সূরা ইউনুস (আয়াত: 9)
হরকত ছাড়া:
إن الذين آمنوا وعملوا الصالحات يهديهم ربهم بإيمانهم تجري من تحتهم الأنهار في جنات النعيم ﴿٩﴾
হরকত সহ:
اِنَّ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ یَهْدِیْهِمْ رَبُّهُمْ بِاِیْمَانِهِمْ ۚ تَجْرِیْ مِنْ تَحْتِهِمُ الْاَنْهٰرُ فِیْ جَنّٰتِ النَّعِیْمِ ﴿۹﴾
উচ্চারণ: ইন্নাল্লাযীনা আ-মানূওয়া ‘আমিলুসসা-লিহা-তি ইয়াহদীহিম রাব্বুহুম বিঈমা-নিহিম তাজরী মিন তাহতিহিমুল আনহা-রু ফী জান্না-তিন না‘ঈম।
আল বায়ান: নিশ্চয় যারা ঈমান আনে এবং নেক আমল করে, তাদের রব ঈমানের কারণে তাদেরকে পথ দেখাবেন, আরামদায়ক জান্নাতসমূহে যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৯. নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তাদের রব তাদের ঈমান আনার কারণে তাদেরকে পথ নির্দেশ করবেন(১); নিয়ামতে ভরপুর জান্নাতে তাদের পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত হবে।(২)
তাইসীরুল ক্বুরআন: যারা ঈমান আনে আর সৎ ‘আমাল করে, তাদের প্রতিপালক তাদের ঈমানের বদৌলতে তাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করবেন। নি‘মাতরাজি দ্বারা পরিপূর্ণ জান্নাতে, তাদের পাদদেশে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হবে।
আহসানুল বায়ান: (৯) নিশ্চয়ই যারা বিশ্বাস করেছে এবং ভাল কাজ করেছে, তাদের প্রতিপালক তাদের বিশ্বাসের কারণে তাদেরকে পথ প্রদর্শন করবেন,[1] শান্তির উদ্যানসমূহে তাদের (বাসস্থানের) তলদেশ দিয়ে নদীমালা প্রবাহিত থাকবে।
মুজিবুর রহমান: নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে এবং ভাল কাজ করেছে, তাদের রাব্ব তাদেরকে লক্ষ্য স্থলে (জান্নাতে) পৌঁছে দিবেন তাদের ঈমানের কারণে, শান্তির উদ্যানসমূহে, তাদের (বাসস্থানের) তলদেশ দিয়ে নহরসমূহ বইতে থাকবে।
ফযলুর রহমান: (পক্ষান্তরে) যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে তাদের বিশ্বাসের কারণেই তাদের প্রভু তাদেরকে (সঠিক) পথের সন্ধান দেবেন এবং সুখের জান্নাতে তাদের নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত হবে।
মুহিউদ্দিন খান: অবশ্য যেসব লোক ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদেরকে হেদায়েত দান করবেন তাদের পালনকর্তা, তাদের ঈমানের মাধ্যমে। এমন সুসময় কানন-কুঞ্জের প্রতি যার তলদেশে প্রবাহিত হয় প্রস্রবণসমূহ।
জহুরুল হক: নিঃসন্দেহ যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, তাদের প্রভু তাদের পথ দেখিয়ে নেবেন তাদের বিশ্বাসের দ্বারা, -- তাদের নিচে দিয়ে বয়ে চলবে ঝরনারাজি আনন্দময় বাগানে।
Sahih International: Indeed, those who have believed and done righteous deeds - their Lord will guide them because of their faith. Beneath them rivers will flow in the Gardens of Pleasure
