সূরা আল-মাঊন (আয়াত: 4)
হরকত ছাড়া:
فويل للمصلين ﴿٤﴾
হরকত সহ:
فَوَیْلٌ لِّلْمُصَلِّیْنَ ۙ﴿۴﴾
উচ্চারণ: ফাওয়াইঁলুলিলল মুসাল্লীন।
আল বায়ান: অতএব সেই সালাত আদায়কারীদের জন্য দুর্ভোগ,
আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া: ৪. কাজেই দুর্ভোগ সে সালাত আদায়কারীদের,
তাইসীরুল ক্বুরআন: অতএব দুর্ভোগ সে সব নামায আদায়কারীর
আহসানুল বায়ান: ৪। সুতরাং পরিতাপ সেই নামায আদায়কারীদের জন্য;
মুজিবুর রহমান: সুতরাং পরিতাপ সেই সালাত আদায়কারীদের জন্য –
ফযলুর রহমান: অতএব, দুর্ভোগ সেই নামাযীদের জন্য
মুহিউদ্দিন খান: অতএব দুর্ভোগ সেসব নামাযীর,
জহুরুল হক: অতএব ধিক্ সেইসব নামায-পড়ুয়াদের প্রতি --
Sahih International: So woe to those who pray
তাফসীরে যাকারিয়া
অনুবাদ: ৪. কাজেই দুর্ভোগ সে সালাত আদায়কারীদের,
তাফসীর:
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
অনুবাদ: ৪। সুতরাং পরিতাপ সেই নামায আদায়কারীদের জন্য;
তাফসীর:
-
তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ
তাফসীর: নামকরণ :
অত্র সূরার সর্বশেষ আয়াতে উল্লিখিত الْمَاعُوْنَ মাউন শব্দ থেকেই সূরার নামকরণ করা হয়েছে। এ ছাড়াও এ সূরাকে সূরা আদ-দীন ও সূরা ইয়াতীম নামেও আখ্যায়িত করা হয়। (ফাতহুল কাদীর)
সূরায় কাফিরদের দুটি বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য ও আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত মুসল্লিদের তিনটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে।
أَرَأَيْتَ ক্রিয়া দ্বারা নাবী (সাঃ)-কে সম্বোধন করা হয়েছে। মূলত প্রশ্নবোধক বাক্য দ্বারা বিস্ময় প্রকাশ করা হয়েছে। أَرَأَيْتَ অর্থ ألم تعلم তুমি কি জানো? মূলত এর দ্বারা শ্রোতাকে বক্তব্যের প্রতি উৎসাহ প্রদান ও আকৃষ্ট করা হচ্ছে। يُكَذِّبُ অর্থ মিথ্যা প্রতিপন্ন করা।
الدِّيْنِ দ্বারা আখিরাতকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ যারা পুনরুত্থান, হিসাব, প্রতিদান ইত্যাদিসহ আখিরাতের ব্যাপারে নাবী রাসূলগণ যে সংবাদ দিয়েছেন তা অস্বীকার করে।
(يَدُعُّ الْيَتِيْمَ) يَدُعُّ
ক্রিয়ার অর্থ হলো: دع বা রূঢ় আচরণ করে হাঁকিয়ে দেয়া। দুনিয়াতে অবিশ্বাসীরা ইয়াতীমদের তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করত : রূঢ় আচরণের সাথে হাঁকিয়ে দিত এবং তাদের প্রতি জুলুম করত, খাদ্য দেওয়া তো দূরের কথা তাদের সাথে ভাল ব্যবহারও করত না।
আরেকটি অর্থ হল গলাধাক্কা দেয়া। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(يَوْمَ يُدَعُّوْنَ إِلٰي نَارِ جَهَنَّمَ دَعًّا)
“সেদিন তাদেরকে চরমভাবে ধাক্কা মারতে মারতে নিয়ে যাওয়া হবে জাহান্নামের অগ্নির দিকে”। (সূরা তুর ৫২: ১৩)
لَا يَحُضُّ عَلٰي طَعَامِ.....))
