সূরা আর-রাদ (আয়াত: 19)
হরকত ছাড়া:
أفمن يعلم أنما أنزل إليك من ربك الحق كمن هو أعمى إنما يتذكر أولو الألباب ﴿١٩﴾
হরকত সহ:
اَفَمَنْ یَّعْلَمُ اَنَّمَاۤ اُنْزِلَ اِلَیْکَ مِنْ رَّبِّکَ الْحَقُّ کَمَنْ هُوَ اَعْمٰی ؕ اِنَّمَا یَتَذَکَّرُ اُولُوا الْاَلْبَابِ ﴿ۙ۱۹﴾
উচ্চারণ: আফামাইঁ ইয়া‘লামুআন্নামাউনযিলা ইলাইকা মির রাব্বিকাল হাক্কুকামান হুওয়া আ‘মা- ইন্নামা-ইয়াতাযাক্কারু ঊলুল আলবা-ব।
আল বায়ান: যে ব্যক্তি জানে তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি যা নাযিল হয়েছে, তা সত্য, সে কি তার মত, যে অন্ধ? বুদ্ধিমানরাই শুধু উপদেশ গ্রহণ করে।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৯. আপনার রব হতে আপনার প্রতি যা নাযিল হয়েছে তা যে ব্যক্তি সত্য বলে জানে সে কি তার মত যে অন্ধ(১)? উপদেশ গ্রহণ করে শুধু বিবেকসম্পন্নগণই(২),
তাইসীরুল ক্বুরআন: যে ব্যক্তি জানে যে, তোমার প্রতিপালকের নিকট থেকে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা সত্য, সে কি ঐ ব্যক্তির সমান যে অন্ধ? বুদ্ধিমান লোকেরাই উপদেশ গ্রহণ করে থাকে
আহসানুল বায়ান: (১৯) তোমার প্রতিপালক হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা যে ব্যক্তি সত্য বলে জানে সে আর অন্ধ কি সমান?[1] কেবলমাত্র জ্ঞানী ব্যক্তিরাই উপদেশ গ্রহণ করে থাকে। [2]
মুজিবুর রহমান: তোমার রাব্ব হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা যে ব্যক্তি সত্য বলে জানে সে, আর অন্ধ কি সমান? উপদেশ গ্রহণ করে শুধু বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিরাই।
ফযলুর রহমান: অতএব, যে জানে যে, তোমার কাছে তোমার প্রভুর কাছ থেকে যা অবতীর্ণ হয়েছে তা সত্য, সে কি ঐ ব্যক্তির মত, যে অন্ধ? (এমন দুই ব্যক্তি একরকম নয়।) বস্তুত বুদ্ধিমানেরাই উপদেশ গ্রহণ করে থাকে;
মুহিউদ্দিন খান: যে ব্যক্তি জানে যে, যা কিছু পালনকর্তার পক্ষ থেকে আপনার প্রতি অবর্তীর্ণ হয়েছে তা সত্য সে কি ঐ ব্যক্তির সমান, যে অন্ধ? তারাই বোঝে, যারা বোধশক্তি সম্পন্ন।
জহুরুল হক: যেজন জানে যে তোমার প্রভুর কাছ থেকে তোমার নিকট যা অবতীর্ণ হয়েছে তা সত্য সে কি তার মতো যে অন্ধ? নিঃসন্দেহ বোধশক্তিসম্পন্ন লোকেরাই কেবল স্মরণ করবে, --
Sahih International: Then is he who knows that what has been revealed to you from your Lord is the truth like one who is blind? They will only be reminded who are people of understanding -
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৯. আপনার রব হতে আপনার প্রতি যা নাযিল হয়েছে তা যে ব্যক্তি সত্য বলে জানে সে কি তার মত যে অন্ধ(১)? উপদেশ গ্রহণ করে শুধু বিবেকসম্পন্নগণই(২),
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ যারা তাদের প্রভুর কাছ থেকে যা এসেছে তা হক্ক বলে ঈমান এনেছে, তারা এটাও বিশ্বাস করেছে যে, এতে কোন সন্দেহ অসামঞ্জস্যতা নেই। এর একাংশ অন্য অংশের সত্যয়ন করে। কোন প্রকার স্ববিরোধিতা এতে পাওয়া যাবে না। এর যাবতীয় সংবাদ বাস্তব, যাবতীয় আদেশ-নিষেধ ইনসাফে পূর্ণ। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “সত্য ও ন্যায়ের দিক দিয়ে আপনার রবের বাণী পরিপূর্ণ।” [সূরা আল-আনআমঃ ১১৫] অর্থাৎ সংবাদ প্রদানে বস্তুনিষ্ঠ এবং আদেশ-নিষেধে ইনসাফপূর্ণ। যারা কুরআনকে এ ধরনের বিশ্বাস করে তারা কি ঐ লোকের মত হতে পারে যে, অন্ধই রয়ে গেছে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর যা নাযিল হয়েছে তাতে বিশ্বাসী হয়নি এমনকি বোঝার চেষ্টাও করেনি? এ দু’ব্যক্তির নীতি দুনিয়ায় এক রকম হতে পারে না এবং আখেরাতে তাদের পরিণামও একই ধরনের হতে পারে না। তাই তো আল্লাহ অন্যত্র বলেনঃ জাহান্নামের অধিবাসী এবং জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়। জান্নাতবাসীরাই সফলকাম। [সূরা আল হাশরঃ ২০] [ইবন কাসীর]