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৯. নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তাদের রব তাদের ঈমান আনার কারণে তাদেরকে পথ নির্দেশ করবেন(১); নিয়ামতে ভরপুর জান্নাতে তাদের পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত হবে।(২)
তাফসীর:
(১) আয়াতে (بِإِيمَانِهِمْ) শব্দের সাথে যে ب হরফটি ব্যবহৃত হয়েছে, তার দুটি অর্থ হতে পারে- (এক) কারণে। তখন আয়াতের অর্থ হবে- যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, তাদেরকে তাদের প্রভু ঈমানের কারণে মহাপুরষ্কারের ব্যবস্থা করবেন। তিনি তাদেরকে হিদায়াত দিবেন। তিনি তাদেরকে তাদের জন্য যা উপকারী তা শিক্ষা দিবেন। হিদায়াতের কারণে তারা ভালো আমল করার তৌফিক লাভ করবেন, তারা আল্লাহর আয়াত ও নিদর্শনসমূহে দৃষ্টি দিতে পারবেন। এ দুনিয়াতে সৎপথে পরিচালিত করবেন। হিদায়াতুল মুস্তাকীম নসীব করবেন আর আখেরাতে পুল-সিরাতের পথে তাদের পরিচালিত করবেন যাতে তারা জান্নাতে পৌছতে পারে। [সা’দী] (দুই) সাহায্যে বা দ্বারা। [কাশশাফ; ইবন কাসীর] মুজাহিদ রাহেমাহুল্লাহ বলেনঃ তাদের জন্য আলোর ব্যবস্থা করবেন ফলে তারা সে আলোকে আলোকিত হয়ে পথ চলতে পারবে। [তাবারী] অর্থাৎ দুনিয়ার জীবনও তাদের আলোকিত হবে। তারা তাদের জীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে জানা থাকার কারণে অন্ধকারে হাতিয়ে বেড়াবে না। তাদের জীবন হবে আলোকিত জীবন। [দেখুনঃ সূরা আল-আনআমঃ ১২২, সূরা আশ-শুরাঃ ৫২, সূরা আল হাদীদঃ ২৮]
আর আখেরাতের জীবনেও তারা তাদের প্রভুর যাবতীয় কল্যাণ লাভে সামর্থ হবেন। পুলসিরাতেও তাদের আলোর ব্যবস্থা থাকবে। যাবতীয় সংকটময় মুহুর্তে তাদের প্রভু তাদের পথ দেখানোর ব্যবস্থা করবেন। [দেখুনঃ সূরা আল-হাদীদঃ ১৩] কাতাদা ও ইবন জুরাইজ বলেন, তার আমল তার জন্য সুন্দর সূরত ও সুগন্ধিযুক্ত বাতাসের রূপ ধারণ করে যখন সে কবর থেকে উঠবে তখন তার সম্মুখীন হয়ে তাকে যাবতীয় কল্যাণের সুসংবাদ জানাবে। সে তখন তাকে বলবে, তুমি কে? সে বলবে, আমি তোমার আমল। তখন তার সামনে আলোর ব্যবস্থা করবে যতক্ষণ না সে জান্নাতে প্রবেশ করায়। আর এটাই এ আয়াতের অর্থ। পক্ষান্তরে কাফেরের জন্য তার আমল কুৎসিত সূরত ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে আসবে এবং তার সার্বক্ষণিক সাথী হবে যতক্ষণ না সে তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাচ্ছে। [তাবারী; ইবন কাসীর]
(২) যদি কেউ প্রশ্ন করে, কিভাবে বলা হল যে, তাদের নিচ দিয়ে নালাসমূহ প্রবাহিত হবে, আর আল্লাহ্ তা'আলা কুরআনের সবখানেই জান্নাতের এ নালাসমূহকে বাগানের নিচ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার কথা জানিয়েছে, এটা তো সম্ভব শুধু এক অবস্থায়, সেটা হচ্ছে, তারা যমীনের উপরে থাকবে, আর নালাসমূহ থাকবে যমীনের নীচ দিয়ে? এটা তো জান্নাতের নালাসমূহের বৈশিষ্ট্য নয়। কারণ, সেগুলো প্রবাহিত হবে যমীনের মধ্যে কোন প্রকার গর্ত না করে? উত্তর হচ্ছে, এ অর্থ নেয়াটা শুদ্ধ নয়। বরং নিচে দিয়ে নালা প্রবাহিত হওয়ার অর্থ তাদের নিকট দিয়ে প্রবাহিত হওয়া। তাদের সামনে দিয়ে নে'আমতপূর্ণ বাগানসমূহে।