‘মিস্কীনদের খাবার দিতে কখনও সে (অন্যদের) উৎসাহ দেয় না’ যেমন আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:
(كَلَّا بَلْ لَّا تُكْرِمُوْنَ الْيَتِيْمَ وَلَا تَحَآضُّوْنَ عَلٰي طَعَامِ الْمِسْكِيْنِ )
“কক্ষনও নয়, বরং তোমরা ইয়াতীমকে সম্মান কর না। এবং মিসকীনকে অন্নদানে পরস্পরকে উৎসাহিত কর না।” (সূরা ফাজর ৮৯: ১৭-১৮)
সুতরাং ইয়াতীমদের দেখাশুনা করা এবং তাদের প্রয়োজনা পূরণ করা ঈমানের দাবী।
অতঃপর যে-সব মুসল্লিরা সালাতের ব্যাপারে উদাসীন তাদের কঠিন ধমক ও জাহান্নামের হুমকি দেয়া হয়েছে।
(عَنْ صَلٰوتِهِمْ سَاهُوْنَ)
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন : এরা হচ্ছে মুনাফিক অর্থাৎ যারা সকলের সাথে থাকলে সালাত আদায় করে কিন্তু একাকী বা গোপনে থাকলে সালাতের ধার ধারে না। এজন্য আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন : لِّلْمُصَلِّيْنَ অর্থাৎ যারা সালাত আদায়কারী এবং সালাতের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল কিন্তু পরবর্তীতে সালাতের ব্যাপারে অলসতা প্রর্দশন করতঃ হয় সালাত সম্পূর্ণ বর্জন করে অথবা শরীয়ত নির্ধারিত সময়ে আদায় না করে অথবা সালাত রাসূলের শেখানো পদ্ধতিতে আদায় না করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(فَخَلَفَ مِنْ ۭبَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلٰوةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا)
“তাদের পরে এলো অপদার্থ পরবর্তীগণ, তারা সালাত নষ্ট করল ও কুপবৃত্তির অনুসরণ করল। সুতরাং তারা অচিরেই কুকর্মের শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে।” (সূরা মারইয়াম ১৯: ৫৯)
তাই প্রসিদ্ধ তাবেয়ী মাসরূক, আবূ যুহা ও আতা বিন দীনার (রহঃ) বলেছেন : আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা তিনি
(عَنْ صَلٰوتِهِمْ سَاهُوْنَ)
এ কথা বলেছেন,
فِيْ صَلٰوتِهِمْ سَاهُوْنَ
বলেননি। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার এ কথার অর্থ হলো : তারা সালাতের ব্যাপারে উদাসীন। সালাতের মাঝে উদাসীন এ কথা বলেননি। কেননা যারা সালাতের ব্যাপারে উদাসীন তারা হয়তো নিয়মিত বা অনিয়মিতভাবেই সালাতের উত্তম সময় থেকে বিলম্ব করে মাকরূহ সময়ে আদায় করে, আবার হয়তো বিনয় নম্রতাসহ সালাতের রুকন-আরকান ও শর্তসমূহ ভালভাবে আদায় করে না। তাই নাবী (সাঃ) বলেন : ওটা মুনাফিকের সালাত (তিনবার বলেছেন)। সে সূর্য অস্তমিত যাওয়ার প্রতিক্ষায় বসে থাকে, সূর্য অস্ত যেতে শুরু করে এমনকি তা শয়তানের দুশিং এর মাঝামাঝি চলে যায় তখন সে দাঁড়িয়ে চারটি ঠোকর মারে। অল্প সময় ছাড়া তারা আল্লাহ তা‘আলাকে স্মরণই করে না। (সহীহ মুসলিম হা. ১৪৪৩)
يُرَآؤُوْنَ অর্থাৎ এ শ্রেণির লোকেরা মানুষকে দেখানোর জন্য সালাত আদায় করে; আল্লাহ তা‘আলার সন্তষ্টির জন্য করে না। তাই সবার সাথে থাকলে চক্ষু লজ্জায় সালাত আদায় করে, আর গোপনে চলে গেলে সালাতের প্রয়োজন বোধ করে না। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(اِنَّ الْمُنٰفِقِیْنَ یُخٰدِعُوْنَ اللہَ وَھُوَ خَادِعُھُمْﺆ وَاِذَا قَامُوْٓا اِلَی الصَّلٰوةِ قَامُوْا کُسَالٰیﺫ یُرَا۬ءُوْنَ النَّاسَ وَلَا یَذْکُرُوْنَ اللہَ اِلَّا قَلِیْلًا)
