সূরা ইউসুফ (আয়াত: 99)
হরকত ছাড়া:
فلما دخلوا على يوسف آوى إليه أبويه وقال ادخلوا مصر إن شاء الله آمنين ﴿٩٩﴾
হরকত সহ:
فَلَمَّا دَخَلُوْا عَلٰی یُوْسُفَ اٰوٰۤی اِلَیْهِ اَبَوَیْهِ وَ قَالَ ادْخُلُوْا مِصْرَ اِنْ شَآءَ اللّٰهُ اٰمِنِیْنَ ﴿ؕ۹۹﴾
উচ্চারণ: ফালাম্মা-দাখালূ‘আলা-ইঊছুফা আ-ওয়াইলাইহি আবাওয়াইহি ওয়া কা-লাদ খুলূমিসরা ইন শাআল্লা-হু আ-মিনীন।
আল বায়ান: অতঃপর যখন তারা ইউসুফের নিকট প্রবেশ করল, তখন সে তার পিতামাতাকে নিজের কাছে স্থান করে দিল এবং বলল, ‘আল্লাহর ইচ্ছায় আপনারা নিরাপদে মিসরে প্রবেশ করুন’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৯৯. অতঃপর তারা যখন ইউসুফের কাছে উপস্থিত হল, তখন তিনি তার পিতামাতাকে নিজের কাছে স্থান দিলেন এবং বললেন, আপনারা আল্লাহর ইচ্ছায় নিরাপদে মিসরে প্রবেশ করুন।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা যখন ইউসুফের কাছে উপস্থিত হল, সে তার পিতা-মাতাকে নিজের কাছে স্থান দিল এবং বলল, ‘আল্লাহর ইচ্ছেয় পূর্ণ নিরাপত্তায় মিসরে প্রবেশ করুন।’
আহসানুল বায়ান: (৯৯) অতঃপর তারা যখন ইউসুফের নিকট উপস্থিত হল, তখন সে তার পিতা-মাতাকে নিজের কাছে স্থান দান করল[1] এবং বলল, আপনারা আল্লাহর ইচ্ছায় নিরাপদে মিসরে প্রবেশ করুন।
মুজিবুর রহমান: অতঃপর তারা যখন ইউসুফের নিকট উপস্থিত হল তখন সে তার মাতা-পিতাকে আলিঙ্গন করল এবং বললঃ আপনারা আল্লাহর ইচ্ছায় নিরাপদে মিসরে প্রবেশ করুন!
ফযলুর রহমান: তারপর তারা যখন (আবার) ইউসুফের কাছে এল তখন সে তার পিতামাতাকে নিজের কাছে টেনে নিল এবং বলল, “তোমরা আল্লাহর ইচ্ছায় নিরাপদে মিসরে প্রবেশ কর।”
মুহিউদ্দিন খান: অতঃপর যখন তারা ইউসুফের কাছে পৌঁছল, তখন ইউসুফ পিতা-মাতাকে নিজের কাছে জায়গা দিলেন এবং বললেনঃ আল্লাহ চাহেন তো শান্তি চিত্তে মিসরে প্রবেশ করুন।
জহুরুল হক: তারপর তাঁরা যখন ইউসুফের দরবারে দাখিল হলেন তখন তিনি তাঁর পিতামাতাকে নিজের সঙ্গে রাখলেন এবং বললেন -- "ইন- শা-আল্লাহ্ মিশরে নির্বিঘ্নে প্রবেশ করুন।"
Sahih International: And when they entered upon Joseph, he took his parents to himself and said, "Enter Egypt, Allah willing, safe [and secure]."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৯৯. অতঃপর তারা যখন ইউসুফের কাছে উপস্থিত হল, তখন তিনি তার পিতামাতাকে নিজের কাছে স্থান দিলেন এবং বললেন, আপনারা আল্লাহর ইচ্ছায় নিরাপদে মিসরে প্রবেশ করুন।(১)
তাফসীর:
(১) ইউসুফ আলাইহিস সালাম পরিবারের সবাইকে বললেনঃ আপনারা সবাই আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী অভাব অনটন থেকে মুক্ত হয়ে, নিৰ্ভয়ে, অবাধে মিসরে প্রবেশ করুন। [তাবারী] উদ্দেশ্য এই যে, ভিনদেশীদের প্রবেশের ব্যাপারে স্বভাবতঃ যেসব বিধিনিষেধ থাকে আপনারা সেগুলো থেকে মুক্ত। [বাগভী; কুরতুবী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৯৯) অতঃপর তারা যখন ইউসুফের নিকট উপস্থিত হল, তখন সে তার পিতা-মাতাকে নিজের কাছে স্থান দান করল[1] এবং বলল, আপনারা আল্লাহর ইচ্ছায় নিরাপদে মিসরে প্রবেশ করুন।
