সূরা হূদ (আয়াত: 72)
হরকত ছাড়া:
قالت يا ويلتا أألد وأنا عجوز وهذا بعلي شيخا إن هذا لشيء عجيب ﴿٧٢﴾
হরকত সহ:
قَالَتْ یٰوَیْلَتٰۤیءَ اَلِدُ وَ اَنَا عَجُوْزٌ وَّ هٰذَا بَعْلِیْ شَیْخًا ؕ اِنَّ هٰذَا لَشَیْءٌ عَجِیْبٌ ﴿۷۲﴾
উচ্চারণ: কা-লাত ইয়া-ওয়াইলাতাআআলিদুওয়া আনা-‘আজুযুওঁ ওয়া হা-যা-বা‘লী শাইখান ইন্না হা-যা-লাশাইউন ‘আজীব।
আল বায়ান: সে বলল, ‘হায়, কী আশ্চর্য! আমি সন্তান প্রসব করব, অথচ আমি বৃদ্ধা, আর এ আমার স্বামী, বৃদ্ধ? এটা তো অবশ্যই এক আশ্চর্যজনক ব্যাপার’!
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭২. তিনি বললেন, হায়, কি আশ্চর্য! সন্তানের জননী হব আমি, যখন আমি বৃদ্ধা এবং এ আমার স্বামী বৃদ্ধ! এটা অবশ্যই এক অদ্ভুত ব্যাপার।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: সে বলল, ‘হায় আমার কপাল! সন্তান হবে আমার, আমি তো অতি বুড়ি আর আমার এই স্বামীও বৃদ্ধ, এতো এক আশ্চর্য ব্যাপার।’
আহসানুল বায়ান: (৭২) সে বলল, ‘হায় ভাগ্য! আমি কি সন্তান প্রসব করব অথচ আমি বৃদ্ধা এবং আমার এই স্বামীও বৃদ্ধ! বাস্তবিকই এটা তো একটা বিস্ময়কর ব্যাপার!’ [1]
মুজিবুর রহমান: সে বললঃ হায় কপাল! এখন আমি সন্তান প্রসব করব বৃদ্ধা হয়ে! আর আমার এই স্বামী অতি বৃদ্ধ। বাস্তবিক এটাতো একটা বিস্ময়কর ব্যাপার!
ফযলুর রহমান: সে বলল, “হায় আল্লাহ! আমি এক বুড়ী, আর আমার এই বৃদ্ধ স্বামী, এ অবস্থায় আমার সন্তান হবে? এ তো এক অবাক কাণ্ড।”
মুহিউদ্দিন খান: সে বলল-কি দুর্ভাগ্য আমার! আমি সন্তান প্রসব করব? অথচ আমি বার্ধক্যের শেষ প্রান্তে এসে উপনীত হয়েছি আর আমার স্বামীও বৃদ্ধ, এতো ভারী আশ্চর্য কথা।
জহুরুল হক: তিনি বললেন -- "হায় আমার আফসোস! আমি কি সন্তান জন্ম দেব যখন আমি বৃদ্ধা হয়ে গেছি আর আমার স্বামীও বৃদ্ধ? এটি নিশ্চয়ই আজব ব্যাপার।"
Sahih International: She said, "Woe to me! Shall I give birth while I am an old woman and this, my husband, is an old man? Indeed, this is an amazing thing!"
