আল কুরআন


সূরা হূদ (আয়াত: 80)

সূরা হূদ (আয়াত: 80)



হরকত ছাড়া:

قال لو أن لي بكم قوة أو آوي إلى ركن شديد ﴿٨٠﴾




হরকত সহ:

قَالَ لَوْ اَنَّ لِیْ بِکُمْ قُوَّۃً اَوْ اٰوِیْۤ اِلٰی رُکْنٍ شَدِیْدٍ ﴿۸۰﴾




উচ্চারণ: কা-লা লাও আন্না লী বিকুম কুওওয়াতান আও আ-বীইলা-রুকনিন শাদীদ।




আল বায়ান: সে বলল, ‘তোমাদের প্রতিরোধে যদি আমার কোন শক্তি থাকত অথবা আমি কোন সুদৃঢ় স্তম্ভের আশ্রয় নিতে পারতাম’*!




আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৮০. তিনি বললেন, তোমাদের উপর যদি আমার শক্তি থাকত অথবা যদি আমি আশ্রয় নিতে পারতাম কোন সুদৃঢ় স্তম্ভের(১)!




তাইসীরুল ক্বুরআন: সে বলল, ‘তোমাদেরকে দমন করার ক্ষমতা আমার যদি থাকত! অথবা কোন মজবুত আশ্রয়ে যদি আশ্রয় নিতে পারতাম!’




আহসানুল বায়ান: (৮০) সে বলল, ‘হায়! যদি তোমাদের উপর আমার শক্তি থাকত, অথবা আমি কোন দৃঢ় স্তম্ভের (শক্তিশালী দলের) আশ্রয় নিতে পারতাম।’[1]



মুজিবুর রহমান: সে বললঃ কি উত্তম হত যদি তোমাদের উপর আমার কিছু ক্ষমতা চলত, অথবা আমি কোন দৃঢ় স্তম্ভের আশ্রয় নিতাম!



ফযলুর রহমান: সে বলল, “আমার যদি তোমাদেরকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা থাকত! কিংবা আমি যদি কোন শক্ত অবলম্বনের কাছে আশ্রয় নিতে পারতাম!”



মুহিউদ্দিন খান: লূত (আঃ) বললেন-হায়, তোমাদের বিরুদ্ধে যদি আমার শক্তি থাকত অথবা আমি কোন সূদৃঢ় আশ্রয় গ্রহণ করতে সক্ষম হতাম।



জহুরুল হক: তিনি বললেন -- "হায়, তোমাদের বাধা দেবার যদি আমার ক্ষমতা থাকতো, অথবা যদি কোনো জোরালো অবলন্বন পেতাম!"



Sahih International: He said, "If only I had against you some power or could take refuge in a strong support."



তাফসীরে যাকারিয়া

অনুবাদ: ৮০. তিনি বললেন, তোমাদের উপর যদি আমার শক্তি থাকত অথবা যদি আমি আশ্রয় নিতে পারতাম কোন সুদৃঢ় স্তম্ভের(১)!


তাফসীর:

(১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা লুত আলাইহিস সালামের উপর রহমত করুন। তিনি নিরুপায় হয়ে সুদৃঢ় জামাতের আশ্রয় কামনা করেছিলেন।” [বুখারীঃ ৩৩৮৭, মুসলিমঃ ১৫১] আর তাই লুত আলাইহিস সালামের পরবর্তী প্রত্যেক নবী সম্ভ্রান্ত শক্তিশালী বংশে জন্মগ্রহন করেছিলেন। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে কোরাইশ কাফেরগণ হাজার রকম অপচেষ্টা করেছিল কিন্তু তার হাশেমী গোত্রের লোকেরা সম্মিলিতভাবে তাকে আশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা দান করেছে, যদিও ধর্মমতের দিক দিয়ে তাদের অনেকেই ভিন্নমত পোষন করত। এ জন্যই সম্পূর্ন বনি হাশেম গোত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে শামিল ছিল। যখন কোরাইশ কাফেররা তাদের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে তাদের দানা পানি বন্ধ করে দিয়েছিল।


তাফসীরে আহসানুল বায়ান

অনুবাদ: (৮০) সে বলল, ‘হায়! যদি তোমাদের উপর আমার শক্তি থাকত, অথবা আমি কোন দৃঢ় স্তম্ভের (শক্তিশালী দলের) আশ্রয় নিতে পারতাম।’[1]


তাফসীর:

[1] শক্তি থেকে উদ্দেশ্য হল নিজ দৈহিক বল ও উপকরণ-শক্তি অথবা সন্তান-সন্ততিদের ক্ষমতা। ‘দৃঢ় স্তম্ভ’ থেকে উদ্দেশ্য হল বংশ, গোত্র বা অনুরূপ কোন সুদৃঢ় আশ্রয়। অর্থাৎ, নিরুপায় হয়ে তিনি আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেছিলেন যে, ‘হায়! যদি আমার নিজের শক্তি থাকত বা কোন আত্মীয়-স্বজন ও আমার গোত্রের আশ্রয় ও সাহায্য-সহযোগিতা হত, তাহলে আজ আমাকে মেহমানদের জন্য এই অস্থিরতার শিকার ও অপমানিত হতে হত না। আমি ঐ দুর্বৃত্তদেরকে সামলে নিতাম এবং মেহমানদের হিফাযত করতে পারতাম।’ লূত (আঃ)-এর উক্ত আশা আল্লাহর উপর ভরসার পরিপন্থী নয়। যেহেতু বাহ্যিক উপায়-উপকরণ ব্যবহার করা বৈধ। আর ‘আল্লাহর উপর ভরসা’র সহীহ অর্থও এই যে, প্রথমে সকল বাহ্যিক উপায়-উপকরণ প্রয়োগ করতে হবে, তারপর আল্লাহর উপর ভরসা করতে হবে। হাত-পা বেঁধে বসে থাকা এবং মুখে ‘আল্লাহর উপর ভরসা আছে’ বলা একেবারে ভুল ব্যাখ্যা। সুতরাং বাহ্যিক উপকরণের দিকে লক্ষ্য রেখে লূত (আঃ) যা বলেছেন, বিলকুল ঠিকই বলেছেন। যাতে এই কথা প্রমাণ হয় যে, আল্লাহর পয়গম্বরগণ যেমন ‘আ-লিমুল গায়ব’ হন না, অনুরূপ তাঁরা ইচ্ছাময়ও হন না (যেমন বর্তমানে মানুষ অনেকের ব্যাপারে এরূপ বিশ্বাস রাখে)। যদি দুনিয়াতে নবীদের কোন এখতিয়ার থাকত, তবে অবশ্যই লূত (আঃ) নিজ অক্ষমতা ও সেই আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতেন না, যা তিনি উল্লিখিত শব্দে ব্যক্ত করেছেন।


তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ


তাফসীর: ৬৯-৮৩ নং আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়::



উক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম (عليه السلام)-কে সন্তানের সুসংবাদ দান এবং লূত (عليه السلام) ও তাঁর সম্প্রদায়ের অপকর্ম সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।



আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতা প্রেরণ করলেন লূত (عليه السلام)-এর অবাধ্য সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার জন্য। ফেরেশতারা লূত (عليه السلام)-এর অবাধ্য জাতিকে ধ্বংস করার যাত্রা পথে ইবরাহীম (عليه السلام)-এর নিকট উঠে গেলেন তাঁকে সু-সংবাদ দেয়ার জন্য। এ সুসংবাদটা ছিল পুত্র ইসহাক ও ইয়াকুবের সুসংবাদ। যেমন অত্র সূরার ৭১ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে। ইবরাহীম (عليه السلام) জানতেন না এরা ফেরেশতা। তারা (ফেরেশতারা) ইবরাহীম (عليه السلام)-এর নিকট গিয়ে সালাম দিলেন এবং ইবরাহীম (عليه السلام)ও তাদের সালামের উত্তর দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ইবরাহীম (عليه السلام) তাদের জন্য একটি ভুনা করা বাছুর নিয়ে আসলেন। এতে বুঝা যায় ইবরাহীম (عليه السلام) বড়ই মেহমানপ্রিয় মানুষ ছিলেন। তিনি তাদেরকে মানুষ মনে করে এ আয়োজন করেছিলেন। যদি জানতেন এরা আল্লাহ তা‘আলার ফেরেশতা তাহলে তিনি এ ব্যবস্থা করতেন না। এখান থেকেও বুঝা যাচ্ছে নাবীরা গায়েব জানেন না। আরো বুঝা যায় মেহমানের যথাসম্ভব সম্মান করা উচিত। মেহমানের কদর করাকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীসে ঈমানদারদের বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করেছেন। যখন ইবরাহীম (عليه السلام) খাবারের আয়োজন করার পর দেখলেন যে, তারা (ফেরেশতারা) সে দিকে হাত দিচ্ছে না অর্থাৎ সেখান থেকে তারা (ফেরেশতারা) খাচ্ছে না, তখন ইবরাহীম (عليه السلام) তাদেরকে ভয় পাচ্ছিলেন। বলা হয় তাদের নিকট এটা প্রসিদ্ধ ছিল যে, কারো বাড়িতে আগত মেহমান যদি মেহমানি গ্রহণ না করে তাহলে বুঝা যাবে যে, আগত মেহমান কোন ভাল উদ্দেশ্য নিয়ে আসেনি। সূরা যারিয়ার ২৬-২৭ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে তাদের নিকট খাবার দেয়ার পর যখন দেখছেন তারা খাচ্ছে না, তখন তিনি বললেন, আপনারা খাচ্ছেন না কেন? সূরা হিজরের ৫২ নং আয়াতে বলা হয়েছে আমরা আপনাদের আগমনে শংকিত। এমতাবস্থায় ফেরেশতারা ইবরাহীম (عليه السلام) কে অভয় দিয়ে বললেন: আপনি ভয় পাবেন না। আমরা আল্লাহ তা‘আলার ফেরেশতা, আমরা অভিশপ্ত সম্প্রদায় লূত (عليه السلام)-এর জাতিকে শাস্তি দেয়ার জন্য প্রেরিত হয়েছি। তখন সারা (আলাইহাস সালাম) তথায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি এই অভিশপ্ত জাতির ধ্বংসের কথা শুনে হাসলেন। কেউ কেউ বলেন, তাকে যে বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের সু-সংবাদ দেয়া হয়েছে এজন্য তিনি হাসলেন।



ফেরেশতারা ইবরাহীম (عليه السلام)-এর স্ত্রী সারাকে পুত্র ইসহাক (عليه السلام)-এর সুসংবাদ দিলেন, এবং ইসহাকের ঘরে ইয়াকুব হবে এ সুসংবাদও দিলেন। তখন সারা (عليه السلام) বললেন যে, আমি এবং আমার স্বামী আমরা তো উভয়ে বৃদ্ধ হয়ে গেছি। এখন সন্তান প্রসব করা তো একটা আশ্চর্যজনক বিষয়। আর এটাতো অসম্ভব বিষয়; যা পৃথিবীর বুকে বিরল। সূরা যারিয়াতের ২৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে সারা বলল: আমি বৃদ্ধা ও বন্ধ্যা। তাদের কথার জবাবে ফেরেশতারা বলল, আপনারা কি আল্লাহ তা‘আলার কাজের ব্যাপারে বিস্ময়বোধ করছেন। অথচ আল্লাহ তা‘আলার নিকট এটা কোনই কঠিন ব্যাপার নয়। তিনি শুধু বলেন, হও তাই হয়ে যায়। যেমন



আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(إِنَّمَآ أَمْرُه۫ٓ إِذَآ أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَّقُوْلَ لَه۫ كُنْ فَيَكُوْنُ)



