সূরা ইউনুস (আয়াত: 76)
হরকত ছাড়া:
فلما جاءهم الحق من عندنا قالوا إن هذا لسحر مبين ﴿٧٦﴾
হরকত সহ:
فَلَمَّا جَآءَهُمُ الْحَقُّ مِنْ عِنْدِنَا قَالُوْۤا اِنَّ هٰذَا لَسِحْرٌ مُّبِیْنٌ ﴿۷۶﴾
উচ্চারণ: ফালাম্মা-জাআহুমুল হাক্কুমিন ‘ইনদিনা-কা-লূইন্না হা-যা-লাছিহরুম মুবীন।
আল বায়ান: অতঃপর যখন তাদের কাছে আমার পক্ষ থেকে সত্য এল, তারা বলল, ‘নিশ্চয় এটি সুস্পষ্ট যাদু’।
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৭৬. অতঃপর যখন তাদের কাছে আমাদের নিকট থেকে সত্য আসল তখন তারা বলল, এটা তো নিশ্চয়ই স্পষ্ট জাদু।(১)
তাইসীরুল ক্বুরআন: অতঃপর আমার নিকট থেকে যখন তাদের কাছে প্রকৃত সত্য এসে পড়ল, তখন তারা বলল, ‘‘এটা তো অবশ্যই সুস্পষ্ট যাদু’’।
আহসানুল বায়ান: (৭৬) অতঃপর যখন তাদের প্রতি আমার নিকট হতে সত্য পৌঁছল, তখন তারা বলতে লাগল, ‘নিশ্চয়ই এটা সুস্পষ্ট যাদু।’[1]
মুজিবুর রহমান: অতঃপর যখন তাদের প্রতি আমার সন্নিধান হতে প্রমাণ পৌঁছল তখন তারা বলতে লাগল, নিশ্চয়ই এটা সুস্পষ্ট যাদু।
ফযলুর রহমান: যখন তাদের কাছে আমার পক্ষ থেকে সত্য এল তখন তারা বলল, “এটা তো পরিষ্কার যাদু।”
মুহিউদ্দিন খান: বস্তুতঃ তারা ছিল গোনাহগার। তারপর আমার পক্ষ থেকে যখন তাদের কাছে সত্য বিষয় উপস্থিত হল, তখন বলতে লাগলো, এগুলো তো প্রকাশ্য যাদু।
জহুরুল হক: তারপর তাদের কাছে যখন আমাদের তরফ থেকে সত্য এল তারা তখন বললে -- "এ তো নিশ্চয়ই পরিস্কার জাদু।"
Sahih International: So when there came to them the truth from Us, they said, "Indeed, this is obvious magic."
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৭৬. অতঃপর যখন তাদের কাছে আমাদের নিকট থেকে সত্য আসল তখন তারা বলল, এটা তো নিশ্চয়ই স্পষ্ট জাদু।(১)
তাফসীর:
(১) অর্থাৎ মূসার বাণী শুনে তারা সেই একই কথা বলেছিল যা মক্কার ফাফেররা বলেছিল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা শুনে। কাফেররা বলেছিল, “এ ব্যক্তি তো পাক্কা জাদুকর” [সূরা ইউনুস: ২, অনুরূপ দেখুন, সূরা ছোয়াদঃ ৪] মূসা ও হারূন আলাইহিমাস সালামের দায়িত্ব তা-ই ছিল যা কুরআনের দৃষ্টিতে সকল নবীর নবুওয়াতের উদ্দেশ্য ছিল এবং সূরা নাযিআতে যে সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করে বলে দেয়া হয়েছেঃ “ফিরআউনের কাছে যান, কারণ সে সীমা অতিক্রম করে গেছে এবং তাকে বলেন, তুমি কি নিজেকে শুধরে নেবার জন্য তৈরী আছো? আমি তোমাকে তোমার রবের দিকে পথ দেখাবো তুমি কি তাঁকে ভয় করবে? [১৭–১৯] কিন্তু ফিরআউন ও তার রাজ্যের প্রধানগণ এ দাওয়াত গ্রহণ করেনি।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৭৬) অতঃপর যখন তাদের প্রতি আমার নিকট হতে সত্য পৌঁছল, তখন তারা বলতে লাগল, ‘নিশ্চয়ই এটা সুস্পষ্ট যাদু।’[1]
তাফসীর:
[1] যখন অস্বীকার করার কোন বিবেকগ্রাহ্য প্রমাণ না থাকে, তখন তা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য বলে দেয় যে, এটা তো যাদু!
