আল কুরআন


সূরা ইউসুফ (আয়াত: 61)

সূরা ইউসুফ (আয়াত: 61)



হরকত ছাড়া:

قالوا سنراود عنه أباه وإنا لفاعلون ﴿٦١﴾




হরকত সহ:

قَالُوْا سَنُرَاوِدُ عَنْهُ اَبَاهُ وَ اِنَّا لَفٰعِلُوْنَ ﴿۶۱﴾




উচ্চারণ: কা-লূছানুরা-ওয়িদু‘আনহু আবা-হু ওয়া ইন্না-লাফা-‘ইলূন।




আল বায়ান: তারা বলল, ‘তার বিষয়ে আমরা তার পিতাকে রাজি করাব, আর এটি আমরা করবই’।




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৬১. তারা বলল, তার ব্যাপারে আমরা তার পিতাকে সম্মত করানোর চেষ্টা করব এবং আমরা নিশ্চয়ই এটা করব।




তাইসীরুল ক্বুরআন: তারা বলল- ‘এ ব্যাপারে আমরা তার পিতাকে রাযী করাতে চেষ্টা করব আর আমরা তা করবই।’




আহসানুল বায়ান: (৬১) তারা বলল, ‘ওর বিষয়ে আমরা ওর পিতাকে সম্মত করার চেষ্টা করব এবং আমরা নিশ্চয়ই এটা করব।’ [1]



মুজিবুর রহমান: তারা বললঃ ওর বিষয়ে আমরা ওর পিতাকে সম্মত করার চেষ্টা করব এবং আমরা নিশ্চয়ই এটা করব।



ফযলুর রহমান: তারা বলল, “আমরা তার ব্যাপারে তার বাবাকে রাজি করানোর চেষ্টা করব এবং আমরা (এ কাজটা) করবই।”



মুহিউদ্দিন খান: তারা বললঃ আমরা তার সম্পর্কে তার পিতাকে সম্মত করার চেষ্টা করব এবং আমাদেরকে একাজ করতেই হবে।



জহুরুল হক: তারা বললে -- "আমরা আলবৎ চেষ্টা করব তার সন্বন্ধে তার পিতার কাছে এবং আমরা নিশ্চয়ই কাজ করব।"



Sahih International: They said, "We will attempt to dissuade his father from [keeping] him, and indeed, we will do [it]."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৬১. তারা বলল, তার ব্যাপারে আমরা তার পিতাকে সম্মত করানোর চেষ্টা করব এবং আমরা নিশ্চয়ই এটা করব।


তাফসীর:

-


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৬১) তারা বলল, ‘ওর বিষয়ে আমরা ওর পিতাকে সম্মত করার চেষ্টা করব এবং আমরা নিশ্চয়ই এটা করব।’ [1]


তাফসীর:

[1] অর্থাৎ সেই ভাইকে নিয়ে আসার জন্য আমরা আব্বাকে উদ্ধুদ্ধ করব, আশা করি যে, আমাদের প্রচেষ্টায় আমরা সফল হব।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৫৮-৬৮ নং আয়াতের তাফসীর:



এখানে ইউসুফ (عليه السلام) খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেয়ার পর যে সুন্দরভাবে দায়িত্ব পালন করেছিলন সে সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।



ইউসুফ (عليه السلام) খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাবার পর বাদশা যে সাত বছর ভাল ফসল উৎপন্ন হবার স্বপ্ন দেখেছিল সে সাত বছর তিনি সারা মিসরে ফসল উৎপন্ন করলেন এবং যেভাবে পরবর্তী সাত বছরের দুর্ভিক্ষের জন্য জমা রাখা দরকার সেভাবে জমা রাখলেন। এতে বুঝা যায় আধুনিককালের এলএসডি, সিএসডি খাদ্য গুদামজাতের অভিযাত্রা ইউসুফ (عليه السلام) এর মাধ্যমেই শুরু হয়েছে। যখন সাত বছর অতিক্রান্ত হয়ে দুর্ভিক্ষের সাত বছর এসে গেল তখন মিসরের সীমানা পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী দূর-দূরান্ত এলাকাসমূহে এই দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ল। ফলে ইয়া‘কূব (عليه السلام) এর পরিবারেও অনটন দেখা দেয়। এ সময় ইয়া‘কূব (عليه السلام) এর কাছে সংবাদ পৌঁছল যে, মিসরের নতুন বাদশা অত্যন্ত সৎ ও দয়ালু। তিনি স্বল্পমূল্যে এক উট পরিমাণ খাদ্যশস্য অভাবী ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণ করেন। এ খবর শুনে তিনি পুত্রদের বললেন, তোমরা মিসরে গিয়ে খাদ্যশস্য নিয়ে এসো। সেমতে দশ ভাই দশটি উট নিয়ে রওনা হয়ে গেল। বৃদ্ধ পিতার খেদমতে ও বাড়ি দেখাশুনার জন্য ছোট ভাই বিনয়ামীন রয়ে গেল। কেন‘আন থেকে মিসরে রাজধানীর দূরত্ব ছিল প্রায় ২৫০ মাইল। যথা সময়ে দশ ভাই মিসরে উপস্থিত হল। তারা যখন ইউসুফ (عليه السلام) এর নিকট প্রবেশ করল তখন ইউসুফ (عليه السلام) তাদেরকে দেখে চিনে ফেলেন কিন্তু তারা চিনতে পারেনি।



