আল কুরআন


সূরা ইউসুফ (আয়াত: 67)

সূরা ইউসুফ (আয়াত: 67)



হরকত ছাড়া:

وقال يا بني لا تدخلوا من باب واحد وادخلوا من أبواب متفرقة وما أغني عنكم من الله من شيء إن الحكم إلا لله عليه توكلت وعليه فليتوكل المتوكلون ﴿٦٧﴾




হরকত সহ:

وَ قَالَ یٰبَنِیَّ لَا تَدْخُلُوْا مِنْۢ بَابٍ وَّاحِدٍ وَّ ادْخُلُوْا مِنْ اَبْوَابٍ مُّتَفَرِّقَۃٍ ؕ وَ مَاۤ اُغْنِیْ عَنْکُمْ مِّنَ اللّٰهِ مِنْ شَیْءٍ ؕ اِنِ الْحُکْمُ اِلَّا لِلّٰهِ ؕ عَلَیْهِ تَوَکَّلْتُ ۚ وَ عَلَیْهِ فَلْیَتَوَکَّلِ الْمُتَوَکِّلُوْنَ ﴿۶۷﴾




উচ্চারণ: ওয়া কা-লা ইয়া-বানিইইয়া লা-তাদখুলূমিম বা-বিওঁ ওয়া-হিদিওঁ ওয়াদখুলূমিন আবওয়াবিম মুতাফাররিকাতিওঁ ওয়ামাউগনী ‘আনকুম মিনাল্লা-হি মিন শাইইন ইনিল হুকমু ইল্লা-লিল্লা-হি ‘আলাইহি তাওয়াক্কালতু ওয়া ‘আলাইহি ফালইয়াতাওয়াক্কালিল মুতাওয়াক্কিলূন।




আল বায়ান: সে বলল, ‘হে আমার ছেলেরা, তোমরা এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করো না, বরং ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ কর এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিপরীতে আমি তোমাদের কোন উপকার করতে পারব না। হুকুম একমাত্র আল্লাহরই। তাঁরই উপর আমি তাওয়াক্কুল করছি এবং তাঁরই উপর যেন সকল তাওয়াক্কুলকারী তাওয়াক্কুল করে’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬৭. আর তিনি বললেন, হে আমার পুত্ৰগণ! তোমরা এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করে না, ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে(১) আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিপরীতে আমি তোমাদের জন্য কিছু করতে পারি না। হুকুমের মালিক তো আল্লাহই। আমি তারই উপর নির্ভর করি। আর আল্লাহরই উপর যেন নির্ভরকারীরা নির্ভর করে।(২)




তাইসীরুল ক্বুরআন: পিতা বলল, ‘হে আমার সন্তানেরা! তোমরা এক দ্বার দিয়ে (মিসরে) প্রবেশ কর না, বরং ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে (মানুষের সন্দেহ কিংবা কুদৃষ্টি এড়ানোর জন্য)। আমি আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে তোমাদের কোনই উপকার করতে পারব না। আল্লাহ ছাড়া হুকুম দাতা কেউ নেই, আমি তাঁর উপরই নির্ভর করি, যারা নির্ভর করতে চায়, তারা তাঁর উপর নির্ভর করুক।’




আহসানুল বায়ান: (৬৭) সে (ইয়াকূব) বলল, ‘হে আমার পুত্রগণ! তোমরা (শহরের) এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করো না; বরং ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে।[1] আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে আমি তোমাদের জন্য কিছু করতে পারি না। বিধান আল্লাহরই।[2] আমি তাঁরই উপর নির্ভর করলাম এবং যারা নির্ভর করতে চায় তারা আল্লাহরই উপর নির্ভর করুক।’



মুজিবুর রহমান: সে বললঃ হে আমার পুত্রগণ! তোমরা এক দরযা দিয়ে প্রবেশ করনা, ভিন্ন ভিন্ন দরযা দিয়ে প্রবেশ করবে, আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে আমি তোমাদের জন্য কিছুই করতে পারিনা। বিধান আল্লাহরই; আমি তাঁরই উপর নির্ভর করি এবং যারা নির্ভর করতে চায় তারা তাঁরই (আল্লাহরই) উপর নির্ভর করুক।



