সূরা ইউনুস (আয়াত: 59)
হরকত ছাড়া:
قل أرأيتم ما أنزل الله لكم من رزق فجعلتم منه حراما وحلالا قل آلله أذن لكم أم على الله تفترون ﴿٥٩﴾
হরকত সহ:
قُلْ اَرَءَیْتُمْ مَّاۤ اَنْزَلَ اللّٰهُ لَکُمْ مِّنْ رِّزْقٍ فَجَعَلْتُمْ مِّنْهُ حَرَامًا وَّ حَلٰلًا ؕ قُلْ آٰللّٰهُ اَذِنَ لَکُمْ اَمْ عَلَی اللّٰهِ تَفْتَرُوْنَ ﴿۵۹﴾
উচ্চারণ: কুল আরাআইতুম মাআনযালাল্লা-হু লাকুম মির রিযকিন ফাজা‘আলতুম মিনহু হারা-মাওঁ ওয়া হালা-লান কুল আল্লা-হু আযিনা লাকুম আম ‘আলাল্লা-হি তাফতারূন।
আল বায়ান: বল, ‘তোমরা কি ভেবে দেখেছ, আল্লাহ তোমাদের জন্য যে রিয্ক নাযিল করেছেন, পরে তোমরা তার কিছু বানিয়েছ হারাম ও হালাল’। বল, ‘আল্লাহ কি তোমাদেরকে অনুমতি দিয়েছেন, নাকি আল্লাহর উপর তোমরা মিথ্যা রটাচ্ছ’?
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৫৯. বলুন, তোমরা আমাকে জানাও, আল্লাহ্ তোমাদের যে রিযক(১) দিয়েছেন তারপর তোমরা তার কিছু হালাল ও কিছু হারাম করেছ(২), বলুন, ‘আল্লাহ কি তোমাদেরকে এটার অনুমতি দিয়েছেন, নাকি তোমরা আল্লাহর উপর মিথ্যা রটনা করছ?(৩)
তাইসীরুল ক্বুরআন: বল-তোমরা কি ভেবে দেখেছ আল্লাহ যে রিযক তোমাদের জন্য পাঠিয়েছেন, তোমরা তার কতকগুলোকে হারাম আর কতককে হালাল করে নিয়েছ। বল, আল্লাহ কি তোমাদেরকে এর অনুমতি দিয়েছেন? না তোমরা আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছ?
আহসানুল বায়ান: (৫৯) তুমি বল, ‘আচ্ছা বল তো, আল্লাহ তোমাদের জন্য যে রুযী অবতীর্ণ করেছেন, অতঃপর তোমরা তার কিছুকে বৈধ ও কিছুকে অবৈধ করে নিয়েছ’;[1] বল, ‘আল্লাহ কি তোমাদেরকে (তার) অনুমতি দিয়েছেন, নাকি তোমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করছ?’
মুজিবুর রহমান: তুমি বলঃ আল্লাহ তোমাদের জন্য যা কিছু রিয্ক পাঠিয়েছিলেন, অতঃপর তোমরা ওর কতক অংশ হারাম এবং কতক অংশ হালাল সাব্যস্ত করে নিলে; তুমি জিজ্ঞেস করঃ আল্লাহ কি তোমাদেরকে অনুমতি দিয়েছেন, না কি তোমরা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করছ?
ফযলুর রহমান: বল, “আমাকে বল তো, আল্লাহ তোমাদের জন্য যে জীবিকা দান করেছেন তোমরা তার মধ্যে কিছু হারাম ও কিছু হালাল সাব্যস্ত করলে!” বল, “আল্লাহ কি তোমাদেরকে (এটা করার) অনুমতি দিয়েছেন, নাকি তোমরা আল্লাহর নামে মিথ্যা বানিয়ে বলছ?”
মুহিউদ্দিন খান: বল, আচ্ছা নিজেই লক্ষ্য করে দেখ, যা কিছু আল্লাহ তোমাদের জন্য রিযিক হিসাবে অবতীর্ণ করেছেন, তোমরা সেগুলোর মধ্য থেকে কোনটাকে হারাম আর কোনটাকে হালাল সাব্যস্ত করেছ? বল, তোমাদের কি আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, নাকি আল্লাহর উপর অপবাদ আরোপ করছ?