ইউসুফ (عليه السلام) এর কৌশল অবলম্বন ও বিনয়ামীনের মিসর আগমন:



সুদ্দী ও অন্যান্যদের বরাতে ইমাম কুরতুবী ও ইবনু কাসীর বর্ণনা করেন যে, দশ ভাই দরবারে পৌঁছলে তাদেরকে প্রাসাদের ভেতরে ডেকে নিয়ে মেহমানদারী করালেন এবং দোভাষীর মাধ্যমে এমনভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেন যেমন অচেনা লোকদের করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল তাদের সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া এবং পিতা ইয়া‘কূব ও ছোটভাই বিনয়ামীনের বর্তমান অবস্থা জেনে নেয়া। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা ভিন্নভাষী এবং ভিনদেশী। কিভাবে বুঝব যে, তোমরা শত্র“র গুপ্তচর নও? তারা বলল, আল্লাহর শপথ! আমরা গুপ্তচর নই। আমরা আল্লাহর নাবী ইয়া‘কূব (عليه السلام) এর সন্তান। তিনি কেন‘আনে বসবাস করেন। অভাবের তাড়নায় তাঁর নির্দেশে সুদূর পথ অতিক্রম করে আপনার কাছে এসেছি আপনার সুনাম-সুখ্যাতি শুনে। যদি আপনি আমাদেরকে সন্দেহ বশে গ্রেফতার করেন অথবা শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেন তাহলে আমাদের অতিবৃদ্ধ পিতা-মাতা ও পরিবার না খেয়ে মারা যাবে। (তাফসীর কুরতুবী, ইবনু কাসীর) এ কথা শুনে ইউসুফ (عليه السلام) এর হৃদয় উথলে উঠল এবং অতি কষ্টে তা বুকে চাপা রেখে তাদের পিতার অন্য কোন সন্তান আছে কি না জিজ্ঞেস করলেন। তারা জবাবে বলল, আমরা ১২ ভাই ছিলাম। আমরা দশ ভাই এখানে এসেছি আর বৈমাত্রেয় দু‘ভাই তাদের একজনকে বাঘে ফেয়ে ফেলেছে এবং অপরজনকে সান্ত্বনাস্বরূপ আমাদের পিতা তাঁর কাছে রাখেন।



তখন ইউসুফ (عليه السلام) তাদের সেই ভাইকে আগামী সফরে নিয়ে আসার উৎসাহ দিয়ে বললেন, দেখ না! আমি মাপে পূর্ণ করে দেই এবং উত্তম অতিথিপরায়ণ। তারপর ভয় দেখিয়ে বললেন: এমনকি যদি না নিয়ে আসো তাহলে আগামীতে তোমাদেরকে কোন খাদ্য দেয়া হবে না। তারা ইউসুফ (عليه السلام) এর কথামত তাদের এগারতম ভাইকে নিয়ে আসতে রাজি হল এবং বলল: আমরা এ ব্যাপারে আমাদের পিতাকে উদ্বুদ্ধ করব। তারা যাতে পুনরায় আসে সেজন্য ইউসুফ (عليه السلام) তাঁর কর্মচারীদেরকে বললেন, তাঁর ভাইদের দেয়া পণ্যমূল্য তাদের মালপত্রের মধ্যে তাদের অজান্তে রেখে দাও। এটা তাদের প্রতি দয়া দেখিয়েছিলেন এবং আগামীতে আসার জন্য পুঁজি না থাকলে যেন এ পুঁজি নিয়ে আসতে পারে, এজন্য এরূপ করেছেন। তারা বাড়িতে এসে পিতাকে বলল: আগামী দিনের খাদ্য বিনইয়ামীনকে নিয়ে যাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। আগামী সফরে তাকে নিতে পারলে খাদ্য দেবে, অন্যথায় খাদ্য দেবে না। তখন ইয়া‘কূব (عليه السلام) বললেন: ইতোপূর্বে তো ইউসুফের ব্যাপারে এরূপ কথা বলেছিলে, তাকে রক্ষণাবেক্ষণ করবে, এতবড় শক্তিশালী দল থাকতে কিভাবে বাঘে খেয়ে ফেলবে? তোমাদের কথায় বিশ্বাস করে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম, সেরূপ কি আবারো তোমাদের প্রতি বিশ্বাস করব? সুতরাং তোমরা তাকে সংরক্ষণ করার যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছ তার ওপর ভরসা করতে পারছিনা। আমি আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করছি, তিনি সর্বোত্তম সংরক্ষণকারী।