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৭২. তিনি বললেন, হায়, কি আশ্চর্য! সন্তানের জননী হব আমি, যখন আমি বৃদ্ধা এবং এ আমার স্বামী বৃদ্ধ! এটা অবশ্যই এক অদ্ভুত ব্যাপার।(১)
তাফসীর:
(১) (يَا وَيْلَتَىٰ) শব্দটি সাধারণত কোন দুর্ভোগে পড়লে মানুষ ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু এর মানে এ নয় যে, সারা এ খবর শুনে যথার্থই খুশী হবার পরিবর্তে উল্টো একে দুর্ভাগ্য মনে করেছিলেন। বরং আসলে এগুলো এমন ধরনের শব্দ ও বাক্য, যা মেয়েরা সাধারণত কোন ব্যাপারে অবাক হয়ে গেলে বলে থাকে। [কুরতুবী; ইবন কাসীর] এ ক্ষেত্রে নিছক বিস্ময় প্রকাশই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। [কুরতুবী; ইবন কাসীর]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৭২) সে বলল, ‘হায় ভাগ্য! আমি কি সন্তান প্রসব করব অথচ আমি বৃদ্ধা এবং আমার এই স্বামীও বৃদ্ধ! বাস্তবিকই এটা তো একটা বিস্ময়কর ব্যাপার!’ [1]
তাফসীর:
[1] উক্ত স্ত্রী সারাহ ছিলেন। তিনি নিজে বৃদ্ধা ও তাঁর স্বামী ইবরাহীম (আঃ)ও বৃদ্ধ ছিলেন। এই জন্য বিস্মিত হওয়া স্বাভাবিক ছিল, আর তারই বহিঃপ্রকাশ তাঁর দ্বারা হয়েছিল।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৬৯-৮৩ নং আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়::
উক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম (عليه السلام)-কে সন্তানের সুসংবাদ দান এবং লূত (عليه السلام) ও তাঁর সম্প্রদায়ের অপকর্ম সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।
আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতা প্রেরণ করলেন লূত (عليه السلام)-এর অবাধ্য সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার জন্য। ফেরেশতারা লূত (عليه السلام)-এর অবাধ্য জাতিকে ধ্বংস করার যাত্রা পথে ইবরাহীম (عليه السلام)-এর নিকট উঠে গেলেন তাঁকে সু-সংবাদ দেয়ার জন্য। এ সুসংবাদটা ছিল পুত্র ইসহাক ও ইয়াকুবের সুসংবাদ। যেমন অত্র সূরার ৭১ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে। ইবরাহীম (عليه السلام) জানতেন না এরা ফেরেশতা। তারা (ফেরেশতারা) ইবরাহীম (عليه السلام)-এর নিকট গিয়ে সালাম দিলেন এবং ইবরাহীম (عليه السلام)ও তাদের সালামের উত্তর দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ইবরাহীম (عليه السلام) তাদের জন্য একটি ভুনা করা বাছুর নিয়ে আসলেন। এতে বুঝা যায় ইবরাহীম (عليه السلام) বড়ই মেহমানপ্রিয় মানুষ ছিলেন। তিনি তাদেরকে মানুষ মনে করে এ আয়োজন করেছিলেন। যদি জানতেন এরা আল্লাহ তা‘আলার ফেরেশতা তাহলে তিনি এ ব্যবস্থা করতেন না। এখান থেকেও বুঝা যাচ্ছে নাবীরা গায়েব জানেন না। আরো বুঝা যায় মেহমানের যথাসম্ভব সম্মান করা উচিত। মেহমানের কদর করাকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীসে ঈমানদারদের বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করেছেন। যখন ইবরাহীম (عليه السلام) খাবারের আয়োজন করার পর দেখলেন যে, তারা (ফেরেশতারা) সে দিকে হাত দিচ্ছে না অর্থাৎ সেখান থেকে তারা (ফেরেশতারা) খাচ্ছে না, তখন ইবরাহীম (عليه السلام) তাদেরকে ভয় পাচ্ছিলেন। বলা হয় তাদের নিকট এটা প্রসিদ্ধ ছিল যে, কারো বাড়িতে আগত মেহমান যদি মেহমানি গ্রহণ না করে তাহলে বুঝা যাবে যে, আগত মেহমান কোন ভাল উদ্দেশ্য নিয়ে আসেনি। সূরা যারিয়ার ২৬-২৭ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে তাদের নিকট খাবার দেয়ার পর যখন দেখছেন তারা খাচ্ছে না, তখন তিনি বললেন, আপনারা খাচ্ছেন না কেন? সূরা হিজরের ৫২ নং আয়াতে বলা হয়েছে আমরা আপনাদের আগমনে শংকিত। এমতাবস্থায় ফেরেশতারা ইবরাহীম (عليه السلام) কে অভয় দিয়ে বললেন: আপনি ভয় পাবেন না। আমরা আল্লাহ তা‘আলার ফেরেশতা, আমরা অভিশপ্ত সম্প্রদায় লূত (عليه السلام)-এর জাতিকে শাস্তি দেয়ার জন্য প্রেরিত হয়েছি। তখন সারা (আলাইহাস সালাম) তথায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি এই অভিশপ্ত জাতির ধ্বংসের কথা শুনে হাসলেন। কেউ কেউ বলেন, তাকে যে বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের সু-সংবাদ দেয়া হয়েছে এজন্য তিনি হাসলেন।
ফেরেশতারা ইবরাহীম (عليه السلام)-এর স্ত্রী সারাকে পুত্র ইসহাক (عليه السلام)-এর সুসংবাদ দিলেন, এবং ইসহাকের ঘরে ইয়াকুব হবে এ সুসংবাদও দিলেন। তখন সারা (عليه السلام) বললেন যে, আমি এবং আমার স্বামী আমরা তো উভয়ে বৃদ্ধ হয়ে গেছি। এখন সন্তান প্রসব করা তো একটা আশ্চর্যজনক বিষয়। আর এটাতো অসম্ভব বিষয়; যা পৃথিবীর বুকে বিরল। সূরা যারিয়াতের ২৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে সারা বলল: আমি বৃদ্ধা ও বন্ধ্যা। তাদের কথার জবাবে ফেরেশতারা বলল, আপনারা কি আল্লাহ তা‘আলার কাজের ব্যাপারে বিস্ময়বোধ করছেন। অথচ আল্লাহ তা‘আলার নিকট এটা কোনই কঠিন ব্যাপার নয়। তিনি শুধু বলেন, হও তাই হয়ে যায়। যেমন
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(إِنَّمَآ أَمْرُه۫ٓ إِذَآ أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَّقُوْلَ لَه۫ كُنْ فَيَكُوْنُ)
“বস্তুতঃ তাঁর সৃষ্টিকার্য এরূপ যে, যখন তিনি কোন কিছু সৃষ্টি করতে ইচ্ছা করেন, তখন তিনি তাকে বলেনঃ “হও”, অমনি তা হয়ে যায়।” (সূরা ইয়াসীন৩৬:৮২) সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার কাজে আশ্চর্য হওয়ার কোনই কারণ নেই।