জহুরুল হক: বলো -- "তোমরা কি দেখেছ আল্লাহ্ তোমাদের জন্য জীবিকা থেকে কত কি পাঠিয়েছেন, তারপর তোমরা তার কিছু হারাম ও হালাল বানিয়েছে?" বলো -- "আল্লাহ্ কি তোমাদের জন্য অনুমতি দিয়েছেন, না তোমরা আল্লাহ্র প্রতি মিথ্যারোপ করছো?"
Sahih International: Say, "Have you seen what Allah has sent down to you of provision of which you have made [some] lawful and [some] unlawful?" Say, "Has Allah permitted you [to do so], or do you invent [something] about Allah?"
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৫৯. বলুন, তোমরা আমাকে জানাও, আল্লাহ্– তোমাদের যে রিযক(১) দিয়েছেন তারপর তোমরা তার কিছু হালাল ও কিছু হারাম করেছ(২), বলুন, ‘আল্লাহ কি তোমাদেরকে এটার অনুমতি দিয়েছেন, নাকি তোমরা আল্লাহর উপর মিথ্যা রটনা করছ?(৩)
তাফসীর:
(১) আয়াত নাযিল হওয়া সম্পর্কে ইবন আব্বাস বলেন, জাহেলী যুগে তারা কিছু জিনিস-কাপড় ইত্যাদি নিজেদের উপর হারাম করে নিয়েছিল, সেটার সংবাদই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতে প্রদান করেছেন। তারপর আল্লাহ অন্য আয়াতে সেটার ব্যাপারে বলেছেন, “বলুন, কে তোমাদের উপর সে সব বস্তু হারাম করেছেন যেগুলো আল্লাহ বান্দাদের জন্য বের করেছেন?” [সূরা আল-আরাফ: ৩২] [তাবারী]
মূলত: রিযিক শব্দটি নিছক খাদ্যের অর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং রকমারি দান, অনুদানও এর আওতাভুক্ত রয়েছে। আল্লাহ দুনিয়ায় মানুষকে যা কিছু দিয়েছেন তা সবই তার রিযিক। এমনকি সন্তান-সন্ততিও রিযিক। হাদীসে বলা হয়েছে, আল্লাহ প্রত্যেক গর্ভবতীর পেটে একজন ফেরেশতা পাঠান। তিনি শিশুর রিযিক এবং তার আয়ু ও কর্ম লিখে দেন। [দেখুন, বুখারীঃ ৩০৩৬] এখানে রিযিক মানে শুধু খাদ্য নয়, যা ভূমিষ্ঠ হবার পরে এ শিশু লাভ করবে। বরং এ দুনিয়ায় তাকে যা কিছু দেয়া হবে সবই রিযিকের অন্তর্ভুক্ত। কুরআনে বলা হয়েছেঃ “যা কিছু আমি তাদের রিযক দিয়েছি তা থেকে তারা খরচ করে।” [সূরা আল-বাকারাহঃ ৩]
(২) অর্থাৎ তোমরা যে এটা কতবড় মারাত্মক বিদ্রোহাত্মক অপরাধ করছে তার কোন অনুভূতিই তোমাদের নেই। রিযিকের মালিক আল্লাহ। তোমরা নিজেরাও আল্লাহর অধীন। এ অবস্থায় আল্লাহর সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ এবং তা ব্যবহার ও ভোগ করার জন্য তার মধ্যে বিধি-নিষেধ আরোপ করার অধিকার তোমরা কোথা থেকে পেলে? বিধি-নিষেধ তো তিনিই দেবেন। তিনিই হালাল বা হারামকারী, অন্য কেউ নয়। আর তা তাঁর রাসূলের মাধ্যমেই আসতে পারে। [ফাতহুল কাদীর]
(৩) আবুল আহওয়াছ আউফ ইবনে মালেক ইবনে নাদলাহ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট খুব অবিন্যস্ত অবস্থায় আসলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেনঃ “তোমার কি সম্পদ আছে? আমি বললামঃ হ্যাঁ, তিনি বললেনঃ কি সম্পদ? আমি বললামঃ সবধরণের সম্পদ, উট, দাস, ঘোড়া এবং ছাগল। তখন তিনি বললেনঃ আল্লাহ যদি তোমাকে কোন সম্পদ দিয়ে থাকেন তবে তা তোমার নিকট দেখা যাওয়া উচিত।” এরপর আরো বললেনঃ “তোমার সম্প্রদায়ের উটের বাচ্চা সুস্থ কান সম্পন্ন হওয়ার পরে তুমি ক্ষুর নিয়ে সেগুলোর কান কেটে বল না যে, এগুলো বুহুর? এবং সেগুলো ফাটিয়ে দিয়ে বা সেগুলোর চামড়া ফাটিয়ে তুমি কি বলনা যে, এগুলোঃ ছুরম? আর এতে করে তুমি সেগুলোকে তোমার এবং তোমার পরিবারের জন্য হারাম বানিয়ে নাও না? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ “আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন তা অবশ্যই তোমার জন্য হালাল। আল্লাহর বাহুর ক্ষমতা তোমার বাহুর ক্ষমতা থেকে নিঃসন্দেহে বেশী শক্তিশালী, আর আল্লাহর ক্ষুর তোমার ক্ষুরের চাইতে ধারালো”। [মুসনাদে আহমাদঃ ৪/৪৭৩] সুতরাং কোন হালাল বস্তুকে হারাম করার ক্ষমতা মানুষকে আল্লাহ দেন নি। তারপর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে আখেরাতের কঠিন ভয় দেখিয়ে এরূপ কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিচ্ছেন।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: (৫৯) তুমি বল, ‘আচ্ছা বল তো, আল্লাহ তোমাদের জন্য যে রুযী অবতীর্ণ করেছেন, অতঃপর তোমরা তার কিছুকে বৈধ ও কিছুকে অবৈধ করে নিয়েছ’;[1] বল, ‘আল্লাহ কি তোমাদেরকে (তার) অনুমতি দিয়েছেন, নাকি তোমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করছ?’
তাফসীর:
[1] এখানে মুশরিকরা যে সকল পশুকে তাদের মূর্তির নামে উৎসর্গ করে নিজেদের জন্য তা হারাম করে নিত, সেই সকল পশুকে হারাম বা অবৈধ করার কথা বুঝানো হয়েছে। সূরা আন্আমে এর বিস্তারিত আলোচনা পার হয়ে গেছে।
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: ৫৯-৬০ নং আয়াতের তাফসীর:
প্রথম আয়াতে মক্কার মুশরিকদের কিছু বিশ্বাস ও কর্মকে খণ্ডন করা হয়েছে। তারা কিছু কিছু প্রাণীর নামকরণ করে যেমন বাহিরাহ, সায়েবাহ, হাম ইত্যাদি পশুকে তাদের মূর্তির নামে উৎসর্গ করে নিজেদের জন্য তা হারাম করে নিত। আবার কিছু কিছু ফসলের কিছু অংশ মূর্তির নামে রেখে দিত এবং কিছু অংশ আল্লাহ তা‘আলার জন্য নির্ধারণ করত। এভাবে আল্লাহ তা‘আলার দেয়া পবিত্র রিযিককে নিজেদের ইচ্ছামত যা খুশি হালাল করে নিত এবং যা খুশি হারাম করে নিত। এই সম্পর্কে সূরা আন‘য়ামের ১৩৬ নং আয়াতে আলোচনা রয়েছে।
আউফ বিন মালেক বিন নায়লা, তিনি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: একদা আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আগমন করি। ঐ সময় আকৃতি ও পোশাক পরিচ্ছদের দিক থেকে আমার অবস্থা ভাল ছিল না। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন: তোমার কি কোন ধন-সম্পদ নেই? আমি বললাম: হ্যাঁ, আছে। তিনি পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, কী সম্পদ আছে? আমি বললাম: সব প্রকারের সম্পদ আছে। যেমন উট, দাস-দাসী, ঘোড়া এবং বকরী। আল্লাহ তা‘আলা যেহেতু তোমাকে সম্পদ দিয়েছেন সেহেতু তিনি তার নিদর্শন তোমার গায়ে দেখতে চান। অতঃপর তিনি বললেন: তোমাদের উটনীর বাচ্চা হয়, ওর সমস্ত অঙ্গ-প্রতঙ্গ নিখুঁত হয়, কিন্তু তোমরা ক্ষুর দিয়ে ওর কান কেটে থাক। আর ওটাকে বলে থাকো বাহায়ের। ওর চামড়া চিরে দাও আর বল সরম। এসব করে নিজেদের ওপর এমন কি পরিবারের ওপর হারাম করে নাও। এটা সত্য নয়কি? আমি বললাম; হ্যাঁ, সত্য। এরপর তিনি বললেন: জেনে রেখ, আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে যা কিছু দান করেছেন তা সবসময়ের জন্য হালাল। কক্ষনো হারাম হতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলার হাত তোমাদের হাত অপেক্ষা অনেক শক্তিশালী। আল্লাহ তা‘আলার চাকু তোমাদের চাকু অপেক্ষা বহুগুণে তীক্ষè। (তিরমিযী হা: ২০০৬, সহীহ)