অতঃপর তারা তাদের মালপত্র খুলে দেখল যে, মালপত্রের মধ্যে তাদের পণ্যমূল্য ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে, এ দেখে তারা তাদের ভাইকে নিয়ে যাবার জন্য পিতার কাছে খুব কাকুতি-মিনতি করে বলল: হে আমাদের পিতা! এর চেয়ে আর কী আশা করতে পারি; তারা আমাদের সাথে সদাচরণ করেছে, মেহমানদারী করেছে, এমনকি আমাদের পুঁজিও ফেরত দিয়ে দিয়েছে। অতএব বিনইয়ামীনকে আমাদের সাথে দিন, আমরা এক উট বেশি খাদ্য নিয়ে আসব। এক উটের বেশির কথা বলার কারণ হল প্রত্যেককে এক উট পরিমাণ শস্য দেয়া হতো, এর বেশি দেয়া হতো না।



ইয়া‘কূব (عليه السلام) তাদের কাকুতি মিনতি ও অবস্থার প্রেক্ষাপট বুঝে বিনইয়ামীনকে তাদের সাথে দিতে সম্মত হলেন। তবে শর্ত করে দিলেন, তোমরা আল্লাহ তা‘আলার নামে অঙ্গীকার করবে যে, অবশ্যই তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে। তবে যদি এমন পরিস্থিতির শিকার হও যে, সকলকে আটক করে নেয়া হয়, বা এমন হয়ে যাও যা থেকে নিষ্কৃতির কোন পথ নেই তাহলে ভিন্ন কথা, ওযর গ্রহণযোগ্য হবে। মিসরে প্রবেশের পূর্বে কিছু দিকনির্দেশনা দিলেন, তোমরা একই দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে না। কারণ তারা সবাই ছিল সুশ্রী ও সুঠাম দেহের অধিকারী, যার ফলে এক সাথে প্রবেশ করলে তাদের ওপর মানুষের বদনজর লাগতে পারে। সুতরাং তিনি তাদেরকে বদনজর থেকে রক্ষার পরামর্শ দিয়ে এ কথা বলেছিলেন। বদনজর লাগা সত্য। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, العَيْنُ حَقٌّ বদনজর লাগা সত্য। (সহীহ বুখারী হা: ৫৭৪০, সহীহ মুসলিম হা: ২১৮৭)



আমাদের দেশে বদনজর থেকে বাঁচার জন্য লোকেরা শিশুদের বাম কপালে কাল টিপ দেয়, ফসলে যাতে বদনজর না লাগে সেজন্য ভাঙ্গা কালো পাতিলে সাদা গোলাকার দাগ দিয়ে লটকিয়ে দেয় ইত্যাদি ইত্যাদি। এসকল উপায়ে বদনজর থেকে বাঁচা যায় না বরং এটা করা শির্ক। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বদনজর থেকে বাঁচার জন্য উপায় শিখিয়ে দিয়েছেন। যেমন



হাদীসে এসেছে, যখন তোমাদের কোন কিছু ভাল লাগে তখন বলবে: بَارَكَ اللّٰهُ (মিশকাত হা: ১২৮৬, সহীহ)



অনুরূপ



مَا شَاءَ اللَّهُ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللّٰهِ



বলা যায়। (সূরা কাহ্ফ ১৮:৩৯)



