সূরা ইউসুফ (আয়াত: 13)
হরকত ছাড়া:
قال إني ليحزنني أن تذهبوا به وأخاف أن يأكله الذئب وأنتم عنه غافلون ﴿١٣﴾
হরকত সহ:
قَالَ اِنِّیْ لَیَحْزُنُنِیْۤ اَنْ تَذْهَبُوْا بِهٖ وَ اَخَافُ اَنْ یَّاْکُلَهُ الذِّئْبُ وَ اَنْتُمْ عَنْهُ غٰفِلُوْنَ ﴿۱۳﴾
উচ্চারণ: কা-লা ইন্নী লাইয়াহযুনুনীআন তাযহাবূবিহী ওয়া আখা-ফূআইঁ ইয়া’কুলাহুযযি‘বুওয়া আনতুম ‘আনহু গা-ফিলূন।
আল বায়ান: সে বলল, ‘নিশ্চয় এটা আমাকে কষ্ট দেবে যে, তোমরা তাকে নিয়ে যাবে এবং আমি আশঙ্কা করি, নেকড়ে তাকে খেয়ে ফেলবে, যখন তোমরা তার ব্যাপারে গাফিল থাকবে’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ১৩. তিনি বললেন, এটা আমাকে অবশ্যই কষ্ট দেবে যে, তোমরা তাকে নিয়ে যাবে এবং আমি আশংকা করি তাকে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলবে, আর তোমরা তার প্রতি অমনোযোগী থাকবে।
তাইসীরুল ক্বুরআন: পিতা বলল, ‘তোমরা যে তাকে নিয়ে যাবে সেটা আমাকে অবশ্যই কষ্ট দেবে আর আমি ভয় করছি যে, নেকড়ে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলবে, আর তখন তার সম্পর্কে তোমরা বে-খেয়াল হয়ে থাকবে।’
আহসানুল বায়ান: (১৩) সে বলল, ‘তোমাদের ওকে নিয়ে যাওয়াটা আমার দুশ্চিন্তার কারণ হবে। আর আমার ভয় হয় যে, তোমরা ওর প্রতি অমনোযোগী হলে ওকে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলবে।’
মুজিবুর রহমান: সে বললঃ এটা আমাকে কষ্ট দিবে যে, তোমরা তাকে নিয়ে যাবে এবং আমি ভয় করি, তোমরা তার প্রতি অমনোযোগী হলে তাকে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলবে।
ফযলুর রহমান: সে বলল, “তোমরা তাকে নিয়ে গেলে আমি চিন্তিত থাকব। আমার ভয় হয়, তোমরা যখন তার ব্যাপারে বেখেয়াল থাকবে তখন তাকে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলবে।”
মুহিউদ্দিন খান: তিনি বললেনঃ আমার দুশ্চিন্তা হয় যে, তোমরা তাকে নিয়ে যাবে এবং আমি আশঙ্কা করি যে, ব্যাঘ্র তাঁকে খেয়ে ফেলবে এবং তোমরা তার দিক থেকে গাফেল থাকবে।
জহুরুল হক: তিনি বললেন -- "এতে অবশ্যই আমাকে কষ্ট দেবে যে তোমরা তাকে নিয়ে যাবে, আর আমি ভয় করছি পাছে নেকড়ে তাকে খেয়ে ফেলে, যদি তোমরা তার প্রতি বেখেয়াল হয়ে যাও!"
Sahih International: [Jacob] said, "Indeed, it saddens me that you should take him, and I fear that a wolf would eat him while you are of him unaware."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ১৩. তিনি বললেন, এটা আমাকে অবশ্যই কষ্ট দেবে যে, তোমরা তাকে নিয়ে যাবে এবং আমি আশংকা করি তাকে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলবে, আর তোমরা তার প্রতি অমনোযোগী থাকবে।
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (১৩) সে বলল, ‘তোমাদের ওকে নিয়ে যাওয়াটা আমার দুশ্চিন্তার কারণ হবে। আর আমার ভয় হয় যে, তোমরা ওর প্রতি অমনোযোগী হলে ওকে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলবে।’
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ১১-১৮ নং আয়াতের তাফসীর:
অত্র আয়াতগুলোতে ইউসুফ (عليه السلام)-এর এগার ভাই তাঁর ক্ষতিসাধন করার জন্য যে মিথ্যা কাহিনী তাঁর পিতার নিকট বানিয়ে বলেছিল সে সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।