ফযলুর রহমান: সে বলে দিল, “হে আমার ছেলেরা! তোমরা একই দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে না, বরং বিভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। আমি কিন্তু আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে তোমাদের জন্য কিছু করতে পারব না। বিধান একমাত্র আল্লাহরই। আমি তাঁরই ওপর ভরসা করি। আর তাঁর ওপর সকলেরই ভরসা করা উচিত।”



মুহিউদ্দিন খান: ইয়াকুব বললেনঃ হে আমার বৎসগণ! সবাই একই প্রবেশদ্বার দিয়ে যেয়ো না, বরং পৃথক পৃথক দরজা দিয়ে প্রবেশ করো। আল্লাহর কোন বিধান থেকে আমি তোমাদেরকে রক্ষা করতে পারি না। নির্দেশ আল্লাহরই চলে। তাঁরই উপর আমি ভরসা করি এবং তাঁরই উপর ভরসা করা উচিত ভরসাকারীদের।



জহুরুল হক: তিনি আরো বললেন, "হে আমার পুত্রগণ! তোমরা একই দরজা দিয়ে ঢুকো না, বরং তোমরা ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে ঢুকবে। আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে তোমাদের জন্যে আমার কিছুই করার ক্ষমতা নেই। বিধান তো একমাত্র আল্লাহ্‌র বৈ তো নয়। তাঁর উপরেই আমি নির্ভর করি, আর তাঁরই উপরে তবে নির্ভর করুক নির্ভরশীলগণ।"



Sahih International: And he said, "O my sons, do not enter from one gate but enter from different gates; and I cannot avail you against [the decree of] Allah at all. The decision is only for Allah; upon Him I have relied, and upon Him let those who would rely [indeed] rely."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৬৭. আর তিনি বললেন, হে আমার পুত্ৰগণ! তোমরা এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করে না, ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে(১) আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিপরীতে আমি তোমাদের জন্য কিছু করতে পারি না। হুকুমের মালিক তো আল্লাহই। আমি তারই উপর নির্ভর করি। আর আল্লাহরই উপর যেন নির্ভরকারীরা নির্ভর করে।(২)


তাফসীর:

(১) আলোচ্য আয়াতসমূহে ছোট ভাইকে সাথে নিয়ে ইউসুফ-ভ্রাতাদের দ্বিতীয়বার মিসর সফরের কথা বর্ণিত হয়েছে। ইউসুফ আলাইহিস সালামের পরে তার ভাইকে পাঠাবার সময় ইয়াকুব আলাইহিস সালামের মন কত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল তা এখানে বর্ণিত হয়েছে। নানা সন্দেহ ও আশংকা তার মনে জেগে ওঠা বিচিত্র নয় এবং সর্বদাই এ চিন্তায় তিনি পেরেশান হয়ে গিয়ে থাকবেন যে, আল্লাহই ভালো জানেন এখন এ ছেলের চেহারাও আর দেখতে পাবো কি না। তাই তিনি হয়তো নিজের সাধ্যমত সতর্কতা অবলম্বন করার ক্ষেত্রে কোন প্রকার ক্রটি না রাখতে চেয়েছিলেন।

তখন ইয়াকুব আলাইহিস সালাম তাদেরকে মিসর শহরে প্রবেশ করার জন্য একটি বিশেষ উপদেশ দেন যে, তোমরা এগার ভাই শহরের একই প্রবেশ দ্বার দিয়ে প্রবেশ করো না, বরং নগর প্রাচীরের কাছে পৌছে ছত্রভঙ্গ হয়ে যেয়ো এবং বিভিন্ন দরজা দিয়ে শহরে প্রবেশ করো। এর কারণ কি, আল্লাহ্ তা বর্ণনা করেননি। তবে অনেকে মনে করেন- এরূপ উপদেশ দানের কারণ এই আশঙ্কা ছিল যে, স্বাস্থ্যবান, সুঠামদেহী, সুদৰ্শন এবং রূপ ও ঔজ্জ্বল্যের অধিকারী এসব যুবক সম্পর্কে যখন লোকেরা জানবে যে, এরা একই পিতার সন্তান এবং ভাই ভাই, তখন কারো বদ নজর গেলে তাদের ক্ষতি হতে পারে। কুরতুবী [ইবন কাসীর] অথবা সঙ্গবদ্ধভাবে প্রবেশ করার কারণে হয়ত কেউ হিংসাপরায়ণ হয়ে তাদের ক্ষতি সাধন করতে পারে। কুরতুবী]