(২) অর্থাৎ আল্লাহর পাঠানো এ শিক্ষা এবং আল্লাহর রাসূলের এ দাওয়াত যারা গ্রহণ করে তারা বুদ্ধিভ্রষ্ট হয় না বরং তারা হয় বিবেকবান, সতর্ক ও বিচক্ষণ ব্যক্তি। এ ছাড়া দুনিয়ায় তাদের জীবন ও চরিত্র যে রূপ ধারণ করে এবং আখেরাতে তারা যে পরিণাম ফল ভোগ করে পরবর্তী আয়াতগুলোতে তা বর্ণনা করা হয়েছে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৯) তোমার প্রতিপালক হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা যে ব্যক্তি সত্য বলে জানে সে আর অন্ধ কি সমান?[1] কেবলমাত্র জ্ঞানী ব্যক্তিরাই উপদেশ গ্রহণ করে থাকে। [2]
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ, কুরআনের সঠিকতা ও সত্যতার উপর বিশ্বাস স্থাপনকারী ব্যক্তি এবং অন্ধ অর্থাৎ কুরআনের সত্যতার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণকারী ব্যক্তি কি সমান হতে পারে? এটা অস্বীকৃতিসূচক প্রশ্ন, অর্থাৎ উক্ত দুই ব্যক্তি তেমনই সমান হতে পারে না, যেমন ফেনা এবং পানি অথবা সোনা, তামা এবং ওর খাদ সমান হতে পারে না।
[2] অর্থাৎ, যার কাছে নীরোগ হৃদয় ও সুস্থ বিবেক না থাকে এবং যে নিজ হৃদয়কে পাপের মরিচায় মলিন করে রাখে এবং বিবেক-বুদ্ধি বিলুপ্ত করে ফেলে, সে এই কুরআন থেকে উপদেশ গ্রহণই করতে পারে না।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১৯-২৪ নং আয়াতের তাফসীর:
উক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা ঐ সমস্ত জ্ঞানী ও সৎ লোকদের গুণাবলী বর্ণনা করছেন যারা আখিরাতে সৌভাগ্যবান হবে, তাদের পরিণাম হবে শুভ। তারা তাদের সৎ পিতা-মাতা, স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে জান্নাতে থাকবে। তাদের গুণাবলী হল
(১) তারা কুরআনের সঠিকতা ও সত্যতার উপর বিশ্বাস স্থাপন করে। এরা তাদের মত নয় যারা অন্ধ অর্থাৎ কুরআনের সত্যতার ব্যাপারে সন্দিহান, সত্য সম্পর্কে জ্ঞান রাখে না এবং সে অনুপাতে আমলও করে না।
(২) যারা আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত প্রতিশ্রুতিপূর্ণ করে। অর্থাৎ আল্লাহ যেসকল বিধি-নিষেধ দিয়েছেন তারা তা মেনে চলে। অথবা সে অঙ্গীকার যা আদম (عليه السلام) এর পৃষ্টদেশ থেকে বের করে সকল আদম সন্তানের নিকট থেকে নিয়েছেন “আমি কি তোমাদের প্রতিপালনকারী নই?” (সূরা আ‘রাফ ৭:১৭২)
بِعَهْدِ اللّٰهِ অর্থাৎ সে সকল সন্ধি, চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি যা মানুষ পরস্পর করে থাকে। অথবা তাদের মাঝে এবং আল্লাহ তা‘আলার মাঝে স্বেচ্ছায় যেসকল প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
(৩) আল্লাহ যাদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন তারা তাদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে। তথা নাবী-রাসূল, মু’মিন মু’মিনাত, আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশিসহ সকলেই এতে শামিল।
(৪) তারা তাদের প্রতিপালক আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে এবং ভয় করে কঠোর শাস্তিকে। তাই শাস্তির ভয়ে এবং প্রতিদানের আশায় তারা ভাল আমল করে।
(৫) তারা আল্লাহ তা‘আলাকে আখিরাতে দেখার জন্য বা তাঁর সন্তুষ্টি লাভের জন্য সকল আদেশ পালনে এবং নিষেধ বর্জনে ধৈর্য ধারণ করে। কাউকে দেখানোর জন্য কোন আমল করে না।