“নিশ্চয়ই মুনাফিকরা আল্লাহর সঙ্গে ধোঁকাবাজি করে; বস্তুত তিনি তাদেরকে ধোঁকায় ফেলে শাস্তি দেন, আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন শৈথিল্যের সঙ্গে দাঁড়ায় কেবল লোক দেখানোর জন্য এবং আল্লাহকে তারা অল্পই স্মরণ করে।” (সূরা নিসা ৪: ১৪২)
রাসূলুল্লাহ বলেছেন :
مَنْ سَمَّعَ سَمَّعَ اللَّهُ بِهِ ، وَمَنْ يُرَائِي يُرَائِي اللَّهُ بِه۪
যে ব্যক্তি লোকদের শুনানোর জন্য কাজ করে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে দিয়েই তা শুনিয়ে দেন। আর যে ব্যক্তি লোকদের দেখানোর জন্য কাজ করে, আল্লাহ তা‘আলা তার মাধ্যমে তা দেখিয়ে দেন। (সহীহ বুখারী হা. ৬৪৯৯, সহীহ মুসলিম হা. ২৯৮৬)
মূলত ইবাদত করা উচিত একাগ্রচিত্তে আল্লাহ তা‘আলার জন্যই। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন :
أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّه۫ يَرَاكَ
তুমি এমনভাবে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করবে যেন তুমি আল্লাহ তা‘আলাকে দেখতে পাচ্ছ, আর তা না পারলে এমন বিশ্বাস নিয়ে ইবাদত করবে যে, তিনি তোমাকে দেখছেন। (সহীহ বুখারী হা. ৫০, সহীহ মুসলিম হা. ১০২)
সুতরাং আমল করতে হবে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকে পাওয়ার জন্য, কোন ব্যক্তির সন্তুষ্টি হাসিলের জন্য আমল করলে তা কখনও গ্রহণযোগ্য হবে না, বরং এমন আমলের জন্য গুনাহগার হতে হবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
(وَقَدِمْنَآ إِلٰي مَا عَمِلُوْا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنٰهُ هَبَا۬ءً مَّنْثُوْرًا)
“আমি তাদের কৃতকর্মের দিকে অগ্রসর হব, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করব।” (সূরা ফুরকান ২৫: ২৩)
(يَمْنَعُوْنَ الْمَاعُوْنَ)
শব্দের অর্থ সামান্য, ছোটখাট জিনিস। অর্থাৎ ওপরে বর্ণিত শ্রেণির লোকেরা এমন সব জিনিস দিতেও কার্পণ্য করে যা দিলে তার কোন ক্ষতি হবে না। যেমন পাত্র, বালতি, পেয়ালা ইত্যাদি নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস। যে ব্যক্তি সামান্য জিনিস দিতে কার্পণ্য করে সে বেশি জিনিস তো কখনই দেবে না। (তাফসীর সা‘দী)
অতএব প্রত্যেক মুসলিমের ভেবে দেখা উচিত, তার মাঝে এসব দোষগুলো আছে কিনা। যদি থাকে তাহলে তাওবা করে ফিরে আসা উচিত। আর তাওবা না করলে আখিরাতে অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে।
আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:
১. ইয়াতীম ও মিসকীনদের খাদ্য খাওয়ানোর প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হচ্ছে।
২. যারা সালাতের ব্যাপারে অমনোযোগী তাদের সতর্ক করা হচ্ছে।
৩. লোক দেখানো আমল আল্লাহ তা‘আলার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
৪. সৎ কাজের প্রতি উৎসাহী হওয়া দরকার।
৫. সালাতের ব্যাপারে উদাসীন ব্যক্তিদের জন্য দুর্ভোগ।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (তাহক্বীক ছাড়া)
তাফসীর: ঐ সূরার তাফসীর যার মধ্যে মাঊন (গৃহস্থালীর প্রয়োজনীয় ছোট খাট জিনিস) এর বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং এটা মক্কী।