ইউসুফ (عليه السلام) এর দশ বৈমাত্রেয় ভাই তাদের সিদ্ধান্ত অনুসারে ইউসুফ (عليه السلام)-কে জঙ্গলে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রতারণার আশ্রয় নিল। তারা একদিন পিতা ইয়া‘কূব (عليه السلام) এর কাছে এসে ইউসুফকে সাথে নিয়ে পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে আনন্দ ভ্রমণে যাবার প্রস্তাব পেশ করল। তারা পিতাকে বলল, আগামীকাল আপনি ইউসুফকে আমাদের সাথে মাঠে যেতে দিন। সেখানে সবার সাথে সে ফল-মূল খাবে, খেলা-ধূলা করবে এবং আনন্দ-উল্লাস করবে। আমরা তাঁর রক্ষণাবেক্ষণ করব। তাদের কথার উত্তরে ইয়া‘কূব (عليه السلام) বললেন, তোমরা তাকে নিয়ে যাবে, আমি দুশ্চিন্তায় থাকব আর আমার ভয় হয় যে, তোমরা তাঁকে রেখে খেলা-ধূলা করতে যাবে তখন নেকড়ে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলবে। তারা বলল, আমাদের সাথে ইউসুফকে পাঠাতে আপনি নিরাপদ মনে করছেন না কেন? ইউসুফের ব্যাপারে আপনি কি আমাদের প্রতি অবিশ্বাস করছেন? অথচ আমরা তাঁর ভাই; আমরা তাঁর কল্যাণকামী। আমরা এতগুলো ভাই থাকতে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলবে তাহলে তো আমরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাব। উল্লেখ্য যে, কেন‘আন অঞ্চলে সে সময়ে বাঘের আক্রমণের ভয় বেশি ছিল। তাছাড়াও ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, ইয়া‘কূব (عليه السلام) পূর্বরাতে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিনি পাহাড়ের ওপরে আছেন আর নীচে ইউসুফ (عليه السلام) খেলা করছে। হঠাৎ দশটি বাঘ এসে তাকে ঘেরাও করে ফেলে এবং আক্রমণ করতে উদ্যত হয়। কিন্তু তন্মধ্যে একটি বাঘ এসে তাকে মুক্ত করে দেয়। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন: উক্ত স্বপ্নের ব্যাখ্যা অনুযায়ী ইয়া‘কূব (عليه السلام) তার দশ পুত্রকেই বাঘ গণ্য করেছিলেন (কুরতুবী)। তখন তারা ছলে বলে কৌশলে পিতাকে এসব কথা বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল এবং ছেলেদের পীড়াপীড়িতে এক পর্যায় তিনি রাযী হলেন। কিন্তু তাদের থেকে অঙ্গীকার নিলেন যাতে তারা ইউসুফের কোনরূপ কষ্ট না দেয় এবং সর্বদা তার প্রতি খেয়াল রাখে। অতঃপর যখন ইউসুফ (عليه السلام) কে তাদের সাথে নিয়ে যেতে সক্ষম হল তখন তারা তাদের সিদ্ধান্ত অনুপাতে ইউসুফ (عليه السلام) কে কূপে নিক্ষেপ করল। আর এমতাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলা ইউসুফ (عليه السلام) এর প্রতি ওয়াহী করলেন যে, তুমি ঘাবড়ে যেও না; আমি তোমাকে সংরক্ষণ তো করবই বরং তোমাকে এমন মর্যাদার অধিকারী বানাব যে, তোমার ভাইয়েরা তোমার নিকট সাহায্যের জন্য আসবে। তখন তুমি তাদেরকে এই কর্মের কথা বলে দেবে আর তারা তোমাকে চিনতে পারবে না। যেমন অত্র সূরার ৮৯ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে এবং ৫৮ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে যে, যখন দুর্ভিক্ষের সময় তারা মিসরে যায় ইউসুফ (عليه السلام) তাদেরকে চিনতে পারেন কিন্তু তারা ইউসুফ (عليه السلام) কে চিনতে পারেনি।
(وَأَوْحَيْنَآ إِلَيْهِ) ‘আমি তাকে ওয়াহী করলাম’ যদিও ইউসুফ (عليه السلام) তখন ছোট কিন্তু যাকে আল্লাহ তা‘আলা নবুওয়াত দেবেন তাদের অনেককে শৈশবেও ওয়াহী প্রেরণ করেন। তবে এ ওয়াহী নবুওয়াতী ওয়াহী ছিল না। কেননা সাধারণতঃ চল্লিশ বছর বয়স হওয়ার পূর্বে আল্লাহ তা‘আলা কাউকে নাবী করেন না। এ ওয়াহী ছিল সেরূপ, যেরূপ ওয়াহী বা ইলহাম এসেছিল শিশু মূসার মায়ের কাছে এবং ইয়াহইয়া (عليه السلام)-এর কাছে। ইমাম কুরতুবী বলেন: কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পূর্বেই অথবা পরে ইউসুফকে সান্ত্বনা ও মুক্তির সুসংবাদস্বরূপ এ ওয়াহী নাযিল হয়েছিল।
পিতার নিকটে ভাইদের কৈফিয়ত:
ইউসুফ (عليه السلام)-কে অন্ধকূপে ফেলে দিয়ে একটা ছাগলছানা জবেহ করে তার রক্ত ইউসুফ (عليه السلام) এর পরিত্যক্ত জামায় মেখে তারা সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরল এবং কাঁদতে কাঁদতে পিতার কাছে হাযির হয়ে কৈফিয়ত পেশ করে বলল: হে আমাদের পিতা! আমরা যখন দৌড় প্রতিযোগিতায় মত্ত ছিলাম এমতাবস্থায় ইউসুফ আমাদের মালপত্রের নিকট ছিল আর তখন নেকড়ে বাঘ এসে তাকে খেয়ে ফেলে। আমরা জানি আপনি আমাদের কথা বিশ্বাস করবেন না যদিও আমরা সত্যবাদী। প্রমাণস্বরূপ ইউসুফ (عليه السلام) এর রক্তমাখা