“বস্তুতঃ তাঁর সৃষ্টিকার্য এরূপ যে, যখন তিনি কোন কিছু সৃষ্টি করতে ইচ্ছা করেন, তখন তিনি তাকে বলেনঃ “হও”, অমনি তা হয়ে যায়।” (সূরা ইয়াসীন৩৬:৮২) সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার কাজে আশ্চর্য হওয়ার কোনই কারণ নেই।



(أَهْلَ الْبَيْتِ) ইবরাহীম (عليه السلام)-এর স্ত্রীকে এখানে ফেরেশতারা আহলে বাইত বলে সম্বোধন করেছেন এবং তার জন্য বহুবচন শব্দ ব্যবহার করেছেন। যা প্রমাণ করে ১. স্ত্রী সর্বপ্রথম আহলে বাইতের অন্তর্ভ্ক্তু। ২. আহলে বাইতের জন্য বহুবচন পুংলিঙ্গ শব্দ ব্যবহার করা ঠিক। যেমন সূরা আহযাবের ৩৩ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পবিত্র স্ত্রীগণের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করেছেন।



মেহমানরূপে আগত ফেরেশ্তাদের পরিচয় পাওয়ার পর ইবরাহীম (عليه السلام)-এর ভয় কেটে গেল। ভয় কেটে যাওয়ার পর ফেরেশতাদের সাথে লূত (عليه السلام)-এর সম্প্রদায়ের ধ্বংস সম্পর্কে কথা কাটাকাটি করতে লাগলেন এবং বললেন যে, আপনারা যে সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার জন্য প্রেরিত হয়েছেন সেখানে তো আল্লাহ তা‘আলার প্রেরিত নাবী লূত (عليه السلام) রয়েছেন, এর উত্তরে ফেরেশতারা যা বললেন, যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী:



(قَالَ إِنَّ فِيْهَا لُوْطًا ط قَالُوْا نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَنْ فِيْهَا ز لَنُنَجِّيَنَّه۫ وَأَهْلَه۫ٓ إِلَّا امْرَأَتَه۫ ز كَانَتْ مِنَ الْغٰبِرِيْنَ)



“ইবরাহীম বলল:‎ ‘এ জনপদে তো লূত রয়েছে।’ তারা বলল:‎ ‘সেথায় কারা আছে, তা আমরা ভাল করেই জানি, আমরা লূতকে ও তার পরিজনদেরকে অবশ্যই রক্ষা করব, তার স্ত্রীকে ছাড়া; সে তো পশ্চাতে অবস্থানকারীদের অন্তর্ভুক্ত।’’ (সূরা আনকাবুত ২৯:৩২)



ইবরাহীম (عليه السلام)-এর এরূপ কথা বলার কারণ ছিল যে, তিনি ছিলেন নরম হৃদয়ের অধিকারী যার ফলে তিনি কোন সম্প্রদায়ের ধ্বংসটা সহ্য করতে পারছিলেন না।



তখন ফেরেশতারা ইবরাহীম (عليه السلام)-এর কথা শুনে বললেন: এখন এসব কথা বলে কোন লাভ নেই। কারণ তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। সুতরাং তাদের ওপর এমন শাস্তি আসছে যে, সে শাস্তি ফিরাবার মত কেউ নেই। অতএব এখন আর তর্ক-বিতর্ক করে কোন লাভ নেই।



