সূরা ইউসুফ (আয়াত: 52)
হরকত ছাড়া:
ذلك ليعلم أني لم أخنه بالغيب وأن الله لا يهدي كيد الخائنين ﴿٥٢﴾
হরকত সহ:
ذٰلِکَ لِیَعْلَمَ اَنِّیْ لَمْ اَخُنْهُ بِالْغَیْبِ وَ اَنَّ اللّٰهَ لَا یَهْدِیْ کَیْدَ الْخَآئِنِیْنَ ﴿۵۲﴾
উচ্চারণ: যা-লিকা লিইয়া‘লামা আন্নী লাম আখুনহু বিলগাইবি ওয়া আন্নাল্লা-হা লা-ইয়াহদী কাইদাল খাইনীন।
আল বায়ান: এটি এ জন্য যে, যাতে সে জানতে পারে, আমি তার অনুপস্থিতিতে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করিনি। আর আল্লাহ অবশ্যই বিশ্বাসঘাতকদের চক্রান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে দেন না।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫২. এটা এ জন্যে যে, যাতে সে জানতে পারে, তার অনুপস্থিতিতে আমি তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিনি এবং নিশ্চয় আল্লাহ বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্র সফল করেন না।
তাইসীরুল ক্বুরআন: (ইউসুফ বলল) ‘আমার উদ্দেশ্য এই যে, সে (অর্থাৎ আযীয) যেন জানতে পারে যে, তার অনুপস্থিতিতে আমি তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিনি আর আল্লাহ বিশ্বাসঘাতকদের কৌশলকে অবশ্যই সফল হতে দেন না।’
আহসানুল বায়ান: (৫২) এটা এ জন্য যে, যাতে সে জানতে পারে যে, তার অনুপস্থিতিতে আমি তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিনি[1] এবং আল্লাহ বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্র সফল করেন না। [2]
মুজিবুর রহমান: সে বললঃ আমি এটা বলেছিলাম যাতে সে জানতে পারে যে, তার অনুপস্থিতিতে আমি তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিনি এবং আল্লাহ বিশ্বাস ঘাতকদের ষড়যন্ত্র সফল করেননা।
ফযলুর রহমান: (ইউসুফ বলল) “এটা এজন্য দরকার ছিল, যাতে আযীয জানতে পারে যে, আমি তার অনুপস্থিতিতে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করিনি। আর আল্লাহ বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্রকে ঠিক পথে চালান না (সফল করেন না)।”
মুহিউদ্দিন খান: ইউসুফ বললেনঃ এটা এজন্য, যাতে আযীয জেনে নেয় যে, আমি গোপনে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করিনি। আরও এই যে, আল্লাহ বিশ্বাসঘাতকদের প্রতারণাকে এগুতে দেন না।
জহুরুল হক: এটিই, যেন তিনি জানতে পারেন যে আমি গোপনে তাঁর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করি নি। আর নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ বিশ্বাসহন্তাদের ছলাকলা পরিচালিত করেন না।
Sahih International: That is so al-'Azeez will know that I did not betray him in [his] absence and that Allah does not guide the plan of betrayers.
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৫২. এটা এ জন্যে যে, যাতে সে জানতে পারে, তার অনুপস্থিতিতে আমি তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিনি এবং নিশ্চয় আল্লাহ বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্র সফল করেন না।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৫২) এটা এ জন্য যে, যাতে সে জানতে পারে যে, তার অনুপস্থিতিতে আমি তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিনি[1] এবং আল্লাহ বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্র সফল করেন না। [2]
তাফসীর:
[1] জেলখানাতে যখন ইউসুফ (আঃ)-কে এই সমস্ত সংবাদ জানানো হল, তখন তিনি তা শ্রবণ করে এই কথা বলেছিলেন। কেউ কেউ বলেন, তিনি বাদশার নিকট গিয়ে এই কথা বলেছিলেন এবং কোন কোন তফসীরকারকের নিকট এটাও যুলাইখারই উক্তি ছিল। উদ্দেশ্য এই যে, ইউসুফ (আঃ)-এর অনুপস্থিতিতেও তাকে মিথ্যাভাবে অপবাদ দিয়ে খিয়ানত ও বিশ্বাসঘাতকতা করব না। বরং আমানতদারীর চাহিদা সামনে রেখেই আমি আমার ভুল স্বীকার করছি। অথবা উদ্দেশ্য এই যে, আমি আমার স্বামীর খিয়ানত করিনি এবং কোন বড় পাপ করে বসিনি। ইমাম ইবনে কাসীর (রঃ) এই মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
[2] যে, সে আপন ছলনা ও চক্রান্তে সর্বদা কৃতকার্য থাকবে। বরং তার প্রভাব সীমাবদ্ধ থাকে ও সাময়িক হয়। পরিশেষে সত্য ও সত্যবাদীরই জয় হয়। সত্যবাদীদেরকে সাময়িক কিছু পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয় মাত্র।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৪২-৫২ নং আয়াতের তাফসীর:
(وَقَالَ لِلَّذِیْ ظَنَّ اَنَّھ۫ نَاجٍ مِّنْھُمَا....)