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৭৪-৮১ নং আয়াতের তাফসীর:
(ثُمَّ بَعَثْنَا مِنْۭ بَعْدِھ۪......)
আল্লাহ তা‘আলা নূহ (عليه السلام)-এর পরেও প্রমাণ-পঞ্জিসহ অসংখ্য নাবী-রাসূলদেরকে পাঠিয়েছিলেন, যা প্রমাণ করত যে, এরা আসলেই আল্লাহ তা‘আলার নাবী। কিন্তু তারা তা বুঝার পরেও তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেনি। কারণ তারা পূর্বেই যেহেতু রাসূলদেরকে কোন রকম চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই অস্বীকার করেছিল তাই তারা ভাবল যে, আমরা যেহেতু পূর্বেই অস্বীকার করেছি সেহেতু এখন আর ঈমান এনে লাভ হবে না। যার ফলে তারা ঈমান আনেনি। যেভাবে কুফরী ও মিথ্যাজ্ঞান করার কারণে পূর্ববর্তী জাতিসমূহের হৃদয় মোহরাংকিত হয়েছিল, ঐভাবেই ভবিষ্যতেও যে জাতি রাসূলগণকে মিথ্যাজ্ঞান করবে এবং আল্লাহ তা‘আলার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করবে, তাদের অন্তরও মোহরাংকিত হবে এবং পূর্ব জাতিসমূহের ন্যায় তারাও হিদায়াত থেকে বঞ্চিত হবে ।
(ثُمَّ بَعَثْنَا مِنْۭ بَعْدِھِمْ مُّوْسٰی وَھٰرُوْنَ...... ِنَّ اللہَ لَا یُصْلِحُ عَمَلَ الْمُفْسِدِیْنَ)
পূর্বে নূহ (عليه السلام)-এর কথা ও অন্যান্য অনেক রাসূল প্রেরণ করার কথা বর্ণনা করার পর আল্লাহ তা‘আলা উক্ত আয়াতগুলোতে মূসা (عليه السلام) ও হারূন (عليه السلام) সম্পর্কে বর্ণনা দিচ্ছেন। আর রাসূলদের কথা বলার পর বিশেষভাবে তাদের দু‘জনের কথা উল্লেখ করার কারণ হল যে, তারা উভয়েই বিশিষ্ট রাসূলগণের অন্তর্ভুক্ত এবং তাদের মাঝে ও তাদের শত্র“র মাঝে অনেক শিক্ষা রয়েছে।
আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে স্পষ্ট নিদর্শন দিয়ে প্রেরণ করেছেন ফির‘আউন ও তার পরিষদবর্গের নিকট, কিন্তু তারা তাদের নিদর্শনকে মেনে নেয়নি। এ নিদর্শন সম্পর্কে সূরা ইসরার ১০১ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে। যেহেতু তারা বড় বড় অপরাধমূলক কাজে অভ্যাসী ছিল, যার কারণে আল্লাহ তা‘আলার প্রেরিত রাসূলকেও অহঙ্কার প্রদর্শন করল। কারণ এক পাপ কাজ অন্য পাপকে আকর্ষণ করে এবং পাপের ওপর অটল থাকলে বড় বড় পাপকর্ম সাধনে সাহস যোগায়। সুতরাং যখন সত্য তাদের কাছে আগমন করল তখন তা অস্বীকার করার কোন বিবেকগ্রাহ্য প্রমাণ না থাকায় অব্যাহতি পাওয়ার জন্য বলে দেয় এটা জাদু। তাছাড়া মূসা (عليه السلام)-এর যুগে জাদুর প্রভাব বেশি ছিল, যেমন আমাদের রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগের সাহিত্য চর্চার প্রভাব বেশি ছিল। মূসা (عليه السلام) বললেন: তোমরা একটু চিন্তা করে দেখ, সত্যের দাওয়াত ও সঠিক কথাকে তোমরা জাদু বলছ! এটা