(أَهْلَ الْبَيْتِ) ইবরাহীম (عليه السلام)-এর স্ত্রীকে এখানে ফেরেশতারা আহলে বাইত বলে সম্বোধন করেছেন এবং তার জন্য বহুবচন শব্দ ব্যবহার করেছেন। যা প্রমাণ করে ১. স্ত্রী সর্বপ্রথম আহলে বাইতের অন্তর্ভ্ক্তু। ২. আহলে বাইতের জন্য বহুবচন পুংলিঙ্গ শব্দ ব্যবহার করা ঠিক। যেমন সূরা আহযাবের ৩৩ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পবিত্র স্ত্রীগণের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করেছেন।
মেহমানরূপে আগত ফেরেশ্তাদের পরিচয় পাওয়ার পর ইবরাহীম (عليه السلام)-এর ভয় কেটে গেল। ভয় কেটে যাওয়ার পর ফেরেশতাদের সাথে লূত (عليه السلام)-এর সম্প্রদায়ের ধ্বংস সম্পর্কে কথা কাটাকাটি করতে লাগলেন এবং বললেন যে, আপনারা যে সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার জন্য প্রেরিত হয়েছেন সেখানে তো আল্লাহ তা‘আলার প্রেরিত নাবী লূত (عليه السلام) রয়েছেন, এর উত্তরে ফেরেশতারা যা বললেন, যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(قَالَ إِنَّ فِيْهَا لُوْطًا ط قَالُوْا نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَنْ فِيْهَا ز لَنُنَجِّيَنَّه۫ وَأَهْلَه۫ٓ إِلَّا امْرَأَتَه۫ ز كَانَتْ مِنَ الْغٰبِرِيْنَ)
“ইবরাহীম বলল: ‘এ জনপদে তো লূত রয়েছে।’ তারা বলল: ‘সেথায় কারা আছে, তা আমরা ভাল করেই জানি, আমরা লূতকে ও তার পরিজনদেরকে অবশ্যই রক্ষা করব, তার স্ত্রীকে ছাড়া; সে তো পশ্চাতে অবস্থানকারীদের অন্তর্ভুক্ত।’’ (সূরা আনকাবুত ২৯:৩২)
ইবরাহীম (عليه السلام)-এর এরূপ কথা বলার কারণ ছিল যে, তিনি ছিলেন নরম হৃদয়ের অধিকারী যার ফলে তিনি কোন সম্প্রদায়ের ধ্বংসটা সহ্য করতে পারছিলেন না।
তখন ফেরেশতারা ইবরাহীম (عليه السلام)-এর কথা শুনে বললেন: এখন এসব কথা বলে কোন লাভ নেই। কারণ তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। সুতরাং তাদের ওপর এমন শাস্তি আসছে যে, সে শাস্তি ফিরাবার মত কেউ নেই। অতএব এখন আর তর্ক-বিতর্ক করে কোন লাভ নেই।
অতঃপর যখন ফেরেশতারা লূত (عليه السلام)-এর নিকট উপস্থিত হল তখন তিনি তাদেরকে নিয়ে খুবই চিন্তায় মগ্ন হলেন, আর তাঁর হৃদয় সঙ্কুচিত হয়ে গেল এবং বললেন যে, আজকের দিনটি বড়ই কঠিন। কারণ তাঁর সম্প্রদায় যখনই কোন সুন্দর-সুদর্শন যুবককে দেখত তখনই তারা তার সাথে অপকর্মে লিপ্ত হতে চাইত। আর এ ফেরেশতারা সুদর্শন যুবকের বেশ ধরে আগমন করেছেন। তিনিও জানতেন যে, আগত যুবকেরা মানুষ নয় বরং ফেরেশতা। যার ফলে তিনি তাদের ব্যাপারে চিন্তিত ছিলেন। অতঃপর যখন তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা (এসব সুদর্শন যুবকদের) ফেরেশতাদের আগমনের কথা জানতে পারল তখন তারা তাদের সাথে অপকর্ম করার জন্য আনন্দে আত্মহারা হয়ে দ্রুত ছুটে আসল। আর তাদেরকে সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য জোর করতে লাগল। যাতে তাদের (ফেরেশতা) সাথে তাদের মন্দ কামনা চরিতার্থ করতে পারে।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَلَقَدْ رَاوَدُوْھُ عَنْ ضَیْفِھ۪ فَطَمَسْنَآ اَعْیُنَھُمْ فَذُوْقُوْا عَذَابِیْ وَنُذُرِ)