তাফসীর:
[1] অর্থাৎ শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে তাঁদেরকে নিজের কাছে স্থান দিলেন এবং ভক্তিপূর্ণ আপ্যায়ন করলেন।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৮৮-১০১ নং আয়াতের তাফসী:
অতঃপর তৃতীয় দফায় তারা তাদের পিতার নির্দেশক্রমে মিসরে আগমন করল। আগমন করে ইউসুফ (عليه السلام) কে তাদের দুরবস্থার কথা অবগত করণার্থে বলল: হে আযীয, আমাদের খাদ্যাভাবে আমাদের পরিবার বিপন্ন হয়ে গেছে, তাছাড়া আমরা যে অর্থ কড়ি নিয়ে এসেছি তা অতি সামান্য, সুতরাং আমাদের অর্থাভাবের কারণে মালামাল কম না দিয়ে পূর্ণমাত্রায় দেবেন এবং আরো কিছু বেশি দেবেন। কেউ কেউ বলেছেন, (وَتَصَدَّقْ عَلَيْنَا) অর্থাৎ বিনয়ামীনকে আমাদের সাথে যেতে দিয়ে অনুগ্রহ করুন। যখন তারা দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরল, এবং পিতার বার্ধক্য, দুর্বলতা ও পুত্র বিচ্ছেদের আঘাতের কথা বর্ণনা করল তখন ইউসুফ (عليه السلام) এর হৃদয় বিগলিত হয়ে গেল। অশ্র“সিক্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে তিনি বললেন: তোমরা ইউসুফ ও তাঁর সহোদর ভাই-এর সাথে যে ব্যবহার করেছিলে তা কি তোমাদের স্মরণ আছে? তিনি ভাইদের অপরাধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার সাথে সাথে উদারতা দেখিয়ে বললেন, তোমরা তখন অজ্ঞ ছিলে। মূলত আল্লাহ তা‘আলার পাপী বান্দারা অজ্ঞই বটে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(ثُمَّ اِنَّ رَبَّکَ لِلَّذِیْنَ عَمِلُوا السُّوْ۬ئَ بِجَھَالَةٍ ثُمَّ تَابُوْا مِنْۭ بَعْدِ ذٰلِکَ وَاَصْلَحُوْٓا اِنَّ رَبَّکَ مِنْۭ بَعْدِھَا لَغَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ)
“যারা অজ্ঞতাবশত মন্দকর্ম করে তারা পরে তাওবাহ করে ও নিজেদেরকে সংশোধন করে নেয় তাদের জন্য তোমার প্রতিপালক অবশ্যই অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা নাহল ১৬:১১৯)
ইউসুফ (عليه السلام) এর মুখ থেকে নিজের বাল্যকালের সকল ঘটনা তুলে ধরলে তারা ইউসুফ (عليه السلام)-কে চিনে ফেলে এবং বলল যে, তুমি কি তাহলে ইউসুফ? উত্তরে তিনি তাঁর পরিচয় প্রকাশ করলেন। সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ, ধৈর্য ও সংযমের শুভ পরিণামের কথা বর্ণনা করে বললেন: তোমরা আমাকে নিঃশেষ করার ষড়যন্ত্রের কোন প্রকার ত্র“টি করোনি, কিন্তু এটা আল্লাহ তা‘আলার দয়া যে, তিনি আমাকে শুধু কূপ থেকে পরিত্রাণ দেননি বরং মিসরের রাজত্বও দান করেছেন। তখন ইউসুফ (عليه السلام) এর ভাইয়েরা সকলেই তাদের ভুল স্বীকার করল। ইউসুফও (عليه السلام) তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন এবং আল্লাহ তা‘আলার কাছেও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন, আর বললেন: আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই, কোন নিন্দা ও ভর্ৎসনা করা হবে না। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কার কাফির ও যারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল এমনকি তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছিল তাদেরকে একথাই বলে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।