তাই আল্লাহ তা‘আলা বলছেন: তোমরা যে এসব কর আল্লাহ তা‘আলা কি তার অনুমতি দিয়েছেন, না তোমরা তাঁর প্রতি অপবাদ দিয়ে থাকো। এটা জানা কথা আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে এসব করার অনুমতি দেননি। তারাই আল্লাহ তা‘আলার ওপর অপবাদ দিয়ে এসব করে থাকে।
পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে কিয়ামত দিবসের শাস্তির ভয় প্রদর্শন করে বলেন, যারা আল্লাহ তা‘আলার ওপর মিথ্যা আরোপ করে, কিয়ামতের দিন সম্পর্কে তাদের ধারণা কী? আমি তাদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করব, তারা কি ভেবেছে আমি তাদের জন্য এসব অপবাদের উপযুক্ত ব্যবস্থা নেব না? সময়ই কথা বলে দেবে। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দার প্রতি অনুগ্রহশীল। আর এই অনুগ্রহের কারণে তিনি দুনিয়াতে মানুষকে পাপের জন্য শাস্তি দেন না; বরং তাদের জন্য একটি দিন নির্ধারিত করে রেখেছেন। অথবা এর অর্থ এও হতে পারে যে, তিনি পার্থিব নেয়ামত বিনা পার্থক্যে মু’মিন ও কাফির সকলকে প্রদান করেন। অথবা যে বস্তু মানুষের জন্য উপকারী তা হালাল করেছেন এবং যে বস্তু মানুষের জন্য ক্ষতিকর তা হারাম করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ আল্লাহ তা‘আলার নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে না। সুতরাং নিজের খেয়াল-খুশি মত যা ইচ্ছা শরীয়ত বানিয়ে নেব তা হতে পারে না। বরং আল্লাহ তা‘আলা যা শরীয়তসিদ্ধ করে দিয়েছেন তাই গ্রহণ করে নিতে হবে এবং সেভাবে ইবাদত করতে হবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. আল্লাহ তা‘আলার হালালকৃত বস্তু হারাম এবং হারামকৃত বস্তুকে হালাল করা যাবে না।
২. দীনের মধ্যে নিজের পক্ষ থেকে কিছু তৈরি করে প্রবেশ করানো বা বাদ দেয়া যাবে না।
৩. আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় বান্দার প্রতি স্নেহপরায়ণ, তিনি জুলুম করেন না।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ৫৯-৬০ নং আয়াতের তাফসীর:
ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), যহ্হাক (রঃ), কাতাদা (রঃ), আবদুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) প্রমুখ মনীষীগণ বলেন যে, মুশরিকরা কতকগুলো জন্তুকে ‘বাহায়ের ‘সাওয়ায়েব' এবং ‘আসায়েল’ নামে নামকরণ করে কোনটাকে নিজেদের উপর হালাল এবং কোনটাকে হারাম করে নিতো, এখানে এটাকেই খণ্ডন করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “জমি হতে যা উৎপন্ন হয় এবং যেসব পশুর জন্ম হয়, তা থেকে তারা একটা অংশ আল্লাহর জন্যে নির্ধারণ করে।”