যার পক্ষ থেকে নজর লেগেছে তার গোসলের পানি দিয়ে যার গায়ে নজর লেগেছে তার শরীরে ঢেলে দেবে। অনুরূপ নজর লাগলে সূরা নাস ও ফালাক পড়ে ঝাড়-ফুঁক করা যায়।



এসব দিকনির্দেশনার কথা বলে ইয়া‘কূব (عليه السلام) আল্লাহ তা‘আলার ফায়সালার দিকে ফিরে গেলেন এবং তাঁর উপরেই নির্ভর করলেন। কারণ তিনি যে ফায়সালা ও নির্দেশ দেন তা-ই হয়, তাঁর নির্দেশের ব্যতিক্রম কিছু হবার সুযোগ নেই। সবাই তাদের পিতার নির্দেশ মোতাবেক বিভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করল। কিন্তু এরপরেও আল্লাহ তা‘আলার পূর্ব নির্ধারিত তাকদীর কার্যকর হয়ে গেল। বিনয়ামীন চুরির মিথ্যা অপবাদে গ্রেফতার হয়ে যায়। যা ছিল ইয়া‘কূব (عليه السلام) এর জন্য দ্বিতীয়বার সবচেয়ে বড় আঘাত। অতএব পিতার নির্দেশ পালন করলেও তারা আল্লাহ তা‘আলার নির্ধারিত তাকদীরকে এড়াতে পারেনি। আর সে তাকদীরের ফলেই ইয়া‘কূব (عليه السلام) তার হারানো দু’সন্তানকে একত্রে ফিরে পান। এতে এটা প্রমাণিত হয় না যে, মানুষের কৌশল অবলম্বন করার কারণে আল্লাহ তা‘আলার নির্ধারিত ভাগ্যকে রদ করা সম্ভব। এটা ছিল ইয়া‘কূব (عليه السلام) এর একটা তদবীর মাত্র। তিনি যে কৌশল অবলম্বন করলেন এটাও আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে শেখানো ছিল, তিনি নিজের থেকে কিছু বলেননি।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. মানুষের বদ নজর লাগা সত্য, তা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।

২. মানুষের কোন কাজের কারণে আল্লাহ তা‘আলার হুকুম রহিত হবে না। যা সিদ্ধান্ত হয়ে যায় তা হবেই, তবে অমঙ্গল হতে বাঁচার এবং মঙ্গল লাভের চেষ্টা করতে হবে।

৩. মানুষ অসহায়, নিরূপায় ও বাধ্য হয়ে কারো কোন ক্ষতি করে ফেললে তাকে দোষারোপ করা ঠিক নয়। যেমন ইয়া‘কূব (عليه السلام) ছেলেদেরকে বলেছিলেন যদি তোমরা অসহায় হয়ে পড় তাহলে সে কথা ভিন্ন।

৪. বদ নজর থেকে বাঁচার জন্য তাবীয-কবজ ও শির্কী চিকিৎসা গ্রহণ করা হারাম, বরং শরীয়তসম্মত অনেক ব্যবস্থা রয়েছে; তা গ্রহণ করা উচিত।

৫. সত্য বিজয়ী ও প্রতিষ্ঠিত হবেই যদিও দেরীত হয়, যেমন ইউসুফ (عليه السلام) প্রতিষ্ঠিত হলেন।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৫৮-৬২ নং আয়াতের তাফসীর

সুদ্দী (রঃ), মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক (রঃ) প্রভৃতি মুফাসসিরগণ হযরত ইউসুফের (আঃ) ভাইদের মিসরে গমনের কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন যে হযরত ইউসুফ (আঃ) মিসরের উযীর নিযুক্ত হওয়ার পর সাত বছর পর্যন্ত খাদ্য শস্য প্রচুর পরিমাণে জমা করেন। এরপরে যখন সাধারণভাবে দুর্ভিক্ষ শুরু হয়ে যায় এবং জনগণ এক একটি দানার জন্যে ব্যাকুল হয়ে ফিরতে থাকে তখন তিনি অভাবীদেরকে দান করতে শুরু করেন। এই দুর্ভিক্ষ মিসরের এলাকায় ছাড়াও কিনআ’ন ইত্যাদি শহরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। হযরত ইউসুফ (আঃ) বিদেশী লোকদেরকে উট বোঝাই করে খাদ্য দান করতেন। স্বয়ং তিনি ও বাদশাহ দিনে শুধুমাত্র একবার দুপুরের সময় দু’ এক গ্রাস খাবার খেতেন এবং মিসরবাসীকে পেট পুরে খাওয়াতেন। সুতরাং ঐ যুগে মিসরবাসীদের উপর এটা একটা আল্লাহর রহমত ছিল।