কি জাদু হতে পারে? জাদুকর তো কখনো কৃতকার্যই হতে পারে না। অর্থাৎ ইচ্ছা অনুযায়ী চাহিদা পূরণ করতে এবং অনাকাক্সিক্ষত পরিণতি থেকে বাঁচতে পারে না। আমি তো আল্লাহ তা‘আলার রাসূল, আমি আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য পাই এবং আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে আমাকে মু’জিযাহ দেয়া হয়েছে। জাদু ও জাদুবিদ্যার আমার প্রয়োজনই বা কি আছে? তাছাড়া আল্লাহ তা‘আলার প্রদর্শিত মু’জিযার তুলনায় তার মূল্যই বা কতটুকু।
তারা মূসা (عليه السلام)-এর সমস্ত মু‘জিযা দেখার পর বলল যে, আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে যে দীনের ওপর পেয়েছি তা থেকে অন্য দীনের ওপর সরে যাব না এবং এই জমিনে তোমাদের রাজত্ব কায়েম করতে দেব না। ফলে তাদের বাপ-দাদার মতবাদে অটল বিশ্বাস ও ধন-সম্পদের লোভ তাদেরকে ঈমান আনা থেকে বিরত রেখেছে। পরবর্তীতে ফির‘আউনের জাদুকরদের ডাকা এবং মূসার জাদুকরদের মোকাবেলা করার কাহিনী সূরা আ‘রাফে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. প্রত্যেক রাসূলই দুনিয়াতে প্রমাণ নিয়ে এসেছেন।
২. যুগে যুগে যারা ঈমান আনেনি তাদের সকলের পরিণতি একই রকম হবে।
৩. মূসা ও হারূন (عليه السلام) হলেন বিশিষ্ট নাবীদের অন্তর্ভুক্ত।
৪. নাবীদের মু‘জিযা কোন জাদু নয়।
৫. বাপ-দাদার দোহাই দিয়ে সঠিক বিষয়ে আমল করা থেকে বিরত থাকা ঠিক নয়।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৭৫-৭৮ নং আয়াতের তাফসীর:
আল্লাহ তা'আলা বলেন, এই রাসূলদের পরে আমি ফিরআউন ও তার দলবলের কাছে মূসা (আঃ) ও হারূন (আঃ)-কে পাঠালাম এবং তাদের সাথে আমার নিদর্শনাবলী, দলীল প্রমাণাদি ও মুজিযাসমূহও ছিল। কিন্তু ঐ পাপিষ্ঠ কওম সত্যের অনুসরণ ও আনুগত্য অস্বীকার করে বসে। যখন তাদের কাছে আমার পক্ষ থেকে সত্য বিষয়গুলো পৌঁছে গেল, তখন তারা কোন চিন্তা না করেই বলতে লাগলো- এটা তো সুস্পষ্ট যাদু। তারা যেন নিজেদের অবাধ্যতার উপর শপথই করে বসেছিল। অথচ তাদের নিজেদেরই বিশ্বাস ছিল যে, তারা যা কিছু বলছে প্রকৃতপক্ষে তা মিথ্যা ও অপবাদ ছাড়া কিছুই নয়। যেমন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বলেন, তারা অস্বীকার তো করছে বটে, কিন্তু তাদের অন্তর স্বয়ং বিশ্বাস রাখছে যে, ওটা তাদের যুলুম ও অবাধ্যাচরণ। মোটকথা, মূসা (আঃ) তাদের দাবী খণ্ডন করতে গিয়ে বলেন- সত্য যখন তোমাদের কাছে এসে যাচ্ছে, তখন তোমরা বলছো যে, এটা যাদু ছাড়া কিছুই নয়। অথচ যাদুকররা তো কখনো কল্যাণ ও মুক্তির মুখ দেখতে পারে না।