অতঃপর যখন ফেরেশতারা লূত (عليه السلام)-এর নিকট উপস্থিত হল তখন তিনি তাদেরকে নিয়ে খুবই চিন্তায় মগ্ন হলেন, আর তাঁর হৃদয় সঙ্কুচিত হয়ে গেল এবং বললেন যে, আজকের দিনটি বড়ই কঠিন। কারণ তাঁর সম্প্রদায় যখনই কোন সুন্দর-সুদর্শন যুবককে দেখত তখনই তারা তার সাথে অপকর্মে লিপ্ত হতে চাইত। আর এ ফেরেশতারা সুদর্শন যুবকের বেশ ধরে আগমন করেছেন। তিনিও জানতেন যে, আগত যুবকেরা মানুষ নয় বরং ফেরেশতা। যার ফলে তিনি তাদের ব্যাপারে চিন্তিত ছিলেন। অতঃপর যখন তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা (এসব সুদর্শন যুবকদের) ফেরেশতাদের আগমনের কথা জানতে পারল তখন তারা তাদের সাথে অপকর্ম করার জন্য আনন্দে আত্মহারা হয়ে দ্রুত ছুটে আসল। আর তাদেরকে সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য জোর করতে লাগল। যাতে তাদের (ফেরেশতা) সাথে তাদের মন্দ কামনা চরিতার্থ করতে পারে।



অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:



(وَلَقَدْ رَاوَدُوْھُ عَنْ ضَیْفِھ۪ فَطَمَسْنَآ اَعْیُنَھُمْ فَذُوْقُوْا عَذَابِیْ وَنُذُرِ)



“তারা মেহমানদের জন্য লূতকে ফুসলিয়েছিল, তখন আমি তাদের চোখের দৃষ্টিশক্তি লোপ করে দিলাম (এবং বললামঃ) আস্বাদন কর আমার আযাব এবং সতর্কবাণীর পরিণাম!” (সূরা কমার ৫৪:৩৭) তখন লূত (عليه السلام) তাদের এ অবস্থা দেখে বললেন যে, যদি তোমাদের উদ্দেশ্য যৌন চাহিদা পূরণ করাই হয়ে থাকে তাহলে এই যে আমার মেয়েরা রয়েছে তাদেরকে নিয়ে যাও এবং বিবাহের মাধ্যমে তাদের সাথে যৌন চাহিদা পূরণ কর। এটাই তোমাদের জন্য সর্বাধিক কল্যাণকর হবে।



কোন কোন মুফাসসিরগণ বলেছেন: লূত (عليه السلام) আমার কন্যা বলতে সমগ্র মহিলাদেরকে বুঝিয়েছেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় কর আর আমাকে আমার মেহমানের সম্মুখে অপমানিত কর না। লূত (عليه السلام)-এর কথার উত্তরে তারা বলল যে, আমাদের মহিলাদের কোনই প্রয়োজন নেই আর আমাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আপনি ভাল করেই জানেন। তাদের এ কথা দ্বারা বুঝা যায় যে, বৈধ ও স্বাভাবিক নিয়মকে তারা অস্বীকার করে দিল এবং অস্বাভাবিক কর্ম ও নির্লজ্জতার ওপর অটল থাকল। তাদের এ পরিস্থিতি দেখে লূত (عليه السلام) আফসোস করে বললেন যে, যদি আমার তোমাদের ওপর কোন প্রভাব থাকত তাহলে আজ আমাকে মেহমানদের জন্য এই অস্থিরতার শিকার ও অপমানিত হতে হত না। বরং আমি তোমাদেরকে প্রতিহত করতাম।