(২) ইয়াকুব আলাইহিস সালাম একদিকে কুদৃষ্টি অথবা হিংসা, অথবা সন্দেহভাজন মনে করার আশঙ্কাবশতঃ ছেলেদের একই দরজা দিয়ে শহরে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন এবং অন্যদিকে একটি বাস্তব সত্য প্রকাশ করাও জরুরী মনে করেছেন। তা হচ্ছে, কুদৃষ্টি থেকে আত্মরক্ষার যে তদবীর আমি বলেছি, আমি জানি যে, তা আল্লাহর ইচ্ছাকে এড়াতে পারবে না। আদেশ একমাত্র আল্লাহরই চলে। তবে মানুষের প্রতি বাহ্যিক তদবীর করার নির্দেশ আছে। তাই এ উপদেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমি তদবীরের উপর ভরসা করি না; বরং আল্লাহর উপরই ভরসা করি।

তার উপরই ভরসা করা এবং বাহ্যিক ও বস্তুভিত্তিক তদবীরের উপর ভরসা না করা প্রত্যেক মানুষের অবশ্য কর্তব্য। যারা সর্বাবস্থায় আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে তাদের সম্পর্কে হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন সুসংবাদ দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার উম্মতের মধ্যে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে। আর তারা হলেন সে সমস্ত লোক যারা (তাদের অসুস্থতার সময়) কারও কাছে ঝাড়ফুক চায় না, লোহা গরম করে ছেক দেয় না, কুলক্ষণ গ্রহণ করে না এবং সর্বদা তাদের প্রভুর উপর ভরসা করে। [বুখারীঃ ৬৪৭২]


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৬৭) সে (ইয়াকূব) বলল, ‘হে আমার পুত্রগণ! তোমরা (শহরের) এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করো না; বরং ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে।[1] আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে আমি তোমাদের জন্য কিছু করতে পারি না। বিধান আল্লাহরই।[2] আমি তাঁরই উপর নির্ভর করলাম এবং যারা নির্ভর করতে চায় তারা আল্লাহরই উপর নির্ভর করুক।’


তাফসীর:

[1] যখন বিনয়্যামীন সহ এগারো জন ভাই মিসর অভিমুখে রওয়ানা দিল, তখন তিনি এ নির্দেশনা দিয়েছিলেন, কেননা একই পিতার এগারো জন পুত্র যারা দেহের উচ্চতা এবং আকার-আকৃতিতেও শ্রেষ্ঠ, যখন একসাথে একই স্থান অথবা দলবদ্ধভাবে কোথাও দিয়ে অতিক্রম করে, তখন সাধারণতঃ লোকেরা আশ্চর্য এবং হিংসার দৃষ্টিতে দেখে, আর এটাই নজর লাগার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং তিনি তাদেরকে বদনজর থেকে বাঁচাবার জন্য উপায় স্বরূপ এই নির্দেশনা দিলেন। নজর লাগা সত্য। এটি নবী (সাঃ) থেকে বহু বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যেমন একটি হাদীসে আছে; الْعَيْنُ حَقٌّ অর্থাৎ নজর লাগা সত্য। (বুখারীঃ চিকিৎসা অধ্যায়, মুসলিমঃ সালাম অধ্যায়) এবং নবী (সাঃ) বদনজর থেকে বাঁচার জন্য স্বীয় উম্মতকে কতিপয় উপায়ও শিখিয়ে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেন, যখন তোমাদেরকে কোন জিনিস ভালো লাগে, তখন بَارَكَ اللهُ বলো। (মুঅত্ত্বা মালিক, আলবানীর তা’লীকাতে মিশকাত ১২৮৬নং) যার নজরে নজর লাগে, তাকে গোসল করতে বলা এবং তার গোসলের এই পানি সেই ব্যক্তির শরীরে ঢালা যাকে নজর লেগেছে। (পূর্বোক্ত উদ্ধৃতি) অনুরূপ ﴿مَا شَاءَ اللهُ لاَ قُوَّةَ إلاَّ بِالله﴾ِ পড়া কুরআন থেকে প্রমাণিত। (সূরা কাহফ ৩৯) ﴿قُلْ أعُوْذُ بِرَبِّ النَّاسِ﴾ এবং ﴿ قُلْ أعُوْذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ﴾ নজর লাগার চিকিৎসায় পড়ে ফুঁক দেওয়া উচিত। (তিরমিযী)