আবুল আহওয়াস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি হচ্ছেন আউফ ইবনে মালিক ইবনে নালা, তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গমন করি। ঐ সময় আকৃতি ও পোশাক পরিচ্ছদের দিক দিয়ে আমার অবস্থা ভাল ছিল না। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার কি কোন ধন-সম্পদ নেই?” আমি উত্তরে বললামঃ হ্যা আছে। তিনি পুনরায় প্রশ্ন করলেনঃ “কি মাল আছে?” আমি জবাব দিলামঃ সর্বপ্রকারের মাল রয়েছে। যেমন, উট, দাসদাসী, ঘোড়া এবং বকরী। তখন তিনি বলেনঃ “যখন তিনি তোমাকে মালধন দান করেছেন, তখন তিনি তার নিদর্শন তোমার উপর দেখতে চান।` অতঃপর তিনি বললেনঃ “তোমাদের উস্ত্রীর বাচ্চা হয়। ওর সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ভাল ও নিখুঁত হয়। কিন্তু তোমরাই ক্ষুর উঠিয়ে নিয়ে ওর কান কেটে দিয়ে থাকো। আর এটাকে বলে থাকো ‘বাহায়ের'? তোমরা ওর চামড়া চিরে দাও এবং ওকে বলে থাকো সরম। তোমরা এগুলো নিজেদের উপরও হারাম করে নাও এবং পরিবারবর্গের জন্যেও। এটা সত্য নয় কি?” আমি বললামঃ হ্যাঁ, সত্য। এরপর তিনি বললেনঃ “জেনে রেখো যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে যা কিছু দান করেছেন, তা সর্বসময়ের জন্যে হালাল। কখনও তা হারাম হতে পারে না। আল্লাহর হাত তোমাদের হাত অপেক্ষা অনেক বেশী শক্তিশালী। আল্লাহর চাকু তোমাদের চাকু অপেক্ষা বহুগুণে তীক্ষ্ণ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
আল্লাহ তাআলা ঐ লোকদের প্রতি নিজের কঠিন অসন্তুষ্টির কথা প্রকাশ করছেন, যারা তাঁর হালালকে নিজেদের উপর হারাম করে নেয় এবং তাঁর হারামকে নিজেদের জন্যে হালাল বানিয়ে নেয়। আর এটা শুধু নিজেদের ব্যক্তিগত মত ও প্রবৃত্তির উপর ভিত্তি করেই করে থাকে, যার কোন দলীল নেই।
এরপর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে কিয়ামত দিবসের শাস্তি হতে ভয় প্রদর্শন করছেন। তিনি বলছেন, যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে, কিয়ামতের দিন আমি তাদের সাথে কিরূপ ব্যবহার করবো এ সম্পর্কে তাদের ধারণা কি?
(আরবী) অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহ লোকদের উপর বড়ই অনুগ্রহশীল। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এটা ছেড়ে দেয়ার মধ্যে যেন দুনিয়াতেই তাদেরকে শাস্তি দিয়ে চিকিৎসা করা উদ্দেশ্য। আমি বলি- এটাও উদ্দেশ্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা লোকদের উপর বড়ই অনুগ্রহশীল। কেননা, তিনি দুনিয়ায় তাদের জন্যে এমন বহু জিনিস হালাল করেছেন, যেগুলো পেয়ে তারা আনন্দিত হয় এবং তাদের জন্যে সেগুলো উপকারী। পক্ষান্তরে তিনি মানুষের জন্যে এমন জিনিস হারাম করেছেন, যেগুলো তাদের জন্যে সরাসরি ক্ষতিকর ছিল। এটা হয় দ্বীনের দিক দিয়েই হাক, না হয় দুনিয়ার দিক দিয়েই হাক। কিন্তু অধিকাংশ লোকই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। অর্থাৎ তারা আল্লাহর দেয়া নিয়ামতগুলো নিজেদের উপর হারাম করে নিচ্ছে এবং নফসের উপর সংকীর্ণতা আনয়ন করছে। এটা এইরূপে যে, নিজেদের পক্ষ থেকে কোন জিনিস হালাল করছে এবং কোন জিনিস হারাম করছে। মুশরিকরা এটাকে নিজেদের মধ্যে বহুল পরিমাণে প্রকাশ করেছে এবং একরূপ পন্থাই বানিয়ে নিয়েছে। যদিও আহলে কিতাবের মধ্যে এটা ছিল না, কিন্তু এখন তারাও এই বিদআত চালু করে দিয়েছে। মূসা ইবনে সাবাহ হতে, (আরবী) -এই উক্তির ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, কিয়ামতের দিন তিন প্রকারের আল্লাহওয়ালা লোককে পেশ করা হবে। আল্লাহ তা'আলা তাদের মধ্যে প্রথম প্রকারের লোককে জিজ্ঞেস করবেনঃ “হে আমার বান্দা! কি উদ্দেশ্যে তুমি ভাল কাজ করেছিলে?