তাদেরকে ইউসুফ (عليه السلام) একটি জামা দিয়ে বললেন: এটা নিয়ে যাও, এটা আমার পিতার মুখমণ্ডলে রাখলেই চোখের জ্যোতি ফিরে আসবে এবং পরিবারের সকলকে মিসরে দাওয়াত দিলেন। এ জামা আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম (عليه السلام) কে দিয়েছিলেন যখন নমরুদ তাঁকে আগুনে নিক্ষেপ করে। ইবরাহীম (عليه السلام) ইসহাককে প্রদান করে, তিনি ইয়া‘কূব (عليه السلام) কে প্রদান করেন। ইয়া‘কূব (عليه السلام) ইউসুফ (عليه السلام) কে পড়িয়ে দেন যাতে কোন প্রকার বদনজর না লাগে। (কুরতুবী) উক্ত জামা নিয়ে মিসর থেকে কাফেলা রওনা হল এবং ওদিকে আল্লাহ তা‘আলা র পক্ষ থেকে ইয়া‘কূব (عليه السلام) এর কাছে মু‘জিযাহস্বরূপ ইউসুফ (عليه السلام) এর সুগন্ধি আসতে লাগল। তাই তিনি বললেন: আমি ইউসুফের সুঘ্রাণ পাচ্ছি। তখন পরিবারের লোকেরা বলল: আপনি এখনো সে পুরাতন ভ্রষ্টতার মাঝেই আছেন। অর্থাৎ ইউসুফ (عليه السلام) কে হারিয়ে ইয়া‘কূব (عليه السلام) মাঝে মাঝেই এরূপ কথা বলতেন যে, আমার মনে হয় ইউসুফ (عليه السلام) বেঁচে আছে, আমি তার সুঘ্রাণ পাচ্ছি।
অতঃপর যখন সুসংবাদদাতা জামাটি নিয়ে এসে ইয়া‘কূব (عليه السلام) এর মুখে রাখল আল্লাহ তা‘আলার রহমতে চোখের দৃষ্টি ফিরে এল। ইয়া‘কূব (عليه السلام) বললেন: ‘আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আমি আল্লাহর নিকট হতে যা জানি তোমরা তা জান না?’ অর্থাৎ আমি ওয়াহীর মাধ্যমে জানতে পেরেছি ইউসুফ (عليه السلام) বেঁচে আছে, তোমাদের কাছে তো ওয়াহী আসে না তাই তোমরা আমার মত জানো না। তখন ইউসুফ (عليه السلام) এর ভাইয়েরা পিতার নিকটও নিজেদের অপরাধ স্বীকার করল এবং তাদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনার জন্য আবেদন করল। ইয়া‘কূব (عليه السلام) অচিরেই ক্ষমা প্রার্থনা করবেন বলে ওয়াদা দিলেন। উদ্দেশ্য হল রাতের শেষ প্রহরে যখন আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন, সে সময়টি দু‘আ কবূলের সময়। তাছাড়া এত বড় অপরাধ করেছে সে জন্য চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন ছিল। তাই তিনি সাথে সাথে ক্ষমা প্রার্থনা না করে অচিরেই ক্ষমা প্রার্থনা করবেন বলে ওয়াদা দিয়েছেন।
অতঃপর তিনি তাঁর ছেলেদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন এবং তারা সকলে ইউসুফ (عليه السلام)-এর উদ্দেশ্যে মিসরে রওনা করলেন, ইউসুফ (عليه السلام) শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে শান্তির অভিবাদন জানিয়ে নিজের কাছে স্থান দিলেন। এমনকি তিনি তাঁর পিতা-মাতাকে রাজার যে আসন সেখানে বসালেন এবং পিতা-মাতা ও সব ভাই ইউসুফ (عليه السلام) এর সম্মানার্থে সিজদায় পড়ে গেলেন।
এখানে সিজদা করা দ্বারা এমনটি মনে করা যাবে না যে, যেহেতু ইউসুফ (عليه السلام) কে তাঁর ভাইয়েরা সিজদা করেছে সেহেতু মানুষকে সিজদা করা যাবে। অতএব কোন মাজারে বা কবরে সিজদা করা কিংবা উচ্চ মর্যাদাস¤পন্ন কোন ব্যক্তিকে সম্মানার্থে সিজদা করা বৈধ। না, এরূপ বৈধ হবে না। কারণ এই সম্মানসূচক সিজদা ইয়া‘কূব (عليه السلام)-এর শরীয়তে বৈধ ছিল কিন্তু শরীয়তে মুহাম্মাদীতে তা হারাম করে দেয়া হয়েছে।