[2] অর্থাৎ, উক্ত নির্দেশনা বাহ্যিক উপায়, সতর্কতা ও সুব্যবস্থা স্বরূপ; যা অবলম্বন করার আদেশ মানুষকে করা হয়েছে। কিন্তু এর মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ভাগ্যে কোন পরিবর্তন ঘটতে পারে না। ঘটবে সেটাই যেটা তাঁর সিদ্ধান্ত বা ফায়সালা অনুসারে তাঁর হুকুম হবে।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৫৮-৬৮ নং আয়াতের তাফসীর:



এখানে ইউসুফ (عليه السلام) খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেয়ার পর যে সুন্দরভাবে দায়িত্ব পালন করেছিলন সে সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।



ইউসুফ (عليه السلام) খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাবার পর বাদশা যে সাত বছর ভাল ফসল উৎপন্ন হবার স্বপ্ন দেখেছিল সে সাত বছর তিনি সারা মিসরে ফসল উৎপন্ন করলেন এবং যেভাবে পরবর্তী সাত বছরের দুর্ভিক্ষের জন্য জমা রাখা দরকার সেভাবে জমা রাখলেন। এতে বুঝা যায় আধুনিককালের এলএসডি, সিএসডি খাদ্য গুদামজাতের অভিযাত্রা ইউসুফ (عليه السلام) এর মাধ্যমেই শুরু হয়েছে। যখন সাত বছর অতিক্রান্ত হয়ে দুর্ভিক্ষের সাত বছর এসে গেল তখন মিসরের সীমানা পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী দূর-দূরান্ত এলাকাসমূহে এই দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ল। ফলে ইয়া‘কূব (عليه السلام) এর পরিবারেও অনটন দেখা দেয়। এ সময় ইয়া‘কূব (عليه السلام) এর কাছে সংবাদ পৌঁছল যে, মিসরের নতুন বাদশা অত্যন্ত সৎ ও দয়ালু। তিনি স্বল্পমূল্যে এক উট পরিমাণ খাদ্যশস্য অভাবী ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণ করেন। এ খবর শুনে তিনি পুত্রদের বললেন, তোমরা মিসরে গিয়ে খাদ্যশস্য নিয়ে এসো। সেমতে দশ ভাই দশটি উট নিয়ে রওনা হয়ে গেল। বৃদ্ধ পিতার খেদমতে ও বাড়ি দেখাশুনার জন্য ছোট ভাই বিনয়ামীন রয়ে গেল। কেন‘আন থেকে মিসরে রাজধানীর দূরত্ব ছিল প্রায় ২৫০ মাইল। যথা সময়ে দশ ভাই মিসরে উপস্থিত হল। তারা যখন ইউসুফ (عليه السلام) এর নিকট প্রবেশ করল তখন ইউসুফ (عليه السلام) তাদেরকে দেখে চিনে ফেলেন কিন্তু তারা চিনতে পারেনি।



ইউসুফ (عليه السلام) এর কৌশল অবলম্বন ও বিনয়ামীনের মিসর আগমন:



সুদ্দী ও অন্যান্যদের বরাতে ইমাম কুরতুবী ও ইবনু কাসীর বর্ণনা করেন যে, দশ ভাই দরবারে পৌঁছলে তাদেরকে প্রাসাদের ভেতরে ডেকে নিয়ে মেহমানদারী করালেন এবং দোভাষীর মাধ্যমে এমনভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেন যেমন অচেনা লোকদের করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল তাদের সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া এবং পিতা ইয়া‘কূব ও ছোটভাই বিনয়ামীনের বর্তমান অবস্থা জেনে নেয়া। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা ভিন্নভাষী এবং ভিনদেশী। কিভাবে বুঝব যে, তোমরা শত্র“র গুপ্তচর নও? তারা বলল, আল্লাহর শপথ! আমরা গুপ্তচর নই। আমরা আল্লাহর নাবী ইয়া‘কূব (عليه السلام) এর সন্তান। তিনি কেন‘আনে বসবাস করেন। অভাবের তাড়নায় তাঁর নির্দেশে সুদূর পথ অতিক্রম করে আপনার কাছে এসেছি আপনার সুনাম-সুখ্যাতি শুনে। যদি আপনি আমাদেরকে সন্দেহ বশে গ্রেফতার করেন অথবা শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেন তাহলে আমাদের অতিবৃদ্ধ পিতা-মাতা ও পরিবার না খেয়ে মারা যাবে। (তাফসীর কুরতুবী, ইবনু কাসীর) এ কথা শুনে ইউসুফ (عليه السلام) এর হৃদয় উথলে উঠল এবং অতি কষ্টে তা বুকে চাপা রেখে তাদের পিতার অন্য কোন সন্তান আছে কি না জিজ্ঞেস করলেন। তারা জবাবে বলল, আমরা ১২ ভাই ছিলাম। আমরা দশ ভাই এখানে এসেছি আর বৈমাত্রেয় দু‘ভাই তাদের একজনকে বাঘে ফেয়ে ফেলেছে এবং অপরজনকে সান্ত্বনাস্বরূপ আমাদের পিতা তাঁর কাছে রাখেন।



তখন ইউসুফ (عليه السلام) তাদের সেই ভাইকে আগামী সফরে নিয়ে আসার উৎসাহ দিয়ে বললেন, দেখ না! আমি মাপে পূর্ণ করে দেই এবং উত্তম অতিথিপরায়ণ। তারপর ভয় দেখিয়ে বললেন: এমনকি যদি না নিয়ে আসো তাহলে আগামীতে তোমাদেরকে কোন খাদ্য দেয়া হবে না। তারা ইউসুফ (عليه السلام) এর কথামত তাদের এগারতম ভাইকে নিয়ে আসতে রাজি হল এবং বলল: আমরা এ ব্যাপারে আমাদের পিতাকে উদ্বুদ্ধ করব। তারা যাতে পুনরায় আসে সেজন্য ইউসুফ (عليه السلام) তাঁর কর্মচারীদেরকে বললেন, তাঁর ভাইদের দেয়া পণ্যমূল্য তাদের মালপত্রের মধ্যে তাদের অজান্তে রেখে দাও। এটা তাদের প্রতি দয়া দেখিয়েছিলেন এবং আগামীতে আসার জন্য পুঁজি না থাকলে যেন এ পুঁজি নিয়ে আসতে পারে, এজন্য এরূপ করেছেন। তারা বাড়িতে এসে পিতাকে বলল: আগামী দিনের খাদ্য বিনইয়ামীনকে নিয়ে যাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। আগামী সফরে তাকে নিতে পারলে খাদ্য দেবে, অন্যথায় খাদ্য দেবে না। তখন ইয়া‘কূব (عليه السلام) বললেন: ইতোপূর্বে তো ইউসুফের ব্যাপারে এরূপ কথা বলেছিলে, তাকে রক্ষণাবেক্ষণ করবে, এতবড় শক্তিশালী দল থাকতে কিভাবে বাঘে খেয়ে ফেলবে? তোমাদের কথায় বিশ্বাস করে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম, সেরূপ কি আবারো তোমাদের প্রতি বিশ্বাস করব? সুতরাং তোমরা তাকে সংরক্ষণ করার যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছ তার ওপর ভরসা করতে পারছিনা। আমি আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করছি, তিনি সর্বোত্তম সংরক্ষণকারী।



অতঃপর তারা তাদের মালপত্র খুলে দেখল যে, মালপত্রের মধ্যে তাদের পণ্যমূল্য ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে, এ দেখে তারা তাদের ভাইকে নিয়ে যাবার জন্য পিতার কাছে খুব কাকুতি-মিনতি করে বলল: হে আমাদের পিতা! এর চেয়ে আর কী আশা করতে পারি; তারা আমাদের সাথে সদাচরণ করেছে, মেহমানদারী করেছে, এমনকি আমাদের পুঁজিও ফেরত দিয়ে দিয়েছে। অতএব বিনইয়ামীনকে আমাদের সাথে দিন, আমরা এক উট বেশি খাদ্য নিয়ে আসব। এক উটের বেশির কথা বলার কারণ হল প্রত্যেককে এক উট পরিমাণ শস্য দেয়া হতো, এর বেশি দেয়া হতো না।