ফেরেশতারা লূত (عليه السلام)-এর অস্থিরতা ও উৎকণ্ঠা এবং তাঁর সম্প্রদায়ের অবাধ্যতা স্বচক্ষে দেখার পর বলল: হে লূত (عليه السلام)! আপনি নিশ্চিত থাকুন। আমরা আল্লাহ তা‘আলার প্রেরিত ফেরেশতা তারা আমাদের কাছে আসবে তো দূরের কথা আপনার কাছেও পৌঁছতে পারবে না। আপনি রাত্রের কিছু অংশ বাকি থাকতে আপনার স্ত্রী ব্যতীত পরিবারের সকলকে নিয়ে এই এলাকা থেকে চলে যান। তবে শর্ত হল পিছনের দিকে ফিরে তাকাবেন না। এরূপ নির্দেশ সূরা হিজরের ৬৫ নং আয়াতের উল্লেখ রয়েছে। পিছনের দিকে তাকাতে নিষেধের কারণ হল কেউ আযাব প্রত্যক্ষ করতে চাইলে তাকেও আযাব গ্রাস করে নিত। প্রত্যুষকালেই এই গ্রামকে ধ্বংস করে দেয়া হবে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ মোতাবেক সেই জনপদকে ভোরবেলায় উল্টিয়ে দেয়া হয় এবং তাদের ওপর ক্রমাগতভাবে পাথরের বৃষ্টি বর্ষণ করা হয় এবং তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করে দেয়া হয়। এটাই ছিল লূত (عليه السلام)-এর সম্প্রদায়ের করুণ পরিণতি। লূত (عليه السلام)-এর জাতির বসতি ছিল জর্ডান ও ইসরাঈলের মধ্যবর্তী মৃতসাগরের নিকট, বাইবেলে যার নাম সুডুম। সুতরাং মক্কার এই সমস্ত কাফির-মুশরিকরাও তাদের থেকে দূরে নয়। তাদের অবস্থাও এরূপ হতে পারে। অতএব তারা যেন আগে থেকেই সাবধান হয়ে যায় এবং আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করে।



আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:



১. নাবীরা গায়েব জানেন না। যদি জানতেন তাহলে ইবরাহীম (عليه السلام) ফেরেশতাদের জন্য ভূনা গোশত নিয়ে আসতেন না এবং লূত (عليه السلام)ও মেহমানদের জন্য চিন্তিত হতেন না।

২. পুরুষের সাথে পুরুষের যৌন চাহিদা নিবারণ করা হারাম।

৩. ইবরাহীম (عليه السلام)-এর আতিথেয়তা সম্পর্কে জানতে পারলাম আর এও জানতে পারলাম যে, তিনি ছিলেন কোমল হৃদয়ওয়ালা ব্যক্তি।

৪. লূত (عليه السلام)-এর জাতির পাপাচার ও তাদের ধ্বংসের কারণ সম্পর্কে জানতে পারলাম।


তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)


তাফসীর: ৮০-৮১ নং আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ হযরত লূত (আঃ) যখন দেখলো যে, তার উপদেশ তার কওমের উপর ক্রীয়াশীল হলো না, তখন তাদেরকে ধমকের সুরে বললো: যদি আমার শক্তি থাকতো বা আমার আত্মীয় স্বজন শক্তিশালী হতো তবে অবশ্যই আমি তোমাদের এই দুষ্কর্যের স্বাদ গ্রহণ করাতাম।

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “লূতের (আঃ) উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক, অবশ্যই তিনি কোন দৃঢ় স্তম্ভের আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। এর দ্বারা তিনি মহা মহিমান্বিত আল্লাহর সত্ত্বাকেই বুঝিয়েছেন। তাঁর পরে যে নবীকেই প্রেরন করা হয়েছে, তিনি তাঁর প্রভাবশালী কওমের মধ্যেই প্রেরিত হয়েছেন।”