মুআয বিন যাবাল (রাঃ) শাম থেকে ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে সিজদা করলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন একি মুআয! মুআয (রাঃ) বললেন: আমি শামে গিয়ে দেখলাম, সে দেশের লোকজন তাদের যাজক ও পাদ্রীদেরকে সিজদা করে। তাই আমি মনে মনে চাইলাম যে, আমরাও আপনাকে সিজদা করব। তা শুনে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: খবরদার! তা করো না। কারণ আমি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করতে আদেশ করতাম তাহলে মহিলাদেরকে বলতাম, তোমরা তোমাদের স্বামীদেরকে সিজদা কর। (ইবনু মাযাহ হা: ১৮৫৩, ইবনু হিববান হা: ৪১৭১, সিলসিলাহ সহীহাহ হা: ১২০৩) অতএব কোন বস্তু বা ব্যক্তিকে সিজদা করা সম্পূর্ণ শির্ক। সিজদা করতে হবে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَّاَنَّ الْمَسٰجِدَ لِلہِ فَلَا تَدْعُوْا مَعَ اللہِ اَحَدًا)
“এবং নিশ্চয়ই সিজদার স্থানসমূহ (সমস্ত ইবাদত) একমাত্র আল্লাহর জন্য। সুতরাং আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকেও ডেকো না।” (সূরা জিন ৭২:১৮) এ সিজদাই ছিল ইউসুফ (عليه السلام) এর সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা যা আল্লাহ তা‘আলা এতদিন পর বাস্তবে পরিণত করেছেন এবং তাদের বিচ্ছিন্নতার পর পুনরায় আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে একত্রিত করে দিয়েছেন এটা ছিল আল্লাহ তা‘আলা র অনুগ্রহ।
(مِّنَ الْبَدْوِ) মিসরের মত সভ্য এলাকার তুলনায় কেন‘আন একটি মরুভূমির মত এলাকা, তাই তিনি بدو (মরু অঞ্চল) শব্দ ব্যবহার করলেন।
অতঃপর ইউসুফ (عليه السلام) আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করলেন এবং তিনি নিজের জন্য দু‘আ করলেন যাতে তিনি মুসলিম থাকা অবস্থায় ঈমানের সাথে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে পারেন এবং তাকে যেন আল্লাহ তা‘আলা সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করেন।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. যারা অপরাধ করে তারা মূলত অজ্ঞতাবশতই করে থাকে। তবে এর ব্যতিক্রমও হয় কিন্তু তা খুবই বিরল।
২. কেউ মন্দ ব্যবহার করলেও তাঁর সাথে যতদূর সম্ভব ভাল ব্যবহার করতে হবে। যেমন ইউসুফ (عليه السلام) তাঁর ভাইদের ব্যাপারে করেছিলেন।
৩. আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত কোন ফেরেশতা, জিন, ইনসান ও বস্তুকে সিজদা করা ইসলামী শরীয়তে জায়েয নেই, বরং বড় শির্ক।
৪. নিজের জন্য দু‘আ করা উচিত যাতে ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করতে পারে ।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৯৯-১০০ নং আয়াতের তাফসীর