` উত্তরে সে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনি জান্নাত তৈরী করেছেন এবং তার মধ্যে বাগান, ফলমূল, বৃক্ষলতা, নদ-নদী, হুর ও প্রাসাদ এবং অনুগত বান্দাদের জন্যে সর্বপ্রকারের নিয়ামত সরবরাহ করে রেখেছেন। ঐগুলো লাভ করার আশাতেই আমি রাত্রি জেগে জেগে আপনার ইবাদত করেছি ও সারা দিন রোযা রেখেছি।” তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “তুমি যখন জান্নাত লাভের আশাতেই এসব আমল করেছো, তখন যাও, জান্নাতই তোমার ঠিকানা। কিন্তু এটা তোমার আমলের বিনিময়ে নয়। আমি তোমাকে জাহান্নাম হতে মুক্তি দিলাম। এটা আমার অনুগ্রহ। আর তোমাকে আমি জান্নাতে প্রবিষ্ট করছি আর এটাও আমার অনুগ্রহ।” তখন সে এবং তার সঙ্গীরা জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারপর দ্বিতীয় প্রকারের লোককে হাযির করা হবে। তাকে আল্লাহ তা'আলা জিজ্ঞেস করবেনঃ “হে আমার বান্দা! তুমি কেন ভাল কাজ করেছিলে?” উত্তরে সে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনি জাহান্নাম তৈরী করেছেন এবং তার মধ্যে রেখেছেন জিঞ্জির, লু-হাওয়া ও গরম পানি। নাফরমান বান্দাদের জন্যে সেখানে সর্বপ্রকারের শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন। আমি এই জাহান্নাম হতে রক্ষা পাওয়ার আশাতেই রাত্রি জেগে জেগে ইবাদত করেছি এবং সারা দিন রোযা রেখেছি।” তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেনঃ “তুমি যখন জাহান্নামের ভয়ে ভাল কাজ করেছে, তখন আমি তোমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিলাম। তারপর এটা অতিরিক্ত অনুগ্রহ যে, তোমাকে আমি জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়ার পর জান্নাতও দান করলাম।” সুতরাং সে এবং তার সাথীরা জান্নাতে প্রবেশ করবে। অতঃপর তৃতীয় প্রকারের লোককে পেশ করা হবে। তাকেও আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেনঃ “হে আমার বান্দা! তুমি কেন ভাল কাজ করেছিলে।” সে উত্তরে বলবেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আমি শুধু আপনার প্রতি প্রেম ও মহব্বতের কারণে আপনার ইবাদত করেছি। আমি রাত জেগে জেগে ইবাদত করেছি এবং ক্ষুধা ও পিপাসা সহ্য করে সারা দিন রোযা রেখেছি একমাত্র আপনার সাথে সাক্ষাৎ লাভের আশায় এবং আপনার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।” তখন মহান আল্লাহ তাকে বলবেনঃ “তুমি যখন আমার মহব্বতে ও আমার সাথে সাক্ষাৎ লাভের উদ্দেশ্যে এরূপ করেছে, তখন আমি তোমার সামনে আমার ঔজ্জ্বল্য প্রকাশ করছি। তুমি এখন আমাকে মন ভরে দেখে নাও এবং চক্ষু জুড়িয়ে নাও। তুমি সর্বাপেক্ষা বড় সম্পদ লাভ করলে।” এরপর তিনি তাকে বলবেনঃ “আমি আমার অনুগ্রহের বদৌলতে তোমাকে জাহান্নাম থেকেও মুক্তি দিচ্ছি এবং জান্নাতেও প্রবিষ্ট করছি। আমার ফিরিশতামণ্ডলী তোমার পাশে হাযির থাকবে এবং আমি স্বয়ং তোমার উপর আমার শান্তি বর্ষণ করতে থাকবো।” সুতরাং সে ও তার সঙ্গীরা জান্নাতে প্রবেশ করবে। (ইবনে আবি হাতিমই (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে এটা বর্ণনা করেছেন)
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।