“তারা মেহমানদের জন্য লূতকে ফুসলিয়েছিল, তখন আমি তাদের চোখের দৃষ্টিশক্তি লোপ করে দিলাম (এবং বললামঃ) আস্বাদন কর আমার আযাব এবং সতর্কবাণীর পরিণাম!” (সূরা কমার ৫৪:৩৭) তখন লূত (عليه السلام) তাদের এ অবস্থা দেখে বললেন যে, যদি তোমাদের উদ্দেশ্য যৌন চাহিদা পূরণ করাই হয়ে থাকে তাহলে এই যে আমার মেয়েরা রয়েছে তাদেরকে নিয়ে যাও এবং বিবাহের মাধ্যমে তাদের সাথে যৌন চাহিদা পূরণ কর। এটাই তোমাদের জন্য সর্বাধিক কল্যাণকর হবে।
কোন কোন মুফাসসিরগণ বলেছেন: লূত (عليه السلام) আমার কন্যা বলতে সমগ্র মহিলাদেরকে বুঝিয়েছেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় কর আর আমাকে আমার মেহমানের সম্মুখে অপমানিত কর না। লূত (عليه السلام)-এর কথার উত্তরে তারা বলল যে, আমাদের মহিলাদের কোনই প্রয়োজন নেই আর আমাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আপনি ভাল করেই জানেন। তাদের এ কথা দ্বারা বুঝা যায় যে, বৈধ ও স্বাভাবিক নিয়মকে তারা অস্বীকার করে দিল এবং অস্বাভাবিক কর্ম ও নির্লজ্জতার ওপর অটল থাকল। তাদের এ পরিস্থিতি দেখে লূত (عليه السلام) আফসোস করে বললেন যে, যদি আমার তোমাদের ওপর কোন প্রভাব থাকত তাহলে আজ আমাকে মেহমানদের জন্য এই অস্থিরতার শিকার ও অপমানিত হতে হত না। বরং আমি তোমাদেরকে প্রতিহত করতাম।
ফেরেশতারা লূত (عليه السلام)-এর অস্থিরতা ও উৎকণ্ঠা এবং তাঁর সম্প্রদায়ের অবাধ্যতা স্বচক্ষে দেখার পর বলল: হে লূত (عليه السلام)! আপনি নিশ্চিত থাকুন। আমরা আল্লাহ তা‘আলার প্রেরিত ফেরেশতা তারা আমাদের কাছে আসবে তো দূরের কথা আপনার কাছেও পৌঁছতে পারবে না। আপনি রাত্রের কিছু অংশ বাকি থাকতে আপনার স্ত্রী ব্যতীত পরিবারের সকলকে নিয়ে এই এলাকা থেকে চলে যান। তবে শর্ত হল পিছনের দিকে ফিরে তাকাবেন না। এরূপ নির্দেশ সূরা হিজরের ৬৫ নং আয়াতের উল্লেখ রয়েছে। পিছনের দিকে তাকাতে নিষেধের কারণ হল কেউ আযাব প্রত্যক্ষ করতে চাইলে তাকেও আযাব গ্রাস করে নিত। প্রত্যুষকালেই এই গ্রামকে ধ্বংস করে দেয়া হবে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ মোতাবেক সেই জনপদকে ভোরবেলায় উল্টিয়ে দেয়া হয় এবং তাদের ওপর ক্রমাগতভাবে পাথরের বৃষ্টি বর্ষণ করা হয় এবং তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করে দেয়া হয়। এটাই ছিল লূত (عليه السلام)-এর সম্প্রদায়ের করুণ পরিণতি। লূত (عليه السلام)-এর জাতির বসতি ছিল জর্ডান ও ইসরাঈলের মধ্যবর্তী মৃতসাগরের নিকট, বাইবেলে যার নাম সুডুম। সুতরাং মক্কার এই সমস্ত কাফির-মুশরিকরাও তাদের থেকে দূরে নয়। তাদের অবস্থাও এরূপ হতে পারে। অতএব তারা যেন আগে থেকেই সাবধান হয়ে যায় এবং আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. নাবীরা গায়েব জানেন না। যদি জানতেন তাহলে ইবরাহীম (عليه السلام) ফেরেশতাদের জন্য ভূনা গোশত নিয়ে আসতেন না এবং লূত (عليه السلام)ও মেহমানদের জন্য চিন্তিত হতেন না।