এর অনুরূপ কথা আল্লাহ্ তা'আলা মারইয়ামকে সম্বোধন করে বলেছিলেন, “অবশ্যই তোমার রব তোমার নিচ দিয়ে প্রস্রবণ প্রবাহিত করেছেন।” [সূরা মারইয়াম: ২৪] আর এটা জানা কথা যে, সে প্রস্রবণটি মারইয়ামের বসার নিচে ছিল না। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে যে, তার নিকটে। তার সামনে। অনুরূপভাবে আল্লাহ্ তা'আলা ফিরআউনের ভাষণ সম্পর্কে বলেছেন, সে বলেছিল: “মিসরের রাজত্ব কি আমার নয়? আর এ নালাসমূহ কি আমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত নয়?” [সূরা আয-যুখরুফ ৫১] এখানে নিচ দিয়ে অর্থ, কাছে বা সামনে। [তাবারী]
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৯) নিশ্চয়ই যারা বিশ্বাস করেছে এবং ভাল কাজ করেছে, তাদের প্রতিপালক তাদের বিশ্বাসের কারণে তাদেরকে পথ প্রদর্শন করবেন,[1] শান্তির উদ্যানসমূহে তাদের (বাসস্থানের) তলদেশ দিয়ে নদীমালা প্রবাহিত থাকবে।
তাফসীর:
[1] এর দ্বিতীয় অর্থ এই করা হয়েছে যে, পৃথিবীতে ঈমান আনার কারণে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা মু’মিনদের জন্য পুলস্বিরাত পার হওয়া সহজ করে দেবেন। এই অর্থে بإيمانهم এ بـ (সাবাবিয়্যাহ) কারণ বর্ণনার জন্য ব্যবহার হয়েছে। কোন কোন তফসীরবিদের মতে তা ‘ইস্তিআনাহ’ (সাহায্যের) অর্থে ব্যবহার হয়েছে। আর তার অর্থ হবে যে, তাদের প্রতিপালক তাদের বিশ্বাস ও ঈমানের সাহায্যে তাদেরকে পথ প্রদর্শন করবেন। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তাদের জন্য এমন আলোর ব্যবস্থা করবেন, যার সাহায্যে তারা চলাফেরা করবে; যেমন সূরা হাদীদে (১২নং আয়াতে) এর বর্ণনা এসেছে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৭-১০ নং আয়াতের তাফসীর:
পূর্বের আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ ও রুবুবিয়্যাহর বর্ণনা করার পর এই আয়াতগুলোতে তাদের প্রতিদান সম্পর্কে বর্ণনা করছেন যারা আল্লাহ তা‘আলার সাক্ষাতকে অস্বীকার করে, যারা সওয়াবের আশা করে না, শাস্তির ভয় করে না, সর্বোপরি ঈমান ও ইসলামকে পরওয়া না করে পার্থিব জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট। اٰيٰتِنَا অর্থাৎ কুরআনের নিদর্শন ও পার্থিব নিদর্শন থেকে কোন শিক্ষা নেয় না। এদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন তারা সেখানে শাস্তি ভোগ করবে।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(مَنْ كَانَ يُرِيْدُ الْحَيٰوةَ الدُّنْيَا وَزِيْنَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيْهَا وَهُمْ فِيْهَا لَا يُبْخَسُوْنَ)
“যে ব্যক্তি পার্থিব জীবন ও তার সৌন্দর্য কামনা করে, দুনিয়াতে আমি তাদের কর্মের পূর্ণ ফল দান করি এবং সেথায় তাদেরকে কম দেয়া হবে না।” (সূরা হূদ ১১:১৫)