কোন কোন মুফাসসির হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, হযরত ইউসুফ (আঃ) প্রথম বছর মালের বিনিময়ে খাদ্য বিক্রি করেন, দ্বিতীয় বছর বিক্রি করেন আসবাবপত্রের বিমিনমিয়ে। এভাবে তিনি তৃতীয় ও চতুর্থ বছরেও খাদ্য বিক্রি করেন। তারপরে বিক্রি করেন স্বয়ং মানুষের জীবন এবং তাদের সন্তানদের বিনিময়ে। সুতরাং তিনি মানুষের জীবন, তাদের সন্তান এবং তাদের অধিকারভুক্ত সমস্ত ধন মালের মালিক হয়ে যান। কিন্তু এরপর তিনি সকলকেই আযাদ করে দেন এবং তাদের মালধনও তাদেরকে ফিরিয়ে দেন। এটা হচ্ছে বণী ইসরাঈলের রিওয়াইত বা বর্ণনা। সুতরাং এটাকে আমরা সত্য মিথ্যা কিছুই বলতে পারি না।

এখানে এই বর্ণনা দেয়া হচ্ছে যে, মিসরে আগমনকারীদের মধ্যে হযরত ইউসুফের (আঃ) ভাইয়েরাও ছিলেন। তাঁরা তাঁদের পিতার নির্দেশক্রমে মিসরে আগমন করেছিলেন। তাঁদের পিতা অবগত হয়েছিলেন যে, মিসরের আযীয মালের বিনিময়ে খাদ্য প্রদান করে থাকেন। তাই তিনি তাঁর দশজন ছেলেকে সেখানে পাঠিয়েছিলেন এবং হযরত ইউসুফের (আঃ) সহোদর ভাই বিনইয়ামীনকে নিজের কাছে রেখেছিলেন। যাকে তিনি হযরত ইউসুফের (আঃ) পরে খুবই ভালবাসতেন। যখন এই যাত্রীদল হযরত ইউসুফের (আঃ) নিকট পৌঁছেন তখন তিনি এক নজর দেখেই তাঁদেরকে চিনে নেন। কিন্তু তাঁদের কেউই তাকে চিনতে পারেন নাই। কেননা, বাল্যাবস্থাতেই তিনি তাঁদের থেকে পৃথক হয়ে গিয়েছিলেন। ভ্রাতাগণ তাঁকে সওদাগরদের নিকট বিক্রি করে দিয়েছিলেন। তারপরে কি হলো তা তারা কি করে জানবেন? এটা তো ছিল কল্পনাতীত কথা যে, যাঁকে তাঁরা গোলাম হিসেবে বিক্রি করে দিয়েছেন তিনি আজ মিসরের আযীয হয়ে বসেছেন। এদিকে হযরত ইউসুফ (আঃ) এমনভাবে তাদের সাথে কথাবার্তা বলেন যে, তিনিই যে ইউসুফ (আঃ) এ ধারণাও তাঁদের অন্তরে স্থান পায় নাই। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনারা কিভাবে আমাদের দেশে আসলেন?” তাঁরা উত্তরে বললো: “আপনি খাদ্য দান করে থাকেন এ খবর শুনেই আমরা আপনার রাজ্যে এসেছি।” তিনি বলেনঃ “আমার মনে সন্দেহ হচ্ছে যে, আপনারা হয়তো গুপ্তচর।” তাঁরা বলেনঃ “আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আমরা গুপ্তচর নই।” তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ “আপনাদের বাসস্থান কোথায়?” তারা জবাবে বলেনঃ “আমরা কিনআ’নের অধিবাসী। আমাদের পিতার নাম ইয়াকুব (আঃ), তিনি আল্লাহ তাআ’লার একজন নবী।” তিনি তাঁদেরকে প্রশ্ন করেনঃ “তোমরা ছাড়া তার আর কোন ছেলে আছে কি? তারা জবাবে বলল “হ্যাঁ, আমরা বারো ভাই ছিলাম। আমাদের মধ্যে যে ছিল সবচেয়ে ছোট এবং পিতার চোখের মণি সে তো ধ্বংস হয়ে গেছে। তারই এক সহোদর ভাই আছে। তাকে পিতা আমাদের সাথে পাঠান নাই। তাকে তিনি নিজের কাছেই রেখে দিয়েছেন। তারই মাধ্যমে তিনি কিছুটা সান্ত্বনা লাভ করে থাকেন।” এরপর হযরত ইউসুফ (আঃ) তার ভৃত্যদের নির্দেশ দেন যে, তাদেরকে যেন সরকারী মেহমান মনে করা হয় এবং সম্মানজনক স্থানে তাদেরকে থাকার ব্যবস্থা করা হয় ও উত্তম খাবার খেতে দেয়া হয়।