হযরত ইউসুফ (আঃ) ভাইদেরকে নিজের পরিচয় দানের পর বলেছিলেনঃ “আমাদের পিতা এবং আপনাদের পরিবারের সমস্ত লোককে আমার কাছে নিয়ে আসবেন। আল্লাহ তাআ’লা এখানে ঐ সংবাদই দিচ্ছেন। হযরত ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতাগণ তাই করলেন। ঐ মহান যাত্রী দলটি কিনআ’ন থেকে মিসরের পথে যাত্রা শুরু করলেন। যখন তারা মিসরের নিকটবর্তী স্থানে পৌঁছলেন, তখন হযরত ইউসুফ (আঃ) স্বীয় পিতা হযরত ইয়াকুবের (আঃ) অভ্যর্থনার জন্যে গমন করলেন এবং বাদশাহর নির্দেশক্রমে শহরের সমস্ত আমীর ও সভাসদও গেলেন। এও বর্ণিত আছে যে, স্বয়ং বাদশাহও অভ্যর্থনার উদ্দেশ্যে গমন করেছিলেন এবং শহরের বাইরে এসেছিলেন।
(আরবি) এই উক্তির ব্যাপারে কোন কোন মুফাসসিরের বক্তব্য এই যে, এখানে রচনায় আগা-পিছা রয়েছে। অর্থাৎ হযরত ইউসুফ (আঃ) তাঁদেরকে বললেনঃ “আপনারা মিসরে প্রবেশ করুন, ইনশাআল্লাহ এখানে নির্ভয় ও নিরাপদে থাকবেন।” এখন শহরে প্রবেশ করার পর তিনি পিতা মাতাকে নিজের কাছে স্থান দেন এবং তাদেরকে উচ্চাসনে বসান। কিন্তু ইমাম ইবনু জারীর (রাঃ) এটা খন্ডন করেছেন এবং বলেছেন যে, এতে সুদ্দীর (রঃ) উক্তিটিই সঠিক। তাঁর উক্তি এই যে, যখন প্রথমে সাক্ষাৎ হলো তখন হযরত ইউসুফ (আঃ) তার পিতা-মাতাকে নিজের কাছে স্থান দেন এবং যখন শহরে প্রবেশ করেন তখন বলেনঃ “এখন শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে এখানে চলে আসুন।” কিন্তু এখানে আর একটি কথা থেকে যাচ্ছে। তা এই যে, (আরবি) এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে বাড়ীতে স্থান দেয়া। যেমন রয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ তিনি তাঁর ভাইকে তাঁর বাড়ীতে স্থান দিলেন।” আর হাদীসেও (আরবি) এইরূপ রয়েছে।
সুতরাং পিতা মাতার আগমনের পর হযরত ইউসুফ (আঃ) তাঁদেরকে নিজের কাছে স্থান দেয়ার পর তাঁদেরকে বলেনঃ আপনারা নিরাপদে মিসরে প্রবেশ করুন। এখানে দুর্ভিক্ষ প্রভৃতি বিপদ-আপদ থেকে মুক্ত অবস্থায় সুখে শান্তিতে বসবাস করুন। আমাদের এরূপ ভাবার্থ বর্ণনা না করার কোনই কারণ নেই।
প্রসিদ্ধ উক্তি রয়েছে যে, দুর্ভিক্ষের যে কয়েক বছর অবশিষ্ট ছিল তা হযরত ইয়াকুবের (আঃ) আগমনের ফলে দূর হয়ে যায়। যেমন মক্কাবাসীদের দুর্ভিক্ষের বাকী বছরগুলি রাসূলুল্লাহর (সঃ) প্রার্থনার কারণে দূর হয়ে গিয়েছিল, যখন আবু সুফিয়ান (রাঃ) তাঁর কাছে দুর্ভিক্ষের অভিযোগ করেন এবং কেঁদে কেঁদে তাঁর কাছে দুআ’র সুপারিশ করেন।
আবদুর রহমান (রঃ) বলেন যে, হযরত ইউসুফের (আঃ) মাতা পূর্বেই ইন্তেকাল করেছিলেন এবং তাঁর পিতার সাথে ছিলেন তাঁর খালা। কিন্তু ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) এবং ইমাম মুহাম্মদ ইবনু ইসহাকের (রঃ) উক্তি এই যে, ঐ সময় স্বয়ং তাঁর মাতাই জীবিত ছিলেন। এই উক্তিটি সঠিকও বটে। তাঁর মৃত্যুর উপর কোন বিশুদ্ধ দলীল নেই। আর কুরআন কারীমের প্রকাশ্য শব্দগুলি এটাই প্রমাণ করছে যে, ঐ সময় তাঁর মাতা জীবিত ছিলেন।