সুতরাং আখিরাতকে বাদ দিয়ে কেবল দুনিয়ার জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলে হবে না, যারা আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি কামনা করার জন্য কাজ করবে না এবং আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস করে দুনিয়ার ওপর তা প্রাধান্য দেবে না তাদের জন্যই জাহান্নাম।
পক্ষান্তরে যারা ঈমান ও সৎআমল করে আল্লাহ তা‘আলা তাদের ঈমান ও সৎআমলের বদৌলতে কিয়ামতের দিন জান্নাতে যাওয়ার পথ সহজ করে দেবেন। দুনিয়াতেও তারা সঠিক পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। মুজাহিদ (রহঃ) বলেন: তাদের সাথে একটা নূর (আলো) থাকবে যার মাধ্যমে তারা পথ চলতে থাকবে। ইবনু জারীর বলেন: তাদের আমলগুলো একটি সুন্দর প্রতিকৃতি ও সুগন্ধময় হাওয়ার আকার বিশিষ্ট হবে এবং তারা যখন কবর থেকে উঠবে এ সুন্দর প্রতিকৃতিগুলো তাদের সামনে সামনে চলতে থাকবে এবং তাদেরকে সর্বপ্রকারের সুসংবাদ দিতে থাকবে। যখনই যে নেককার লোক তাকে জিজ্ঞাসা করবে তুমি কে? সে উত্তরে বলবে, আমি তোমার নেক আমল। এভাবে তাকে জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছে দেবে।
(دَعْوٰهُمْ فِيْهَا) অর্থাৎ জান্নাতে তাদের প্রথম ইবাদত বা দু’আ হবে আল্লাহ তা‘আলার তাসবীহ, আল্লাহ তা‘আলাকে সকল অপরিপূর্ণ দোষ থেকে মুক্ত ঘোষণা করা। আর সর্বশেষ ইবাদতস্বরূপ তাদের মুখ থেকে বের হবে আল হামদুলিল্লাহ। সেখানে তাদেরকে কোন ইবাদত করতে বাধ্য করা হবে না কিন্তু অন্তরের প্রশান্তি ও মনের ভেতর থেকে এমনিতে এসব বাক্য বের হয়ে আসবে। হাদীসে এসেছে: জান্নাতীগণের মুখে এমনভাবে তাসবীহ ও তাহমীদ স্বয়ংক্রিয় করা হবে, যেমন শ্বাস-প্রশ্বাস স্বয়ংক্রিয় (সহীহ মুসলিম হা: ২৮৩৫)। অর্থাৎ নিজের কোন ইচ্ছা ব্যতিরেকে যেরূপ শ্বাস-প্রশ্বাস চলতে থাকে, অনুরূপ জান্নাতীদের মুখে কোন ইচ্ছা ছাড়াই আল্লাহ তা‘আলার হামদ ও তাসবীহর শব্দ আসতে থাকবে।
জান্নাতীরা তথায় শুধু শান্তিপূর্ণ বাণীই শুনবে অন্য কোন বেহুদা কথা-বার্তা তারা শুনতে পাবে না। ফেরেশতাদেতর পক্ষ থেকে নিজেদের মাঝে অভিবাদন হবে সালাম। ফেরেশতারা জান্নাতে প্রবেশকালে জান্নাতীদেরকে সালাম দিয়ে অভিভাদন জানাবে। যেমন
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(تَحِيَّتُهُمْ يَوْمَ يَلْقَوْنَه۫ سَلَامٌ)
“যেদিন তারা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে, সেদিন তাদের অভিবাদন হবে ‘সালাম’।” (সূরা আহযাব ৩৩:৪৪)
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(وَالْمَلٰ۬ئِكَةُ يَدْخُلُوْنَ عَلَيْهِمْ مِّنْ كُلِّ بَابٍ - سَلٰمٌ عَلَيْكُمْ بِمَا صَبَرْتُمْ فَنِعْمَ عُقْبَي الدَّارِ)
“ফেরেশ্তাগণ তাদের নিকট উপস্থিত হবে প্রত্যেক দ্বার দিয়ে, (এবং বলবে:) তোমাদের প্রতি (সালাম) শান্তি; কত ভাল এ পরিণাম!’’ (সূরা রা‘দ ১৩:২৩-২৪)
আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