ঐ অবাধ্যরা মূসা (আঃ)-কে বললো- হে মূসা (আঃ)! আপনি তো আমাদের কাছে এজন্যেই এসেছেন যে, আমাদেরকে আমাদের পূর্বপুরুষদের ধর্ম থেকে ফিরিয়ে দিবেন, অতঃপর শ্রেষ্ঠত্ব, রাজত্ব এবং বিজয় গৌরব সবই হয়ে যাবে আপনার ও আপনার ভাই হারূন (আঃ)-এর জন্যে।
আল্লাহ পাক মূসা (আঃ) ও ফিরআউনের কাহিনী কয়েক জায়গায় বর্ণনা করেছেন। কেননা, এটা হচ্ছে বিস্ময়কর কাহিনী। ফিরআউন পূর্ব হতেই মূসা (আঃ) থেকে আতংকিত ছিল। কিন্তু কি আশ্চার্যজনক ব্যাপার যে, যে ফিরআউন মূসা (আঃ)-কে এতো ভয় করতো, আল্লাহ্ তা'আলা তার কাছেই তাঁকে লালিত পালিত করলেন। রাজকুমাররূপে মূসা (আঃ) ফিরআউনের কাছে লালিত পালিত হতে থাকলেন। অতঃপর একটা বিপ্লব ঘটে গেল এবং এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো যে, তিনি ফিরআউনের কাছে আর টিকতে পারলেন না। তাকে তার নিকট থেকে পালিয়ে যেতে হলো। আল্লাহ পাক তাকে নবুওয়াত ও রিসালাত দান করে গৌরবান্বিত করলেন এবং তাকে এতো বড় সম্মান দিলেন যে, স্বয়ং তিনি তাঁর সাথে কথা বললেন। এরপর তিনি তাঁকে ঐ ফিরআউনের কাছেই নবীরূপে প্রেরণ করলেন এবং বলে দিলেন। তাকে গিয়ে বল যে, সে যেন আমার দিকে প্রত্যাবর্তন করে এবং বে-দ্বীনীর পরিবর্তে দ্বীনের উপর চলে । অথচ ফিরআউন সেই সময় বিপুল ধন-সম্পদ ও ক্ষমতার অধিকারী ছিল। যা হাক, আল্লাহ তাআলার নির্দেশক্রমে মূসা (আঃ) ফিরআউনের কাছে পয়গাম নিয়ে। আসলেন। ঐ সময় তার ভাই হারূন (আঃ) ছাড়া তার আর কোন সাহায্যকারী ছিল না। ফিরআউন কিন্তু ক্ষমতার গর্বে গর্বিত হয়ে উঠলো এবং তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করলো। সে এমন এক দাবী করে বসলো, যার সে মোটেই হকদার ছিল না। বানী ইসরাঈলের মুমিনদেরকে সে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করলো। এরূপ সংকীর্ণ পরিস্থিতিতেও মূসা (আঃ) ও হারূন (আঃ) ফিরআউনের অন্যায়ের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে গেলেন। আল্লাহ পাক তাদেরকে স্বীয় তত্ত্বাবধানে নিয়ে নিলেন। একের পর এক মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে ফিরআউনের বিবাদ ও তর্ক বিতর্ক হতে থাকলো। মূসা (আঃ) এমন এমন নিদর্শন ও মু'জিযা পেশ করতে লাগলেন যে, যা দেখে হতবাক হতে হয় এবং স্বীকার করতে হয় যে, আল্লাহর পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কেউই এরূপ দলীল কখনো পেশ করতে পারে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও ফিরআউন ও তার দলবল এই শপথ করে বসলো যে, তারা কখনো মূসা (আঃ)-কে মানবে না। অবশেষে এমন শাস্তি নেমে আসলো যে, তা রদ করার ক্ষমতা কারো থাকলো না। একদিন ফিরআউন ও তার দলবলকে নদীতে ডুবিয়ে দেয়া হলো এবং এইভাবে ঐ অত্যাচারী কওমের মূলোচ্ছেদ হয়ে গেল।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।