১-৭ নং আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে বলেনঃ হে মুহাম্মদ (সঃ)! তুমি কি ঐ লোকটিকে দেখেছো যে প্রতিফল দিবসকে অবিশ্বাস করে? সেতো ঐ ব্যক্তি যে ইয়াতীমকে ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয় এবং অভাবগ্রস্তকে আহার্যদানে উৎসাহ প্রদান করে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেছেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “না, কখনই নয়। বস্তুতঃ তোমরা ইয়াতীমকে সম্মান কর না এবং তোমরা অভাবগ্রস্তদেরকে খাদ্য দানে পরস্পরকে উৎসাহিত কর না।” (৮৯:১৭-১৮) অর্থাৎ ঐ ভিক্ষুককে, যে প্রয়োজন অনুপাতে ভিক্ষা পায় না।
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ সুতরাং দুর্ভোগ ঐ নামাযীদের যারা নিজেদের নামায সম্বন্ধে উদাসীন। অর্থাৎ সর্বনাশ রয়েছে ঐসব মুনাফিকের জন্যে যারা লোকদের সামনে নামায আদায় করে, কিন্তু অন্য সময় করে না। অর্থাৎ লোক দেখানোই তাদের নামায আদায়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ অর্থই করেছেন। এ অর্থও করা হয়েছে যে, তারা নির্দিষ্ট সময় পার করে দেয়। মাসরূক (রঃ) এবং আবু যুহা (রঃ) এ কথা বলেছেন।
হযরত আতা ইবনে দীনার (রঃ) বলেনঃ আল্লাহর শুকরিয়া যে, তিনি (আরবি) বলেছেন, (আরবি) বলেননি। অর্থাৎ আল্লাহপাক বলছেন যে, তারা নামাযের ব্যাপারে উদাসীন থাকে, নামাযের মধ্যে গাফিল বা উদাসীন থাকে এরূপ কথা বলেননি। আবার এ শব্দেই এ অর্থও রয়েছে যে, এমন নামাযীদের জন্যেও সর্বনাশ রয়েছে যারা সব সময় শেষ সময় নামায আদায় করে। অথবা আরকান আহকাম আদায়ের ব্যাপারে মনোযোগ দেয় না। রুকু সিজদার ব্যাপারে উদাসীনতার পরিচয় দেয়। এসব কিছু যার মধ্যে রয়েছে সে নিঃসন্দেহে দুর্ভাগা। যার মধ্যে এসব অন্যায় যতো বেশী রয়েছে সে ততো বেশী সর্বনাশের মধ্যে পতিত হয়েছে। তার আমল ততো বেশী ক্রটিপুর্ণ এবং ক্ষতিকারক।
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ওটা মুনাফিকের নামায, ওটা মুনাফিকের নামায, ওটা মুনাফিকের নামায, যে সূর্যের প্রতীক্ষায় বসে থাকে, সূর্য অস্ত যেতে শুরু করলে শয়তান যখন তার শিং মিলিয়ে দেয় তখন এ ব্যক্তি দাঁড়িয়ে মোরগের মত চারটি ঠোকর মারে। তাতে আল্লাহর স্মরণ খুব কমই করে।` এখানে আসরের নামাযকে বুঝানো হয়েছে। এ নামাযকে “সালাতুল ভূসতা” বা মধ্যবর্তী নামায বলে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লিখিত ব্যক্তি মাকরূহ সময়ে উঠে দাড়ায় এবং কাকের মত ঠোকর দেয়। তাতে আরকান, আহকাম, রুকু, সিজদাহ ইত্যাদি যথাযথভাবে পালন করা হয় না এবং আল্লাহর স্মরণও খুব কম থাকে। লোক দেখানো নামায আদায় করা করা একই কথা। ঐ মুনাফিকদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (আরবি)
অর্থাৎ “মুনাফিকরা আল্লাহকে ধােকা দেয় এবং তিনি তাদেরকে ধােকা (-র প্রতিফল) দেন, তারা যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন অলসতা ও উদাসীনতার সাথে দাঁড়ায়, তারা শুধু লোক দেখানোর জন্যেই নামায পড়ে থাকে এবং তারা আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে থাকে।` (৪:১৪২)।