ইউসুফ (عليه السلام) তাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা করার পর দুজনের যে ব্যক্তি মুক্তি লাভ করবে অর্থাৎ জেল থেকে মুক্তি পেয়ে পুনরায় বাদশাকে শরাব পান করানোর দায়িত্বে নিযুক্ত হবে তাকে বললেন: তোমার মালিকের নিকট (অর্থাৎ বাদশাহর কাছে) আমার বিষয়টি আলোচনা করবে যাতে তিনি জানতে পারেন যে, আমি অন্যায়ভাবে জেলে বন্দী হয়ে আছি। ফলে আমার মুক্তির ব্যবস্থা করবে। কিন্তু সে যখন মুক্তি পেল তখন ইউসুফ (عليه السلام) এর ব্যাপারে বাদশার নিকট আলোচনা করতে ভুলে গেল, আর ভুলিয়ে দেয়াটা মূলতঃ শয়তানেরই কাজ ছিল। যার ফলে ইউসুফ (عليه السلام) কে কারারুদ্ধ অবস্থায় কয়েক বছর জেলখানায় অবস্থান করতে হয়েছে।
(بِضْعَ سِنِیْنَ) - আয়াতে بضع যে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছেঅ। তা মূলত তিন থেকে নয় পর্যন্ত সংখ্যাকে বুঝায়। যার ফলে ইউসুফ (عليه السلام) কত বছর কারারুদ্ধ ছিলেন তা সঠিকভাবে বলা যায় না। অধিকাংশ তাফসীরবিদগণ বলেছেন, সাত বছর জেলখানায় ছিলেন।
(وَقَالَ الْمَلِکُ اِنِّیْٓ اَرٰی سَبْعَ بَقَرٰتٍ سِمَانٍ..... وَاَنَّ اللہَ لَا یَھْدِیْ کَیْدَ الْخَا۬ئِنِیْنَ)
অত্র আয়াগুলোতে মিসরের বাদশার স্বপ্ন ও ইউসুফ (عليه السلام) কর্তৃক এর ব্যাখ্যা দান এবং কারাগার থেকে মুক্তির মাধ্যম সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।
মিসরের বাদশা একটি স্বপ্ন দেখলেন এবং এটিই ছিল আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে ইউসুফ (عليه السلام) এর জেলখানা থেকে মুক্তির অসীলা। বাদশা তার সভাসদগণকে ডেকে বললেন: আমি স্বপ্নে দেখতে পেলাম সাতটি মোটা-তাজা গাভীকে সাতটি জীর্ণশীর্ণ (হালকা) গাভী খেয়ে ফেলছে এবং আরো দেখতে পেলাম সাতটি সবুজ শীষ আর অপর সাতটি শুষ্ক। বাদশা স্বপ্নের কথা বর্ণনা করার পর যারা স্বপ্নের ব্যাখ্যায় পারদর্শী এমন সব মুআব্বির, জ্যোতিষী ও গণকদের কাছে সঠিক ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন। কিন্তু তারা সকলেই অপারগতা প্রকাশ করল এবং বাদশাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য বলল, এটা কোন ব্যাখ্যাযোগ্য স্বপ্ন নয়; বরং এটা (اَضْغَاثُ اَحْلَامٍ) বা কল্পনা প্রসূত মনের খেয়াল মাত্র। أَضْغَاثُ শব্দটি ضغث এর বহুবচন, অর্থ ঘাসের গোছা। أَحْلَامٍ শব্দটি حُلم এর বহুবচন যার অর্থ স্বপ্ন। অর্থাৎ এমন স্বপ্ন যার কোন অর্থ নেই, কল্পনাপ্রসূত মনের খেয়াল। কিন্তু বাদশা তাতে স্বস্তি পান পেলেন না। এমন সময় কারামুক্ত ইউসুফ (عليه السلام)-এর সেই সঙ্গী যাকে বলেছিলেন, তোমাদের একজন মুক্তি পেয়ে আবার বাদশার সরাব পান করানোর দায়িত্ব পাবে এবং এ কথাও বলেছিলেন, বাদশার কাছে আমার কথা বলিও সে এত দিন ভুলে গিয়েছিল, তখন ইউসুফ (عليه السلام) এর কথা তার স্মরণ হল। সে বাদশার কাছে ইউসুফ (عليه السلام) এর কথা উল্লেখ করল এবং এ কথাও বলল, জেলে থাকাকালে আমি ও আমার সঙ্গী (যাকে শূলিবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে) স্বপ্ন দেখেছিলাম। তিনি আমাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা করেছিলেন যা বাস্তবায়িত হয়েছে। উক্ত খাদেম কারাগারে যাবার অনুমতি তলব করলে বাদশা ইউসুফের কাছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানার জন্য উক্ত খাদেমকে কারাগারে পাঠালেন। উক্ত খাদেম স্বপ্নের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরে ব্যাখ্যা সম্পর্কে জানতে চাইলে ইউসুফ (عليه السلام) তাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানিয়ে দিলেন। তিনি বললেন: ‘সাতটি মোটা-তাজা গাভী’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল সাত বছর ভাল ফসল হবে, আর ‘সাতটি শীর্ণকায় গাভী’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল সাত বছর দুর্ভিক্ষ হবে। অনুরূপ ‘সাতটি সবুজ শীষ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল সাত বছর ভাল ফসল হবে, এমনকি ফসলে মাঠ সবুজ শ্যামলে পরিণত হবে। আর অপর ‘সাতটি শুষ্ক শীষ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল কোন ফসল উৎপন্ন হবে না। এ ব্যাখ্যা দেয়ার সাথে সাথে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে তাও বলে দিলেন। তিনি বললেন: ধারাবাহিকভাবে সাত বছর ভালভাবে চাষাবাদ করবে এবং যে শস্য উৎপন্ন হবে তা কেটে যতটুকু খাওয়ার তা বাদে সব শীষসহ জমা করে রাখবে যাতে শস্য ভালভাবে সংরক্ষিত থাকে, নষ্ট না হয়। অতঃপর এ সাতটি ভাল বছরের পর সাতটি কঠিন দুর্ভিক্ষের বছর আসবে, তখন এ জমাকৃত খাদ্য কাজে লাগবে, ফসল না হলেও এগুলো খেয়ে দুর্ভিক্ষের সাত বছর অতিক্রম করতে পারবে।
(مِّمَّا تُحْصِنُوْنَ)
অর্থাৎ শস্যবীজ যা পুনরায় চাষ করার জন্য সংরক্ষণ করে রাখা হয়। এ শস্যবীজ ব্যতীত দুর্ভিক্ষের সাত বছর জমাকৃত সব খাদ্য শেষ হয়ে যাবে।
(ثُمَّ يَأْتِيْ مِنْم بَعْدِ ذٰلِكَ)
অর্থাৎ এ দুর্ভিক্ষের সাত বছর অতীত হয়ে যাওয়ার পর প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে, ফলে প্রচুর ফসল উৎপন্ন হবে এবং তোমরা আঙুর থেকে রস বের করবে, যায়তুন থেকে তেল বের করবে এবং চতুষ্পদ জন্তু থেকে দুধ দোয়াবে। বাদশা এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা শুনে বুঝতে পারলেন এটাই সঠিক ব্যাখ্যা। তাই তিনি কর্মচারীদেরকে বললেন: তাঁকে (ইউসুফকে) নিয়ে এসো। আগত দূত ইউসুফ (عليه السلام)-কে বলল, বাদশা আপনাকে ডেকেছেন। ইউসুফ (عليه السلام) বললেন, তোমার রব তথা বাদশার কাছে ফিরে যাও এবং জিজ্ঞেস কর, যে মহিলারা তাদের হাত কেটে ফেলেছিল তাদের বিষয়টি কী? ইউসুফ (عليه السلام) ধৈর্যের পরিচয় দিলেন এবং আত্মমর্যাদাবোধের দিকে লক্ষ্য করলেন। যেখানে বাদশা মুক্তি দিয়ে তার কাছে যেতে বলেছেন সেখানে তিনি বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ নিতে পারতেন, কিন্তু তিনি চাচ্ছিলেন তাকে যে অপবাদ দেয়া হয়েছে তা থেকে সকলের সামনে পবিত্রতা প্রমাণিত হোক।