(৬) আর তারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে, সালাতের সময়-সীমা বহাল রাখে, বিনয়-নম্রতার সাথে এবং ধীর-স্থির চিত্তে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পদ্ধতিতে আদায় করে, নিজের মনগড়া পদ্ধতিতে নয়।
(৭) প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে তাদেরকে যে রিযিক দেয়া হয়েছে তা হতে তারা আল্লাহ তা‘আলার পথে ব্যয় করে। এতে ওয়াজিব ও নফল সকল দান শামিল।
(৮) তাদের সাথে কেউ কোন মন্দ ব্যবহার করলে তারা উত্তমভাবে তার জবাব দেয় কিংবা ধৈর্য ধারণ করে। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ط اِدْفَعْ بِالَّتِيْ هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِيْ بَيْنَكَ وَبَيْنَه۫ عَدَاوَةٌ كَأَنَّه۫ وَلِيٌّ حَمِيْمٌ)
“ভাল এবং মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহত কর উৎকৃষ্ট দ্বারা; ফলে, তোমার সাথে যার শত্র“তা আছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মত।” (হা-মীম-সাজদাহ ৪১:৩৪)
সুতরাং যারা এই সমস্ত গুণ অর্জন করতে পারবে তাদের জন্যই রয়েছে শুভ পরিণাম। তারা এবং তাদের সৎ স্ত্রী-পুত্র, পিতা-মাতাসহ জান্নাতে প্রবেশ করবে। দুনিয়াতে যারা সৎকর্ম করে জান্নাতে তাদের সৎ কর্মশীল আত্মীয়-স্বজনদের সাথে আল্লাহ তা‘আলা সাক্ষাত করিয়ে দিবেন যাতে তাদের চক্ষু শীতল হয়।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُمْ بِإِيْمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَآ أَلَتْنٰهُمْ مِّنْ عَمَلِهِمْ مِّنْ شَيْءٍ ط كُلُّ امْرِئٍۭ بِمَا كَسَبَ رَهِيْنٌ)
“এবং যারা ঈমান আনে আর তাদের সন্তান-সন্ততিও ঈমানে তাদের অনুসারী হয়, তাদের সাথে মিলিত করব তাদের সন্তান-সন্ততিকে এবং আমি তাদের কর্মফলের ঘাটতি করব না, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী।” (সূরা তুর ৫২:২১)
সুতরাং যারা ঈমান আনবে ও সৎ আমল করবে তাদের আত্মীয়-স্বজনরা জান্নাতে গেলে একত্রে বসবাস করতে পারবে। আর ঈমান না থাকলে আত্মীয়-স্বজন যতই জান্নাতে যাক তাদের পক্ষে কোন দিন জান্নাতে যাওয়া সম্ভব হবে না।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. জান্নাতী সৌভাগ্যশীল ব্যক্তিদের ৮টি গুণ পেলাম।
২. যার আমল কাউকে পিছে ফেলে রেখেছে তার বংশ-মর্যাদা তাকে এগিয়ে নিতে পারবে না।
৩. যারা দুনিয়াতে সৎআমল করেছে তারা আখিরাতে সৎ আত্মীয়দের সাথে জান্নাতে থাকবে।
৪. পিতা-মাতা ও সন্তান-সন্ততির সাথে ভাল ব্যবহার করতে হবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: আল্লাহ তাআ’লা স্বীয় নবীকে (সঃ) বলেনঃ হে মুহাম্মদ (সঃ)! তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা যে ব্যক্তি সরাসরি সত্য বলে জানে বা বিশ্বাস করে, তাতে তার কোন সংশয় ও সন্দেহ থাকে না, সে একটিকে আর একটির সত্যতা প্রতিপাদনকারী ও আনুকূল্যকারী মনে করে, সব খবরকেই সত্য বলে বিশ্বাস করে, তোমার সত্যবাদিতার কথা অকপটে স্বীকার করে, আর দ্বিতীয় আর একটি ব্যক্তি, অন্তর্চক্ষু অন্ধ, মঙ্গল বুঝেই না এবং বুঝলেও মানে না ও বিশ্বাস করে না, এ দু’জন কি কখনও সমান হতে পারে? কখনো না। যেমন আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “জাহান্নামের অধিবাসী ও জান্নাতের অধিবাসী সমান নয়। জান্নাতবাসীরাই সফলকাম।” এই ঘোষনা এখানেও দেয়া হয়েছে যে, এ দু'জন সমান নয়। কথা এই যে, বুদ্ধিমান ও বিবেকশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তিরাই শুধু উপদেশ গ্রহণ করে থাকে।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।