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সঃ) বলেছেনঃ (আরবি) জাহান্নামের একটি ঘাঁটির নাম। ওর আগুন এমন তেজস্বী ও গরম যে, জাহান্নামের অন্যান্য আগুন এই আগুন থেকে আল্লাহর কাছে দৈনিক চারশ’ বার আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকে। এই (আরবি) এই উম্মতের অহংকারী আলেমদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে এবং যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও গর্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে দান খায়রাত করে থাকে তাদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে। আর যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও গর্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে হজ্ব করে ও জিহাদ করে তাদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)
তবে হ্যা, এখানে স্মরণ রাখার বিষয় যে, কোন ব্যক্তি যদি সম্পূর্ণ সদুদ্দেশ্যে কোন ভাল কাজ করে, আর জনগণ তা জেনে ফেলে এবং এতে সে খুশী হয় তাহলে এটা রিয়াকারী ও অহংকার বলে গণ্য হবে না।
মুসনাদে আবী ইয়ালা মুসিলীতে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি একাকী (নফল) নামায পড়ছিলাম এমন সময় হঠাৎ করে একটি লোক আমার কাছে এসে পড়ে, এতে আমি কিছুটা আনন্দিত হই (এতে কি আমার রিয়া হবে?)” উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন “(না, না, বরং) তুমি এতে দুটি পুণ্য লাভ করবে। একটি গোপন করার পুণ্য এবং আরেকটি প্রকাশ করার পুণ্য।” ইবনে মুবারক (রঃ) বলেন যে, (এ হাদীসটি রিয়াকারদের জন্যে খুবই উত্তম। কিন্তু সনদের দিক থেকে এটা গারীব। তবে একই অর্থবোধক হাদীস অন্য সনদেও বর্ণিত আছে)
ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) একটি গারীব সনদে হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, যখন (আরবি) এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ মহান! তোমাদের প্রত্যেককে সারা পৃথিবীর সমান দেয়ার চেয়েও এটাই তোমাদের জন্যে উত্তম। এখানে ঐ ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যে নামায পড়লে কোন কল্যাণের আশা করে না এবং না পড়লেও স্বীয় প্রতিপালকের:ভয় তার মনে কোন রেখাপাত করে না।”
অন্য এক রিওয়াইয়াতে আছে যে, নবী করীম (সঃ)-কে এ আয়াতের তাৎপর্য জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “এখানে ঐ সব লোকের কথা বলা হয়েছে যারা নামায আদায়ের ব্যাপারে নির্ধারিত সময় থেকে বিলম্ব করে। এর একটি অর্থ এও রয়েছে যে, আদৌ নামায পড়ে না। অন্য একটি অর্থ এই আছে যে, শরীয়ত অনুমোদিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর নামায পড়ে। আবার এটাও অর্থ রয়েছে যে, সময়ের প্রথম দিকে নামায পড়ে না।
একটি মাওকুফ হাদীসে রয়েছে যে, হযরত সা'দ ইবনে আবী অক্কাস (রাঃ) বলেনঃ এর ভাবার্থ হলোঃ নামাযের সময়কে সংকীর্ণ করে ফেলে। এ বর্ণনাটিই সবচেয়ে নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য। ইমাম বায়হাকীও (রঃ) বলেছেন যে, মার’ রিওয়াইয়াত যঈফ বা দুর্বল এবং মাওকূফ রিওয়াইয়াত সহীহ বা বিশুদ্ধ। ইমাম হাকিমও (রঃ) একথা বলেছেন। কাজেই এসব লোক আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে যেমন অলসতা করে, তেমনি লোকদের অধিকারও আদায় করে না। তারা রিয়াকারী করে ও যাকাত দেয় না।