হযরত ইউসুফ (আঃ) স্বীয় পিতা-মাতাকে রাজ সিংহাসনে বসিয়ে দেন। সেই সময় তাঁর পিতা-মাতা এবং এগারোটি ভাই সবাই তাঁর সামনে সিজদায় পড়ে যান। তখন তিনি পিতাকে সম্বোধন করে বলেনঃ “আব্বাজান! দেখুন, এতো দিনে আমার পূর্বের সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রকাশিত হলো। এই হচ্ছে এগারোটি তারকা এবং এই হচ্ছে সূর্য ও চন্দ্র যা আমার সামনে সিজদায় পতিত রয়েছে। তাদের শরীয়তে এটা বৈধ ছিল যে, বড়দেরকে তারা সালামের সাথে সিজদা করতেন। এমন কি হযরত আদম (আঃ) থেকে নিয়ে হযরত ঈসা (আঃ) পর্যন্ত সমস্ত নবীর উম্মতদের জন্যে এটা জায়েয ছিল। কিন্তু মিল্লাতে মুহাম্মদিয়াতে (সঃ) আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআ’লা নিজের পবিত্র সত্ত্বা ছাড়া অন্য কারো জন্যে সিজদাকে বৈধ করেন নাই। বরং তিনি ওটা একমাত্র নিজের জন্যেই নির্দিষ্ট করেছেন। হযরত কাতাদা’ (রঃ) প্রভৃতি গুরুজনের উক্তির সারমর্ম এটাই।
হাদীস শরীফে রয়েছে যে, হযরত মুআ’য (রাঃ) সিরিয়ায় গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি দেখেন যে, সিরিয়াবাসী তাদের বড়দেরকে সিজদা করে থাকে। তিনি ফিরে এসে রাসূলুল্লাহকে (সা) সিজদা করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে মুআ’য (রাঃ)! এটা কি?” তিনি উত্তরে বলেনঃ “আমি সিরিয়াবাসীদেরকে দেখেছি যে, তারা তাদের বড় ও সম্মানিত লোকদেরকে সিজদা করে থাকে। তা হলে আপনি তো সর্বাপেক্ষা এর বড় হকদার।” একথায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “যদি আমি কাউকেও কারো জন্যে সিজদার হুকুম দিতাম তবে স্ত্রীলোককে হুকুম করতাম যে, সে যেন তার স্বামীকে সিজদা করে। কারণ এই যে, তার বড় হক রয়েছে।”
অন্য এক হাদীসে রয়েছে যে, হযরত সালমান ফারসী (রাঃ) তাঁর ইসলাম গ্রহণের শুরুতে রাসূলুল্লাহকে (সঃ) পথে দেখে সিজদা করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে সালমান (রাঃ)! আমাকে সিজদা করো না। সিজদা ঐ আল্লাহকে কর যিনি চিরঞ্জীব যিনি কখনো মৃত্যুবরণ করবেন না।”
মোট কথা, যেহেতু তাদের শরীয়তে মানুষকে সিজদা করা জায়েয ছিল, তাই তারা হযরত ইউসুফকে (আঃ) সিজদা করেছিলেন। তখন হযরত ইউসুফ (আঃ) বলেনঃ “দেখুন আব্বা! আমার স্বপ্নের তাৎপর্য প্রকাশিত হয়েছে। আমার প্রতিপালক এটাকে সত্যরূপে দেখিয়েছেন। এর ফল প্রকাশ হয়ে পড়েছে।”
অন্য আয়াতে কিয়ামতের দিনের জন্যেও এই শব্দই ব্যবহৃত হয়েছে। সেখানে (আরবি) বলা হয়েছে।
এরপর হযরত ইউসুফ (আঃ) বললেনঃ “এটাও আমার উপর আল্লাহর একটা ইহসান যে, তিনি আমার স্বপ্নকে সত্যরূপে দেখায়েছেন। যা আমি শুয়ে শুয়ে দেখেছিলাম, আল্লাহরই সমস্ত প্রশংসা যে, সেটাই তিনি আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখায়েছেন। আমার উপর তাঁর আরো অনুগ্রহ এই যে, তিনি আমাকে জেলখানা হতে মুক্তি দান করেছেন এবং আপনাদের সকলকে মরুভূমি হতে সরিয়ে এখানে আনয়ন করেছেন এবং আমার সাথে সাক্ষাৎ করায়েছেন।” হযরত ইয়াকুব (আঃ) জন্তু লালন-পালন করতেন বলে সাধারণতঃ তাঁকে মরুভূমি অঞ্চলেই বসবাস করতে হতো।
ফিলিস্তিনও সিরিয়ার জঙ্গলে অবস্থিত। অধিকাংশ সময় তাঁরা তাঁবু খাটিয়ে বাস করতেন। বলা হয়েছে যে, তাঁরা হাসমীর নিম্নদেশে আওলাজ নামক স্থানে বসবাস করতেন এবং সেখানে পশু পালন করতেন। উট, বকরী ইত্যাদি তাঁদের সাথে থাকতো।
অতঃপর হযরত ইউসুফ (আঃ) বলেনঃ “আমার উপর আল্লাহ পাকের এটা কম বড় অনুগ্রহ নয় যে, শয়তান আমার ও আমার ভ্রাতাদের সম্পর্ক নষ্ট করার পরও তিনি আপনাদেরকে মরু অঞ্চল হতে এখানে আনয়ন করেছেন। আমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা করেন তা-ই নিপুণতার সাথে করে থাকেন। তিনি ঐ কাজের যথাযোগ্য উপকরণের ব্যবস্থা করে দেন। আর ওটাকে তিনি অতি সহজ করে দেন। বান্দার কিসে কল্যান রয়েছে তা তিনি খুব ভাল রূপেই জানেন। নিজের কাজে, কথায়, ফায়সালায় ও উদ্দেশ্যে তিনি অতি নিপুন।”
সুলাইমানের (রঃ) উক্তি এই যে, স্বপ্ন দেখা ও ওর তাৎপর্য প্রকাশিত হওয়ার মধ্যে চল্লিশ বছরের ব্যবধান ছিল। আব্দুল্লাহ ইবনু শাদ্দাদ (রঃ) বলেন যে, স্বপ্নের তাৎপর্য প্রকাশিত হতে এর চেয়ে বেশী সময় লাগে না। এটাই হচ্ছে সময়ের শেষ সীমা। হযরত হাসান (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, ৮০ বছর পরে পিতা পুত্রের মিলন ঘটে। এটা চিন্তার বিষয়, সেই সময় যমীনে হযরত ইয়াকুব (আঃ) অপেক্ষা আল্লাহ তাআ’লার বড় প্রিয় পাত্র আর কেউ ছিলেন না। তথাপি তাকে এতো দীর্ঘ দিন ধরে পুত্র ইউসুফকে (আঃ) ছেড়ে থাকতে হলো। সব সময় তাঁর চক্ষু দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হতে থাকতো। আর অন্তরে দুঃখ ও বেদনার তরঙ্গ উঠতো। অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, এই বিচ্ছেদের সময়কাল ছিল ৮৩ (তিরাশি) বছর।
মুবারক ইন ফুযালা’ (রঃ) হাসান (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, যখন হযরত ইউসুফকে (আঃ) কূপে নিক্ষেপ করা হয়েছিল তখন তাঁর বয়স ছিল ১৭ (সতেরো বছর)। আর তিনি পিতার নিকট হারিয়ে থাকেন ৮০ (আশি) বছর। তারপরে তিনি ২৩ (তেইশ) বছর জীবিত থাকেন। ১২০ (এক শ’ বিশ) বছর বয়সে তিনি মৃত্যু মুখে পতিত হন। হযরত কাতাদা’’র (রঃ) উক্তি অনুসারে ৩৫ (পঁয়ত্রিশ) বছর প্ররে পিতা পুত্রের মিলন হয়। মুহাম্মদ ইবন ইসহাক (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইউসুফ (আঃ) পিতার নিকট হতে ১৮ (আঠারো) বছর পর্যন্ত হারিয়ে থাকেন। আহলে কিতাবের ধারণায় তিনি চল্লিশ বছর পর্যন্ত পিতার নিকট হতে অনুপস্থিত ছিলেন। তারপর মিসরে পিতার সাথে মিলিত হন এবং এরপর ১৭ (সতের) বছর জীবিত থাকেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, বানু ইসরাঈল যখন মিসরে পৌঁছেন তখন তাঁদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৬৩ (তেষট্টি) জন। (নুসখায়ে মাক্কিয়াতে তিনশ’ ষাটজন রয়েছে) আর যখন তারা মিসর হতে বের হন তখন তাদের সংখ্যা দাঁড়ায় ছ’লক্ষ সত্তর হাজার। আবু ইসহাক (রঃ) মাসরূক (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, যখন তারা মিসরে প্রবেশ করেন তখন তাঁদের সংখ্যা ছিল তিনশ’ নব্বই জন। এঁদের মধ্যে ছিলেন পুরুষ ও নারী। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লাই সর্বাদিক সঠিক জ্ঞানের অধিকারী। আব্দুল্লাহ ইবনু শাদ্দাদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, যখন এই লোকগুলি মিসরে আগমন করেন তখন তাদের মোট সংখ্যা ছিল ৮৬ (ছিয়াশি) জন। তাদের মধ্যে ছিলেন পুরুষ, নারী, বালক ও বৃদ্ধ। আর যখন বের হন তখন তাদের সংখ্যা দাঁড়ায় ছ’লক্ষেরও বেশি।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।