(لَا يَسْمَعُوْنَ فِيْهَا لَغْوًا إِلَّا سَلٰمًا)
“সেথায় তারা ‘শান্তির সম্ভাষণ ব্যতীত’ কোন অসার বাক্য শুনবে না।” (সূরা মারইয়াম ১৯:৬২)
সুতরাং এ নেয়ামত পাবার জন্য প্রত্যেক মু’মিনকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। বেশি বেশি সৎআমল ও আল্লাহ তা‘আলার পথে দান করতে হবে।
ইবনু আব্বাস (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিপদে পড়লে এ দু’আ বলতেন-
لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ العَظِيْمُ الحَلِيْمُ، لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ رَبُّ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ، وَرَبُّ العَرْشِ العَظِيْمِ
আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া সত্য কোন মা‘বূদ নেই, তিনি মহান ও ধৈর্যশীল, আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া সত্য কোন মা‘বূদ নেই। তিনি আকাশ-জমিনের প্রতিপালক ও মহান আরশের অধিপতি। (সহীহ বুখারী হা: ৬৩৪৫, সহীহ মুসলিম হা: ২৭৩০)
ইমাম কুরতুবী (رحمه الله) বলেন: সালাফগণ এ বাক্য দ্বারা দু’আ করতেন এবং একে বিপদাপদের দু’আ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
ইমাম কুরতুবী (رحمه الله) বলেন: সুন্নাত হল প্রথমে আল্লাহ তা‘আলার নাম নিয়ে খাওয়া শুরু করবে, খাওয়া শেষে আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করবে। জান্নাতীরা এ পদ্ধতি অনুসরণ করবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা বান্দার প্রতি খুশী হন যখন বান্দা এক লোকমা খায় আর আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করে, এক বার পান করে আর আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করে। (সহীহ মুসলিম হা: ২৭৩৪)
আয়াত হতে শিক্ষনীয় বিষয়:
১. আখিরাত ভুলে গিয়ে দুনিয়াকে প্রাধান্য দেয়ার ব্যাপারে সতর্কবাণী।
২. কুরআনের আয়াত সম্পর্কে গাফেল হবার ব্যাপারে সতর্কবাণী।
৩. ঈমান ও সৎ আমল জান্নাতে যাওয়ার মাধ্যম।
৪. জান্নাতে জান্নাতীরা সালাম দিয়ে পরস্পরকে অভিবাদন জানাবে।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৯-১০ নং আয়াতের তাফসীর:
এখানে ঐ ভাগ্যবানদের খবর দেয়া হচ্ছে যারা ঈমান এনেছে, নবী রাসূলদের সত্যতা স্বীকার করেছে, আল্লাহ ও তার রাসূল (সঃ)-এর অনুগত হয়েছে এবং ভাল কাজ করেছে, তাদের ব্যাপারে এই ওয়াদা করা হয়েছে যে, তাদের নেক আমলের বিনিময়ে তাদেরকে হিদায়াত দান করা হবে। এখানে :এর । অক্ষরটি (কারণবোধক) হতে পারে। অর্থাৎ দুনিয়ায় তাদের ঈমান আনয়নের কারণে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে সরল সঠিক পথের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখবেন। শেষ পর্যন্ত তারা সেই পথ অতিক্রম করে নেবে এবং জান্নাত পর্যন্ত পৌছে যাবে। আবার এই অক্ষরটি (সাহায্যবোধক) হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন মুজাহিদ (রঃ) বলেছেন যে, তাদের সাথে একটা নূর (আলো) থাকবে যার সাহায্যে তারা পথ চলতে থাকবে। ইবনে জারীর (রঃ)-এর উক্তি এই যে, তাদের আমলগুলো একটি সুন্দর প্রতিকৃতি ও সুগন্ধময় হাওয়ার আকার বিশিষ্ট হবে এবং তারা যখন কবর হতে উঠবে তখন এই সুন্দর প্রতিকৃতি তাদের আগে আগে চলবে এবং তাদেরকে সর্বপ্রকারের সুসংবাদ দিতে থাকবে । যখন সেই নেককার ব্যক্তি ঐ প্রতিকৃতিকে জিজ্ঞেস করবেঃ “তুমি কে?` সে উত্তরে বলবেঃ “আমি তোমার নেক আমল।” সে আলোকবর্তিকারূপে তার আগে আগে চলবে, এবং তাকে জান্নাত পর্যন্ত পৌছিয়ে দেবে। এজন্যেই আল্লাহ পাক (আরবী)-এ কথা বলেছেন। পক্ষান্তরে কাফিরের আমলগুলো অত্যন্ত কুৎসিত প্রতিকৃতির আকারে হবে এবং দুর্গন্ধময় হাওয়ার দেহ ধারণ করবে। সে তার সঙ্গীকে আঁকড়ে ধরে থাকবে এবং জাহান্নামে নিয়ে গিয়ে ফেলে দেবে। কাতাদা (রঃ)-এরও উক্তি এটাই। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী।
জান্নাতবাসীদের অবস্থা এই হবে যে, (আরবী) হবে তাদের সম্বোধন। ইবনে জুরাইজ (রঃ) বলেন যে, যখন তাদের পার্শ্ব দিয়ে এমন পাখী উড়ে যাবে যার চাহিদা তাদের মনে জেগে উঠবে তখন উল্লিখিত কালেমা তাদের মুখে উচ্চারিত হবে। তথায় এটাই হবে তাদের উক্তি। তখন একজন ফিরিশতা তাদের আকাঙ্ক্ষিত বস্তু নিয়ে হাযির হয়ে তাদেরকে সালাম করবেন। তারা সালামের জবাব দেবে। তাই আল্লাহ তাআলা (আরবী) -এ কথা বলেছেন। তারা ঐ খাদ্য খাওয়ার পর আল্লাহর শাকর ও প্রশংসা করবেন। এ জন্যেই মহান আল্লাহ (আরবী)-এই উক্তি করেছেন।
মুকাতিল ইবনে হাইয়ান (রঃ) বলেন যে, জান্নাতবাসী যখন কোন খাবার চেয়ে নেয়ার ইচ্ছে করবে তখন (আরবী) বলবে। তখন তার কাছে দশ হাজার খাদেম একটি সোনার খাঞ্জা নিয়ে হাযির হয়ে যাবে। প্রত্যেক খাঞ্জায় এমন নতুন খাদ্য থাকবে যা অন্য খাঞ্জায় থাকবে না। জান্নাতবাসী তখন প্রত্যেক খাঞ্জা হতেই কিছু না কিছু খাবে।
সুফইয়ান সাওরী (রঃ) বলেন যে, যখন কোন লোক কোন জিনিস চাইবে তখন (আরবী) বলবে। এই আয়াতটি (আরবী) (৩৩:৪৪) এবং (আরবী) (৫৬:২৫-২৬) ইত্যাদি আয়াতগুলোর সহিত সাদৃশ্যযুক্ত। এগুলো একথাই প্রমাণ করে যে, আল্লাহ পাক সদা সর্বদাই প্রশংসিত এবং সর্বদাই পূজনীয়। এজন্যেই সৃষ্টির শুরুতেও তিনি স্বীয় সত্তার প্রশংসা করেছেন এবং অবতারণের শুরুতেও। যেমন তিনি বলেছেনঃ (আরবী) (১৮:১) আর এক জায়গায় বলেছেনঃ (আরবী) ইত্যাদি। (৬:১)
তিনি প্রথমেও প্রশংসিত এবং শেষেও প্রশংসিত, হয় দুনিয়াই হাক বা দ্বীনই হাক। এজন্যেই হাদীসে এসেছে যে, জান্নাতবাসীকে তাসবীহ ও তাহমীদ শেখানো হয়েছে, যেমন নফসের কামনা ও বাসনাও তাদেরকে দেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহর নিয়ামতরাজী তাদের উপর বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়, তেমন তার তাহমীদ ও তাবীও বর্ধিত হতে থাকে। তা কখনও শেষ হবার নয়। আল্লাহ ছাড়া কোন মা’রূদ ও প্রতিপালক নেই।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।