হযরত আলী (রাঃ) মাউন শব্দের অর্থ যাকাত পরিশোধ বলেও উল্লেখ করেছেন। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য তাফসীরকারগণও একই কথা বলেছেন। হযরত হাসান বসরী (রাঃ) বলেন যে, তাদের নামায আদায়ও রিয়াকারী ও অহংকার প্রকাশক। তাদের সম্পদের সাদকার মধ্যে রিয়া বা লোক দেখানো উদ্দেশ্য রয়েছে। হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ) বলেন যে, এই মুনাফিকরা লোক দেখানোর জন্যে নামায আদায় করে, কারণ নামায প্রকাশ্য ব্যাপার। তবে তারা যাকাত আদায় করে না, কারণ যাকাত গোপনীয় ব্যাপার। হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, মাউন ঐ সব জিনিষকে বলা হয় যা মানুষ একে অন্যের নিকট চেয়ে থাকে। যেমন কোদাল, বালতি, ডেকচি ইত্যাদি। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ মাউনের এ অর্থই বর্ণনা করেছেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, বর্ণনাকারী বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে ছিলাম এবং মাউনের আমরা এ তাফসীর করেছি।”
সুনানে নাসাঈতে হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “প্রত্যেক ভাল জিনিষই সদকা। ডোল, হাঁড়ি, বালতি ইত্যাদি দেয়াকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আমলে আমরা মাউন নামে অভিহিত করতাম। মোটকথা, এর অর্থ হলো যাকাত না দেয়া, আনুগত্য না করা, কোন জিনিষ চাইলে না দেয়া, ছোট ছোট জিনিষ কেউ কিছু সময়ের জন্যে নিতে চাইলে না দেয়া, যেমন চালুনি, কোদাল, দা, কুড়াল, ডেকচি ডোল ইত্যাদি।
একটি গারীব বা দুর্বল হাদীসে রয়েছে যে, নুমায়ের গোত্রের প্রতিনিধি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল (সঃ)! আমাদেরকে বিশেষ আদেশ কি দিচ্ছেন?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “মাউনের ব্যাপারে নিষেধ করো না। প্রতিনিধি পুনরায় প্রশ্ন করলেনঃ “মাঊন কি?” তিনি জবাব দিলেনঃ “পাথর, লোহা, পানি।” প্রতিনিধি জিজ্ঞেস করলেনঃ “লোহা দ্বারা কোন লোহাকে বুঝানো হচ্ছে?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “মনে কর, তোমাদের তামার পাতিল, লোহার কোদাল ইত্যাদি। প্রতিনিধি প্রশ্ন করলেনঃ “পাথরের অর্থ কি?” রাসূলুল্লাহ বললেনঃ “ডেকচি, শীলবাটা ইত্যাদি।” (এ হাদীসটি খুবই গরীব বা দুর্বল) এর রাভী বা বর্ণনাকারী মাশহুর’ শ্রেণীভুক্ত নন।
আলী ইবনে ফুলান নুমাইরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “মুসলমান মুসলমানের ভাই। দেখা হলে সালাম করবে, সালাম করলে ভাল জবাব দিবে এবং মাঊনের ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানাবে অর্থাৎ নিষেধ করবে না।” আলী নুমাইরী (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “মাউন কি?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “পাথর, লোহা এবং এ জাতীয় অন্যান্য জিনিষ।” এসব ব্যাপারে আল্লাহ সবচেয়ে ভাল জানেন।
সতর্কবার্তা
কুরআনের কো্নো অনুবাদ ১০০% নির্ভুল হতে পারে না এবং এটি কুরআন পাঠের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যায় না। আমরা এখানে বাংলা ভাষায় অনূদিত প্রায় ৮ জন অনুবাদকের অনুবাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমরা তাদের নির্ভুলতার গ্যারান্টি দিতে পারি না।