রাসূলুল্লাহ বলেছেন: যদি আমি অতদিন কারাগারে থাকতাম যতদিন ইউসুফ (عليه السلام) ছিলেন, তাহলে বাদশার দূত প্রথমবার আসার সাথে সাথে আমি তার প্রস্তাব গ্রহণ করতাম। এ কথা বলার পর তিনি ৫০ নং আয়াতটি তেলাওয়াত করেন। (তিরমিযী হা: ৩১১৬, সহীহ)
কারাগার থেকে পাঠানো ইউসুফ (عليه السلام) এর দাবী অনুযায়ী মহিলাদের কাছে বাদশা ঘটনার তদন্ত করলেন। বাদশা সেসব মহিলাকে দরবারে ডাকলেন, তারা প্রকৃত ঘটনা খুলে বলল এবং ইউসুফ (عليه السلام) যে নির্দোষ এ কথা স্বীকার করল। তখন আযীযের স্ত্রী যুলাইখাও স্বীকার করল যে, এখন সত্য সুস্পষ্ট হয়ে গেছে, আমিই তাকে অপকর্ম করার জন্য আহ্বান করেছিলাম, সে নিজেকে সংযত রেখেছে, সে নির্দোষ, সে সত্যবাদী। পরিশেষে ইউসুফ (عليه السلام) সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে জেলখানা থেকে বেরিয়ে এলেন। আর তিনি বাদশার সামনে মহিলাদের এ স্বীকারোক্তির ব্যবস্থা এ জন্য করেছিলেন যাতে যুলাইখার স্বামী জেনে নেয়, তার অনুপস্থিতিতে তিনি কোন খেয়ানত করেননি। বরং তিনি তার আমানত রক্ষা করেছেন।
(وَمَآ أُبَرِّئُ نَفْسِيْ)
‘আমি নিজেকে নির্দোষ মনে করি না’ এটা ইউসুফ (عليه السلام) এর কথাও হতে পারে, তাহলে এটা তাঁর পক্ষ থেকে আত্মবিনয়ের বহিঃপ্রকাশ হবে। কেননা এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি অপবাদ থেকে পবিত্র। পক্ষান্তরে যুলাইখার কথাও হতে পারে, তবে এটাই সম্ভাবনা বেশি, কারণ সে নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করেছে। যার ফলেই সে বলছে, আমি নিজেকে নির্দোষ মনে করি না, কারণ মানুষের অন্তর খারাপ কাজ প্রবণ। তবে আল্লাহ তা‘আলা যাকে রহম করেন সে ব্যতীত।
সুতরাং এমন আত্মা যা খারাপ কাজের প্রতি ঝুঁকে পড়ে তা থেকে আল্লাহ তা‘আলার কাছে আশ্রয় চাইতে হবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. যারা শত প্রতিকূল পরিবেশেও আল্লাহ তা‘আলার আদেশ নিষেধ মেনে চলেন তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা উচ্চ মর্যাদায় আসীন করেন।
২. ধৈর্য ধারণ করার ফযীলত সম্পর্কে জানা গেল। সুতরাং কোন বিষয়ে তাড়াহুড়া করা উচিত নয়।
৩. মানুষের মন সর্বদা খারাপ কাজের দিকেই ধাবিত হয়। তবে যার প্রতি আল্লাহ তা‘আলা রহম করেন সে ব্যতীত।
৪. খারাপ কাজ প্রবণ অন্তর থেকে আল্লাহ তা‘আলার কাছে আশ্রয় চাইতে হবে।
৫. উক্ত আয়াত অর্থনীতি ও সম্পদ সংরক্ষণের মূলনীতি।
৬. উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা বিপদ মুক্তির চেয়ে আপতিত অপবাদ মুক্তিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।