ইয়া‘কূব (عليه السلام) তাদের কাকুতি মিনতি ও অবস্থার প্রেক্ষাপট বুঝে বিনইয়ামীনকে তাদের সাথে দিতে সম্মত হলেন। তবে শর্ত করে দিলেন, তোমরা আল্লাহ তা‘আলার নামে অঙ্গীকার করবে যে, অবশ্যই তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে। তবে যদি এমন পরিস্থিতির শিকার হও যে, সকলকে আটক করে নেয়া হয়, বা এমন হয়ে যাও যা থেকে নিষ্কৃতির কোন পথ নেই তাহলে ভিন্ন কথা, ওযর গ্রহণযোগ্য হবে। মিসরে প্রবেশের পূর্বে কিছু দিকনির্দেশনা দিলেন, তোমরা একই দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে না। কারণ তারা সবাই ছিল সুশ্রী ও সুঠাম দেহের অধিকারী, যার ফলে এক সাথে প্রবেশ করলে তাদের ওপর মানুষের বদনজর লাগতে পারে। সুতরাং তিনি তাদেরকে বদনজর থেকে রক্ষার পরামর্শ দিয়ে এ কথা বলেছিলেন। বদনজর লাগা সত্য। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, العَيْنُ حَقٌّ বদনজর লাগা সত্য। (সহীহ বুখারী হা: ৫৭৪০, সহীহ মুসলিম হা: ২১৮৭)



আমাদের দেশে বদনজর থেকে বাঁচার জন্য লোকেরা শিশুদের বাম কপালে কাল টিপ দেয়, ফসলে যাতে বদনজর না লাগে সেজন্য ভাঙ্গা কালো পাতিলে সাদা গোলাকার দাগ দিয়ে লটকিয়ে দেয় ইত্যাদি ইত্যাদি। এসকল উপায়ে বদনজর থেকে বাঁচা যায় না বরং এটা করা শির্ক। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বদনজর থেকে বাঁচার জন্য উপায় শিখিয়ে দিয়েছেন। যেমন



হাদীসে এসেছে, যখন তোমাদের কোন কিছু ভাল লাগে তখন বলবে: بَارَكَ اللّٰهُ (মিশকাত হা: ১২৮৬, সহীহ)



অনুরূপ



مَا شَاءَ اللَّهُ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللّٰهِ



বলা যায়। (সূরা কাহ্ফ ১৮:৩৯)



যার পক্ষ থেকে নজর লেগেছে তার গোসলের পানি দিয়ে যার গায়ে নজর লেগেছে তার শরীরে ঢেলে দেবে। অনুরূপ নজর লাগলে সূরা নাস ও ফালাক পড়ে ঝাড়-ফুঁক করা যায়।



এসব দিকনির্দেশনার কথা বলে ইয়া‘কূব (عليه السلام) আল্লাহ তা‘আলার ফায়সালার দিকে ফিরে গেলেন এবং তাঁর উপরেই নির্ভর করলেন। কারণ তিনি যে ফায়সালা ও নির্দেশ দেন তা-ই হয়, তাঁর নির্দেশের ব্যতিক্রম কিছু হবার সুযোগ নেই। সবাই তাদের পিতার নির্দেশ মোতাবেক বিভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করল। কিন্তু এরপরেও আল্লাহ তা‘আলার পূর্ব নির্ধারিত তাকদীর কার্যকর হয়ে গেল। বিনয়ামীন চুরির মিথ্যা অপবাদে গ্রেফতার হয়ে যায়। যা ছিল ইয়া‘কূব (عليه السلام) এর জন্য দ্বিতীয়বার সবচেয়ে বড় আঘাত। অতএব পিতার নির্দেশ পালন করলেও তারা আল্লাহ তা‘আলার নির্ধারিত তাকদীরকে এড়াতে পারেনি। আর সে তাকদীরের ফলেই ইয়া‘কূব (عليه السلام) তার হারানো দু’সন্তানকে একত্রে ফিরে পান। এতে এটা প্রমাণিত হয় না যে, মানুষের কৌশল অবলম্বন করার কারণে আল্লাহ তা‘আলার নির্ধারিত ভাগ্যকে রদ করা সম্ভব। এটা ছিল ইয়া‘কূব (عليه السلام) এর একটা তদবীর মাত্র। তিনি যে কৌশল অবলম্বন করলেন এটাও আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে শেখানো ছিল, তিনি নিজের থেকে কিছু বলেননি।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. মানুষের বদ নজর লাগা সত্য, তা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।