২. পুরুষের সাথে পুরুষের যৌন চাহিদা নিবারণ করা হারাম।
৩. ইবরাহীম (عليه السلام)-এর আতিথেয়তা সম্পর্কে জানতে পারলাম আর এও জানতে পারলাম যে, তিনি ছিলেন কোমল হৃদয়ওয়ালা ব্যক্তি।
৪. লূত (عليه السلام)-এর জাতির পাপাচার ও তাদের ধ্বংসের কারণ সম্পর্কে জানতে পারলাম।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৬৯-৭৩ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “যখন আমার দূতেরা ইবরাহীমের (আঃ) নিকট সুসংবাদ নিয়ে আসলো।” তাঁরা ছিলেন ফেরেশতা। একটি উক্তি এই রয়েছে যে, তাঁরা তাঁকে হযরত ইসহাকের (আঃ) সুসংবাদ দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় উক্তি এই আছে যে, তাঁরা তাঁকে হযরত লূতের (আঃ) কওমের ধ্বংস প্রাপ্ত হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছিলেন। প্রথম উক্তিটির সাক্ষী হচ্ছে আল্লাহ পাকের নিম্নের উক্তিঃ (আরবী)
অর্থাৎ “যখন ইবরাহীম (আঃ) হতে ভয় দূরীভূত হলো এবং তার কাছে সুসংবাদ আসলো, তখন সে লূতের (আঃ) কওমের ব্যাপারে আমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হলো। (১১ :৭৪) ফেরেশতারা এসে তাঁকে সালাম দিলেন। তিনিও তাদের সালামের জবাবে (আরবি) বললেন। ইলমে বায়ানের আলেমগণ বলেন যে, ফেরেশতাদের সালামের উত্তরে হযরত ইবরাহীমের (আঃ) সালামটাই উত্তম। কেননা, (আরবি) শব্দটি বা (আরবি) পেশ দিয়ে পড়ায় এতে দৃঢ়তা ও স্থায়িত্ব এসেছে। সালাম বিনিময়ের পরেই হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের সামনে আতিথ্যরূপে গো-বৎসের ভাজা মাংস পেশ করেন। যখন তিনি দেখেন যে, নবাগত মেহমানদের হাত খাবারের দিকে বাড়ছে না তখন তিনি তাদেরকে অদ্ভুত ভাবতে লাগলেন এবং শঙ্কিত হলেন। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, হযরত লূতের (আঃ) কওমের ধ্বংস সাধনের জন্যে যে ফেরেশতাদের পাঠান হয়েছিল তাঁরা যুবক মানুষের আকারে ভূ-পৃষ্ঠে অবতরণ করেছিলেন। তাঁরা হযরত ইবরাহীমের (আঃ) বাড়িতে আগমন করেন। তিনি তাদেরকে দেখে খুবই সম্মান করেন এবং তাড়াতাড়ি গো-বৎসের গোশত গরম পাথরে সেঁকে নিয়ে তাদের সামনে পেশ করেন। নিজেও তিনি তাঁদের সাথে দস্তরখানায় বসে পড়েন। তাঁর স্ত্রী হয়রত সারা’ তাদের পানাহার করাবার কাজে লেগে যান। এটা সর্বজন বিদিত যে, ফেরেশতারা পানাহার করেন না। সুতরাং তারা খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন এবং বলেনঃ “আমরা কোন খাদ্যের মূল্য না দেয়া পর্যন্ত তা খাই না।” হযরত ইবরাহীম (আঃ) বলেনঃ “তা হলে মূল্য প্রদান করুন!” তাঁরা জিজ্ঞেস করলেনঃ এর মূল্য কত? তিনি উত্তরে বললেনঃ “বিসমিল্লাহ বলে খাওয়া শুরু করা এবং খাওয়ার শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলা, এটাই