অতঃপর যখন তাঁদেরকে খাদ্য শস্য দেয়া শুরু হলো এবং বস্তা ভর্তি করে দেয়া হলো, আর তাঁদের সাথে যতগুলি বাহন জন্তু ছিল সেগুলি যতগুলি বোঝা বইতে পারে ততগুলিই ওগুলির উপর চাপিয়ে দেয়া হলো তখন হযরত ইউসুফ (আঃ) তাঁদেরকে বললেনঃ “দেখুন! আপনাদের কথার সত্যতার প্রমাণ হিসেবে আপনাদের যে ভাইটিকে এবার সঙ্গে আনেন নাই, পরবর্তী সময়ে তাকে অবশ্যই সাথে নিয়ে আসবেন। দেখুন! আমি আপনাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করেছি এবং আপনাদের সম্মান প্রদর্শনে একটুও ক্রটি করি নাই।” এভাবে তাঁদের উৎসাহ প্রদানের পর আবার ধমকও দেন। তিনি বলেনঃ “পরের দফে যদি আপনারা আপনাদের ঐ ভাইটিকে সঙ্গে না আনেন তবে খাদ্যের একটি দানাও আপনাদেরকে দেয়া হবে না এমনকি আপনাদেরকে আমার কাছেও আসতে দেবো না।” তাঁরা প্রতিশ্রুতি দিল এবং বললো, “আমরা আমাদের পিতাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে
বলবো এবং যে কোন প্রকারেই হোক না কেন আমরা আমাদের ঐ ভাইটিকে সঙ্গে আনার চেষ্টা করবো। যাতে আমরা বাদশাহর কাছে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত না হই।” সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, হযরত ইউসুফ (আঃ) তাঁর ভাইদের নিকট থেকে কিছু জিনিষ তার কাছে বন্ধক রেখেছিলেন এবং তাদেরকে বলেছিলেনঃ “আপনারা আপনাদের ঐ ভাইটিকে সঙ্গে করে আমার কাছে আসলেই এটা পেয়ে যাবেন। কিন্তু এটা সত্য বলে মনে হচ্ছে না। কেননা, তিনি তো তাদেরকে পুনরায় তাঁর কাছে ফিরে আসার ব্যাপারে বেশ উৎসাহ প্রদান করেছিলেন এবং অনেক কিছু লোভ দেখিয়ে ছিলেন।

যখন ভ্রাতাগণ বিদায়ের প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন তখন হযরত ইউসুফ (আঃ) তাঁর চতুর ভৃত্যদেরকে নির্দেশ দিলেন যে, খাদ্য দ্রব্য গ্রহণের বিনিময় হিসেবে যে সব আসবাবপত্র তাঁরা আনয়ন করেছে তা যেন তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু এমন কৌশলে এটা করতে হবে যে, তাঁরা যেন মোটেই টের না পায়। তাঁদের বস্তার মধ্যে ঐ আসবাবপত্র গুলি অতি সন্তর্পণে ভরে দিতে হবে। সম্ভবতঃ এর একটি কারণ হচ্ছে: তাঁর মনে হলো যে, যে সব আসবাব তাঁরা খাদ্য দ্রব্য গ্রহণের বিনিময় হিসেবে আনয়ন করেছে সেগুলি যদি তিনি নিয়ে নেন তবে তাদের বাড়ীর অবস্থা কি হবে! আবার এটাও হতে পারে যে, তিনি পিতা ও ভাইদের নিকট থেকে খাদ্যের বিনিময় গ্রহণ করা সমীচীন মনে করেননি। তাছাড়া এও হতে পারে যে, তাঁর ধারণায় যখন তারা বাড়ীতে গিয়ে বস্তা খুলবে এবং তাদের আসবাবপত্রগুলি বস্তার মধ্যে পাবে তখন অবশ্যই তার প্রাপ্য জিনিষ তাঁকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্যে তার কাছে তারা ফিরে আসবে। এই সুযোগে তিনি তাঁদের সাথে পুনরায় মিলিত হতে পারবেন।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।