ফেরেশ্‌তাগণ হযরত লূতের (আঃ) মনমরা অবস্থা লক্ষ্য করে নিজেদের স্বরূপ তার কাছে প্রকাশ করেন। তারা বলেনঃ হে লূত (আঃ)! আমরা আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত হয়েছি। তারা কখনো আপনার নিকট পৌঁছতে পারবে না। (এবং আমাদের নিকটও না)। আপনি অদ্য রাত্রির শেষ ভাগে আপনার পরিবার পরিজনসহ এখান থেকে সরে পড়বেন। আপনি নিজে তাদের পেছনে থাকবেন এবং সরাসরি নিজেদের পথে চলতে থাকবেন। আপনাদের কেউই যেন কওমের হা-হুতাশ, কান্নাকাটি এবং চীৎকার শুনে তাদের দিকে ফিরেও না দেখে। এর থেকে তারা হযরত লূতের (আঃ) স্ত্রীকে পৃথক করে দেন। তারা বলেন যে, তার স্ত্রী তাদের অনুসরণ করতে পারবে না, সে তার কওমের শাস্তির সময় তাদের হা-হুতাশ ও কান্না শুনে তাদের দিকে ফিরে তাকাবে। কেননা, তার কওমের সাথে সেও ধ্বংস হয়ে যাবে, এ ফায়সালা আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে হয়েই গেছে। এক কিরাআতে (আরবি) অর্থাৎ (আরবি) শব্দের উপর পেশ দিয়ে রয়েছে। যে সব গুরুজনের নিকট ‘পেশ’ ও ‘যবর’ দুটোই জায়েয তারা বর্ণনা করেন যে, হযরত লূতের (আঃ) স্ত্রী ও তাদের সাথে বের হয়েছিল। কিন্তু শাস্তি অবতীর্ণ হওয়ার সময় কওমের চীৎকার শুনে সে ধৈর্য ধারণ করতে পারে নাই। সে তাদের দিকে ফিরে তাকিয়েছিল এবং ‘হায় আমার কওম!’ একথা মুখ দিয়ে বেরও হয়েছিল। তৎক্ষণাৎ আকাশ থেকে একটা পাথর তার প্রতি নিক্ষিপ্ত হয়। সুতরাং সেও ধ্বংস হতে যায়।

হযরত লূতকে (আঃ) আরো সান্ত্বনা দানের জন্যে তাঁর কওমের শাস্তি নিকটবর্তী হয়ে যাওয়ার কথাও তাঁর কাছে বর্ণনা করে দেন যে, সকাল হওয়া মাত্রই তারা ধ্বংস হয়ে যাবে আর সকাল তো খুবই নিকটে।

হযরত লূতের (আঃ) কওম তাঁর দরজার উপর দাঁড়িয়েছিল এবং তাঁকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে রেখেছিল। তারা তাঁর দিকে তীর বেগে ধাবিত হচ্ছিল। এমতাবস্থায় হযরত জিবরাঈল (আঃ) ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন এবং নিজের ডানা দ্বারা তাদের মুখের উপর আঘাত করেন। ফলে তাদের চক্ষু অন্ধ হয়ে যায়।