হচ্ছে এর মূল্য।” তারা এ কথা শুনে হযরত জিবরাইল (আঃ) হযরত মীকাঈলের (আঃ) দিকে দৃষ্টিপাত করেন এবং তারা পরস্পরে বলাবলি করেন যে, বাস্তবিকই তার মধ্যে এই যোগ্যতা রয়েছে যে, আল্লাহ তাআ’লা তাঁকে নিজের খলিল (দোস্ত) বানিয়ে নেবেন। তখনও তাঁরা যখন খাদ্য খেলেন না তখন বিভিন্ন প্রকারের ধারণা তাঁর অন্তরে জাগ্রত হলো। হযরত সারা’ (রঃ) যখন দেখলেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বয়ং তাঁদেরকে আহার করানোর কাজে লেগে রয়েছেন, তথাপি তাঁরা খাচ্ছেন না তখন তিনি হেসে উঠলেন। আর এদিকে হযরত ইবরাহীম (আঃ) ভীত হয়ে পড়লেন। তাঁর এ অবস্থা দেখে ফেরেশতাগণ তাঁকে বললেনঃ “ভয়ের কোন কারণ নেই। এখন তাঁর ভয় দূর করার জন্যে তারা প্রকৃত ব্যাপার তাঁর সামনে তুলে ধরলেন। তাঁরা বললেনঃ “আমরা মানুষ নই, বরং ফেরেশতা। হযরত লূতের (আঃ) কওমকে ধ্বংস করার জন্যে আমরা প্রেরিত হয়েছি।”
হযরত লূতের (আঃ) কওমের ধ্বংসের কথা শুনে হযরত সারা’ (রঃ) খুশী হলেন। ঐ সময় তিনি আরো একটি সুসংবাদ শুনালেন। তা এই যে, ঐ নৈরাশ্যের বয়সেও তিনি সন্তান প্রসব করবেন। এটা ছিল তাঁর কাছে খুবই বিস্ময়কর ব্যাপার। তিনি এতেও বিস্ময় বোধ করলেন যে, যে কওমের উপর আল্লাহর শাস্তি অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে তারা তো সম্পূর্ণরূপে গাফেল রয়েছে। মোট কথা, ফেরেশতাগণ তাকে ইসহাক (আঃ) নামক সন্তানের সুসংবাদ প্রদান করেন এবং এ কথাও বলেন, হযরত ইসহাকের (আঃ) ঔরসে ইয়াকুব (আঃ) নামক সন্তান জন্মগ্রহণ করবেন।
এই আয়াত দ্বারা এই দলিল গ্রহণ করা যায় যে, ‘যাবীহুল্লাহ' (আল্লাহর পথে যবাইকৃত) হযরত ইসমাইল (আঃ) ছিলেন। কেননা, হযরত ইসহাকেরই (আঃ) তো সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল এবং সাথে সাথে এ সুসংবাদও দেয়া হয়েছিল যে, তাঁর ঔরসে হযরত ইয়াকুব (আঃ) জন্মগ্রহণ করবেন।
ফেরেশতাদের এই শুভ সংবাদ শুনে নারীদের সাধারণ অভ্যাস অনুযায়ী হযরত সারা’ (রঃ) বিস্ময় প্রকাশ করেন। তাঁর বিস্ময়ের কারণ ছিল এই যে, তাঁরা স্বামী-স্ত্রী উভয়েই তো বার্ধক্যে উপনীত হয়েছেন। সুতরাং সেই বয়সে সন্তান লাভ কিরূপে সম্ভব? এটা বড়ই বিস্ময়কর ব্যাপারই বটে। এ দেখে ফেরেশতাগণ বললেনঃ “আল্লাহ তাআ’লার কাজে বিস্মিত হওয়ার কি আছে? আল্লাহ তাআ’লা আপনাদেরকে এই বয়সেই সন্তান দান করবেন। যদিও আজ পর্যন্ত আপনার কোন সন্তান হয় নাই এবং আপনার স্বামী বুড়ো হয়ে গেছেন, তথাপি জেনে রাখুন যে, আল্লাহর ক্ষমতার কোন শেষ নেই। তিনি যা চান তা-ই হয়ে থাকে। হে নবী পরিবারের লোক! আপনাদের উপর আল্লাহ তাআ’লার রহমত ও বরকত রয়েছে। সুতরাং আপনাদের জন্যে এটা শোভনীয় নয় যে, তাঁর কাজে বিস্ময় প্রকাশ করবেন। তিনি হচ্ছেন প্রশংসার যোগ্য ও মহা মহিমান্বিত।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।