৭. এখানে তাদের জন্য বড় শিক্ষা নিহিত রয়েছে যারা অপরের বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে নারীদের চক্রান্ত থেকে সাবধান থাকবেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৫০-৫২ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তাআ’লা রাজা সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে বলেন যে, রাজার স্বপ্নের তাৎপর্য জেনে নেয়ার পর যখন রাজদূত হযরত ইউসুফের (আঃ) নিকট হতে বিদায় গ্রহণ করলো এবং রাজাকে সমস্ত ঘটনা অবহিত করলো তখন রাজা তার ঐ স্বপ্নের এই তাৎপর্য শুনে খুবই খুশী হলেন এবং এটাই যে তার স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা তা তাঁর নিশ্চিতরূপে বিশ্বাস হয়ে গেল তিনি এটাও বুঝতে পারলেন যে, হযরত ইউসুফ (আঃ) একজন বড় বিদ্বান ও সম্মানিত ব্যক্তি। স্বপ্নের ব্যাখ্যার ব্যাপারে তাঁর পূর্ণ জ্ঞান রয়েছে। তাছাড়া তিনি অত্যন্ত মহৎ চরিত্রের অধিকারী। তিনি আল্লাহ মাখলুকের শুভাকাংখী। তার কোন লোভ নেই। এখন তাঁর সাথে স্বয়ং সাক্ষাৎ করার তাঁর খুবই আগ্রহ হলো। তৎক্ষণাৎ তিনি দূতকে বললেনঃ যাও এখনই হযরত ইউসুফকে (আঃ) কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে আমার কাছে নিয়ে এসো।” সুতরাং পুনরায় দূত কারাগারে গিয়ে হযরত ইউসুফের (আঃ) সাথে সাক্ষাৎ করলো এবং বাদশাহর পয়গাম তাঁকে শুনিয়ে দিলো। তখন তিনি বললেনঃ “আমি এখান থেকে বের হবো না যে পর্যন্ত না মিসরের বাদশাহ এবং তার সভাসদবর্গ এটা অবগত হবেন যে, আমার অপরাধ কি ছিল? আযীযের স্ত্রী সম্পর্কে যে দোষ আমার উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে তা কতটুকু সত্য? এতদিন পর্যন্ত আমাকে কারাগারের বন্দী রাখার মধ্যে কি রহস্য নিহিত রয়েছে? এটা কি শুধুমাত্র অত্যাচার ও বাড়াবাড়ির ভিত্তিতে? তুমি ফিরে গিয়ে বাদশাহকে আমার পয়গাম জানিয়ে দাও। তিনি যেন ঘটনাটি পূর্ণভাবে বিশ্লেষণ করেন।”
হাসীদ শরীফেও হযরত ইউসুফের (আঃ) এই ধৈর্য এবং তাঁর এই সৌজন্য ও ভদ্রতার ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন : “হযরত ইবরাহীম (আঃ) অপেক্ষা আমরাই সন্দেহের বেশী হকদার। হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “হে আমার প্রতিপালক আপনি কিভাবে মৃতকে জীবিত করবেন তা আমাকে দেখিয়ে দিন।” (২: ২৬০) আল্লাহ তাআ’লা হযরত লূতের (আঃ) উপর রহম করুন! তিনি কোন শক্তিশালী দল বা কোন মযবুত দুর্গের আশ্রয়ে আসতে চেয়েছিলেন। জেনে রেখোঁরেখো যে, হযরত ইউসুফ (আঃ) যতদিন জেলখানায় অবস্থান করেছিলেন, আমি যদি সেখানে ততদিন অবস্থান করতাম, অতঃপর দূত আমার কাছে আমার মুক্তির প্রস্তাব নিয়ে আসতো তবে আমি অবশ্যই তার প্রস্তাব (বিনা শর্তে) কবুল করে নিতাম।”
মুসনাদে আহমাদে (আরবি)…… (আরবি) এই আয়াতের তাফসীরে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেনঃ “যদি আমি হতাম তবে তৎক্ষণাৎ দূতের কথা মেনে নিতাম এবং কোন ওজর অনুসন্ধান করতাম না।”