জামা পেশ করল। কিন্তু তারা এটা বুুঝতে পারেনি যে, বাঘে খেয়ে ফেললে কি জামা অক্ষত থাকে? তাই যখন রক্তমাখা অক্ষত জামা পিতার কাছে নিয়ে আসল তখন ইয়া‘কূব (عليه السلام) বুঝতে পারলেন এটা তাদের সাজানো ঘটনা। প্রকৃত ঘটনা এটা নয়। সুতরাং এখন ধৈর্য ধারণ করা ব্যতীত আর কোন উপায় নেই। আল্লাহ তা‘আলাই এ ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করবেন। তখন ইয়া‘কূব (عليه السلام) সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ তা‘আলার ওপর ভরসা করলেন। মদীনার মুনাফিকরা আয়িশাহ কে যখন মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিল তখন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ ব্যাপারে আয়িশাহ কে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন: আল্লাহ তা‘আলার কসম! আমি আমার ও আপনাদের জন্য ইউসুফের বাবার ঐ উদাহরণ দেখতে পাচ্ছি। সুতরাং আমার পক্ষে পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়। তোমরা যা বর্ণনা করছ, সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই আমার সাহায্যস্থল। (সহীহ বুখারী হা: ৪৭৫০)
عُصْبَةٌ অর্থাৎ শক্তিশালী দল, سَوَّلَتْ চাকচিক্য করে দেয়া, আকর্ষণীয় করে দেয়া।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. বিপদে বিচলিত না হয়ে বরং ধৈর্যধারণ করতে হবে এবং আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য চাইতে হবে।
২. মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে, মিথ্যার পরিণতি ভয়াবহ।
৩. যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সহযোগিতা করেন।
৪. দৌড়, তীর নিক্ষেপ ও কুস্তী ইসলামে বৈধ খেলা তবে যেন সীমালংঘন না হয়।
৫. কোন বিষয়ে সঠিক জ্ঞান না আসা পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলার দিকে সোপর্দ করে দেয়া উচিত।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ১৩-১৪ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তাআ’লা তাঁর নবী হযরত ইয়াকুবের (আঃ) ব্যাপারে খবর দিচ্ছেন যে, তিনি তাদের আবেদনের জবাবে বললেনঃ ‘তোমরা তো জান যে, আমি আমার পুত্র ইউসুফের (আঃ) বিচ্ছেদ মোটেই সহ্য করতে পারি না। সুতরাং তোমরা যে তাকে তোমাদের সাথে নিয়ে যেতে চাচ্ছ, এই সময়টুকুর বিচ্ছেদ আমার কাছে খুবই কঠিন ঠেকছে!’ হযরত ইউসুফের (আঃ) প্রতি তাঁর পিতা হযরত ইয়াকুবের (আঃ) এতো বেশী আকর্ষণের কারণ ছিল এই যে, তিনি তার চেহারায় বড় উত্তম গুণের লক্ষণ দেখতে পাচ্ছিলেন। তাঁর ললাটে নুবওয়াতের জ্যোতি চমকাচ্ছিল। তিনি ছিলেন অতি উত্তম চরিত্রের অধিকারী। তাঁর কথাবার্তায় মহত্ত্বের লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছিল। তার দৈহিক রূপ ছিল যেমন অতীব সুন্দর, তেমনই চরিত্রের দিক দিয়েও তিনি ছিলেন অত্যন্ত মহান। তাঁর উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক!
তাঁকে ভাইদের সাথে পাঠাতে আপত্তি করার দ্বিতীয় কারণ বলতে গিয়ে তিনি বলেনঃ তোমরা বকরী চরানো ও অন্যান্য কাজে নিমগ্ন থাকবে, আর এই সুযোগে হয়তো নেকড়ে বাঘ এসে ইউসুফকে (আঃ) খেয়ে ফেলবে। তোমরা হয়তো কোন টেরই পাবে না। হায়! হযরত ইয়াকুবের (আঃ) এই কথাটিকে তারা লুফে নিলেন এবং এটাকেই উপযুক্ত ও সঠিক ওযরের পন্থা মনে করলেন। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন যে, ইউসুফকে (আঃ) হারিয়ে দিয়ে পিতার সামনে এসে মনগড়া এই ওযরই পেশ করবেন। তৎক্ষণাৎ তাঁরা পিতাকে তাঁর কথার উত্তরে বললেনঃ “আব্বাজান! আপনি এটা কি চিন্তা করছেন? আমাদের মতো একটা শক্তিশালী দল বিদ্যমান থাকতেও ইউসুফকে (আঃ) নেকড়ে বাঘে খেয়ে ফেলবে? এটা অসম্ভব ব্যাপারই বটে। যদি এটাই হয় তবে তো আমরা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো।”
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।