহর নির্দেশ মনে করেই। তাঁরা আখেরাতের কঠোর হিসাবকে ভয় করেন। এ জন্যেই তারা মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাকেন, সৎ কার্যের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন, মধ্যম পথকে তারা কোন সময়ই পরিত্যাগ করেন না। সর্বাবস্থায়ই আল্লাহ তাআ’লার প্রতি লক্ষ্য রাখেন। হারাম কাজ এবং আল্লাহর নাফরমানীর দিকে প্রবৃত্তি তাদেরকে আকর্ষণ করলেও তারা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং আখেরাতের সওয়াবের কথা স্মরণ করে এবং আল্লাহ তাআ’লার সন্তুষ্টি কামনা করে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ থেকে বিরত থাকেন। তারা নামাযের পূর্ণরূপে হিফাযত করেন। রুকু ও সিজদার সময় শরীয়ত অনুযায়ী বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ করে থাকেন। আল্লাহ যাদেরকে দান করতে বলেছেন তাদেরকে তারা আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ থেকে দান করে থাকেন। দরিদ্র, অভাবী ও মিসকীন নিজেদের মধ্যকার হোক বা দূর সম্পৰ্কীয় হোক, তাদের বরকত থেকে তারা বঞ্চিত হন না। গোপনে ও প্রকাশ্যে, সময়ে-অসময়ে তারা আল্লাহর পথে খরচ করে থাকেন। তারা মন্দকে ভাল দ্বারা এবং শক্রতাকে বন্ধুত্ব দ্বারা দূরীভূত করে থাকেন। কেউ তাঁদের সাথে অসদাচরণ করলে তারা তার সাথে সদাচরণ করেন। তাঁদের সামনে কেউ মস্তক উত্তোলন করলে তারা মস্তক অবনত করেন। তাঁরা অন্যদের যুলুম সহ্য করে তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করেন। কুরআন কারীমের শিক্ষা হচ্ছেঃ “মন্দকে ভাল দ্বারা দূরীভূত কর, তাহলে তোমার মধ্যে ও তার মধ্যে যে শত্রুতা ছিল তা দূর হয়ে গিয়ে এমন হবে যে, সে যেন তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু। ধৈর্যশীল ও সৌভাগ্যবান ব্যক্তিই এই মর্যাদা লাভ করে থাকে।” এই রূপ লোকদের জন্যেই উত্তম পরিণাম রয়েছে।

সেই উত্তম পরিণাম এবং উত্তম ঘর হচ্ছে জান্নাত, যা অবিনশ্বর ও চিরস্থায়ী। হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, জান্নাতের একটি প্রাসাদের নাম ‘আদন’। তাতে মিনার ও কক্ষ রয়েছে। তাতে রয়েছে পাঁচ হাজার দরজা। প্রত্যেক দরজার উপর পাঁচ হাজার ফেরেশতা রয়েছেন। ঐ প্রাসাদটি নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের জন্যে নির্দিষ্ট। যহাক (রঃ) বলেন যে, এটা জান্নাতের শহর। এতে থাকবেন নবীগণ, শহীদগণ এবং হিদায়াতের ইমামগণ। তাদের আশে পাশে অন্যান্য লোকেরা থাকবেন। ওর চতুর্দিকে অন্যান্য বেহেশত রয়েছে। ওখানে তারা তাঁদের প্রিয়জনকেও তাদের সাথে দেখতে পাবেন। তাদের সাথে থাকবেন তাঁদের মুমিনমু’মিন পিতা, পিতামহ, পুত্র, পৌত্র, স্ত্রী ইত্যাদি আত্মীয় স্বজন। তারা সুখে শান্তিতে অবস্থান করবেন এবং তাঁদের চক্ষুগুলি ঠাণ্ডা হবে। এমন কি তাদের মধ্যে কারো কারো আমল যদি তাকে ঐ উচ্চ মর্যাদায় পৌছাবার যোগ্যতা নাও রাখে, তবুও আল্লাহ তাআ’লা তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেবেন এবং ঐ উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছিয়ে দেবেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যারা ঈমান এনেছে” এবং তাদের সন্তানরা ঈমানের মাধ্যমে তাদের অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সাথে তাদের সন্তানদেরকে মিলিত করবো।” (৫২: ২১)।

তাঁদেরকে মুবারকবাদ ও সালাম জ্ঞাপনের জন্যে সদাসর্বদা প্রত্যেকটি দরজা দিয়ে ফেরেশতাগণ যাতায়াত করবেন। এটাও আল্লাহ তাআ’লার একটি নিয়ামত। এর ফলে তাঁরা সব সময় খুশী থাকবেন এবং সুসংবাদ শুনবেন। এটা ফেরেশতাদের সৌভাগ্যের কারণ যে, তাঁরা শান্তির ঘরে নবী, সিদ্দীক ও শহীদদের সংস্পর্শে থাকতে পাবেন। এতে তারা নিজেদের জীবনকে ধন্য মনে করবেন।