২. মানুষের কোন কাজের কারণে আল্লাহ তা‘আলার হুকুম রহিত হবে না। যা সিদ্ধান্ত হয়ে যায় তা হবেই, তবে অমঙ্গল হতে বাঁচার এবং মঙ্গল লাভের চেষ্টা করতে হবে।

৩. মানুষ অসহায়, নিরূপায় ও বাধ্য হয়ে কারো কোন ক্ষতি করে ফেললে তাকে দোষারোপ করা ঠিক নয়। যেমন ইয়া‘কূব (عليه السلام) ছেলেদেরকে বলেছিলেন যদি তোমরা অসহায় হয়ে পড় তাহলে সে কথা ভিন্ন।

৪. বদ নজর থেকে বাঁচার জন্য তাবীয-কবজ ও শির্কী চিকিৎসা গ্রহণ করা হারাম, বরং শরীয়তসম্মত অনেক ব্যবস্থা রয়েছে; তা গ্রহণ করা উচিত।

৫. সত্য বিজয়ী ও প্রতিষ্ঠিত হবেই যদিও দেরীত হয়, যেমন ইউসুফ (عليه السلام) প্রতিষ্ঠিত হলেন।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৬৭-৬৮ নং আয়াতের তাফসীর

হযরত ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতাগণ যে সময় তাঁদের ভাই বিনইয়ামীনসহ মিসরের পথে যাত্রা শুরু করেন আল্লাহ তাআ’লা তারই খবর দিচ্ছেন। হযরত ইয়াকুবের (আঃ) মনে এই আশঙ্কা ছিল যে, তাঁর ছেলেদের উপর মানুষের কুদৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হতে পারে। কেননা, তারা সবাই ছিলেন সুশ্রী ও সুঠাম দেহের অধিকারী। এই কারণেই তাদের মিসরের পথে রওয়ানা হবার সময় তাদেরকে উপদেশ দেনঃ “হে আমার প্রিয় বৎসগণ! তোমরা সবাই একই দরজা দিয়ে শহরে প্রবেশ করবে না। বরং ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। কেননা মানুষের কুদৃষ্টি লেগে যাওয়া সত্য। এটা ঘোড় সওয়ারকে ঘোড়র উপর থেকে ফেলে দেয়।” এর সাথে সাথেই তিনি বলেনঃ “আমি জানি এবং আমার এ বিশ্বাস আছে যে, আমার এই তদবীর তকদীরের কোন পরিবর্তন ঘটাতে পারে না। আল্লাহ তাআ’লার ফায়সালাকে কোন লোকই কোন তদবীর দ্বারা বদলাতে পারে না। তাঁর ইচ্ছা পূর্ণ হয়েই থাকে। একমাত্র তাঁরই হুকুম কার্যকরী হয়। কে এমন আছে যে তার ইচ্ছাকে তিল পরিমাণ বদলাতে পারে? কে আছে যে তার ফরমানকে মুলতবী রাখতে পারে? তার ফায়সালাকে ফেরাতে পারে এমন কে আছে? তাঁরই উপর আমার ভরসা। শুধু আমার উপরই সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রত্যেকেরই তাঁরই উপর ভরসা করা উচিত।”

সুতরাং হযরত ইয়াকুবের (আঃ) পুত্রগণ তাঁদের পিতার উপদেশ মান্য করল এবং বিভিন্ন দরজা দিয়ে শহরে প্রবেশ করল। এভাবে আল্লাহ তাআ’লার ফায়সালাকে পরিবর্তন করার ক্ষমতা তাদের ছিল না। হ্যাঁ, তবে হযরত ইয়াকুব (আঃ) একটি প্রকাশ্য তদবীর পূর্ণ করলেন, যেন তাঁর সন্তানরা কু-নযর থেকে বাঁচতে পারেন। তিনি জ্ঞানী ছিলেন। তাঁর আল্লাহ প্রদত্ত বিদ্যা ছিল কিন্তু অধিকাংশ লোকই এটা অবগত নয়।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।