মুসনাদে আবদির রাযযাকে ইকরামা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমি ইউসুফের (আঃ) ধৈর্য ও সহনশীলতা দেখে বিস্ময় বোধ করি। আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করুন! বাদশাহ স্বপ্ন দেখলেন এবং সেই স্বপ্নের তাৎপর্য জানবার জন্যে তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন। দূত এসে হযরত ইউসুফকে (আঃ) ঐ স্বপ্নের তাৎপর্য জিজ্ঞেস করলো। আর তিনি তৎক্ষণাৎ কোন শর্তারোপ ছাড়াই স্বপ্নের তাৎপর্য বলে দিলেন। যদি আমি হতাম তবে যে পর্যন্ত জেলখানা থেকে নিজেকে মুক্ত করিয়ে না নিতাম কখনো তা বলে দিতাম না।” হযরত ইউসুফের সবর ও করমের উপর বিস্মিত হতে হয়। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন। তার কাছে দূত আসছে তার মুক্তির পয়গাম নিয়ে। আর তাকে তিনি বলেছেনঃ “এখন নয়, যে পর্যন্ত না সকলের কাছে আমার পবিত্রতা, পূণ্যশীলতা এবং নির্দোষিতা প্রকাশিত হয়। তার জায়গায় যদি আমি হতাম তবে দৌড়ে গিয়ে দরজার উপর পৌঁছে যেতাম।” এ বর্ণনাটি মুরসাল।
এখন বাদশাহ ঘটনার সত্যাসত্য নিরূপণ করতে শুরু করলেন। যে ভদ্র মহিলাদেরকে তার স্ত্রী যুলাইখা দাওয়াত করেছিল তাদেরকে তিনি ডেকে পাঠান এবং স্বয়ং তাঁর স্ত্রীকেও দরবারে ডাকিয়ে নেন। অতঃপর তিনি ঐ মহিলাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “যিয়াফতের দিনের ব্যাপারটা কি? খুঁটিনাটি বর্ণনা কর, কিছুই গোপন করো না।” মহিলারা তখন সমস্বরে বলে উঠলোঃ “আল্লাহর মাহাত্ম্য অদ্ভূত বটে! আমরা আজ এটা অকপটে স্বীকার করছি। যে, হযরত ইউসুফের (আঃ) কোনই অপরাধ ছিল না। তাঁর সম্পর্কে যা কিছু বলা হয়েছিল সবই তার উপর অপবাদ ছিল। আল্লাহর শপথ! আমরা খুব ভালরূপেই জানি ইউসুফ (আঃ) সম্পূর্ণ নির্দোষ। ঐ সময় যুলাইখাও বলে উঠলো: “সত্য শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েই গেল। আমি আজ স্বয়ং স্বীকার করছি যে, আমিই ইউসুফকে (আঃ) কুকাজের দিকে আহবান করেছিলাম। ঐ সময় তিনি যা বলেছিলেন ওটাই সত্য ছিল। অর্থাৎ তিনি বলেছিলেনঃ “এই মহিলাই আমাকে তার দিকে আকৃষ্ট করতে চেয়েছিল।” এ ব্যাপারে তিনি সম্পূর্ণরূপে সত্যবাদী। আজ আমি দ্বিধাহীন চিত্ত্বে নিজের অপরাধ স্বীকার করছি, যাতে আমার স্বামীও আশ্বস্ত হন যে, আমিও প্রকৃতপক্ষে তাঁর ব্যাপারে কোন খিয়ানত করি নাই। হযরত ইউসুফের (আঃ) পবিত্রতার কারণে আমার দ্বারা কোন দুষ্কার্য প্রকাশিত হয় নাই। ব্যভিচার থেকে মহান আল্লাহ আমাকে রক্ষা করেছেন। আমার এই স্বীকারোক্তির দ্বারা আমার স্বামীর সামনে এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়ে গেল যে, আমি নির্লজ্জতাপূর্ণ কার্যে জড়িত হয়ে পড়ি নাই।”
এটা সম্পূর্ণরূপে সত্য যে, বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্র আল্লাহ সফল করেন না, বরং তা তিনি বানচাল করে দেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।