হযরত আমর ইবনুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সর্বপ্রথম কে জান্নাতে যাবে তা তোমরা জান কি?” সাহাবীগণ উত্তরে বলেনঃ “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) ভাল জানেন।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আল্লাহও সৃষ্টির মধ্যে সর্বপ্রথম জান্নাতে যাবে দরিদ্র মুহাজিরগণ, যারা দুনিয়ার ভোগ বিলাস হতে দূরে ছিল, কষ্ট ও বিপদ-আপদের মধ্য দিয়ে দিন কাটাতো। যাদের মনের বাসনা মনেই রয়ে গিয়েছিল এমতাবস্থায় তারা মৃত্যুবরণ করেছিল। রহমতের ফেরেশতাদেরকে বলা হবেঃ “যাও, তাদেরকে মুবারকবাদ দাও।” ফেরেশতাগণ বলবেনঃ “হে আল্লাহ! আমরা আপনার আকাশের অধিবাসী উত্তম মাখলুক। আপনি কি আমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, আমরা গিয়ে তাদেরকে সালাম করবো এবং মুবারকবাদ জানাবো?” উত্তরে আল্লাহ তাআ’লা বলবেনঃ “এরা হচ্ছে আমার সেই বান্দা যারা শুধু আমারই ইবাদত করতো, আমার সাথে অন্য কাউকেও শরীক করে নাই, পার্থিব সুখ-সম্ভোগ হতে বঞ্চিত ছিল এবং কষ্ট ও বিপদ-আপদের মধ্য দিয়ে কালাতিপাত করেছিল। তাদের কোন মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয় নাই। এতত্সত্ত্বেও তারা ধৈর্য ধারণ করেছে ও কৃতজ্ঞ থেকেছে।” তখন ফেরেশতারা তাড়াতাড়ি অতি আগ্রহের সাথে তাদের দিকে দৌড় দিবেন। এদিক ওদিকের প্রত্যেক দরজা দিয়ে প্রবেশ করবেন এবং সালাম করে তাদেরকে মুবারকবাদ জানাবেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বপ্রথম যে সব লোক বেহেশতে প্রবেশ করবে তারা হচ্ছে দরিদ্র মুহাজিররা। তারা কষ্ট ও বিপদ-আপদের মধ্যে পতিত ছিল। যখনই তাদেরকে যে হুকুম করা হয়েছে তখনই তারা তা পালন করেছে। বাদশাহদের কাছে তাদের প্রয়োজন হতো। কিন্তু মৃত্যু পর্যন্ত তাদের প্রয়োজন পুরা হয় নাই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআ’লা জান্নাতকে সামনে আসতে বলবেন। জান্নাত তখন সুন্দর সাজে সজ্জিত হয়ে আল্লাহ তাআ’লার সামনে হাজির হবে। ঐ সময় আল্লাহ তাআ’লা ঘোষণা করবেনঃ “আমার যে সব বান্দা আমার পথে জিহাদ করতো, আমার পথে যাদেরকে কষ্ট দেয়া হতো তারা আজ কোথায়? তোমরা এসো, বিনা হিসাবে জান্নাতে চলে যাও।” ঐ সময় ফেরেশতারা আল্লাহর সামনে সিজদায় পড়ে যাবেন এবং আরয করবেনঃ “হে আমাদের প্রতিপালক! এরা কারা যাদেরকে আপনি আমাদের উপরও ফযীলত দান করলেন?” মহামহিমান্বিত আল্লাহ উত্তরে বলবেনঃ “এরা আমার ঐ বান্দা যারা আমার পথে জিহাদ করেছে এবং আমার পথে কষ্ট সহ্য করেছে।” ফেরেশতারা তখন তড়িৎ গতিতে এদিকে ওদিকের দরজা দিয়ে তাদের কাছে পৌঁছে যাবেন, তাদেরকে সালাম করবেন এবং মুবারকবাদ জানিয়ে বলবেনঃ “আপনারা আপনাদের ধৈর্য ধারনের কতই না উত্তম বিনিময় লাভ করেছেন।”

আবু উমামা (রাঃ) বলেনঃ “মু'মিন বেহেশতের মধ্যে নিজের আসনের উপর আরামে অত্যন্ত শান শওকতের সাথে হেলান দিয়ে বসে থাকবে। সেবক দল সারি সারি ভাবে এদিকে ওদিকে দাঁড়িয়ে থাকবে। যে দরজার খাদেমের কাছে ফেরেশতা অনুমতি চাইবেন, তিনি তাঁর পার্শ্ববর্তী খাদেমকে বলবেন। তিনি আবার অন্যকে বলবেন এবং তিনি আবার অপরকে বলবেন। শেষ পর্যন্ত মুমিনমু’মিনকে জিজ্ঞেস করা হবে। মুমিনমু’মিন আসার অনুমতি দেবে। এইভাবে একে অপরের কাছে পয়গাম পৌছাবে এবং সর্বশেষ খাদেম ফেরেশতাকে অনুমতি দেবে ও দরজা খুলে দেবে। ফেরেশতা তখন প্রবেশ করে সালাম করতঃ চলে যাবেন।

অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রত্যেক বছরের মাথায় শহীদদের কবরের কাছে আসতেন এবং বলতেনঃ (আরবি)

অর্থাৎ “তোমরা ধৈর্য ধারণ করেছে বলে তোমাদের প্রতি শান্তি, কতই উত্তম এই পরিণাম।” এইরূপই হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উসমান (রাঃ) করতেন।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।