হযরত হুযাইফা ইবনু ইয়ামান (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, স্বয়ং হযরত ইবরাহীমও (আঃ) হযরত লূতের (আঃ) কওমের নিকট আগমন করেন এবং তাদেরকে বুঝিয়ে বলেনঃ “দেখো, তোমরা আল্লাহর শাস্তিকে ক্রয় করে নিয়ো না।” কিন্তু তারা আল্লাহর দোস্তের উপদেশও মান্য করে নাই। অবশেষে শাস্তির নির্ধারিত সময় এসে পড়লো। হযরত লূত (আঃ) তার জমিতে কাজ করছিলেন, এমন সময় ফেরেশতাগণ তার নিকট আগমন করেন। তাঁরা তাঁকে বলেনঃ আজ রাত্রিতে আমরা আপনার বাড়ীতে মেহমান হলাম।” হযরত জিবরাঈলের (আঃ) প্রতি আল্লাহ পাকের এই নির্দেশ ছিল যে, যে পর্যন্ত হযরত লূত (আঃ) তিনবার তাঁর কওমের বদ অভ্যাসের সাক্ষ্য প্রদান না করবেন সেই পর্যন্ত যেন তাদেরকে শাস্তি দেয়া না হয়। হযরত লূত (আঃ) যখন তাদেরকে নিয়ে চললেন তখন পথিমধ্যেই তাদেরকে বললেনঃ “এখানকার লোকেরা বড়ই দুশ্চরিত্র, এই এই দোষ তাদের মধ্যে রয়েছে। কিছু দূর গিয়ে দ্বিতীয়বার তিনি তাদেরকে বলেনঃ “এই গ্রামের লোকদের দুষ্কার্য কি আপনারা অবগত নন? আমার জানা মতে এদের চেয়ে দুষ্ট লোক-ভূপৃষ্ঠে আর নেই। হায়! আমি আপনাদেরকে কোথায় নিয়ে যাবো! আমার কওম তো সমস্ত মাখলুক হতে বদতর। ঐ সময় হযরত জিবরাঈল (আঃ) তার সঙ্গীয় ফেরেশতাদেরকে বলেনঃ “দেখো, দু’বার তিনি একথা বললেন।” অতঃপর যখন তিনি তাদেরকে নিয়ে বাড়ীর দরজায় পৌঁছলেন তখন মনের দুঃখে তিনি কেঁদে ফেললেন এবং বলতে লাগলেনঃ “আমার কওম সমস্ত মাখলুকের মধ্যে সবচেয়ে বেশী বদ ও দূষ্ট প্রকৃতির। এরা কোন দুষ্কার্যে জড়িয়ে পড়েছে তা কি আপনাদের জানা নেই? ভূ-পৃষ্ঠে কোন বস্তি এই বস্তি অপেক্ষা খারাপ নেই।” ঐ সময় হযরত জিবরাঈল (আঃ) পুনঃরায় ফেরেশতাগণকে বললেনঃ “দেখো, তিনি তিন বার স্বীয় কওমের বদ অভ্যাসের সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। মনে রেখোঁরেখো যে, এখন তাদের উপর শাস্তি অবধারিত হয়ে গেছে।” অতঃপর তারা বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করেন। ঐ সময় তাঁর বৃদ্ধা স্ত্রী উঁচু জায়গায় চড়ে কাপড় নাড়াতে শুরু করে। সাথে সাথে গ্রামের দুবৃত্তেরা দৌড়ে এসে তাকে জিজ্ঞেস করেঃ “ব্যাপার কি?” সে উত্তরে বলেঃ “লূতের (আঃ) বাড়ীতে মেহমান এসেছে। আমি এদের চেয়ে সুদর্শন ও সুগন্ধময় লোক আর কখনো দেখি নাই।” এ কথা শোনা মাত্রই আনন্দে আত্মহারা হয়ে তারা হযরত লূতের (আঃ) বাড়ীতে দৌড়ে আসে। চারদিক থেকে তারা তার বাড়ীকে ঘিরে ফেলে। তিনি তাদেরকে কসম দেন এবং উপদেশ দিতে গিয়ে বলেনঃ “দেখো, স্ত্রীলোক বহু রয়েছে।” কিন্তু তারা কিছুতেই ঐ দুষ্কার্য হতে বিরত থাকলো না। ঐ সময় হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাদের শাস্তির জন্যে আল্লাহ তাআ’লার নিকট অনুমতি প্রার্থনা করেন। আল্লাহ পাক অনুমতি দান করেন। তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর প্রকৃত রূপের ডানা খুলে দেন। তাঁর দু’টি ডানা রয়েছে; যে গুলির উপর মণিমুক্তা বসানো আছে। তাঁর দাঁত গুলি তক্‌তকে, ঝকঝকে। তাঁর কপাল উঁচু এবং বড়। তাঁর মস্তক মুক্তার মতো, যেন বরফ। তাঁর পদদ্বয় সবুজ বর্ণের। হযরত লূতকে (আঃ) তিনি বলেনঃ “আমরা আপনার প্রতিপালক কর্তৃক প্রেরিত হয়েছি। তারা (আপনার কওম) আপনার নিকট পৌঁছতে পারবে না। আপনি দরজা দিয়ে বেরিয়ে যান।” একথা বলে তিনি তার ডানা দ্বারা তাদের মুখের উপর মেরে দেন। ফলে তারা অন্ধ হয়ে যায়। তারা পথও চিনতে পারছিল না। হযরত লূত (আঃ) স্বীয় পরিবার বর্গ নিয়ে ঐ রাত্রেই বেরিয়ে পড়ে, আল্লাহ তাআ’লার নির্দেশও এটাই ছিল। মুহাম্মদ ইবনু কা’ব (রঃ), কাতাদা’ (রঃ), সুদ্দী (রঃ) প্রভৃতি গুরুজনের বর্ণনা এটাই।





সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।